যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে দুই বন্ধুর তর্ক শেষ-মেষ সমাপ্ত হলো যখন শামীম বললো, ‘তুই তোর মতো ভাবতে থাক। আমি যুদ্ধে যাব এবং আমার বিশ্বাস যুদ্ধে আমরা অবশ্যই জিতবো। কারণ পাকিস্তানিরা এসেছে বাংলাদেশকে বুটের তলায় পিষতে। আর আমরা লড়াই করবো স্বাধীনতার জন্য। কাদের চাওয়ার জোর বেশি? বল, কাদের চাওয়ার জোর বেশি?’
এ কথার পর সাকিব রণে ভঙ্গ দেয়। তার আগে দুই বন্ধুর বেশুমার তর্ক হয়। বাঙালি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এই কথাটি সাকিব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। অবাক হয়েছে শামীমের যুদ্ধে যাবার কথা শুনে।
তারপর জোর গলায় বলেছে, ‘এই পাগলামির জন্য তোদের অনেক চড়া মূল্য দতে হবে, মনে রাখিস। তুই কি মনে করিস, পাকিস্তানি মিলিটারি পুচকে মুক্তিবাহনীর কাছে হেরে যাবে এবং তোদের স্বপ্নের সোনার বাংলা স্বাধীন হবে? তুই এখনও দুঃস্বপ্নের ঘোরে আছিস।’
‘দেখ সাকিব, এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলবে। আমার ধারণা, পাকিস্তানিরা একসময় মনোবল হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’
‘তুই উল্টোটা বুঝেছিস। পাকিস্তানিরা মনোবল হারাবে না। মনোবল হারাবে ভাইতা বাঙালি। বাঙালির কাছে এমন কি অস্ত্র আছে যে সেই অস্ত্র দিয়ে শক্তিশালী পাকিস্তানি মিলিটারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? ইন্ডিয়া তোদের নাচাচ্ছে আর তোরা বেকুবের মতো নাচছিস। তুই আর যাই করিস তোর পরিবারকে ধ্বংস করিস না।’ সাকিব জোর দিয়ে বলে।
শামীম বলে, ‘শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ হয় নারে পাগল। যুদ্ধের প্রধান শক্তি মনোবল। পাকিস্তানিরা আমাদের দেশ ধ্বংস করতে এসেছে আর আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবো। দুয়ের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। তুই সেই ব্যবধান
ধরতে পারছিস না।’
‘তুই যুদ্ধে গেলে ব্যাপারটা কি চাপা থাকবে? সবাই জেনে যাবে তুই যুদ্ধে গেছিস। তখন রাজাকাররা এসে তোর বাবা-মাকে ধরে নিয়ে যাবে। এই ব্যাপারটি তুই একবারের জন্যেও ভাবছিস না।’
‘ভাববো না কেন? অবশ্যই ভাবছি।’
‘তারপরও তুই যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিস? তোর কলেজ পড়ুয়া বোন সাথীর কথা একটু হলেও তোর ভাবা দরকার। যদি তোর কারণে রাজাকাররা ওকে তুলে নিয়ে যায়?’
শামীমকে ভাবনা কাতর দেখায়। নিঃশব্দে মাথা নামিয়ে থাকে। তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলে, ‘তুলে নিয়ে গেলে আমি থাকলেই কি ঠেকাতে পারবো?’
‘তারমানে তুই যুদ্ধে যাবি?’
‘হ্যা। যুদ্ধে আমাকে যেতেই হবে। দেশটা শত্রুমুক্ত করতে হবে। পাকিস্তানিরা এই দেশটাকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছে। আর বাবা-মায়ের কথা বলছিস? অন্য যারা যুদ্ধে গেছে তাদের বাবা মায়ের যা হবে আমার বাবা-মায়েরও তাই হবে। আমার প্রশ্ন, তুই আমাকে যুদ্ধে যেতে বারণ করছিস কেন? এ দেশটা কি তোর না? তুই যুদ্ধে যাচ্ছিস না কেন?’
‘তোর মতো আমাকে পাগলা কুত্তা কামড়ায়নি। আমি বেকুবের মতো নিজের জানটা নিজে নিজেই খোয়াতে চাই না।’ সাকিব রাগত বলে চলে যাচ্ছিল। শামীম তাকে ডেকে থামায়। বলে, ‘একটা অনুরোধ করবো। রাখবি?’
‘বল কি অনুরোধ?’
‘তুই আমার বন্ধু। আমার বোন সাথীকে তোর জিম্মায় রেখে গেলাম। তুই ওকে দেখে রাখবি? কথা দে।’
সাকিব থমকে তাকালো শামীমের দিকে। বললো, ‘আমি বুঝতে পারছি না, যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে তুই এতো এডামেন্ড কেন? তোকেতো আমি কোনদিন রাজনীতি করতে দেখিনি। ভার্সিটির হলে যখন ছিলাম, নেতাদের চাপে আমি তবু দু’একদিন মিছিলে গেছি, তোকেতো একদিনও মিছিলে যেতে দেখিনি। সেই তুই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছিস। এই ব্যাপারটা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না।’
‘মিছিলে যাওয়া আর যুদ্ধে যাওয়া এক কথা নয়রে সাকিব। যুদ্ধে যাওয়ার নাম দেশপ্রেম। আমি আমার দেশকে ভালবাসি। দেশপ্রেমের টানে আমি যুদ্ধে যেতে চাই।’
‘দেশ মানে! তুই কোন দেশের কথা বলছিস?’ সাকিব কঠিন গলায় প্রশ্ন করলো।
শামীম স্বাভাবিকভাবে বললো, ‘দেশতো একটাই। বাংলাদেশ।’
সাকিব জোর দিয়ে বললো, ‘দিবা স্বপ দেখা বাদদে। এই দেশ কোনদিন বাংলাদেশ হবে না। চ্যালেঞ্জ করলাম তোর সঙ্গে। পাকিস্তান ভাঙা অতো সহজ না। ইন্ডিয়া যত ফালাফালি করুক পাকিস্তানের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তুলার মতো উড়ে যাবে।’
‘সে যা ইচ্ছে হোক। তুই আমাকে কথা দে। আমার বোনটাকে তুই দেখে রাখবি এবং আমার ব্যাপারটা গোপন রাখবি। তোর ভরসায় সাথীকে রেখে গেলাম। রাখবি না আমার কথা?’
