সন্ধেটা বেশ অদ্ভুত ছিল। ঢাকার আকাশে তখনও বিদ্যুতের আলো ঢোকেনি। গ্যাসল্যাম্পের হলদে আলোয় রাস্তার ছায়াগুলো লম্বা হয়ে উঠছিল। আমি জানি না কীভাবে, কিন্তু তখন স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম- আমি আর একুশ শতকে নেই। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে, অথবা হয়তো সময়টাই পিছিয়ে গেছে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি- দাঁড়িয়ে আছি দেবানন্দপুর পুকুর পাড়ের- সেই পরিচিত অথচ অচেনা বাড়িটার সামনে। কাঠের দরজা, বারান্দার লোহার গ্রিল, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে একটানা কাশির শব্দ। এই কাশির শব্দ আমি বইয়ে পড়েছি। এই কাশি ইতিহাস।
দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো এক স্বর-
-“খোলা আছে, ঢুকে পড়ো।”
আমি ঢুকে পড়লাম।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরে শহর- চেনা নয়, অথচ অচেনাও নয়। কংক্রিটের জঙ্গল, কাচের দেয়াল, মেয়েদের দ্রুত পায়ে হাঁটা- কারো কাঁধে ল্যাপটপ, কারো কোলে শিশু, কারো আবার চোখে ক্লান্তির ছায়া।
“এত আলো,” তিনি মৃদু হাসেন, “আমাদের সময় মেয়েদের জীবনে এত আলো ছিল না।”
আমার সঙ্গে ল্যাপটপ। তিনি তিক্ষèভাবে তাকিয়ে দেখলেন। বললেন, এই দিয়ে লেখা যায় বুঝি। আমাদের সময় টাইপ রাইটারে অনেকে লিখতো।
আমি, বললাম, “আপনার জন্মের পরে পৃথিবী নামক গ্রহটি এরমধ্যে দেড়শতবার তার অক্ষে ঘুরে এসেছে, শরৎবাবু।”
শরৎচন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। বললেন, কত বছর। ওসব বয়সের হিসাব কি আর এখন প্রয়োজন আছে! বয়স এখন একটি সংখ্যামাত্র।
তারপর আফিম নিয়ে একটু ঝিমুচ্ছেন। সহজে কাউকে ঠাহর করতে পারেন না কাউকে।
ঘরে আলো কম। জানালার পাশে বসে তিনি খুক খুক করে কাশছেন। চোখদুটো গভীর, কিন্তু ক্লান্ত। মুখে চাপা হাসি- যেন হাসলে ব্যথা বাড়বে, তবু না হাসলে অপরাধ হবে- এই তার ভাব।
আবার সন্দেহ হচ্ছিল ইনিই কি সেই অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র! শ্রীকান্তের কোনো শ্রীই যেন অবশিষ্ট নেই।
নতুন দার মতো আমার বলতে ইচ্ছে করলো- শ্রী কান্তের কি শ্রী! নে তামাক সাজ। তার গায়েও একটা কালোপনা র্যাপার! তবে নিশ্চিত ইনিই শরৎচন্দ্র।
অনেকক্ষণ পরে তিনি বললেন, তুমি তো বাপু, এ তল্লাটে থাকো বলে মনে হয় না। কোনো পত্রিকার লোক নও তো। আমি বাপু এখন লিখি টিকি না।
আমি বললাম, না আমি পত্রিকার লোক নই, আবার আপনার রতনও নই। বললে কিন্তু তামাক সেজে দিতে পারবো না। এখন কেউ তামাক খায় না। আপনি তো বর্মার চুরুট বেশ খেতেন। চুরুটটা এখনো কিছুটা আছে। কিন্তু সচরাচর কাউকে খেতে দেখা যায় না। বরং বার্মা থেকে এখন আসে- ইয়াবা।
- বুড়ো আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, সেটা আবার কি।
- ওই এক ধরনের নেশা দ্রব্য। বার্মা থেকে খুব আসে।
- বার্মা থেকে শুনেছি রোহিঙ্গাও আসে। তোমার কাছে হবে নাকি?
