বয়স তখন দশ-এগারো হবে। জীবন জুড়ে উচ্ছলতা আর তারুণ্যে ভরপুর। আমরা তখন গ্রামের বাড়িতে মায়ের সাথে থাকি। আমাদের সাথে বুবুও থাকতেন। দাদিকে আমরা বুবু বলতাম।
আব্বা বাইরে চাকরি করতেন, বাড়ি আসতেন সপ্তাহান্তে, কখনো মাসের শেষে। তাঁর বাড়ি ফেরা ছিল আমাদের জন্য সবচাইতে বড় সুখবর।
এমনিভাবে দিন কাটতো, তারপর বছর ঘুরে আসতো ঈদ।
সাতাশ রমজান থেকে আমাদের ঈদ উৎসব শুরু হতো। ঐ দিন চলতো ঈদ উপলক্ষে মেহেদী পরার ধূম। পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়ি চলতো হৈ-হুল্লোড়। কার হাতটি বেশি লাল হয়েছে, কার আঁকাটা ভালো হয়েছে তা নিয়ে চলতো গবেষণা, দফায় দফায় বৈঠক। অন্যের জীবন রাঙিয়ে মেহেদী গাছটা ঠায় দাঁড়িয়ে সেদিন বিজয়ের হাসি হাসতো।
আব্বা বাড়ি আসতেন, বাড়ি আসতেন ছোট কাকার পরিবার। সবাই মিলে আনন্দে আত্মহারা হতাম। ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় চলতো চাঁদ দেখার পর্ব। ছেলে-বুড়োদের চাঁদ দেখার সে কি হিড়িক! সবাই দলে দলে দৌড়াতো স্কুল মাঠের দিকে নতুন চাঁদ দেখার আশায়। লোকে লোকারণ্য স্কুল মাঠ! সবাই আঙুল উঁচিয়ে হাসিমুখে দেখতাম চাঁদের হাসি।
বাড়ি ফিরে আমাদের ছোটদের কোন কাজ থাকতো না। ভাইবোনেরা মিলে লুডু নিয়ে বসতাম। ওই দিন পড়ার ছুটি হতো বিনা নোটিশে। আহারে... সে কি আনন্দ! মনে হতো, পৃথিবীর সব সুখ যেন আমাদের হাতের মুঠোয়।
পরেরদিন ১লা শাওয়াল। খুব ভোরে আব্বা সবাইকে জাগিয়ে দিতেন। আমরাও হুড়মুড় করে উঠে পড়তাম। সমস্ত বাড়িতে চলতো পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কী যে ফকফকা লাগতো বাড়িটা! এরপর নতুন সাবান নিয়ে পুকুরে দৌড়ঝাঁপ।
মা আর ছোটমা মিলে ঈদে রান্না করতেন নানাপদ। সেমাই, জর্দা, পায়েস, পোলাও, আরো কত কি! জর্দা ছিল আমার ভীষণ প্রিয়, আমি গোগ্রাসে জর্দার বাটি সাবাড় করতাম। মা হেসে বলতেন- "আমার জর্দা পাগলী...।" আহা! মায়ের সে ডাক আজও ঈদ এলে আমার কানে রিনিঝিনি সুর তুলে বাজতে থাকে। কোথায় গেছে সেসব দিন! কতদিন যে মা'কে দেখিনা!
এরপর নতুন জামা-কাপড় পরে চলতো ঈদ সালামি তোলার পর্ব। কে আগে কারটা নিতে পারে... সেকি হুলুস্থুল কাণ্ড! ভাইবোনেরা সারি বেঁধে যেতাম ঈদের মাঠে, চলতো কেনাকাটার ধূম। পাপড় ভাজা, জিলাপি, রসগোল্লা কি যে প্রিয় ছিল!
ঈদের নামাজ শেষে আব্বা সবাইকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। প্রথমেই যেতেন বুবুর ঘরে। চলতো কদমবুসির পর্ব। পর্যায়ক্রমে কদমবুসি সেরে সবশেষে মা'কে সালাম করতাম। মা আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করতেন... মায়ের দু'চোখ আনন্দ-অশ্রুতে ভরে উঠতো।
ঈদের সারাটাদিন খুব আনন্দ আর হৈচৈ করে কাটতো আমাদের। সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। আজ বুবু, আব্বা কেউই বেঁচে নেই। মায়ের শরীরটাও বড্ড খারাপ থাকে আজকাল। ভাইবোনরা সবাই প্রয়োজনের তাগিদে একেক জায়গায়। বছর অন্তে দেখা হয়... হয় না। আহারে জীবন!
‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না...আহা আমার নানান রঙের দিনগুলি!’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









