হ্যারি কেইনকে নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তিনি স্ত্রী কেটি ও চার সন্তানকে নিয়ে মিউনিখের কোথাও থাকেন। বাভারিয়ার এক সরাইখানার মালিক নাকি কৃতজ্ঞতা থেকে তাকে প্রতিদিন স্নিটজেল, প্রেটজেল আর নানা ধরনের মাংস পাঠান। বিয়ার তার বিশেষ পছন্দ নয়, তবে গলফ খেলতে ভালোবাসেন। ২০২৩ সাল থেকে দক্ষিণ জার্মানির পরিবেশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছেন যে টেগার্নজি হ্রদের ধারে হাঁটতে দেখলে তাকে সাধারণ কোনো কৃষক বলে ভুল হতে পারে।
৩৩ বছর বয়সে ব্যালন ডি’অরজয়ী কেইন যেন এক রহস্যময় মানুষ। মাঠের বাইরে তিনি খুব একটা আলোচনায় থাকেন না। অথচ মাঠে নামলেই তার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তিনি করেছেন ৭৩ গোল। সংখ্যাটি অবিশ্বাস্য। ২০১১-১২ মৌসুমে লিওনেল মেসি ছাড়া আর কেউ এক মৌসুমে এত গোল করতে পারেননি।
ফুটবল যখন শিল্পে পরিণত হলো, তখন খেলাটিকে দেখার চোখও বদলে গেল। সমর্থকদের বিচার আর একমাত্র বিবেচ্য রইল না; ফুটবল হয়ে উঠল বিপুলসংখ্যক ভোক্তার বিনোদন। আর্থিক বাজারের মতো এখানেও কিছু খেলোয়াড়ের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল, অন্যদের অবদান রয়ে গেল আড়ালে।
আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন শক্তিশালী, ক্ষিপ্র, আকর্ষণীয় এবং আত্মপ্রচারে দক্ষ খেলোয়াড়েরা। তাদের পেছনে থাকে বড় ক্লাবের প্রচারযন্ত্র ও বাণিজ্যিক শক্তি। অন্যদিকে আড়ালে পড়ে থাকেন অপেক্ষাকৃত নিরীহ, কম আলোচিত এবং দলকে সাহায্য করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ফুটবলাররা। তাদের মূল্য বুঝতে হলে শুধু গোল বা শারীরিক সক্ষমতার হিসাব করলেই চলে না; দেখতে হয় তারা কীভাবে খেলা পড়েন, বিপদ আসার আগেই কীভাবে তা বুঝতে পারেন এবং সতীর্থদের জন্য কীভাবে সুযোগ তৈরি করেন।

হ্যারি কেইন এই দ্বিতীয় ধরনের খেলোয়াড়েরই প্রতিনিধি। গত এক দশকে বিশ্ব ফুটবলে সম্ভবত সবচেয়ে কম মূল্যায়িত তারকাদের একজন তিনি।
টটেনহ্যামে ইতিহাস, কিন্তু স্বীকৃতি কম
টটেনহ্যামের প্রতি কেইনের দীর্ঘদিনের আনুগত্য তাকে এমন এক ক্লাবের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল, যার আর্থিক ক্ষমতা ও প্রচার-প্রতিপত্তি ইউরোপের বৃহত্তম ক্লাবগুলোর সমান ছিল না। তবু সেখানে তিনি এমন কিছু রেকর্ড গড়েছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাঙা কঠিন হবে। প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে কোনো একটি ক্লাবের জার্সি পরে কেইনের মতো ২১৩ গোল আর কেউ করেননি। লিগে এক পঞ্জিকাবর্ষে ৩৯ গোল করার রেকর্ডও তার। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলোর বাইরে থেকেও তিনি একাধিকবার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, একই মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতার কৃতিত্বও অর্জন করেছেন। ২০২০-২১ মৌসুমে তার গোল ছিল ২৩টি, আর সতীর্থদের গোল করিয়েছিলেন ১৪ বার।

