রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ঈদ লালবাগ এবং সত্তর দশক

আমীরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

ঈদ লালবাগ এবং সত্তর দশক

আমি জন্ম নিয়েছিলাম আমলিগোলায়। লালবাগের পেছনে দীর্ঘ একটা রাস্তার দুপাশটা আমলিগোলা। শ্রীনাথ স্ট্রিট, আতশখানা লেন। জগন্নাথ সাহা লেন এমন সব সোনালি নাম ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। পোস্ট অফিসে সে সব নামের সদর আছে। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে আমলিগোলা নামটি আজও খ্যাতনামা হয়ে আছে। এই এলাকার বিখ্যাত এক সমাজসেবক ও ইতিহাসবিদের নাম নাজির হোসেন। তার লেখা কিংবদন্তীর ঢাকা বইতে আছে রাস্তার মোড়ে বড় আমলি বা তেঁতুল গাছ ছিল। সেই থেকে আমলিগোলা নামের উৎপত্তি। মতান্তরে শায়েস্তা খানের আমলে এখানে শস্যের গোলা ছিল। গোলা এ আসির থেকে আমলিগোলা নামের উৎপত্তি। আমলিগোলার পেছনে বিস্তীর্ণ কামরাঙ্গীরচর। বুড়িগঙ্গা নদীটা অনেক দূর সরে গেছে। ছোটবেলায় দেখেছি এই চরে অল্পকিছু বাড়িঘর। বেড়া বা টিনের তৈরি। বর্ষাকালে পুরো চর জলমগ্ন থাকতো। কখনো কখনো পানি আমলিগোলার রাস্তায় উঠে আসতো। তখন দেখেছি আমলিগোলার গলিতে নৌকা চলছে।

শীতকালে কামরাঙ্গির চর হয়ে উঠতো ফসলের ক্ষেত। আমাদের বাসায় কাজ করতো  এক মেয়ে। তার নাম আনোয়ারা। সে থাকতো কামরাঙ্গির চরে। শীত বিকেলে সে আমাদের নিয়ে যেতো চরের মাঠে ঘুরতে। সেই দৃশ্য খুব স্পষ্টভাবে আজও মনে পড়ে। এই চরের পাশে ছিল বালুঘাট, কয়লাঘাট। বড় বড় মহাজনী নাও এসে আমলিগোলার বিভিন্ন ঘাটে ভিড়তো। আমরা ছেলেবেলায় বালুঘাটের শস্য তোলা মাঠে খেলেছি। বিকেলে হাওয়া খেতে ঘুরে বেড়িয়েছি। কোনো কোনো দিন হেঁটে হেঁটে খররোদে চর পেরিয়ে চলে গিয়েছি বুড়িগঙ্গা নদীতে। দুপুরে নদীর জলে লাফ ঝাঁপ করেছি। সাঁতার কেটেছি। নদীর ওপারে আটি, কেরানিগঞ্জ এমন সব নামের গ্রাম। আহা সেসবের চিহ্ন আজ নেই। কামরাঙ্গির চর এখন বিপুল জনবসতিপূর্ণ এলাকা। বড় বড় দালানকোঠা। রাস্তাঘাট, বাজার মার্কেট ছেলেবেলাকে চিনতে পারার সামান্য উপকরণ সেই চরে নেই। প্রিয় আমলিগোলাও অল্প পরিসরে লম্বা লম্বা বাড়ি। জনবৃদ্ধির চাপ। আজকাল আমলিগোলাকে চেনা যায় না। এই পাড়ায় বড় বড় উঠোন দেখেছি। নানারকম গাছপালা দেখেছি। নিরিবিলি মফস্বল শহরের ছায়া ছিল আমলিগোলায়। স্থানীয় লোকেরা নানারকম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। কেউ চকবাজারে, কেউ নওয়াবপুরে, দোকানদারি করতো। লালবাগ আমলিগোলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেক ছোটখাটো দোকান। রেস্তরাঁ ইত্যাদি। আর বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমলিগোলায় বাস করতেন আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আমলিগোলার স্থানীয় অধিবাসী। তিনি বাংলাদেশের আদি শিল্পপতিদের একজন। তিনি স্বাপ্নিক শিল্পপতি। যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। তার কোম্পানির মালা শাড়ি একদা গ্রামে গঞ্জে প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিল। ব্যাংক বীমা শাড়ি কাপড়, কাটলারি, হাউজিং, শার্টিং, রিয়েল এস্টেট সব ব্যবসায় তিনি হয়েছেন সফল। 