‘এত করে যখন বলছিস। তখন কি আর করা। কথা দিলাম।’ শামীম উঠে সাকিবকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আবেগে দুজনই কেঁদে ফেলে।
গ্রাম পেরিয়ে যেতে শামীম একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে নেয় প্রিয় গ্রামকে। দেশ স্বাধীন না হলে এই গ্রামে তার আর ফেরা হবে না। শেষবারের মতো দেখে নিলো গ্রাম। বুকের মথ্যে হু হু করে ওঠে। চোখ ভিজে আসে। পেছনে ফেলে গেল বৃদ্ধ পিতা-মাতা আর কলেজ পড়ুয়া ছোট বোন সাথীকে। সাথীর দায়িত্ব বন্ধু সাকিবকে দিয়ে শামীম অনেকটা নিশ্চিন্ত। সাকিব তার ছোটবেলার বন্ধু। সেই স্কুল জীবন থেকে তারা একসঙ্গে বেড়ে উঠছে। সাকিব অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। তার বাবা বিডি মেম্বর। মুসলিম লীগের সমর্থক। জেনারেল টিক্কা খান পাকিস্তান রক্ষায় সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘শান্তি কমিটি’ করার নির্দেশ দেওয়ায় সেই ডাকে সাড়া দিয়ে সাকিবের বাবা ফজলুর রহমান ইউনিয়ন ‘শান্তি কমিটি’র চেয়ারম্যান হয়েছে। পাঞ্জাবির বুক পকেটে পাকিস্তানের ছোট পতাকা লাগিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সাকিব যে এই কারণে যুদ্ধে যাচ্ছে না এই ব্যাপারটা শামীম ঠিকই বুঝতে পারে। সেও তার বাবার মতো পাকিস্তান পন্থি।
গ্রামে কয়েকজন রাজাকারও হয়েছে। তারা রাইফেলের ট্রেনিং নিয়ে কাধে রাইফেল নিয়ে বীর দর্পে ঘুরে বেড়ায়। এলাকায় রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়েছে ফজলুর রহমানের নিজস্ব তত্ত¦াবধানে। রাজাকাররা পাকিস্তান বাহিনীকে সাহায্য করবে। তারা মাস গেলে বেতন পাবে। তারা পাকিস্তান রক্ষা করবে। এটা তাদের ঈমানি দায়িত্ব। তারা জানে না পাকিস্তানের রাজনীতির আসল চরিত্র। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশ দুই খন্ড হয়ে ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান গঠিত হয়। মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ইন্ডিয়া। বাংলা ভাগ হলো। কত কত মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেল। দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তুর মতো রিফিউজি হলো। সাধের ভিটে মাটি ছেড়ে পালিয়ে অন্যদেশে গেল। পূর্ব বাংলার নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। এই পূর্বপাকিস্তান নাম নিয়ে প্রতিবাদ করেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবর রহমান। ১৯৫৭ সালে করাচিতে গণপরিষদের তরুণ সদস্য শেখ মুজিবর রহমান বক্তৃতা দেওয়ার সময় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটির প্রতিবাদ করে বলেন, ‘পূর্ব বাংলা নামের একটা ইতিহাস ঐতিহ্য আছে। আর যদি পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতেই হয় তাহলে বাংলার মানুষের জনমত যাচাই করতে হবে। তারা এই নামের পরিবর্তন মেনে নেবে কিনা সেজন্য গণভোট দিতে হবে।’
তার আগেই পূর্ববাংলার জনগণের আশা ভঙ্গ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নার এক ঘোষণায় পূর্ববাংলার জনগণ হাল ছেড়ে দিয়েছে। পাকিস্তান জন্মের মাস সাতেক পরে জিন্না ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসে। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সে ঘোষণা দেয়, ‘উর্দু-উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।’ এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘোষণা দিলে ছাত্ররা তার উক্তির চরম প্রতিবাদ জানায়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। সারা দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে। জিন্না হয়তো বুঝতে পারেনি তার উচ্চারিত কিছু কথায় তারই প্রতিষ্ঠিত নতুন দেশটির ভাঙন ডেকে আনতে ভূমিকা রাখবে।
জিন্না তখন পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগেরও সভাপতি। নয়দিনের পূর্ববঙ্গ সফরে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি শহরে সে ভাষণ দেয়। সবখানেই সে বলে, ’উর্দুই হবে পাকিস্তানের একামাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বলার পর কয়েকজন ছাত্র ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে থাকে। যা জিন্নাকে ভীষণ অপ্রস্তুত করে। কিছুক্ষণ সে বক্তৃতা বন্ধ রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে বোকা বনে যায়। তাঁর ধারণা ছিল তাঁর কথায় এদেশের মূখ জনগণ হাততালি দিয়ে উল্লাস করে উঠবে। তাতো হলো না। উল্টো মুখের ওপর প্রতিবাদ করে বসলো। ভীষণ অবাক হলেন তিনি। ঘটনা তার কাছে ভীষণ অপ্রত্যাশিত।
২.
রাইফেল কাধে তিনজন রাজাকার ফজলুর রহমানের বাড়িতে আসে। বাইরে থেকে ডাকতে থাকে। ‘চেয়ারম্যান সাহেব বাড়ি আছেন? চেয়ারম্যান সাহেব?’
বেরিয়ে আসে সাকিব। সাকিবকে দেখে সালাম দেয় রাজাকার আলিম। আলিম মাদ্রাসায় পড়েছে, কিছুদিন স্কুলে পড়েছে। ওই পর্যন্ত বিদ্যার দৌড়। ওই সামান্য কিছু লেখাপড়া করার পর ওই পাঠ চুকিয়ে গ্রামে এসে বাউন্ডেলেপনা করে ঘুরে বেড়ায়। রাজাকার গঠনের কথা শুনে আলিম স্বেচ্ছায় এসে রাজাকারের খাতায় নাম লেখায়। ট্রেনিং নেয় অস্ত্র চালানোর। খুবই গরীব ঘরের সন্তান আলিম। রাজাকারে নাম লেখালে মাসে-মাসে বেতন পাবে। আর পাবে গনিমতের মাল। আলিমের ঘাড়ে অস্ত্র দেখে সবাই ভয় পায়। সমীহ করে। এই আনন্দে আলিম নিজেকে বিরাট কিছু ভাবে। তার দুজন সাগরেদ আছে। তারাও রাজাকারের ট্রেনিং নিয়েছে। তারাও বুক ফুলিয়ে রাজা বাদশার মতো চলাফেরা করে। তারা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের কাছে এসেছে একটি অনুমতির জন্য।
‘কি ব্যাপার? কি হয়েছে?’ সাকিব বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে।
আলিম বলে, ‘চেয়ারম্যান সাহেব বাড়ি নাই?’
‘না নেই।’ সাকিব বলে।
আলিম বলে, ‘তাকে ভীষণ দরকার। একটা অপারেশন করতে হবে। তার অনুমতি ছাড়া সেটা করা যাচ্ছে না।’
‘আমাকে বলা যাবে?’ সাকিব জিজ্ঞেস করে।
‘আপনিতো এসবের মধ্যে নাই। আপনাকে কিভাবে বলি।’
‘বলে দেখতে পারো। আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলে তোমাদের জানাবো।’
আলিম সাহস নিয়ে এগিয়ে এসে বলে, ‘মধ্যপাড়ার শামীম মুক্তিবাহিনীতে গেছে। আমরা পাকিস্তান রক্ষায় জীবন দেওয়ার জন্য আল্লার কসম খাইছি। আর কিনা আমাদের চোখের সামনে সে মুক্তিবাহিনী হয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? ইন্ডিয়ার দালালি করবেÑআর আমরা তাই মাইনা নিমু?’
