শৈশব মানেই দুরন্তপনা, হাসি-আনন্দ, স্বপ্ন আর সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি। অথচ রাজধানীর রাজপথ, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল কিংবা ফুটপাতের শিশুদের কাছে শৈশবের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, নির্যাতন আর অবহেলার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে করতে তাদের অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছে ভয়ংকর এক মরণনেশায়, যার নাম ‘ড্যান্ডি’।
মাত্র কয়েক টাকার আঠার বাষ্পে সাময়িকভাবে যন্ত্রণাহীন হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে তাদের জীবন, নষ্ট হচ্ছে মেধা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। এটি কেবল মাদকাসক্তির সমস্যা নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বহীনতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। ড্যান্ডির ভয়াবহতা এখানেই যে, এটি সহজলভ্য, সস্তা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মাত্র ৪০-৫০ টাকার আঠা কিনে শিশুরা নিজেদের শরীর ও মস্তিষ্ককে ঠেলে দিচ্ছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। রাসায়নিক দ্রাবকের বিষাক্ত প্রভাবে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, লিভার, কিডনি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে তৈরি হতে পারে স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক জটিলতা। এমনকি আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে। অথচ এসব শিশুর অধিকাংশই জানে না, তারা নিজেদের অজান্তে কতটা ভয়ংকর বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, শিশুরা কেন এই নেশায় জড়াচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে তাদের জীবনের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, নির্যাতন, অনাথত্ব কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাদের ঠেলে দিচ্ছে রাস্তায়। সেখানে নেই পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা নিরাপত্তা। জীবিকার প্রয়োজনে তাদের করতে হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
দিনের পর দিন অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে তারা মানসিক যন্ত্রণা ভুলতে বেছে নিচ্ছে নেশাকে। ফলে, ড্যান্ডি আসক্তিকে শুধু অপরাধ বা অনৈতিকতার দৃষ্টিতে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। পথশিশুদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করে কিংবা অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং তাদের নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ড্যান্ডিতে আসক্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদকমুক্ত করার চিকিৎসাই নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং, পারিবারিক পুনর্মিলনের উদ্যোগ এবং সামাজিক পুনর্বাসন। কারণ, চিকিৎসা শেষে আবারও যদি তারা আগের অনিরাপদ পরিবেশে ফিরে যায়, তাহলে পুনরায় আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
একই সঙ্গে আঠা উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে, শিশুদের কাছে সিনথেটিক আঠা বিক্রি বন্ধে আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। হার্ডওয়্যার, মুচি ও ইলেকট্রিক পণ্যের দোকানগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। তবে, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বৈধ শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত এসব পণ্যের নিরাপদ বিপণনব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় পথশিশুদের ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু কয়েক হাজার আসন কিংবা সীমিত পুনর্বাসন কার্যক্রম দিয়ে বিপুলসংখ্যক পথশিশুর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। সরকারি নিরাময় কেন্দ্রে শয্যাসংকট এবং বেসরকারি কেন্দ্রে উচ্চ চিকিৎসাব্যয় পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তাই বাজেটে পথশিশুদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, পথশিশুদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তারা সমাজের বোঝা নয়, অপরাধীও নয়; তারা আমাদেরই সমাজের বঞ্চিত শিশু। তাদের হাতে পলিথিনের ব্যাগ নয়, বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। একটি শিশুকে ড্যান্ডির আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একটি জীবন রক্ষা করা নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখা। রাষ্ট্র যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে এই শিশুদের অকালমৃত্যুর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না। কারণ, একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার উন্নত সড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা মেট্রোরেলে নয়; বরং তার সবচেয়ে অসহায় শিশুটির নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