ছোটবেলায় তাকে দেখেছি তাকে দুধে আলতা বরণ। টকটকে গায়ের রং। টয়োটা গাড়ি করে তিনি চলাচল করতেন। মহল্লায় তিনি অসম্ভব সম্মানীত ব্যক্তি। তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির হোসেন। এলাকায় তিনি চেয়ারম্যান সাহেব নামে পরিচিত। আমরা ছোটবেলায় আমলিগোলায় মোষের শিংয়ের কারবারিদের দেখেছি। তারা ছোট্ট একটা ঘরে মোষের শিং পুড়িয়ে চিরুনি ও অন্যান্য সৌখিন জিনিশপত্র বানাতেন। শিংটা পুড়িয়ে নরম করা হতো। তারপর ঘষে ঘষে এর উজ্জ্বলতা বাড়ানো হতো। ছুরি দিয়ে কেটে কেটে চিরুনির খাঁজ তৈরি করতো। এমন একজন কারিগর ছিলেন টাপ্পুর বাবা। রোগা পাতলা মানুষটা। পরনে থাকতো স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। সেই চঞ্চল বনেদী পাড়ায় অনেক আনন্দ নিয়ে ঈদ আসতো। পুরো একমাস রোজা। ঢাকার মানুষ রোজায় দোকানের খাবার খেতে খুব ভালোবাসে। তাই ধীরে ধীরে চকের ইফতার বাজার গড়ে উঠেছিল। রোজার দিনে লালবাগ চৌরাস্তার মোড় ও আমলিগোলায় দুপুর থেকে জমে ওঠে ইফতার বাজার।

খুব প্রিয় ছিল ঘুগনি আর তেহারী। পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, ছোলাবুট, সর্ষে তেল এসব দিয়ে বড় বোলে মুড়ি ভর্তা মাখা দলেবলে খাওয়ার মজা আলাদা। মনে আছে ভোরবেলা সেহরি খাওয়ার সময় কাসিদা গেয়ে ঘুম ভাঙানো হতো রোজাদারদের। তারা বাড়িতে গিয়ে দলবেঁধে সমস্বরে গান গাইতো। সানী ভাইয়ের কাছে তালিম নিতে হতো। রোজা শেষে গান গাওয়ার দলকে বখশিস দেয়া হতো। আমলিগোলার আফসু, ইকবাল, আসলাম সানী, বহুদিন রোজার মাসে কাসিদা গেয়েছেন। তখন ঈদের জামাকাপড় রেডিমেট কেনা হতো না। টেইলার্সে যারা সেলাই করতেন তাদেরকে বলা হতো খলিফা। ৭০ এর ঈদে খলিফা সাহেব আমার একটা চেক শার্ট আকারে ছোট করে ফেলেছিল তাই বাবার সেকী উত্তেজনা। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চিৎকার করে খলিফাকে গালমন্দ করলেন। এই দৃশ্য আমার এখনো মনে পড়ে। 