কিন্তু টটেনহ্যামের হয়ে এই সাফল্যগুলো সেই প্রচার পায়নি, যা পেয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মোহাম্মদ সালাহ কিংবা রবার্ট লেভানডফস্কির মতো তারকারা। ২০২১ সালের বসন্তে টটেনহ্যামের তৎকালীন কোচ হোসে মরিনিয়ো কেইনকে নিজের দপ্তরে ডেকে পাঠান। তিনি বুঝেছিলেন, ক্লাবটির প্রতি কেইনের আনুগত্যের সীমা আছে। টটেনহ্যাম হয়তো তার প্রিয় ক্লাব, কিন্তু সেই আনুগত্যের কারণে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা তার উচিত নয়।
মরিনহো তাকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তার বক্তব্য ছিল পরিষ্কার: কেইন টটেনহ্যামকে নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন, কিন্তু একজন ফুটবলার হিসেবে তার প্রতি বছর চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার অধিকার আছে। একই সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগও কেইনের মতো একজন খেলোয়াড়কে ছাড়া চলতে পারে না।
লেভানডফস্কির বিপরীত এক স্ট্রাইকার
কেইন নিজেই টটেনহ্যাম ছাড়ার উদ্যোগ নেন। ক্লাব রাজি হয়, তবে শর্ত ছিল—ইংল্যান্ডের কোনো সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নয়, ইউরোপের অন্য কোনো ক্লাবে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত বায়ার্ন মিউনিখের প্রস্তাবই তার সামনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বায়ার্নের সভাপতি উলি হোয়েনেস তাকে শুধু একটি ক্লাবের নয়, একটি পরিবারের অংশ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, বায়ার্নে খেলোয়াড়েরা বাড়ির মতো অনুভব করেন; একবার সেখানে এলে আর চলে যেতে চান না। কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান এবং ক্লাবের কর্তারা নতুন স্ট্রাইকারকে নিয়ে একটি বিষয়ে একমত ছিলেন। রবার্ট লেভানডফস্কির জায়গায় এমন কাউকে আনতে হবে, যিনি পোলিশ স্ট্রাইকারের ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
তারা এমন একজনকে চেয়েছিলেন, যিনি শুধু সতীর্থদের তৈরি করা সুযোগ থেকে গোল করবেন না; বরং নিজেই সতীর্থদের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করবেন। এমন একজন, যিনি নিজের পরিসংখ্যান বাড়ানোর চেয়ে দলের আক্রমণকে আরও কার্যকর করে তুলবেন। একক শিল্পীর বদলে অর্কেস্ট্রার পরিচালকের মতো খেলবেন। নামমাত্র একজন স্ট্রাইকার হলেও যার মধ্যে থাকবে একজন মাঝমাঠের খেলোয়াড়ের বুদ্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি। বাণিজ্যিক ফুটবল ও আধুনিক প্রযুক্তি যেখানে ব্যক্তিগত নায়ক তৈরি করতে আগ্রহী, সেখানে বায়ার্ন চেয়েছিল এমন একজনকে, যার শক্তি প্রকাশ পাবে পুরো দলকে আরও ভালো করে তোলার মধ্য দিয়ে।
কেইন তার বিনয়, পরিশ্রম ও নিঃস্বার্থ খেলায় জার্মানদের মন জয় করেন। তার ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করা। তিনি শুধু লেভানডফস্কির জায়গা পূরণ করেননি; তিন মৌসুমের মধ্যেই বায়ার্নের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। জার্মান ফুটবলে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মধ্যে এখন কেইন বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তার আগে এই মর্যাদা পেয়েছিলেন কেভিন কিগানের মতো তারকা, যিনি হামবুর্গের হয়ে খেলেছেন এবং ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন।
যে বুদ্ধি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না
কেইনের হাত ধরে বায়ার্ন ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দলে পরিণত হয়েছে। প্যারিস সাঁ-জার্মাঁর সঙ্গে তারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষ দলগুলোর কাতারে। বায়ার্নের সাফল্যের মধ্যে রয়েছে দুটি বুন্দেসলিগা শিরোপা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে ওঠা।
গত মৌসুমে কেইন করেছেন ৬১ গোল, সঙ্গে সাতটি অ্যাসিস্ট। সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু তার সামগ্রিক অবদান বোঝার জন্য এই হিসাব যথেষ্ট নয়। কেইনের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু বল পায়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন না; বল পাওয়ার আগেই খেলার পরবর্তী পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করেন। কোথায় জায়গা তৈরি হবে, কোন সতীর্থকে বল দিলে আক্রমণ এগোবে, কখন নিজে গোলের দিকে যাবেন আর কখন অন্যকে সুযোগ করে দেবেন—এসব সিদ্ধান্তে তার ফুটবল-বুদ্ধি কাজ করে।

একজন ভালো স্ট্রাইকার গোল করেন। একজন অসাধারণ স্ট্রাইকার গোল করার পাশাপাশি দলের অন্যদেরও ভালো খেলতে সাহায্য করেন। কেইনের মূল্য এখানেই। তিনি কেবল আক্রমণের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ নন; পুরো আক্রমণকে সংগঠিত করার অন্যতম প্রধান শক্তি। তার মতো খেলোয়াড়কে বুঝতে হলে শুধু গোলের সংখ্যা দেখতে হবে না। দেখতে হবে, তার উপস্থিতিতে সতীর্থদের খেলা কতটা সহজ হয়ে ওঠে, দলের আক্রমণ কতটা বৈচিত্র্য পায় এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে কতভাবে সমস্যায় ফেলা যায়।
কেইন তাই শুধু একজন গোলদাতা নন। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যার বুদ্ধি ও দলগত দৃষ্টিভঙ্গি সতীর্থদের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তার পায়ে বল থাকুক বা না থাকুক, খেলার ওপর তার প্রভাব থাকে। আর এখানেই হ্যারি কেইনের আসল মহত্ত্ব: তিনি শুধু নিজে ভালো খেলেন না, তার চারপাশের খেলাটাকেও আরও ভালো করে তোলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