আমি মনে মনে ভাবলাম, বুড়ো হলেও কৌতূহল এখনো ষোলো আনা আছে।
বললাম, না। সিগারেট খেলে দিতে পারি।
বললেন, ডাক্তারের বারণ। এখন আর ধূমপান করি না। আফিমও তো আজকাল পাওয়া যায় না।
তা বাপু বলো কি মনে করে। আমি তো আগেই বললাম লেখা টেকা দিতে পারবো না। আমি চোখেও দেখি না। কানেও শুনি না। তবু এই কাগজের লোকগুলো- জন্মদিন এলেই বড় ডিস্টার্ব করে।
-“আপনি কি জানেন, আমি বললাম, আপনার চরিত্রগুলো এখনও জীবন্ত। এখনও আমাদের সঙ্গে কথা বলে। এখনও তাদের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া শেষ হয়নি। কিন্তু আপনি আমাদের কাছে এক রহস্যময় চরিত্র হয়েই রইলেন। কেউ বলে আপনি বিয়ে করেননি। কী মশাই, একটু ঝেড়ে কাশুন।”
তিনি হালকা করে হাসলেন। এখন তো কাশতেও পারি না। তবে জানি, ওরাই কথা বলেই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নইলে শরীর অনেক আগেই ছেড়ে দিত। আমার চরিত্র আর আমার মধ্যে পার্থক্য করতে যাও কেন? একজন লেখকের সৃষ্ট চরিত্রই আসলে লেখকের জীবন। কেউ তার পর নয়।”
আমি চুপ করে রইলাম। মনে পড়ছিল রাজলক্ষ্মীর মুখ, অন্নদাদির নিঃশব্দ সহনশীলতা, অচলার লাঞ্ছনা, গফুরের চোখের লজ্জা, আর গহরের দ্বিধাগ্রস্ত অথচ উন্মুক্ত হৃদয়।
-“আমি আপনার সঙ্গে তর্ক করতে এসেছি আজ” বললাম।
-“ভালো, তিনি বললেন। “তর্ক না হলে সাহিত্য বাঁচে না।”
আমি বললাম, তাহলে বলুন-বড় প্রেম কেন কাছেই টানে না, উহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়? যে প্রেম দূরে ঠেলে দেয়, সে কীভাবে বড় প্রেম হয়?
শরৎচন্দ্র মৃদু হাসলেন। বললেন, “তরুণ বয়স-এখনও প্রেমের ঘোর কাটেনি। নাকি ইতিমধ্যেই কাউকে ভুলতে পারছ না?
আমি অবাক হলাম।
-“আপনি কি শ্রীকান্তের মতো হাত দেখতেও জানেন? মানুষের মুখ দেখে অনুমান করতে পারেন? কীভাবে জানলেন, আমি কাউকে ভুলতে পারছি না?
শরৎচন্দ্র হেসে বললেন, তুমি কেন হে? আমিও কি আজও ভুলতে পেরেছি? ধরো, কেউ তোমার সঙ্গে থাকল-সেখানেও তো প্রেম মরে যেতে পারে। প্রেম আসলে স্মৃতি। কাউকে অবলম্বন করে তার জন্ম; কোনো স্পর্শযোগ্য বস্তুর সঙ্গে প্রেম চলে না।”
আমি বললাম, ঠিক আছে, তা না হয় মানা গেল। কিন্তু শ্রীকান্ত লিখতে গিয়ে বাঙালি আর মুসলমানের ব্যাপারটা কেন টেনে আনলেন? মুসলমানরাই তো আজ সংখ্যায় বেশি কথা বলছে বাংলায়। আজও অনেকে বলেন-‘বাঙালি বনাম মুসলমান’ কেন? মুসলমান কি বাঙালি নয়?
