ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ, অর্জন, ব্যর্থতা ও সংগ্রামের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই একটি জাতি ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নেয়। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস বারবার রাজনৈতিক পালাবদলের শিকার হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের বয়ান বদলে যাওয়া, পাঠ্যবইয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন এবং সাধারণ ছবি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঠ্যবইয়ে দলীয় প্রচার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইতিহাসের আরেকটি সংস্করণ যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এভাবে এক সরকারের লেখা ইতিহাস অন্য সরকার এসে সংশোধন করতে থাকলে শিক্ষার্থীরা কোন বয়ানকে বিশ্বাস করবে? ইতিহাস কি তবে গবেষণালব্ধ সত্যের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অভিরুচির প্রতিফলন হয়ে থাকবে?
উদ্বেগের বিষয় শুধু ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তন নয়; পাঠ্যবইয়ের সাধারণ ছবি নিয়েও রাজনৈতিক প্রতীক খোঁজার প্রবণতা। শিশুদের ইংরেজি বর্ণ শেখানোর বইয়ে নৌকার ছবি দেখে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীকের প্রচার খোঁজা কিংবা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত দাঁড়িপাল্লার ছবিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। কোনো ছবি রাজনৈতিক প্রতীকের সঙ্গে মিলে গেলে তার প্রাসঙ্গিকতা, উদ্দেশ্য ও শিক্ষামূল্য যাচাই করা যেতে পারে। কিন্তু নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে ছবি বাদ দেওয়া কিংবা বই ছাপানো বন্ধ করা শিক্ষার পরিবেশকে অযথা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে ফেলে।
এর চেয়েও হতাশাজনক হলো, পাঠ্যবইয়ের বিতর্কের মধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক গবেষণা কর্মকর্তার পর আরো নয় কর্মকর্তাকে বদলি করা। বদলির সঙ্গে বিতর্কের সরাসরি সম্পর্ক আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তাই প্রমাণ ছাড়া একে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলা সমীচীন হবে না। তবে, এ ধরনের ঘটনার সময় ও প্রেক্ষাপট স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন কোনো মতপ্রকাশ দমন কিংবা দায় এড়ানোর উপায় না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ে সক্রেটিসের নামে প্লেটোর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থের লেখকত্ব আরোপের মতো ভুল দীর্ঘদিন থেকে যাওয়া প্রমাণ করে, রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে বইয়ের তথ্যগত নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি এমন ভুল সংশোধনে আট বছর লাগে, তবে সংশোধন ও মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক কমিশন। ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত এ কমিশন তথ্য-প্রমাণ, গবেষণা ও বহুমাত্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করবে। পাঠ্যবই সংশোধনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ বিশেষজ্ঞ নির্বাচন এবং ভুল সংশোধনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পাঠ্যবই কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র নয়; এটি আগামী প্রজন্মের জ্ঞান, বিবেক ও মূল্যবোধ গঠনের মাধ্যম। ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাসের ভাষ্য পাল্টাতে থাকলে শিক্ষার্থীরা সত্যের চেয়ে দলীয় আনুগত্য শিখবে। তাই ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আত্মপ্রচারের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। সরকার বদলাবে, নীতির পরিবর্তনও হতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের সত্য যেন ক্ষমতার সঙ্গে বদলে না যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