সাকিব সহজ ভাবে বললো, ‘তাতো মানা যায় না। কিন্তু তোমাদের ইচ্ছা কি? কি করতে চাও তোমরা?’
‘এই জন্যেতো আমরা চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে পরামর্শ করতে আছি। উনি যা বলবেন আমরা তাই করবো।’ বললো আলিম।
বেটে খাটো রাজাকার, নাম জহর, তোতলিয়ে কথা বলে। সে বললো, ‘আমাদের ইচ্ছা শামীমের বাপকে ধাইরা মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়া যামু।’ লম্বা ফর্সা বোকা টাইপের গেদু রাজাকার বললো, ‘আমাদের আরও ইচ্ছা ওর বোনটাকে আমরা বিয়া করমু।’
সাকিব বললো, ‘তিনজন মিলা একজনকে বিয়া করবি? এটা কেমন কথা?’
রাজাকারের কমান্ডার আলিম বাঁধা দিয়ে বললো, ‘আমরাতো সবাই বিয়াত্ত। আমাদের মধ্যে একজন আছে সে অবিয়াত্ত। চেহারা সুরুত মাশাল্লাহ ভাল।’
‘কে সে?’
আলিম বলে, ‘আপনি চিনবেন না। বাড়ি ভেন্নাগাছি। আমাদের সাথে রাজাকারে ভর্তি হইছে। দুর্দান্ত সাহস। মুক্তিফৌজ পাইলে বেয়োনেট দিয়া খোঁচাইয়া শেষ কইরা ফেলে। একটু ভয় ডর নাই।’
সাকিব তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে বলে, ‘রাজাকারদের সাহস আমার চেনা আছে। মুক্তিবাহিনীর নাম শুনলে তোরা কাপড় নষ্ট করিস। আবার মুখে বড় বড় কথা। শোন, আব্বার সাথে আমার কথা হইছে। শামীমের বাবা-মা এবং সাথীর ব্যাপারে তোদের কিছু করতে হবে না। যা করার আব্বা করবে।’
‘কি করবে চেয়ারম্যান সাহেব?’
সাকিব গম্ভীর ভাবে বলে, ‘কি করবে তা কি তোদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে?’
আলিম আমতা আমতা করে বলে, ‘না ভাইজান। আমরা একটা প্লান করছিলামতো, তাই জিগাইতেছি।’
‘কি প্লান?’
‘না থাক ভাইজান। আমগো প্লান হুইনা কাম নাই। চেয়ারম্যান সাহেবের প্লান মতোই কাম হবে। আমরা যাইগা। চল তোরা।’
ফর্সা লম্বু গেদু রাজাকার তবু বলে, ‘ব্যাপারটা ভাইবা দেইখেন ভাইজান, আমগো চোখের সামনে সে মুক্তিফৌজে গেছে মিলিটারি জিগাইলে কি জবাব দিমু আমরা?’
‘আবার জিগায়। কইলাম না এইটা নিয়া তোদের ভাবতে হবে না।’
আলিম আবার তাগাদা দেয়, ‘চল চল।’
রাজাকাররা চলে যায়। সাকিবের মাথায় ভিন্ন চিন্তা এসে ভর করে। সাথীকে নিয়ে নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়। সে ভাবনা আরও জটিল। সাথীকে সে একান্তে পেতে চায়। এই ভাবনাটা হঠাৎই মাথায় ঝাঁকিয়ে শক্ত করে চেপে বসে। রাজাকাররা তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার করেছে। কথাটা শুনে নিজের মধ্যে সেই ভাবনাটা আবার মাথা চারা দেয়। ব্যাপারটা নিয়ে জটিল ভাবনা শুরু হয় সাকিবের মনে।
ভাবনাটা এমনভাবে মাথায় জট পাকাচ্ছে যে রাতে তার ঘুম উবে গেল। একটানা একই ভাবনা। হঠাৎ তার মনে হলো শামীম ব্যাপারটা জানলে কি ভাববে? শামীম তার বন্ধু। পরক্ষণে তার মনে হলো, কোথায় শামীম? তার কি আর সশরীরে ফিরে আসার সুযোগ আছে? সাকিব নিজে নিজেই বলে, অসম্ভব। দেশ কোনদিন স্বাধীন হবে না। শামীমও কোনদিন ফিরে আসতে পারবে না। আসলে নির্ঘাত মৃত্যু।
সাকিবের এখনকার ভাবনা কিভাবে সাথীকে সে কাছে পাবে। নানাভাবে কাছে পাওয়ার কৌশল নিয়ে সে ভাবতে থাকে।
সকালে ঘুম ভাঙলো বেলা করে। রাত কেটেছে নির্ঘুম। উঠে সাকিব হাঁটতে হাঁটতে সাথীদের বাড়ির দিকে যায়। দেখা হয় সাথীর বাবা করিম মিয়ার সঙ্গে। করিম মিয়া চরায় যাচ্ছিল কাস্তে হাতে। হ্যাংলা পাতলা করিম মিয়ার থুতনিতে একগোছা দাড়ি। পাক ধরেছে। মাথায়ও কাঁচা-পাকা চুল। বেশির ভাগ অংশ ফাঁকা। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে সে যাচ্ছিল চরার দিকে। সাকিব দেখে সালাম দিলে করিম মিয়া দাঁড়িয়ে তাজিমের সঙ্গে সালামের জবাব দেয়। সাকিব তার ছেলের বন্ধু। সময় এখন তাদেরই। তার বাবা পাকিস্তানি মিলিটারিদের সঙ্গে চলা-ফেরা করে। বিরাট ক্ষমতা। তার ছেলেকে সমীহ না করে উপায় আছে?
‘বাবা কেমন আছ তুমি?’ করিম মিয়া মিষ্টি করে শুধায়।
‘আছি চাচা মোটামুটি। আপনারা কেমন আছেন?’