শরৎচন্দ্র জানালার বাইরে তাকালেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
-“আমি তখন সমাজকে যেমন দেখতাম, তেমনই লিখতাম। আদর্শ সমাজ নয়-বাস্তব সমাজ।”
-“কিন্তু সেই বাস্তব কি পক্ষপাতদুষ্ট ছিল না?
তিনি মাথা নাড়লেন।
-“পক্ষপাত আমার ছিল না। বিভাজন ছিল সমাজে। ভাষা, ধর্ম, শ্রেণি-সব মিলিয়ে মানুষের পরিচয় তখনও জটিল ছিল। আজও কি কম? তাছাড়া একটা কথা বলি-যাদের কথা বলেছি, তারা অনেকেই প্রকৃত অর্থে বাঙালি ছিল না। আমাদের ওখানে অবাঙালি পাড়াও ছিল। অভিজাত মুসলমানরা তখন নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করত।”
আমি আর উত্তর দিলাম না। কারণ জানতাম-আজও খুব কম বদলেছে।
আমি বললাম, তবু মুসলমান চরিত্র নিয়ে আপনি খুব বেশি লেখেননি। জানি-গহর চরিত্র নিয়ে দুই পক্ষেরই রোষে পড়েছিলেন। মুসলমান হয়ে বৈষ্ণব গান, হিন্দু আশ্রমে যাতায়াত-আপনি জানতেন এর ফল কী হবে।”
তিনি হেসে বললেন,
-“জানতাম। তবু লিখেছিলাম।”
-“কেন?”
-“কারণ মানুষ ধর্মের চেয়েও বড়-এই কথাটা যদি সাহিত্য না বলে, কে বলবে? আর সত্যি বলতে, গহর নামে আমার এক সহপাঠী ছিল। সে এমনই ছিল। তোমরা যেমন হিন্দুদের সব ভাগ ভুলে সবাইকে এক করে দেখো, মুসলমানদের মধ্যেও তেমনি নানা পথের মানুষ আছে। তারাও তো মুসলমান। আমি শুধু গহর আঁকিনি-কমললতার সঙ্গে তার প্রেমও ঘটিয়েছিলাম। সহজ কাজ নাকি এটা?
আমি সম্মতি জানালাম।
তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
-“হরিসাধন দাসগুপ্তের কমললতা ছবিটা দেখেছ?
-“জ্বি। সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছিলেন।”
-“বুঝেছি। তোমাদের কালেও উত্তম-সুচিত্রার প্রেম শেষ হয়নি। আর তরুণ কুমার, পাহাড়ি সান্ন্যালকে ভুলে গেলে!
আমি একটু লজ্জা পেলাম।
তাঁর চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি-শরীর ভাঙা, কিন্তু মন অটুট।
আমি সাহস করে বললাম,
-“আপনি মুসলমান সমাজ নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঢাকায় এসে। কিন্তু মহেশ ছাড়া আর কিছু এল না কেন।”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-“তুমি জানো কেন?
-“ভয়?”
-“না। দায়িত্ব। আমি জানতাম, মুসলমান সমাজের ভেতরের কুসংস্কার লিখলে সেটা ক্ষমা করা হবে না। হিন্দু সমাজ আমাকে গাল দেবে, কিন্তু মেনে নেবে। মুসলমান সমাজ তখন সেই জায়গায় ছিল না।”
আমি চুপ করে রইলাম। একুশ শতকেও কথাটা কষ্ট দেয়।
তিনি আবার বললেন, “গহর ছিল পরীক্ষামূলক চরিত্র। আমি মিলন দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা আর হলো কই?”
আমি প্রশ্ন করলাম,
-“তবে বিপ্রদাস? আপনি কি সাম্প্রদায়িক ছিলেন?
