জাতীয় নির্বাচনে বড় বিজয় অর্জন যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি সেই বিজয় ধরে রাখা এবং সাংগঠনিক শক্তিকে সুসংহত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আকারে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ছোট হলেও রাজনৈতিক তাৎপর্য ও সাংগঠনিক পরীক্ষার দিক থেকে এটি বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জাতীয় পর্যায়ে অর্জিত ঐক্য তৃণমূল পর্যায়ে কতটা কার্যকর, তা প্রমাণিত হবে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি সম্পর্কের প্রতিফলন। এখানে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে জাতীয় নির্বাচনে সফল হওয়া মানেই স্থানীয় নির্বাচনে অনায়াসে জয়লাভ করা নয়। বিশেষ করে একই দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী হলে অভ্যন্তরীণ বিরোধের আশঙ্কা বাড়ে। বিএনপির জন্য এই বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি।
দলটির পক্ষ থেকে প্রার্থী বাছাইয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, জনসমর্থন, দলের প্রতি অবদান ও ত্যাগ এবং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রার্থী যাচাইয়ের জন্য কমিটি গঠনও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে তা বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে তৃণমূলের অসন্তোষ দলীয় ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামত যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।
দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেছেন—এমন নেতার অবদান যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি শুধু সাংগঠনিক পরিচয়ের ভিত্তিতে জনসমর্থনহীন কাউকে প্রার্থী করাও যুক্তিসংগত নয়। আবার জনপ্রিয়তার দাবি যাচাই করতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে। ব্যক্তিগত আনুগত্য, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ যেন প্রার্থী নির্বাচনের প্রধান বিবেচ্য না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিএনপির সামনে আরেকটি বড় সমস্যা মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক কমিটি ও স্থানীয় নেতৃত্বের বিরোধ। দুর্বল বা বিতর্কিত সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে প্রার্থী বাছাই করা কঠিন।
তাই যেখানে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ রয়েছে, সেখানে গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাঁদের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত ও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
এখানে মনে রাখা দরকার, দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা মানে ভিন্নমত দমন নয়; বরং ন্যায্য প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্যের সমাধান করা। একইভাবে বিকল্প প্রার্থীর প্রস্তুতি রাখা এবং একই পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক বিষয় নয়। এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্ট রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার বিস্তার কিংবা নির্বাচনী সাফল্যের হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