‘কেমন আর থাকবো বাবা। সারাক্ষণ নানান দুশ্চিন্তায় থাকি। তোমার চাচীতো সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে।’
‘করারই কথা। শামীম এমন একটা কাজ করবে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। শামীমের জন্য এখন আপনাদেরও নানান বিপদ। আমার বেশি ভাবনা সাথীকে নিয়ে। যুবতী মেয়ে। কে কখন বলে দেয় ওর ভাই ইন্ডিয়া গেছে, দুস্কৃতিকারির খাতায় নাম লেখাইছে। তাহলেতো মহা বিপদ। কি বলেন চাচা?’ সাকিবের প্রশ্নে করিম মিয়া ঘাড় নেড়ে মাথা নামিয়ে থাকে। আর কি বলবে। বলার মতো কথা খুঁজে পায় না।
সাকিব বলে, ‘চাচা, একটা কথা বলবো। কথাটা না বলেও পারছি না। বলতেও খারাপ লাগছে। কি ভাবে যে বলবো, তাই ভাবছি।’
‘তুমি বাবা সোজা-সুজি বলো। তুমিতো আমাদের পর না’
‘ঠিকই বলেছেন। আমি আপনাদের আপনার মানুষ। আপনার মানুষ হিসেবেই কথাটা বলছি। ব্যাটাদের নজর পড়েছে আপনার মেয়ে সাথীর উপর। ওরা সাথীকে তুলে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চায়। আব্বা তাদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছে। তাদের কথা, ওর ভাই আমাদের বিপক্ষে, মুসলমানের দেশ পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ত্র ধরেছে। আমরা তার বাড়িঘর লুট করবো। সাথীকে তুলে নিয়ে আগে ধর্ষণ করবো তারপর ক্যাম্পে জমা দেব। কথাগুলো আমি নিজের কানে শুনেছি চাচা। শুনে স্থির থাকতে পারিনি। আমার মাথা চক্কর দিচ্ছিল। সাথী আমার বন্ধুর ছোট বোন। তারমানে সে আমারও ছোট বোন। তার এই অবস্থা আমি কিভাবে মেনে নেব চাচা, আপনি বলুন?’
করিম মিয়া কান্না গলায় বলে, ‘তুমি আমার মেয়েকে রক্ষা করো বাবা। আমি ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি শামীম যুদ্ধে যাবে। টের পাইলে কি ওরে আমি এই অবস্থায় যুদ্ধে যাইতে দিতাম? ওর মা সারাক্ষণ এইটা ভাইবা কান্দে। তুমি আমার মেয়েটাকে বাঁচাও বাবা।’
সাকিব কায়দা করে বলে, ‘মা বলতে ছিল সাথীকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে। মায়ের শরীরটা খারাপ। মাকে একটু দেখাশোনা করলো। সেই সঙ্গে সাথী আমাদের বাড়িতে থাকলে কেউ আর ওকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারবে না। আপনি কি বলেন চাচা?’
কথাটা ঝড়ের গতিতে সাকিব বলে করিম মিয়ার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে।
করিম মিয়া বলে, ‘এটাতো খুবই ভাল কথা। সাথীকে নিয়াইতো আমাদের বেশি চিন্তা। তোমাদের বাড়ি থাকলে আমাদের আর ভাবনার কিছু থাকবে না। সাথী তোমাদের বাড়ি থাকা আর আমাদের বাড়ি থাকা একই কথা।’
সাকিব কায়দা করে বলে, ‘চাচা এক কাম করেন। আপনি বাড়ি গিয়া চাচীর সঙ্গে পরামর্শ করে যেটা ভাল হয় সেইটা করেন।’
‘ঠিকই বলেছ বাবা। আমি অহনই যাইতাছি সাথীর মায়ের সাথে পরামর্শ করতে।’
করিম মিয়া দ্রুত বাড়ির পথ ধরে। সাকিব মুচকি হেসে সকালের মেঘমুক্ত আকাশ দেখে। আষাঢ় মাস শুরু হয়েছে। প্রতিদিন বৃষ্টি ঝরছে। আজ আকাশ নির্মল। এমন নির্মল আকাশ সচরাচর দেখা যায় না। সাকিব মনে মনে সাথীকে নিয়ে ভেবে নিজে নিজে ব্যাকুল হয়।
করিম মিয়াকে ফিরে আসতে দেখে সাথীর মা রমিছা বিবি অবাক বিস্ময়ে তাকায়। ‘কি অইলো ফিরা আইলেন যে?’
‘তোমার সঙ্গে একটা পরামর্শ করতে আইলাম।’ করিম মিয়া কাস্তে বেড়ার বাতায় গুঁজে বারান্দায় এসে মাটিতে ঠেস দিয়ে বসে।
‘কি পরামর্শ?’ ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে রমিছা বিবি।
করিম মিয়া সব ঘটনা খুলে বলে। সাকিবের সঙ্গে কি কি কথা হয়েছে, সাকিব কি পরামর্শ দিয়েছে একে একে সব বিস্তারিত বলে করিম মিয়া। রমিছা বিবি সব শুনে লম্বা করে শ্বাস ফেলে। কান্না গলায় বলে, ‘শেষপর্যন্ত মেয়েটার কপালে এই আছিল।’ বলতে বলতে শব্দ করে শ্বাস ফেলে। কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। করিম মিয়া ধমকে বলে, ‘কান্নাকাটির কি অইলো, আমিতো কিছুই বুঝতাছি না।’
‘আপনি বুঝবেন কি? আপনি কি মাইয়ার মাইনষের সব কিছু বোঝেন?’
‘মাইয়া মাইনষের সব কিছু আবার কি?’ করিম মিয়া বোকার মতো প্রশ্ন করে উদাসভাবে তাকিয়ে থাকে। রমিছা বিবি বলে, ‘আপনি আপনার কামে যান। আপনার এতো কিছু বোঝা লাগবে না।’
‘বোঝা লাগবে। আমাকে একটুপর সাকিবকে রেজাল্ট জানাতে হবে। মাথার উপর খাড়া বিপদ নিয়ে কামে যাই কেমনে?’
এইসময় সেখানে আসে সাথী। সে পাশের বাড়িতে গিয়েছিল ধান শুকাতে। সামান্য আউস ধান পেয়েছে করিম মিয়া। নিজেদের উঠোন না থাকায় পাশের বাড়ির উঠোনে সেদ্ধ ধান শুকাতে নিয়ে গেছে। তাকে সাকিবের বলা কথা সব খুলে বলে করিম মিয়া। সব শুনে সাথী বলে, ‘বাজান চলো আজই আমরা নানার বাড়ি গিয়া আশ্রয় নেই।’
‘সেখানে রাজাকার নাই?’ কঠিন গলায় প্রশ্ন করে করিম মিয়া।
‘শুনছি ওখানে নিরাপদ। ভাইয়াও তাই বলে গেছে।’
দুদিন পরের ঘটনা। করিম মিয়া আজ রাতেই পালিয়ে শশুর বাড়ি যাবে।
রাতে খেতে বসেছে করিম মিয়া। সাথী খাওয়া এগিয়ে দিচ্ছে। সাথীকেও খেতে বলছিল করিম মিয়া। সাথী বলেছে তার খিধে নেই। খাবে না। সাথী এখান থেকে চলে যেতে পারলে যেন বাঁচে। এখানে থাকলে সাকিব তাকে নিয়ে রঙ্গ তামাশা করবে। খারাপ প্রস্তাব দেবে। এর আগে একবার সে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। সাথী ভয় দেখিয়ে বলেছিল, ভাইয়াকে সে বলে দেবে। সাকিব আর কথা বাড়ায়নি। শুধু বলেছিল, ‘সেটা বলো না। আমি আর তোমাকে এমন কথা বলবো না।’ সাথী নিশ্চিত তাকে বাড়িতে নিয়ে সে এই ঘটনার প্রতিশোধ নেবে। করিম মিয়ার খাওয়া শেষ। হাত ধুতে গ্লাস হাতে ঘরের বাইরে এসে দেখে টর্চলাইট জ¦ালিয়ে বাড়িতে ঢুকছে কে যেন। একজন নয় জনা চারেক। কাধে রাইফেল। এসেই করিম মিয়াকে ডাকে। ‘করিম মিয়া বাড়ি আছো?’ সেই ডাক শুনে করিম মিয়ার আত্তা শুকিয়ে যায়। সাথী গিয়ে চৌকির নিচে পালায়। তার বুকের কাঁপুনি ঝড়ের বেগে বাড়তে থাকে।
আলিম রাজাকার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে, ‘করিম চাচা, তোমার ছেলে শামীম কোথায় গেছে?’
