জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের দশ দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। আবার একই কারণে দেশের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় ১৯ জেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষরে জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও ভূমিক্ষয়ের মতো সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য।
এ জন্য উপকূলের সমস্যা সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক। এজন্য শুধু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে দাবি উত্থাপন নয়, জাতীয় পর্যায়েও উপকূলের সুরক্ষায় কার্যকর নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত ‘কোস্টাল ক্লাইমেট ডায়ালগ’-এও বক্তারা এ ধরনের মন্তব্য করেন। আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নীতিগত প্রস্তাবনা ‘উপকূল ঘোষণা’ প্রণয়ন এবং তা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরার লক্ষ্যে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
সংলাপে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সীমাহীন সংকটের মুখে রয়েছে। দেশের বিশাল উপকূলীয় জনপদকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। একই সঙ্গে উপকূলের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতেও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিবেশের বিদ্যমান সংকটগুলোর সমাধানের আশা ব্যক্ত করা হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা জাতীয় সংসদে এবং সংসদের বাইরে তুলে ধরতে উপকূলবিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠনের পরামর্শ আলোচকদের। এ ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা টেকসই হবে না। প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে উপকূলের মানুষের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষার কথা বলে বনের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা স্ববিরোধী হবে। পরিবেশ ও মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে বলা হয়, উপকূলের মানুষের জন্য হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, নাকি অন্য খাতে ব্যয় বাড়ানো হবে, তা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বদলীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। শুধু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; দেশের ভেতরেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এটি সত্য, জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলের সুরক্ষার মতো বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সমন্বিত অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সংকট এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে এবং নদীভাঙনে মানুষ হারাচ্ছে বসতভিটা ও জীবিকার উৎস। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য না থাকায় দরিদ্র পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় পড়ছে। এই বাস্তবতায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশাকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে, কৃষক, জেলে, নারী, তরুণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।
বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম (বিসিজেএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন তার বক্তব্যে ‘উপকূল ঘোষণা’য় জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি, নদী ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সমস্যা তাদের মতো করে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সহজ শর্তে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের দাবিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
তবে, সম্মেলনে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপকূলের সংকট কোনো একক সরকার বা রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি জাতীয় অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই উপকূল রক্ষায় রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সমন্বিত জাতীয় অবস্থান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রত্যাশা থাকবে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সমস্যাবলী গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরা এবং যথাযথ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ অপরিহার্য। এসব করতে ব্যর্থ হলে, শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে তা নয়, একই সঙ্গে দেশ ও দেশের সব মানুষের বহুমাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা অবধারিত।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