তিনি শান্তভাবে তাকালেন।
-“আমি মানুষের পক্ষে ছিলাম। নির্যাতিতের পক্ষে, নারীর পক্ষে, নিপীড়িতের পক্ষে। এটাকেই যদি সাম্প্রদায়িকতা বলা হয়, তবে আমি দোষী। আর শোনো-সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা তখন দুর্বল ছিল না। সংখ্যার জোরে নিজেদের ভাগ নিজেদেরই করতে হবে-এই বিশ্বাস ছিল।”
আমি জানতাম, এই উত্তরই আসবে। তবু বুকটা হালকা হয়ে গেল।
আমি বললাম,
-“আপনার নারীরা সমাজ বদলাতে পারেনি-এই অভিযোগও আছে।”
তিনি হাসলেন।
-“সমাজ কি একজন ঔপন্যাসিক বদলাতে পারে?”
-“তবে?
-“আমি আয়না ধরেছিলাম। ভাঙার কাজ পাঠকের। সমাজটাকে তো আগে কেউ দেখতেই পারতো না। আমি একটা দেখার পথ করে দিয়েছিলাম। নিজের পিঠ যেমন নিজের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়, তেমন নিজ সমাজে বাস করেও সবটা দেখা যায় না।”
হঠাৎ বাইরে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে শঙ্খধ্বনি। আমি চমকে তাকালাম।
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“এই শব্দদুটোই মিলেই তো বাঙালি- তাকে হিন্দু মুসলিম যাই বলো।”
আমি বুঝলাম- সময়, ধর্ম, ইতিহাস-সব এক হয়ে গেছে।
আমি বললাম, - আজ আপনার জন্মের দেড়শ বছর পূর্ণ হচ্ছে। জানেন?
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
-“জানি। তবে আমি জানতে চাই-আমার লেখা কি এখনও কাউকে আঘাত দেয়?
আমি বললাম,
-“দেয়। আর তাই পড়া হয়।”
আমি উঠতে গেলে তিনি বললেন,
-“একটা কথা লিখে রাখবে।”
-“কী?”
-“হিন্দু-মুসলমান নিয়ে যত কথা হয়, তার চেয়েও বড় কথা-মানুষ নিয়ে কত কম কথা হয়।”
বেরিয়ে এসে দেখি-গ্যাসল্যাম্প নেই। গাড়ির হেডলাইট, মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন।
আমি ফিরে এসেছি।
কিন্তু সঙ্গে এসেছে রাজলক্ষ্মী, গহর, গফুর, অন্নদাদি, সব্যসাচী।
আর সেই মানুষটি- যাকে ভুলতে পারছি না।
দ্বিতীয় অধ্যায়
আমি জানি না, কবে থেকে আমার ঘড়ি আমাকে মিথ্যা বলা শুরু করল। প্রথমে মনে হয়েছিল ব্যাটারি শেষ। পরে বুঝলাম-এটা ব্যাটারির ব্যর্থতা নয়, সময়েরই একধরনের আত্মসমর্পণ। ঘড়ির কাঁটা ঠিকই ঘুরছে, কিন্তু আমার চারপাশের বাস্তবতা ক্রমে এমন এক জায়গায় ঢুকে পড়ছে যেখানে তারিখগুলো আর ধারাবাহিক নয়, বছরগুলোও ক্যালেন্ডারের নিয়ম মানে না।
দেবদাস নিয়ে অনেক ফিল্ম হয়েছে। সালমান খান, ঐশ্বরিয়া রায় আর মাধুরী দীক্ষিত অভিনয় করেছিলেন হিন্দি ফিল্মে। এই ছবি দেখে নির্মল দা বললেন- এটা কিছু হলো মজিদ- এ তো রীতিমতো একটা বাংলা উপন্যাসকে হত্যা করা হলো।
কেন দাদা?