‘কোথায় গেছে আমি জানি না বাবা।’ ভয়ে ভয়ে বলে করিম মিয়া।
‘মিছা কথা কওয়ার জায়গা পাও না। মনে করছো আমরা কিছু জানি না। তোমার ছেলে ইন্ডিয়া গেছে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করতে। সে দুস্কৃতির খাতায় নাম লেখাইছে। চলো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে যাইতে হবে।’
‘কোথায়?’ ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে করিম মিয়া।
‘ক্যাম্পে।’ আলিম বলে।
ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে আসে রমিছা বিবি। এসে আলিমের পা জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘বাবা আলিম, আমরা সত্যি জানি না শামীম কই গেছে। ও কিছুতেই যুদ্ধে যাবে না। ও ভীষণ ভীতু। তোমরা শামীমের বাপকে ছাইড়া দেও। মিলিটারি তারে মাইরা ফেলবে। আমি তার জান ভিক্ষা চাই।’
আলিম গর্জে উঠে অন্য রাজাকারদের বলে, ‘তোদের কি বলতাছি শুনতে পাস নাই? তোরা এই বুইড়া হালারে বান। এই হালার বুদ্ধিতেই ওর পোলা আমাগো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য ইন্ডিয়া গেছে। ব্যাটা আমাদের শত্রু পাকিস্তানের শত্রু মালাউনগো দেশে গেছে দুস্কৃতির খাতায় নাম লেখাইতে। সাহস দেইখা বাঁচি না। এহনও খাড়াইয়া আছোস ক্যা? বান শালাকে।’
দু’জন রাজাকার ছুটে এসে করিম মিয়াকে পিঠমোড়া করে বাঁধে। রমিছা বেগম আলিমের দুপা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কয়েকজন প্রতিবেশি আড়াল থেকে দেখে তারা আড়ালেই মিলিয়ে যায়। কেউ সামনে আসে না। তখন কারও সামনে আসার মতো অবস্থা ছিল না। সবাই ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ অবস্থা। সাথী চৌকির তলা থেকে বের হয়ে কি করবে ভাবতে থাকে। একবার ভাবে বাইরে গিয়ে আলিম ভাইকে অনুরোধ করবে বাবাকে ছেড়ে দিতে। আবার ভাবে, ওরা যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায়, তখন?
এইসময় সাকিবের কন্ঠ শোনা যায়। টর্চ লাইটের আলো ফেলে সাকিব উঠোনে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘কি হইছে? এতো হলাচিল্লা কিসের?’
করিম মিয়া বলে, ‘দেখতো বাবা, ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তুমিতো সবই জানো, শামীমের খবর আমরা কিভাবে জানবো?’
সাকিব গর্জে ওঠে, ‘আলিম, তোকে না বলেছিলাম করিম চাচার ব্যাপারে তোদের কিছু করতে হবে না। যা করার আব্বার সঙ্গে কথা বলে আমরাই করবো। ছেড়ে দে তাকে’
রমিছা বিবি গিয়ে সাকিবের পা জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘আমগো বিপদের সময় আল্লাহ তোমাকে পাঠাইছে বাবা। তুমি না আইলে আজ কপালে কি যে দুর্ভোগ অইত তা আল্লাই জানে।’
সাকিব বলে, ‘আমিতো আসতাম না। জরুরী কাজে ব্যস্ত ছিলাম। বাড়ির কামলা ইউনুস গিয়ে বললো, করিম চাচাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তাই শুনে আর দেরি করতে পারলাম না। হাজার হোক আপনারা আমার আপনজন। বন্ধুর পিতা-মাতা। শামীম আমার জানের জান দোস্ত। আমি থাকতে তার বাবা-মায়ের কিছু হবে সেটা আমি কিভাবে মেনে নেব? তার চেয়ে আমার মরে যাওয়া ভাল।’
ঘর থেকে সাথী লম্বা করে শ্বাস ফেলে। সাকিবের কথা গুলো তার ভাল লাগে। এর মধ্যে অন্য কোন তত্ত্ব আছে কিনা সাথী সেটাও ভাবে।
সাকিব এবার রাজাকারদের ধমকে বলে, ‘তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা বলছি।’ রাজাকাররা তবু দাঁড়িয়ে থাকে। সাকিব নিজে থেকে বলে, বুঝতে পারছি। তোরা কিছু দক্ষিণা চাস। চাচী, ঘরে সোনাদানা কিছু আছে?
‘সোনাদানা কই পামু বাবা। আমার একটা বিয়ার নাকফুল আছে।’
সাকিব বলে, ‘তাই দেন। ওরা এতো কষ্ট করে এতদূর এসেছে। ওদের যাতায়াত ভাড়াটাতো দেওয়া দরকার। জানের চেয়েতো সোনার মূল্য বেশি না।’
রমিছা বিবি ঘরে গিয়ে পুটলিতে বাধা নাকফুলটা এনে সাকিবের হাতে দেয়। সাকিব লাইট জ¦ালিয়ে নাকফুলটা দেখে। হেসে বলে, ‘নে। জিনিসটা খারাপ না। ভাল দাম পাবি। এখন এটা নিয়ে কেটে পড়। আর কোনদিন এ বাড়িতে আসবি না।’
সাকিব এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় কি যেন বলে। তারপর রাজাকাররা নাকফুলটা নিয়ে চলে যায়।
রমিছা বলে, ‘বাবা ঘরে আইসা বসো। তোমার জন্য এতোবড় বিপদ থাইকা আল্লাহ আমগো রক্ষা করলো। একটু বসো।’ রমিছা বিবি টুল আগাইয়া দেয়।
‘সাথীকে দেখছি না। কোথায় সে?’
রমিছা বলে, ‘ঘরেই আছে। রাজাকার দেইখা ভয় পাইছে।’
‘ভয় পাওয়ারই কথা। ওরাতো মানুষ না। এক একটা জানোয়ার। সুযোগ পাইলে লুটপাট করে। গোয়াল থেকে গরু পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। ওদের ব্যাপক ক্ষমতা দিছে সরকার।’
রমিছা সাথীকে নিয়ে আসে সাকিবের সামনে। সাকিব একঝলক দেখে হেসে ফেলে। তার হাসির কারণ বুঝতে পারে না সাথী। সাকিব বলে,‘তুমি শামীমের বোন। মানে আমারও বোন। আমাদের বাড়িতে থাকতে তোমার এতো আপত্তি কেন?’
