২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল বুলেটের শব্দে আর স্বজনহারা আদিবাসী মানুষের বুকফাটা আর্তনাদে। সেই অভিশপ্ত দিনে নিজেদের অধিকার ও বাপ-দাদার ভিটেমাটি আগলে রাখতে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বীর তিন সন্তান-মঙ্গল মাডী, রমেশ টুডু ও শ্যামল হেমব্রম।
আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল শত শত আদিবাসী ও বাঙালি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই, লুট হয়েছিল হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু আর সারা জীবনের সঞ্চয়। সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর কেটে গেছে দীর্ঘ দশটি বছর। আর মাত্র কয়েকদিন পর, ৬ নভেম্বর ২০২৬-এ পূর্ণ হতে চলেছে এই ট্র্যাজেডির এক দশক! অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘ এক দশকেও বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে চলেছে, সাঁওতালরা আজও তাদের হৃত অধিকার ও বাপ-দাদার ভূমির মালিকানা ফিরে পায়নি।
এই ঐতিহাসিক বঞ্চনার পটভূমিতে ৬ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাগদাফার্মে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এক বিশাল অধিকার আদায় সমাবেশ। এক দশকের শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলার বিরুদ্ধে সাঁওতাল ও প্রান্তিক বাঙালি কৃষকদের এই ঐক্যবদ্ধ জমায়েত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ নয়, এটি শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের এক বজ্রঘোষণা।
র্দীঘমেয়াদি বঞ্চনা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কে। ২০১৬ সালের রক্তভেজা স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ‘১৯৬২ সালের চুক্তি ভঙ্গ করে আমাদের পূর্বপুরুষদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আর ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সেই রক্তভেজা ভিটেমাটি আগলে রাখতে গিয়ে আমাদের বুকে বুলেট চালানো হয়েছে।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘র্দীঘ ১০টি বছর ধরে আইনগত ও রাজপথের লড়াই- সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পরও, এক দশক পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র মঙ্গল, রমেশ আর শ্যামল হত্যার বিচার করেনি।’ সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিগত ১০ বছরে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি এখনো চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির পক্ষে করা হয়েছে মাত্র ১টি মামলা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্ট কোর্টে জমা দেওয়া হয়নি। সিবিআই এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে এই মামলা তদন্তের দায়িত্ব রয়েছে বলে তারা অবহিত আছেন। ভূমি আন্দোলনের এই নেতা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘যে মাটি আমাদের ভাইদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, সেই উর্বরা কৃষিজমিতে কোনো বাণিজ্যিক বা করপোরেট ইপিজেড আমরা করতে দেব না। বাপ-দাদার এই জমি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের জীবন। জমির অধিকার ফেরত এবং খুনিদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই লড়াই থামবে না। তিনি আরো জানান, ‘৬ নভেম্বর ২০২৬-এর সমাবেশ থেকে আমাদের অধিকার আদায়ের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। রাষ্ট্র হয় আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিক, না হয় আমাদের জীবন নিক; কিন্তু বাপ-দাদার এক ইঞ্চি মাটিও আমরা কাউকে কেড়ে নিতে দেব না।
নিপীড়িত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রধান দাবিগুলো খুব স্পষ্ট এবং আপসহীন। প্রথমত: তিন সাঁওতাল হত্যার চূড়ান্ত বিচার চাই- এক দশকেও কেন সাঁওতাল হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের শাস্তি হলো না? তদন্ত আর আইনি দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে আছে আমাদের ন্যায়বিচার। আমরা আর কোনো আশ্বাস বা প্রহসন চাই না। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত: বাপ-দাদার জমি ফেরত চাই- ১৯৬২ সালে রংপুর চিনিকলের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের যে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তার শর্ত ছিল স্পষ্ট- সেখানে আখ চাষ না হলে জমি প্রকৃত মালিকদের ফেরত দেওয়া হবে।
চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে, চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে। তাই আইনি ও নৈতিকভাবে এই জমি এখন সাঁওতাল ও স্থানীয় কৃষকদের প্রাপ্য। আমাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি আমাদের হাতেই ফিরিয়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত: রক্তভেজা জমিতে কোনো ইপিজেড নয়- যে মাটিতে মঙ্গল, রমেশ আর শ্যামলের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, যেখানে আজও আামাদের বুকফাটা কান্না মিশে আছে, সেই পুণ্যভূমিতে কোনো বাণিজ্যিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না। তিন ফসলি এই উর্বর কৃষিজমি আমাদের বাঁচায়, আমাদের অন্ন জোগায়। রক্তেভেজা মাটিতে কোনো করপোরেট স্থাপনা আমরা বরদাশত করব না। চর্তুথত: সকল প্রকার ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ান- সাঁওতালদের এই ভূমি আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে নানা সময়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র হয়েছে।
বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকদের মধ্যে। অতি সম্প্রতি (গাইবান্ধায় সাঁওতালদের সমাবেশে হামলা, আহত ৫, প্রথম আলো, ১২ এপ্রিল ২০২৬) বাগদাফার্ম এলাকায় সাঁওতালদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, যাতে পাঁচজন সাঁওতাল নেতা গুরুতর আহত হন। এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ও উচ্ছেদ চেষ্টা প্রমাণ করে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এখনও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। আামদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সমাবেশ থেকেই সমন্ত ভূমিগ্রাসী ও বর্ণবাদী ষড়যন্ত্রের জবাব দেওয়া হবে। পঞ্চমত: জীবন ও ভূমির পূর্ণ নিরাপত্তা চাই- নিজ দেশে নিজের ভিটামাটিতে আমরা আর কতকাল পরবাসীর মতো তাড়া খেয়ে বেড়াব? প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ আতঙ্ক, হামলা ও মিথ্যা মামলার খড়গ নিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রকে প্রতিটি সাঁওতাল ও প্রান্তিক নাগরিককের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মি. হিংগু মুরমু বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন- ‘র্দীঘ ১০টি বছর পার হয়ে গেলেও সরকার এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সুষ্ঠু বিচার বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। আইন, আদালত, প্রয়োগকারী এবং বাস্তবায়নের সব ক্ষমতাই সরকারের হাতে। তাই আমি মনে করি, এখানে সরকারের চরম ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে; অথবা একে ব্যর্থতা না বলে ধরে নিতে হবে, এটাই সরকারের প্রকৃত ইচ্ছা। আজ পর্যন্ত কোনো বিচার না হওয়ায় আমরা কি তবে ধরে নিব, সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায়কে নির্বিচারে হত্যা ও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করাই মূল উদ্দেশ্য? সরকারের মনে যা-ই থাকুক না কেন, আমরা আদিবাসীরা প্রয়োজনে জীবন দেব, তবুও নিজেদের জন্মভূমি ছাড়ব না।
মঙ্গল, রমেশ ও শ্যামলদের রক্তে রঞ্জিত বাগদাফার্মের বাপ-দাদাদের জমির মালিকানার দাবিতে কোনো প্রকার ছাড় দেবে না প্রান্তিক বাঙালি কৃষক ও আদিবাসী জনগণ। তাই আগামী ৬ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে আমরা সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলি সরকার ও বিশ্ববাসীর কাছে বাংলার মাটিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠীত হোক। বাগদাফার্মসহ বাংলাদেশের সকল আদিবাসীর জমি ও বসতভিটা ন্যায়সংগতভাবে তাদের উত্তরসুরিদের কাছে অনতিবিলম্বে ফেরত দেওয়া হোক।’
৬ নভেম্বরের এই সমাবেশ আদিবাসীদের আস্তিত্বের লড়াই। এটি কেবল সাঁওতালদের একার লড়াই নয়, এটি এদেশের সমস্ত নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। আসুন, আগামী ৬ নভেম্বর বাগদাফার্মের সমাবেশে দলে দলে যোগ দিন। জালিমের সমস্ত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমরা ছিনিয়ে আনব আামদের অধিকার, আমাদের জমি এবং আমাদের আত্মমর্যাদা। রক্ত দিয়ে যে মাটির অধিকার আমরা লিখেছি, সে মাটি আমরা কাউকেই কেড়ে নিতে দেব না। পরিশেষে, সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির স্লোগান দিয়ে শেষ করতে চাই- ‘যে মাটি আমাদের পূর্বপুরুষের রক্তভেজা, সে মাটি আমরা ছাড়ব না।’
লেখক : আদিবাসী লেখক ও উন্নয়নকর্মী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