বাবা তখন শাড়ি কিনতে যেতেন সদরঘাটে। ঢাকায় তখন বিপনীবিতানের এমন রমরমা ছিল না। সদরঘাটের পরে বায়তুল মোকররম তৈরি হলো। নিউমার্কেট গাউছিয়ায় শাড়ি কাপড় বিক্রি শুরু হয় আরও পরে। নিউমার্কেটে তখন কাঁচাবাজার ছিল জমজমাট। বাবার সঙ্গে ঈদের আগের দিন আমরা নিউমার্কেট কাঁচাবাজার যেতাম। উঁচু টিনশেডের ঢাকনা দেয়া মার্কেট। বাবা ঘুরে ঘুরে দরদাম করে জিনিশপত্র কিনতেন। চিনি, পোলাওয়ের চাল, বুটের ডাল, দুধ, লাচ্ছা সেমাই, গরুর মাংস, মুরগি এসব প্রয়োজনীয় জিনিশ কেনা হতো কাপড়ের ব্যাগে। রিকশায় চেপে বাবার সঙ্গে বাসায় ফিরতাম। সদরঘাটে টিনশেডের মার্কেটে নানারকম শাড়ি পাওয়া যেতো। তবে সে আমলে ক্যারোলিন শাড়ি খুব জনপ্রিয় ছিল। 

পাতলা সিল্কের মতো শাড়ি। মা, ফুফু ও চাচীর জন্য তিনটা শাড়ি বাবাকে কিনতেই হতো। আমলিগোলা থেকে রিকশায় চেপে যানজটহীন শহরে খুব দ্রুত সদরঘাট পৌঁছে যেতাম। লালবাগ হয়ে চকবাজার মোগলটুলি পেরিয়ে বাবুবাজার ইসলামপুর পাটুয়াটুলি হয়ে সদরঘাট চলে যেতাম। এই ব্যস্ততম রাস্তাটুকু রিকশায় যেতে ভারি ভালো লাগতো। বাবা দেখিয়ে দিতেন এইটা জেলখানা। ঐ যে আহসান মঞ্জিল। ও পাশে বুড়িগঙ্গা নদী। ঐ পাশে দোলাইখাল। একদা ঐখানে নৌকা চলতো। বাঁ পাশে নওয়াবপুর। পেরিয়ে এলাম তাঁতীবাজার। এই যে জজকোর্ট, জগন্নাথ কলেজ। বাঁ পাশে চলে গেলে বাংলাবাজার। ওখানে বইয়ের আড়ৎ। এইভাবে বাবা ছোটবেলায় ঢাকা শহরকে পরিচিত করে দেন আমাদের সঙ্গে। আমি ছোটবেলাতেই শহিদ মিনার, হাইকোর্ট, কার্জন হল, ডিআইটি এসব চিনে ফেলেছিলাম। 

দুই.
১৯৭১ সাল।
আমলিগোলায় যুদ্ধের ঢেউ এসে লাগে। মোশাররফ ভাই, সোহান ভাই যুদ্ধে চলে গেলেন বুড়িগঙ্গার ওপারে। আর যারা প্রবীণ ব্যক্তি ছিলেন সরাসরি যারা পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তারা নিশ্চুপ রইলেন। এলাকার শান্তি রক্ষার জন্য তারা তৎপর হলেন। তাই আমলিগোলায় যুদ্ধের ডামাডোল তেমন চোখে পড়েনি। যুদ্ধের কনভয় বা পাকিস্তানি আর্মিরা আমলিগোলায় আসেনি। এই এলাকায় আইয়ুব খানের দালালেরা খুব সক্রিয় ছিল। তারা মনে প্রাণে পাকিস্তানের ভাঙন চায়নি। আমার বাবাও কিছুটা সেই দলের মানুষ ছিলেন। তিনি ৪৭ সালে লড়কে লেঙে পাকিস্তান বলে ঝান্ডা উড়িয়েছিলেন। যাহোক সম্ভবত ডিসেম্বর মাসে ঈদুল ফিতরের আগমন ঘটে। আকাশে একফালি রমজানের চাঁদ ওঠে। পরদিন মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আমলিগোলার সরু রাস্তায় সারি বেঁধে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়। সেই ঈদে আমরা নতুন জামাকাপড় পরিনি। বড় ভাইয়ের টাইট হয়ে যাওয়া জামা পরে ঈদ উদযাপন করি। একটা কদবেল কিনে লাঠি দিয়ে চুষে চুষে সারাদিন সেটা খেয়েছি। কী যে সুস্বাদু সেই কদবেল। 