কথাটা এমন ভাবে বলে যেন সাকিব নিশ্চিত সাথী ইচ্ছে করে সাকিবদের বাড়িতে যাচ্ছে না। সাথী জবাব খূঁজে পায় না। সে মাথা নামিয়ে থাকে।
সাকিব বলে, ‘আমি তোমার নিরাপত্তার কথাটা বেশি ভাবছি। যে সমস্ত মেয়েদের পাকিস্তানিরা তুলে নিয়ে যায় তাদের উপর সবাই মিলে পাশবিক অত্যাচার করে। এর চেয়ে নরক যন্ত্রণা অনেক ভাল। সে দৃশ্য দেখলে সহ্য হবে না। শুনেছি ক্যাম্পে মেয়েদের উলঙ্গ করে রাখে। কেন রাখে জানো?’
সাথী জবাব দিতে পারে না। রমিছা এবং করিম মিয়া হা মুখে তাকিয়ে থাকে। সাকিব বলে, ‘মেয়েরা নিরুপায়ে হয়ে নিজের পরণের শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। তাই পাকিস্তানি সৈন্যরা মেয়েদের উলঙ্গ করে রাখে। যাতে মেয়েরা আত্মহত্যা করতে না পারে। ব্যাপারটা ভাবো, কি জঘন্য কারবার।’
সাথী বুঝতে পারে তাকে ভয় দেখাতেই কথাগুলো বলছে সাকিব। তবে সে মিথ্যে বলেনি। এ কথা সে আরও অনেকের মুখে শুনেছে।
সাকিব বলে, ‘আমার মায়ের শরীরটা ভাল না। তুমি আমার মায়ের পাশে থাকলে সে একজন কথা বলার লোক পাবে। পাশাপাশি তোমার নিরাপত্তাও বজায় থাকবে। তুমি আমাদের বাড়িতে থাকলে কোন রাজাকার এমন কি মিলিটারিও তোমাকে স্পর্শ করার সাহস পাবে না। এখন তুমি ভেবে দেখ। যদি মন চায় কাল কাপড় চোপড় নিয়ে তুমি আমাদের বাড়ি যেও। আর যদি মন না চায় তাহলে বড় বিপদের জন্য তৈরি থেক।’
রমিছা বিবি বলে, ‘কাল কেন, আজই যাক না।’ সাথী ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাকিবের সঙ্গে সাকিবদের বাড়ি রওনা হয়।
৩.
শামীম ট্রেনিং শেষ করে অপারেশনে নেমে পড়ে। তার দলের সে ডেপুটি কমান্ডার। গতরাতে একটি অপারেশনে গিয়েছিল তারা। অপারেশন সাকসেসফুল। পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্প এ্যাটাক করে উড়িয়ে দিয়েছে সেই ক্যাম্প। ক্যাম্পের রাজাকার পাকআর্মী মিলে জনা পঞ্চাশেক সৈন্য ছিল। গ্রেনেড চার্জে সবারই সমাধি ঘটেছে। তারপর তারা কয়েকমাইল হেঁটে এসে একটি গ্রামে আশ্রয় নেয়।
সকালে লোকজনের চিৎকারে শামীমের ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে দেখে লোকজন যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। খবর নিয়ে জানতে পারে মিলিটারি আর রাজাকাররা মিলে কয়েকটি বাড়ি লুটপাট করছে। তারপর তারা কয়েকজন যুবতী মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। শামীম দলের ছেলেদের খবর পাঠায়। তারা এলে শামীম বলে, ‘তোমাদের মা বোনকে শয়তানরা তুলে নিয়ে যাচ্ছে, পারলে তাদের রক্ষা করো।’
কমান্ডারের এই কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধারা তিনদলে ভাগ হয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ঘেরাও করে। তারপর ফায়ার শুরু করে। শামীম বলে, ‘সাবধানে ফায়ার করবে। যাতে ওদের সঙ্গে আমাদের মা বোন যারা আছে তারা যেন আক্রান্ত না হয়। ২৫ জন পাকআর্মী আর ২০ জন রাজাকারের অর্ধেক নিহত হয় বাকিরা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আহত অবস্থায় বন্দী হয়। কয়েকজন মা বোন আহত হলে তাদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ডেকে পাঠানো হয়। আহত পাকআর্মী আর রাজাকারদের ছিনিয়ে নেয় গ্রামবাসী। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের মানা করছিল কিন্তু তারা কারও আপত্তি কানে না তুলে ইটা মুগুর দিয়ে পিটিয়ে সবাইকে থেতলে ফেলে। তারপর কেরোসিন ঢেলে তাদের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। শামীম গ্রামবাসীকে ডেকে বলে, আপনারা সাবধান হয়ে যান। খুব তাড়াতাড়ি পাকআর্মী এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আপনাদের গ্রাম আক্রমণ করবে। শামীমের কথায় তারা কোন কর্ণপাত করে না। তারা মিলিটারি মেরেছে এই আনন্দে আত্মহারা।
সন্ধার পরপরই শামীমরা সেল্টার চেঞ্জ করে। তারা বগুড়া জেলার সেরপুর থানার নিশ্চিন্তুপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়। সেখানেই রকিবের সঙ্গে শামীমের দেখা হয়ে যায়। রকিব শুনেছিল শামীমরা শেরপুরের আশে-পাশে অবস্থান নিয়েছে। সেইমতে শামীমকে খুঁজতে খুঁজতে শেরপুরে এসে উপস্থিত হয়। ভাগ্যক্রমে এখানেই শামীমকে পেয়ে যায়। রকিবকে পেয়ে শামীম যেন চাঁদ হাতে পেল। জড়িয়ে ধরলো রকিবকে। রকিব তার খালাতো ভাই। নিশ্চয়ই ওর কাছে বাড়ির কোন খবর আছে। শামীমের ধারণা সঠিক। রকিবের কাছে অনেক খবর আছে। সাথীর একটি চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি রকিব পড়ে দেখেনি। সে সুযোগ ছিল না। চিঠিটি এমনভাবে আটকানো খুলতে গেলে ছিঁড়ে যাবে। শামীম চিঠি পড়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকে। যে সাকিবকে বন্ধু ভেবে বিশ্বাস করে সাথীর দায়িত্ব তার কাধে চাপিয়েছিল সেই সাকিব সাথীকে তার নিজের কব্জায় নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে প্রতারণা করছে। রকিব বুঝতে পারে না শামীম অস্থিরভাবে পায়চারি করছে কেন? চিঠিতে কি লেখা ছিল? খারাপ কিছু ছিল কি? নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ছিল। না হলে শামীম চিঠি পড়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করবে কেন?
রকিব কাছাকাছি গিয়ে শামীমের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বলে, ‘চিঠিতে খারাপ কিছু লিখেছে নাকি?’
