বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিবর্তনশীল এক নতুন মাত্রায় উপনীত হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে (যেমন ইউএস নিউজ-এর প্রতিবেদন) অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তিতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ১৭ কোটি মানুষের জনমিতি এবং উৎপাদন খাতের জোরালো অবস্থানের সুবাদে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে দেশটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
বৈশ্বিক বিভিন্ন টানাপোড়েন ও মেরুকরণের মাঝে বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে চলেছে। নতুন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবছরের মতো এবারও জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিবেশনের উদ্বোধন হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । এর মধ্য দিয়ে তিনি মা-বাবার পারিবারিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চলেছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে তিনি তুলে ধরবেন নতুন বাংলাদেশের পরিকল্পনা। জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ পরিষদের ভাষণে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রম এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানাবেন তিনি। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে এবার প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তব্য দেবেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের এই মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার নজির তৈরি হবে। তারেক রহমানের বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের নথিতে তার সেই বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে। ভাষণে তিনি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ধনী ও দরিদ্র দেশের বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, পরবর্তী সময়েও তিনি সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে বক্তব্য দেন।
১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক সভা এবং ২০০৫ সালের ৬০তম অধিবেশনেও তাঁর বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে। এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে। রোহিঙ্গা সংকটও সফরের অন্যতম অগ্রাধিকার থাকবে। এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান সরকারের জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটি প্রথম অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাড়ে চার দশকের মধ্যে সরকারপ্রধান ও একই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে একইমঞ্চে বক্তব্য রাখতে যাচ্ছেন তাদেরই উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বের যে কোনো দেশের ক্ষেত্রে এটি বিরল ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য হিসেবে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই দুই কারণে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে দেশের গ্রহণযোগ্যতা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেবেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের আয়োজনে একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন তিনি। মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সফরের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাত, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয় গুরুত্ব পাবে। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। অধিবেশনে শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, উদীয়মান প্রযুক্তি ও জাতিসংঘ সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। তারেক রহমানের বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকের বেশি সময়ের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উন্নয়নে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কেন অব্যাহত রয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পাশাপাশি তিনি শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচারসহ দেশগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই ভাষণের ঠিক ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া আরো কয়েকবার সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারকসভা এবং ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন। ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের দুটি পৃথক সভায়ও তিনি বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান প্রথমবারের মতো একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। এতে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু মোকাবিলা ও জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়গুলোও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে স্থান পাবে। পাশাপাশি সফরে রোহিঙ্গা সংকটকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তার অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবে। ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণে যার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল, ২০২৬ সালে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দেশের মর্যাদা শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামরিক শক্তি কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই দেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের সক্ষমতা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। এ গুরুত্বপূর্ণ মনোনয়ন যুগোপযোগী এমন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শিতা ও বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বের প্রায় সব স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক ফোরাম। এই পরিষদের সভাপতির পদ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক নানা প্রশ্নে আলোচনা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই পদে কোনো দেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সেই দেশের প্রতি আস্থারই প্রতিফলন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি দীর্ঘ যাত্রা রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজকের উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের পেছনে যেমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি কাজ করেছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান, দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে।
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হিসেবে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও অর্থায়ন ক্রমশ কমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এ সংকটের টেকসই সমাধানের প্রশ্নটি পুনরায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ।
জলবায়ু ক্ষতিপূরণ, অভিযোজন অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশ্নে উন্নয়নশীল বিশ্বের দাবিগুলোকে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও এই অর্জন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের প্রকৃত ভিত্তি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি। সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো শক্তিশালী না হলে আন্তর্জাতিক সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বিশ্বমঞ্চে সম্মান অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্মানের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাও তেমনি জরুরি। জাতীয় স্বার্থ, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বাংলাদেশ যদি এই সুযোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে এই সাফল্য কেবল একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকার নতুন অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