মূল গল্পে তো এসব নাই।
আমি বললাম, দেবদাস তো আছে দাদা। এর মানে বাঙালি অতীশ লঙ্ঘিল তুষারে ভয়ংকর।
তোমার হেয়ালি বুঝতে পারলাম না।
আমরা এতো এতো বিদেশি নায়ক নায়িকার কথা জানি, লাইলি মজনু, শিরি ফরহাদ, আলাউদ্দীন-পদ্মাবতী, রোমিও জুলিয়েট- এবার না হয় আমাদের নায়কের নাম জানলো দক্ষিণের মানুষ। নাম থাকাই তো যথেষ্ট দাদা।
মানুষের মতো কাহিনিরও বিবর্তন হয়।
দেবু দা বলে যখন ঐশ্বরিয়া আগল ভেঙে দৌড় দিলো!
তোমার সঙ্গে পারলাম না তাই তো-
তালসোনাপুর নামে একটি গ্রামে থাকত দেবদাসের বাড়ি। সবাই পার্বতীকে আদর করে পারু বলে ডাকত। ছোটবেলা থেকেই দুজনে ভাব, পড়ত আর স্বপ্ন দেখত। বড় হতে হতে সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ভালোবাসায় বদলে যায়।
দেবদাস পড়াশোনার জন্য শহরে চলে গেলে দূরত্ব বাড়ে, কিন্তু ভালোবাসা কমে না। পারু চায় তারা বিয়ে করুক। কিন্তু সমাজ আর পরিবার তাদের ভালোবাসাকে মানতে চায় না। দেবদাসের বাবা-মা পারুর পরিবারকে ছোট মনে করে বিয়েতে রাজি হন না।
ভয় আর দ্বিধায় পড়ে দেবদাস সাহস হারিয়ে ফেলে। সে শহরে ফিরে যায় এবং পারুকে চিঠি লিখে সম্পর্ক ভেঙে দেয়। পারুর বিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে হয়ে যায়।
শহরে দেবদাস একা হয়ে পড়ে। সে মদে ডুবে যায়, শরীর ও মন ভেঙে পড়ে। চন্দ্রমুখী নামে এক নারী তাকে ভালোবাসে, দেখাশোনা করে, কিন্তু দেবদাস তার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারে না।
মৃত্যুর আগে দেবদাস একবার পারুকে দেখার জন্য তার বাড়ির সামনে আসে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই সে মারা যায়। পারু ছুটে এলেও সমাজের নিয়ম তাকে শেষবারের মতো দেবদাসকে দেখতেও দেয় না।
শরৎচন্দ্র আমাকে লক্ষ্য করে বলে বসলেন- দেবু বিয়ে করলে কি প্রেমের মর্ম বুঝতে পারতো! প্রেম তাদের একত্র হতে দেয়নি।
সেই রাতে আমি লিখছিলাম। লিখছিলাম শরৎ-উপন্যাসের নারীদের নিয়ে, লিখছিলাম মুসলিম পাঠকের অভিমান নিয়ে, লিখছিলাম বাঙালি বনাম মুসলমান” ফুটবল ম্যাচের বাক্যটি কীভাবে একশ বছর পরেও খোঁচা দেয়। লিখছিলাম-সাহিত্য নৈতিকতার আদালত নয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের সাক্ষ্য।
কলম থামিয়ে যখন মাথা তুললাম, দেখি জানালার বাইরে কুয়াশা নেই, অথচ শহরটা ঝাপসা। গলির মোড়ের চায়ের দোকানের আলো নেই, অথচ কোনো এক পুরনো গ্যাসল্যাম্প জ্বলছে। রিকশার বেল নেই, অথচ কোথাও ঘোড়ার টগবগ শব্দ।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমার ঘরে একটা অচেনা গন্ধ-পুরনো বইয়ের, কাঠের আলমারির, ন্যাপথলিনের, আর একধরনের কালি-কালি ধোঁয়া।