শামীম বলে, ‘ভয়ংকর খারাপ। আমার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠছে। আমি স্থির থাকতে পারছি না। আমাকে খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে যেতে হবে।’
রকিব শান্ত কন্ঠে বলে, ‘চিঠির বিষয় কি আমাকে কিছু বলা যাবে?’
‘যাবে। তবে এখন নয়, বাড়ি যেতে যেতে বলবো।’
‘কিন্তু তুই যেভাবে পায়চারি করছিস তাতে এখন গেলে হিতে-বিপরীত হতে পারে। তুই শান্ত হ।’
‘শান্ত হওয়ার অবস্থা আমার নেই রকিব। সাথীর চিঠি আমাকে ভীষণ অশান্ত করে তুলেছে।’
‘সেটা আমাকে বলা যাবে না?’
‘বললামতো যাবে। তবে এখন নয়। বাড়ি যেতে যেতে।’
‘কি এমন কথা যে তোকে আবার রিস্ক নিয়ে বাড়ি যেতে হবে?’
‘হ্যাঁ যেতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। ফকির লালন সাঁই বলেছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’
‘তা ঠিক।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে রকিব মেনে নেয়।
‘এখন বল, তুই কি এই খবর দিতে এসেছিস নাকি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিবি?’
‘মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব।’
‘তাহলে আমি একটা ছেলেকে ডেকে তার দায়িত্বে তোকে দিয়ে দিচ্ছি। সেই তোকে বিভিন্ন অস্ত্রের ট্রেনিং দেবে। যুদ্ধের নিয়ম কানুন শিখিয়ে দেবে।’
‘তাহলেতো খুব ভাল হয়।’
‘ট্রেনিংটা মন দিয়ে করবি। কোন হেলাফেলা যেন না করিস।’
‘প্রশ্নই ওঠে না। এমন পেয়ে ধন হারায় কে? যে হারায় তার মতো বেকুব আর কে আছে?’
‘ভাল কথা বলেছিস। এখন যা, মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাক। আমি একটু একা থাকবো।’
রকিব বেরিয়ে গেলে শামীম আবার চিঠিটা বের করে পড়ে। রাগে ক্ষোভে তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
৪.
শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের সঙ্গে স্ত্রী আয়েশা বেগমের সকাল থেকে তুমুল ঝগড়া চলছে। আয়েশা বেগম বলছেন, ‘ছেলেকে বিয়া দিয়া দেন। ঘরে পাপ কাজ হচ্ছে।’
‘কী পাপ কাজ হচ্ছে?’ ফজলুর রহমান ক্ষুব্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন। আয়েশা বেগম ঠান্ডা মাথায় বলেন, ‘কি পাপ কাজ হচ্ছে আপনি জানেন না? ঘরে ছেলে অন্য মেয়ের সাথে জে¦না করছে আর আপনি দেখেও না দেখার ভান করছেন। আবার বলছেন কি পাপ হচ্ছে?’ ফজলুর রহমান আমতা আমতা করে বললেন, ‘ঘটনাটা আমিও প্রথম প্রথম খারাপ ভাবছিলাম। কিন্তু যখন সাকিবের মুখে আসল কথা শুনলাম তখন আর রাগ করতে পারলাম না।’
‘কি কইছে সাকিব?’
‘আমি সাকিবের বন্ধু নজরুলের কাছে গিয়া এই ব্যাপারটা সাকিবকে বোঝানোর কথা বলছিলাম। সাকিব যা বলছে তাতে আমি আর সাকিবকে দোষ দিতে পারলাম না।’
‘আবোল-তাবোল কথা বাদ দিয়া সাকিব কি কইছে হেই কথা কন।’ আয়েশা বেগম রেগে মেগে বলে ওঠেন।
ফজলুর রহমান গলা কেশে বলেন, ‘রাজাকাররা সাথীকে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়া যাইতে চাইছিল। মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়া গেলে সাথীর কি অবস্থা হবে একবার ভাইবা দেখছো? তা’ছাড়া সাকিব যা করছে তা মোটেও দোষের কিছু না। যুদ্ধের সময় এসব করার নিয়ম আছে।’
আয়েশা বেগম চেঁচিয়ে বললেন, রাখেন আপনার নিয়ম। আপনি কি ওই নিয়ম ধুইয়া পানি খাইবেন? ছেলে কবুল ছাড়া একটি বেগানা মেয়েকে নিয়া একই ঘরে রাত কাটাইতাছে সেটা আপনার কাছে নিয়ম অয়া গেল! আপনি ওই মেয়েকে সাকিবের সঙ্গে বিয়া দিয়া দেন। তারপর ওরা যা ইচ্ছা করুক। না হলে এই বাড়ির কোন কিছু আমি স্পর্শ করবো না।’
‘এতে সমস্যা কোথায় আমি বুঝতে পারতাছি না। ওই মেয়েটা মালে গণিমাত। শত্রু পক্ষের সম্পত্তি। ওকে আমরা যুদ্ধে মালে গণিমাত হিসাবে পেয়েছি। ওরা আমাদের যুদ্ধ বন্দিনী, দাসী। ওদের দাসী হিসাবে সহবত করা জায়েজ। তোমার ছেলে মোটেও পাপ করছে না।’
‘এ কথা আপনি কই পাইলেন?’
‘এটা দলিলের কথা।’
‘রাখেন আপনার দলিল।’
‘দলিল রাখমু মানে? তুমি কি ধর্ম মানতে চাও না? মুসরিক নাস্তিক অয়া গেছ?
‘আপনি যা কন আমি তাই। কিন্তু আমি বাঁইচা থাকতে সাকিবকে পাপ কাজ করতে দিমু না।’
‘কি করবা তুমি?’
‘আমি সাকিবকে বাঁধা দিমু। না মানলে আমি গলায় ফাঁস নিয়া আত্মহত্যা করমু।’
‘তোমার যা ইচ্ছা তুমি করো।’
আয়েশা বেগম নিজে নিজে খেদ ঝারতে থাকেন। ‘পাড়ার মধ্যে ছিঃ ছিঃ পইড়া গেছে। লোকজন কি কয় তা নিয়া বাপ-বেটার মাথা ব্যথা নাই।’
ফজলুর রহমান ধমকে ওঠেন, লোকের কথা বাদ দাও। রাজাকাররা সাথীকে মিলিটারির হাতে তুইলা দিলে কি অইতো, তা একবার ভাইবা দেখছো?’ মেয়েটার জীবন ছেড়া-বেড়া হয়া যাইতো। দেশে এখন যুদ্ধ চলতাছে। যুদ্ধে ওরা আমাদের শত্রু। ওরা কাফের মুশরিক। ওদের বাড়িঘর লুট করা মুসলমানদের দায়িত্ব। ওদের সব নারীরা যুদ্ধ বন্দিনী এবং দাসী। তাদের সহবত করা জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।’
আয়েশা বেগম দম নিয়ে খানিক পর বলেন, ‘শামীম যুদ্ধ থাইকা ফিরা আইসা আপনাদের বাপবেটাকে গুলি কইরা মারবেÑতখন কেমন লাগবে?’