মনে আছে মা রান্না করেছিলেন শাদা পোলাও আর আলু দিয়ে টকটকে গরুর মাংস। সেমাই আর গুড়ের ক্ষীর। অভাবের সংসারে খাবারের প্রাচুর্য ছিল না। ইঁদুরের মতো খিদে পেটে আমরা ছটফট করতাম। মা ঠিকই সেসব টের পেতেন। 

যৎসামান্য যা জুটতো খেতে দিতেন। স্বাধীনতার পরও আমার বাবার ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না। দানবের মতো অভাব এসে আরও গ্রাস করল। মনে পড়ে রিলিফের একটা শার্ট পেলাম। চকরা বকরা চেক শার্ট। কী শীত কী গ্রীস্ম সেই শার্ট পরে থাকতাম দিনমান। 

বড় ভাইদের জামা পরেই ঈদ কাটতো। নতুন বছরে তখন নতুন বই কেনার সামর্থ ছির না আমার। বড় ভাইয়ের পুরোন বই মোটা সুতো দিয়ে সেলাই করে ভালো ছাত্র হওয়ার চেষ্টা করতাম। আমাদের কালে ঈর্ষাকারতা ছিল না। লোক দেখানো ব্যাপারটা কম ছিল। সামাজিকভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। পুরানা ঢাকার পাড়া মহল্লায় প্রত্যেকে এক পরিবারের অংশ হিসেবে বাস করতো। ধনীরা প্রচুর পরিমাণে দান করতেন। বাইরে থেকে এসে যারা বসতি গড়ে তুলেছিলেন তাদের প্রতিও আদি ঢাকাবাসীরা ঐক্য অনুভব করতেন। 

তাই আক্ষরিক অর্থে বলা যেতে পারেÑঈদের দিন সেকালে সবার দুয়ার খোলা ছিল। প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়ি যেতো। উঠোনে কোনো বাউন্ডারি ছিল না। সকলের সমান প্রবেশাধিকার থাকতো প্রত্যেকের বাড়িতে। মেয়েরা পরিশীলিত পোমাক পরতো। কড়া কাজে দলবেঁধে তারা আত্মীয়ের বাড়িতে যেতো। বোনদের হাতের আঙুল ধরে ছোট ভাইয়েরা ঘুরে বেড়াতো। ছোটবেলায় দেখেছি ঈদের জমজমাট মেলা। না এসব ফ্যাশনের মেলা নয়। নিছক আনন্দ বিনোদনের মেলা। 

কামরাঙ্গির চরে এমন একটা ঈদ মেলা বসতো ঈদের পরদিন। চারপাশে চারটা নাগরদোলা ঘুরতো। আমি নাগরদোলায় চড়তে খুব পছন্দ করতাম। ক্যাড়ক্যাড় শব্দ শুনলেই আমার বুকে মোচড় দিয়ে উঠতো। মেলা শেষে একবার একটা কাগজের কুমির কিনেছিলাম। সুতো দিয়ে টানলে কুমিরটা ফরফর করে সামনে এগিয়ে যেতো। কাগজের কুমিরের সঙ্গে খেলা করতে খুব আনন্দ লাগতো। কুমিরের দাম ছিল মাত্র দুই আনা। অর্থাৎ বারো পয়সা। কিংবা সেই কাগজের তৈরি টমটম গাড়িও আজ হারিয়ে গেছে। আমাদের ছেলেবেলায় প্রাচুর্য ছিল না। লোভ লালসা ছিল না। ধনী গরিব পার্থক্য ছিল না। তখন সুন্দর সম্পর্ক ছিল সবার ভেতর। ঈদের আনন্দ ছিল। জীবন ছিল রৌদ্রছায়ায় মমতাময়। সেই দিনগুলো স্মৃতি হয়ে আছে মানসপটে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.