টেবিলের ওপর একটা খাম।
খামের ওপর লেখা-“মজিদ-চলুন। আজ কথা আছে।”
আমি তো কোনো খাম রাখিনি।
আমি তো কাউকে চিনি না যে আমাকে এভাবে ডাকে।
তবু আমি খাম খুললাম।
ভেতরে একটা ঠিকানা, আর তিনটি নাম-
আমার বুকের ভেতর একটা ঢেউ উঠল-যেমন পাঠের সময় উঠে, যখন কোনো বাক্য হঠাৎ নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
দরজার ওপারে নারায়ণ”
ঠিকানাটা অনুসরণ করে হাঁটতে হাঁটতে আমি বুঝলাম-আমি কলকাতায়, কিন্তু আমার চেনা কলকাতা নয়। এই কলকাতায় পোস্টার আছে-“স্বরাজ”, অসহযোগ”, খাদির গ্রহণ করুন”, বই বাজেয়াপ্ত”-আর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও মোহামেডান” আর মোহনবাগান”- এর পতাকা উড়ছে, যেন ভাষা ও ধর্ম দুটোই মাঠে নেমেছে।
একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়িটা বিশাল নয়, কিন্তু দরজার ওপর একটি নামফলক-“নারায়ণ”।
ভেতর থেকে হাসির শব্দ, তর্কের শব্দ, আর কাগজ উল্টানোর শব্দ।
আমি দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে কণ্ঠ-
-“আসুন, আসুন। এখানে কেউ অতিথি নয়-সবাই সহযাত্রী। কেউ আর এখন নারায়ণ নেই। সব এখন নগদ নারায়ণ” বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন। ভাবলাম, নজরুল ছাড়া এ হাসি আর কে হাসতে পারে। জাহান্নামের অগুনে বসেও হাসে।
আমি ঢুকে পড়লাম।
ঘরে তিনজন।
একজন মাঝারি গড়ন, পরিপাটি পোশাক, চোখে নেতৃত্বের স্থিরতা-চোখের ভিতর একটা মমতা, কিন্তু তা কোনো দুর্বলতা নয়। চিত্তরঞ্জন দাশ।
একজন রোগা, ক্ষীণদেহ, কাশির চাপা শব্দ, চোখে অদ্ভুত রূপকল্প-শরৎচন্দ্র।
আরেকজন-চোখে আগুন, মুখে বিদ্রোহ, কিন্তু ঠোঁটে শিশুর মতো হাসি; পোশাকে সাদামাটা অথচ চলনে ঢেউ-নজরুল।
আমি দাঁড়িয়ে আছি, মাথা নুয়ে। তিনটি শতাব্দীর ভেতরে ঢুকে পড়েছি মনে হচ্ছে।
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“লেখক বলেই আপনার প্রবেশ মূল্য অমূল্য। লেখকদের সঙ্গে সময়ের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে-সময় তাদের কাছে হিসাব চায়।”
নজরুল হেসে বললেন,
-“সময় হিসাব চাইলে আমি গান শোনাই। গানের কাছে সময় হার মানে।”
শরৎচন্দ্র কাশলেন, তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন,
-“আর আমি গল্প বলি। গল্পের কাছে সময় বশ মানে।”
আমি বললাম,
-“কিন্তু আমার প্রশ্ন আছে।”
চিত্তরঞ্জন চেয়ার টেনে দিলেন,
-“তাই তো ডাকা। বসুন।”
আমি আমার সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাক্যটা উচ্চারণ করলাম-
-“শ্রীকান্তে ফুটবল ম্যাচ: ‘বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের ম্যাচ’। মুসলমান পাঠকেরা বলে-মুসলমান কি বাঙালি নয়?
ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা। যেন তিনজনই বুঝলেন-এটা শুধু সাহিত্য নয়, এটা পরিচয়ের ক্ষত।
শরৎচন্দ্র আস্তে বললেন,
-“এই প্রশ্নটা আমি অনেক আগে শুনেছি। কিন্তু আপনারা বুঝতে চান না, ওই সময়ের কলকাতা এক রকম ছিল না। বাঙালি মুসলমান, অবাঙালি মুসলমান-সবাই ছিল। আর ‘বাঙালি’ শব্দটি তখন অনেক সময় ভাষার পরিচয়ে নয়, সামাজিক অবস্থানের পরিচয়ে ব্যবহৃত হতো।”
নজরুল হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠলেন,
-“কিন্তু শরৎদা, শব্দ তো নিরীহ নয়। শব্দের মধ্যে ক্ষমতা থাকে। আজ আপনি যা লিখলেন, কাল সেটাই পরিচয়ের বন্দুক হতে পারে।”
শরৎচন্দ্র তাকালেন নজরুলের দিকে। চোখে কোনো রাগ নেই, আছে ক্লান্ত সত্য।
-“আমি মানি। কিন্তু আমি যদি আমার দেখা সমাজের কথাই না লিখি, তবে আমি কী লিখব? তখনকার মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশ নিজেরা বাঙালি’পরিচয়কে সহজে গ্রহণ করত না-এটা সত্যও।”
চিত্তরঞ্জন দাশ ধীরে ধীরে বললেন,
-“আপনারা দুজনই ঠিক। শব্দের ভুল হলে ক্ষতি হয়; আবার বাস্তবতা আড়াল করলে ইতিহাস মিথ্যে হয়। কিন্তু সমাধান কী?
আমি বললাম,
-“সমাধান হলো-লেখককে আরও সতর্ক হতে হয়।”
নজরুল বললেন,
-“আর পাঠককে আরও উদার।”
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“আর রাজনীতিকে আরও মানবিক।”
চিত্তরঞ্জন হেসে বললেন,
-“দেখুন, এই তিনটি যদি একসঙ্গে সম্ভব হতো, তবে দেশ ভাগ হতো না। আমি তো চেয়েছিলাম বাঙালি হিন্দু মুসলিমে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। ব্রিটিশ যাবে- আমরা ভাষাভিত্তিক ন্যায় ভিত্তিক এক দেশ গড়ে তুলব। নজরুল গান শোনাবে। শরৎ গল্প বলবে। তখন তো আর বিদ্রোহের দরকার থাকবে না। না পথের দাবি, না অগ্নিবীণা কোনো কাজে আসবে না। থাকবে শুধু গান, থাকবে শুধু কবিতা।”
শরৎচন্দ্র বললেন, ওসব আমাকে দিয়ে হবে না। আমি তো নজরুলের মতো গান গাইতে পারি না। আমি আসলে সব্যসাচীর মতো বিপ্লবী। নজরুল হলো শশী যে বিদ্রোহের সঙ্গেও থাকতে পারে, গানের সঙ্গে থাকতে পারে।
কথাটা ঘরের ভিতর ঢেউ হয়ে উঠল। আমি বুঝলাম-এই ঘরে সময় থেমে আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গোপনে দাঁড়িয়ে।
আমি বললাম,
-“গহর চরিত্র-মুসলমান হয়েও বৈষ্ণব সাধনা, আশ্রমে থাকা, কমললতাকে ভালোবাসা-দুই পক্ষই রাগ করেছিল। আপনি কেন এমন ঝুঁকি নিলেন?”
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“কারণ মানুষ মিশ্র। সমাজ একরঙা চায়, কিন্তু হৃদয় একরঙা নয়।”
নজরুল টেবিলে হাত ঠুকলেন,
-“এই তো! আমি তো সারা জীবন এইটাই বলেছি। মসজিদ-মন্দির নিয়ে যারা লড়াই করে, তারা আসলে মানুষের ভেতরের দরজাটা বন্ধ রাখতে চায়।”
চিত্তরঞ্জন মাথা নেড়ে বললেন,
-“কিন্তু সমাজের মোড়লরা দরজা বন্ধ রাখতেই চায়। কারণ দরজা খুললে ক্ষমতা হারাতে হয়।”
আমি বললাম,
-“তাহলে গহরকে আপনি বলি দিলেন?