ফজলুর রহমান উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। ‘ওই দিবা স্বপ্ন দেইখা লাভ নাই।’
তারপর হাসতে হাসতে ফজলুর রহমান বেরিয়ে যান।
৫.
আলিমের নেতৃতে¦ তিন রাজাকার এক হিন্দু বাড়ি লুটপাট করে এসে খুশি মনে শুয়ে পড়ে। লুটের মাল সকালে ভাগ করবে। ভাগের কথা ভাবতে ভাবতে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমোতে না ঘুমোতে নাক ডাকার শব্দ শুরু হয়। প্রথমে গেদু রাজাকার। তারপর জহর, শেষে আলিম। আলিম ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখে তার স্ত্রী রুবিনা ফিরে এসেছে। রুবিনা বাপের বাড়ি গেছে এবং বলে দিয়েছে সে আর রাজাকারের সঙ্গে সংসার করবে না। আলিম স্বপ্নে দেখে রুবিনা ফিরে এসে মিষ্টি সুরে আলিমকে ডাকছে। ঘুমের তালে আলিম লাফিয়ে উঠে অন্ধকারে দরজা খুঁজতে থাকে। হাতরে হাতরে দরজা খুঁজে পায়। দরজা খুলে ভূত দেখার মতো আলিম চমকে ওঠে। দরজার মুখে অনেকগুলো মানুষ। সবার মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। আলিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মুখ চেপে ধরে। তারপর বাকি দুজনকে ঘুমের মধ্যে হাত এবং মুখ বেঁধে ফেলে। তারপর তিন জনকে দূরে ফাঁকা মাঠে নিয়ে যায়।
শামীম নিজের মুখের কাপড় সরিয়ে বলে, ‘চিনছোস আমাকে?’
‘শামীমভাই।’ বলেই আলিম শামীমের পা জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘শামীমভাই জান ভিক্ষা চাই।’
শামীম বলে, ‘পাবি। জান ভিক্ষা দিমু। আমরা যা বলি তুই যদি তাই করিস।’
আলিম সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘আপনারা যা বলবেন আমরা তাই করমু। তাও জানে মাইরেন না।’
শামীম বলে, ‘তাহলে চল। যেতে যেতে করণীয় বলছি তোকে।’
জহর এবং গেদুকে কয়েকজনের পাহারায় রেখে আলিমকে নিয়ে শামীম এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
জহর এবং গেদু ভাবে প্রথমে ওরা আলিমকে মারবে তারপর আমাদের মারবে। আজ কারও রক্ষা নাই। রাজাকার হওয়ার সাধ আজ জন্মের মতো মিটিয়ে দেবে।
আলিমকে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেইভাবে আলিম গিয়ে সাকিবকে মৃদু স্বরে ডাকে। সাকিব জেগে আতংকিত গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কে?’
আলিম বলে, ‘আমি আলিম। আলিম রাজাকার।’
‘এতো রাতে কি চাস?’ সাকিব ধমকে ওঠে।
‘ভাই আস্তে কথা কন। জরুরী খবর আছে। ওঠেন।’
সাকিব দরজা খুলে বাইরে আসা মাত্র আড়াল থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বেরিয়ে এসে সাকিবের মুখ চেপে ধরে। তারপর গামছা দিয়ে মুখ বাঁধে। দড়ি দিয়ে দুই হাতও পিঠমোড়া করে বাঁধে।
আলিম রাজাকার একই কায়দায় ফজলুর রহমানের ঘরের কাছে গিয়ে মোলায়েম স্বরে ডাকে। চেয়ারম্যান সাহেব, ও চেয়ারম্যান সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেব কি জাইগা আছেন?’
বার কয়েক ডাকার পর ফজলুর রহমান গলা খাকারি দিয়ে গলা পরিস্কার করে। বলে, ‘কে ডাকে?’
‘আমি আলিম। আলিম রাজাকার।’
‘কি চাস?’
‘জরুরী খবর আছে চাচা। ওঠেন। বাইরে আসেন।’
‘এখন যা। সকালে আসিস।’
‘সকালে আসলে হবে না চাচা। তাইলে চিড়িয়া উইড়া যাবে। শামীম বাড়ি আইছে চাচা। এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।’
সবই আলিমকে শিখিয়ে দেওয়া। আলিম শুধু তোতা পাখির মতো শিখানো বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছে। ফজলুর রহমান টর্চলাইট জ¦ালিয়ে চোখ রগড়ে বাইরে আসে। বাইরে আসা মাত্র কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আচমকা ফজলুর রহমানের মুখ চেপে ধরে। তারপর হাত এবং চোখ বেঁধে নিয়ে বাইরে আসে। এইসময় শামীম রকিবকে ঈশারায় ডেকে পূর্বে শিখানো কথামতো কাজ করতে বলে। তারপর ফজলুর রহমান সাকিব এবং আলিমের মুখ এবং চোখ বেঁধে বাইরে নিয়ে যায়। যেখানে জহর এবং গেদু রাজাকারকে বেঁধে রাখা ছিল।
রকিব শামীমের খালাতো ভাই। সাথীর প্রেমিক। সাকিবের ঘরে ঢুকে সাথীকে মৃদু স্বরে ডাকতে থাকে রকিব। কোন সাড়া না পেয়ে টর্চলাইট জ¦ালিয়ে চারদিক খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে রকিব বলে, ‘সাথী আমি রকিব। শামীমভাই এসেছে তোমাকে উদ্ধার করতে। তুমি ভয় পেও না। বেরিয়ে এসো।’
সাথী এবার খাটের নিচে থেকে বেরিয়ে এসে রকিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। রকিব বলে, কেঁদো না সাথী। এখন কাঁদার সময় না। চলো, এখনই আমাদের এই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
রকিবের সঙ্গে সাথী যেতে যেতে বলে, ‘ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হবে না? কতদিন ভাইয়াকে দেখি না। কেমন আছে আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাই?’
‘আমরা যেমন আছি। সেও তেমন আছে।’
করিম মিয়া এবং রমিছা বিবি পোটলা-পুটিলি বেঁধে রেডি হয়ে ছিল। সাথী আসা মাত্র তারা দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে।
খোলা মাঠে সবাই জমায়েত হলে দলের বড়ভাই হায়দার আলীকে শামীম বলে, ‘বড়ভাই, এই লোকের নাম ফজলুর রহমান। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। সে এই রাজাকারদের তৈরি করেছে। সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কালিপদ রায় এবং তার স্ত্রীকে হত্যা করে তার মেধাবী সুন্দরী মেয়েকে মিলিটারি ক্যাম্পে দিয়ে এসেছে। সেই জঘন্য কাজের সাহায্যকারি হলো এই তিন রাজাকার। আর এই পিশাচের নাম সাকিব। তার কথাতো আপনাকে আগেই বলেছি। এখন তাদের কি শাস্তি দেওয়া যায় আপনি ভেবে ঠিক করেন। আমি একটু মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে আসি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









