শিক্ষার নানাস্তরে ভর্তির জন্য নানা ধরনের ভর্তি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর জন্য নানারকম প্রস্তুতি ও ঝক্কি ঝামেলাও কম নয়। তাই অনেকেই বলে থাকেন ভর্তি যুদ্ধ। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের ভর্তি প্রতিযোগিতা মোটামুটি স্বাভাবিক লেভেলের হলেও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির যে প্রতিযোগিতা তা ভীষণভাবে লড়াই করে যাওয়ার মতো অবস্থা।
এই লড়াইয়ের লক্ষ্য বুয়েট, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানে নিজের জন্য একটি আসন জয় করা। এই জয়ের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর জন্য পরবর্তী শিক্ষাজীবন কেমন হবে তা নির্ধারিত হয় । সেই সাথে তার গোটা জীবনের ক্যারিয়ার গঠনেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। সুতরাং উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির এই সময়কালে একজন শিক্ষার্থীকে নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে নিরলসভাবে চেষ্টা, ধৈর্য নিয়ে এগুতে হয়।
নিয়মিতভাবে পরিশ্রম, অধ্যবসায় করে গেলে স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রাখার জন্য যোগ্যতা অর্জন কঠিন কিছু নয়। এজন্য শিক্ষার্থীর অভিভাবকদেরও বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হয়। শিক্ষার্থীকে মানসিক ও অর্থনৈতিক সাপোর্ট, পাঠের জন্য নিরিবিলি পরিবেশে তৈরি করা, প্রয়োজনীয় বইপত্র সংগ্রহ করে দেওয়া, সাহস ও উৎসাহ প্রদান, খাবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া, সবসময় খেয়াল রাখাসহ নানা ধরনের সহযোগিতা করা সচেতন অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এখানে একটি বিষয় বলে রাখি- আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে রয়েছে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের নির্দিষ্ট সীমারেখা। একধাপ থেকে আরেক ধাপে পদার্পণ করার আগে শিক্ষার্থীকে অবশ্যই পূর্ব ধাপের প্রান্তিক যোগ্যতাগুলো পুরোপুরিভাবে অর্জন করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে গেলে শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষা জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই শিক্ষা জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা থাকতে হয়।
এক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীর মানস গঠনের পথ সুগম হয়। আর তখন শিক্ষার্থী পরিপূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষার্থী পড়ালেখায় মনোযোগ হারাতে থাকে এবং ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। এভাবে পিছিয়ে যেতে যেতে একসময় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে, আর যারা অধ্যয়নরত থাকে তাদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার জন্য ভালো সুযোগ অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে আমার বিশেষ পর্যবেক্ষণ, উচ্চ শিক্ষায় ভর্তিচ্ছুদের প্রস্তুতি থাকতে হয় অনেক আগে থেকেই। মাধ্যমিক স্তর থেকেই শুরু করতে পারলে সবচেয়ে ভালো।
তা না হলেও উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তির পরপরই একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের লক্ষ্য স্থির করে পঠন-পাঠন শুরু করা উচিত। এখানে এ কথাটিও মাথায় রাখতে হবে, ভর্তির দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার ভালো ফলাফলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই দুটো পরীক্ষার সময় ভালো প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে তাতে একাডেমিক পারফরমেন্স যেমন ভালো হয়, তেমনি উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির জন্যও কাজে লাগে।
এবার ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আরো পরিষ্কার করে বলতে চাই, ইতোমধ্যে তোমরা নিশ্চয়ই ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তোমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোন বিশ্ববিদ্যালয় কখন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, আবেদন করার জন্য কী কী তথ্য লাগবে এবং আবেদনের শেষ তারিখের আগেই তোমার আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একেবারে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কারণ, ওই দিন হঠাৎ করে তোমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা প্রযুক্তিগত সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে তোমার আবেদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সবসময় দু’চারদিন সময় হাতে রেখে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই ভালো।
এবার আসা যাক পঠন-পাঠনে তোমাদের প্রস্তুতির কথা। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। অন্যদের বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজসমূহে ভর্তি হতে হয়। বুয়েট, মেডিকেল কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো একটিতে ভর্তি হতে হলে তোমাকে তুমুল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সেই প্রতিযোগিতায় তোমার পাশের বন্ধুটিও তোমাকে ছাড় দেবে না।
