পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রায় প্রতিটি জীবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের মহাবিবর্তনের ইতিহাস। একটি ধানের দেশীয় জাত, একটি বিরল বনজ উদ্ভিদ কিংবা একটি বুনো ফলের গাছ- প্রতিটির জিনগত বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ এবং একফসলি কৃষির বিস্তারের কারণে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনগত বৈচিত্র্য। একবার কোনো প্রজাতি বা তার বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়ে গেলে পুনরায় তা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।
তাই জীববৈচিত্র্যের এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো - জিন ব্যাংক। জিন ব্যাংক হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণব্যবস্থা, যেখানে উদ্ভিদের বীজ, টিস্যু, পরাগ, ডিএনএ, অণুজীব কিংবা প্রাণীর জিনগত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং প্রয়োজনের সময় গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন কিংবা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পুনরুদ্ধারে সেই উপাদান ব্যবহার করা।
এটি শুধু একটি সংরক্ষণাগার নয়; বরং ভবিষ্যতের খাদ্য, কৃষি ও পরিবেশ নিরাপত্তার এক নীরব বীমা। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। খরা, পানির লবণাক্ততা, বন্যা, অতিবৃষ্টি, ফসলের নতুন রোগবালাই এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রচলিত অনেক ফসলের উৎপাদন হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা এমন ফসলের জাত খুঁজছেন, যেগুলো প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম সেই প্রয়োজনীয় জিন পাওয়া যায় কোনো দেশীয় বা বুনো জাতের মধ্যে।
যদি সেই জাত আগেই বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে উন্নত জাত উদ্ভাবনের সুযোগও হারিয়ে যাবে। এ কারণেই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর। বাংলাদেশের কৃষিও এ বাস্তবতা থেকে পৃথক নয়। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দেশীয় ধানের জাত চাষ হতো। এখন উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তারের কারণে অনেক দেশীয় জাত আর মাঠে দেখা যায় না।
অথচ এসব দেশীয় ধানের মধ্যে ছিল লবণাক্ততা, খরা বা বন্যা সহ্য করার মতো মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য। একইভাবে দেশীয় শাকসবজি, ডাল, ফল, ঔষধি উদ্ভিদ এবং বনজ প্রজাতির অনেকগুলোই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। জিন ব্যাংক এসব সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে। শুধু কৃষি নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানেও জিন ব্যাংকের গুরুত্ব বাড়ছে। পৃথিবীর বহু ওষুধ উদ্ভিদ, অণুজীব কিংবা প্রাকৃতিক জৈব উপাদান থেকে এসেছে।
আজ যে উদ্ভিদকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিচ্ছি না, ভবিষ্যতে তার মধ্যেই হয়ত পাওয়া যাবে কোনো কঠিন রোগের প্রতিষেধক। আবার অণুজীবের জিনগত বৈচিত্র্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিক বা শিল্পে ব্যবহৃত এনজাইম উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ মানে শুধু প্রকৃতি রক্ষা নয়; এটি মানবস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যেও জরুরি। গত হওয়া কোভিড ১৯ মহামারি বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিল- জিনগত তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। ভাইরাসের জিনোম দ্রুত শনাক্ত করা, নতুন ভ্যারিয়েন্ট পর্যবেক্ষণ এবং টিকা উন্নয়নে জিনগত তথ্যভাণ্ডারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিনগত তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবহারকে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। জিন ব্যাংক শুধু গবেষণাগারের জন্য নয়; এটি অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। উন্নত দেশগুলো জীববৈচিত্র্যকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখছে। নতুন ফসল, ওষুধ, শিল্পজাত কাঁচামাল কিংবা বায়োটেকনোলজি ভিত্তিক পণ্য উদ্ভাবনের ভিত্তি হলো জিনগত সম্পদ। ওইসিডি-এর মতে, ভবিষ্যতের ‘বায়োইকোনমি’ গড়ে তুলতে জিনগত সম্পদের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, যে দেশ আজ তার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করবে, ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে সেই দেশই এগিয়ে থাকবে। বিশ্বে জিন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার সফল উদাহরণও রয়েছে। নরওয়ের স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ বীজের নমুনা সংরক্ষিত আছে। একে অনেকেই ‘পৃথিবীর শেষ বীজভান্ডার’ বলে অভিহিত করেন।
কোনো দেশে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কারণে বীজভাণ্ডার ধ্বংস হলেও এই বৈশ্বিক সংরক্ষণাগার থেকে আবার সেই বীজ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এটি প্রমাণ করে, জিন ব্যাংক কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার একটি কৌশলগত অবকাঠামো। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ফসল ও উদ্ভিদসম্পদের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ করছে। তবে, দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এসব উদ্যোগ এখনও সীমিত। পাহাড়, হাওর, চরাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো অঞ্চলের দেশীয় উদ্ভিদসম্পদ আরো পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক গবেষণাগার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত কক্ষ তাপমাত্রা, দক্ষ গবেষক, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের তথ্যব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি সংরক্ষিত উপাদানের নিয়মিত পরীক্ষা, পুনর্জীবন এবং ডিজিটাল ডাটাবেজও অপরিহার্য। শুধু বীজ সংরক্ষণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এগুলোর কার্যক্ষমতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইন ও ন্যায্যতা। জীববৈচিত্র্য কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়। তাই জিনগত সম্পদ ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য উদ্ভাবিত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং উৎসদেশ যেন ন্যায্য সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নাগোয়া প্রটোকলের নীতিগুলো অনুসরণ করা জরুরি। বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দেশের জন্য এখনই সময় জাতীয় পর্যায়ে জিন ব্যাংক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করার। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে দেশীয় উদ্ভিদ ও কৃষিজ সম্পদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বায়োটেকনোলজি, জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে সংরক্ষিত জিনগত সম্পদ শুধু তাকেই পড়ে না থাকে, বরং নতুন উদ্ভাবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। প্রকৃতি আমাদের হাতে যে জিনগত সম্পদ তুলে দিয়েছে, তা কেবল বর্তমান প্রজন্মের নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও অধিকার। আজ আমরা যদি অবহেলায় এই সম্পদ হারিয়ে ফেলি, তবে আগামী দিনের বিজ্ঞান, কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানকে তার কঠিন মূল্য দিতে হবে। তাই জিন ব্যাংককে কেবল একটি গবেষণাগারভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