তাই এই প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে হলে, অবশ্যই তোমার কঠিন শ্রম, নিরলস সাধনা ও চেষ্টা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে বিগত একাডেমিক পাঠ্যবইয়ের আদ্যোপান্ত নিজের আয়ত্তে রাখতে হবে। সেই সাথে সাধারণ জ্ঞানের উপর বিস্তর পড়াশোনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন ধরনের প্রশ্ন করে থাকে সে সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রয়োজনীয় পঠন-পাঠনের দিকে এগুতে হবে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নের স্বাভাবিক ধরন ঠিক রেখে কিছুটা ভিন্নতাও আনতে পারে, সেটাও মাথায় রাখতে হবে।
এখানে বলে রাখি, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে এমনকি উপজেলা পর্যায়ও ভর্তিচ্ছুদের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য গড়ে উঠেছে নানারকম কোচিং সেন্টার। শিক্ষার্থীদের অনেকেই কোনো না কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে নিজেদের প্রস্তুতি জোরালো করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছ। মনে রাখতে হবে, কোচিং সেন্টারের উপর সম্পূর্ণ ভরসা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে অর্জনের প্রচেষ্টা বিফল হতে পারে। সুতরাং এই ভর্তি লড়াইয়ে তোমার ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই তোমাকে সফলতার মুখ দেখাতে পারবে। কোচিং সেন্টার, সিনিয়র বড় ভাই কিংবা তোমার অভিভাবক তোমাকে দিক নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণাই দিতে পারবে মাত্র। মূল লড়াইটা তোমাকেই করে যেতে হবে। আর নিজের সুন্দর জীবন গঠনের জন্য এই যুদ্ধে জয়লাভ খুবই জরুরি।
এবার ধরে নেওয়া যাক পূর্ব প্রস্তুতির কোনো বালাই নাই। কিংবা বিগত একাডেমিক ফলাফলগুলো আশাব্যঞ্জক নয়, তাই বলে কি তুমি উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির সব আশা ছেড়ে দেবে। অবশ্যই না। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই পরাজয় স্বীকার করা দুর্বল ও ভীরুদের কাজ। একাডেমিক ফলাফল যে কোনো কারণে একটু খারাপ হতে পারে, অথবা নানা সমস্যার জন্য ভর্তি পরীক্ষার জন্য নিয়মিত চর্চা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি, তাই বলেই তুমি পিছিয়ে আছ, এমনটা নয়। আজ থেকে, এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দাও। নিজের যা কিছু অর্জন ঝুলিতে জমা আছে, সেটুকু ঘষামাজা করে নাও। অনেক উদাহরণ আছে এমন, একাডেমিক ফলাফল আশানুরূপ না, কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর উপার্জনের জন্য কাজে যুক্ত হতে হয়েছে, যাতে ভর্তির আবেদনসহ পরীক্ষার খরচ চালানো যায়। এমন অনেক শিক্ষার্থীও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে নিজের জায়গা করার কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরেছে।
এবার আসা যাক, ভর্তি পরীক্ষার ভালো-মন্দ নিয়ে। ধরে নিলাম তোমার বুয়েট কিংবা মেডিকেল কলেজ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা খুবই খারাপ হয়েছে। মানলাম, তুমি এগুলোর কোনোটাতেই চান্স পাবে না বলে নিশ্চিত হয়েছ। তাই বলে মন খারাপ করে, ভেঙে পড়া বোকামির কাজ। কেননা, তোমার সামনে রয়েছে আরো অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক সুযোগের হাতছানি। অযথা ভেঙে পড়ে এই সুযোগগুলো হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এমনও হতে পারে, তুমি সর্বশেষ যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পরীক্ষা দিবে সেটিতেই সর্বোচ্চ ভালো ফলাফল করে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতে পারো। এখানে আমার মেয়ের ভর্তির ঘটনা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চাই। আমার মেয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার্থী ছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন ওর সকল পরীক্ষা খারাপ হয়ে যায়।
কোনোভাবেই ভর্তি হওয়ার মতো স্কোর ওঠে না। মেয়ের প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রের সহযাত্রী ছিলাম আমি। এক এক করে পরীক্ষাগুলো শেষ হচ্ছিল আর আমাদের আশার আলোগুলো নিভে যাচ্ছিল। কিন্তু আমরা হতাশ বা নিরাশ হইনি। তখনো একটি সুযোগ হাতে ছিল। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মনোবল ছিল মেয়ের। পরীক্ষা হলো। ফলাফল হলো।
চেষ্টা, শ্রম, সাধনা বৃথা গেল না। অনেক ভালো স্কোর তুলে মেয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছে। তাই উচ্চ শিক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান, অযথা সময় নষ্ট না করে নিজের মেধা ও মনন কাজে লাগিয়ে পঠন-পাঠনে মনোনিবেশ করতে হবে। সেই সাথে নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবেই স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে তোমার জন্য।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