শরৎচন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-“আমি কাউকে বলি দিইনি। আমি দেখিয়েছি, সমাজ কীভাবে বলি নেয়।”
নজরুল বললেন,
-“সমাজ বলি নেয়, আর কবি তার রক্ত দিয়ে গান লেখে।”
আমি দেখলাম, নজরুলের চোখে জল নেই, কিন্তু চোখ জ্বলছে।
মহেশ, গফুর, আমিনা-আর না-লেখা উপন্যাস
আমি প্রশ্ন তুললাম,
-“আপনি মুসলমান সমাজকে নিয়ে উপন্যাস লিখবেন বলেছিলেন। কিন্তু মহেশ ছাড়া আর কেন লিখলেন না?
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“মহেশে আমি মুসলমানকে খারাপ’করিনি। তাতেও সমস্যা হলো। ভাবুন, যদি আমি মুসলমান সমাজের ভেতরের নিপীড়ন লিখতাম, কী হতো?
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“সমাজ আঘাত সহ্য করতে শেখেনি, শরৎ।”
নজরুল তীব্র স্বরে বললেন,
-“তবু লিখতে হবে। যদি না লিখি, তাহলে কুসংস্কার জেতে।”
শরৎচন্দ্র শান্ত স্বরে বললেন,
-“আমি লিখেছি-নারীর ব্যথা, জাতপাতের ব্যথা, দরিদ্রের ব্যথা। কিন্তু আমি জানতাম, ধর্মের প্রশ্নে মানুষ সহজে বিচার করে না, আক্রমণ করে।”
আমি বললাম,
-“আপনি কি ভয় পেয়েছিলেন?
তিনি বললেন,
-“ভয় না। আমি অসুস্থ ছিলাম। আয়ু কম ছিল। আমি যেটুকু পারি, সেটুকুই করেছি।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আমার মনে হলো-রোগে নয়, সমাজে মানুষ মরে।
আমি বললাম,
-“পথের দাবী বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নাকি বলেছিলেন উত্তেজক’। আপনি কষ্ট পেয়েছিলেন।”
শরৎচন্দ্র মাথা নামালেন।
-“হ্যাঁ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথেরও নিজের সীমা ছিল। তিনি কবি-আমি যোদ্ধা নই, তবু আমার লেখার মধ্যে যুদ্ধ ঢুকে পড়েছিল।”
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“আমি তো চেয়েছিলাম, সাহিত্য মানুষকে জাগাক। আমি তাই ‘নারায়ণ’ করেছিলাম।”
নজরুল হেসে বললেন,
-“আর আমি তো জাগাতে গিয়ে নিজেই জেল খেয়েছি!”
আপনার তো একটি বই বাজেয়াফত হয়েছে। আর আমার জন্য যেন একটি স্ট্যান্ডিং অর্ডারে পরিণত হয়েছিল। বেরুনো মাত্রই বাজেয়াপ্ত। এখনো সরকারিভাবে অনেক বই বাজেয়াপ্তের তালিকায় রয়ে গেছে।
তার হাসি ঘরের দেয়ালে লেগে বাজল-কিন্তু হাসির মধ্যে একটা বিষাদ ছিল।
আমি হঠাৎ বুঝলাম, ঘরের কোণায় একটা আয়না আছে। আয়নাটায় প্রতিফলন নেই, বরং আয়নাটা যেন অন্য সময়ের জানালা।
আয়নাটার ভেতর আমি দেখলাম-
একদিকে দাঙ্গার আগুন, আরেকদিকে ভাষা আন্দোলনের মিছিল, আরেকদিকে স্বাধীনতার পতাকা, আরেকদিকে দেশভাগের ট্রেন।
আমি কেঁপে উঠলাম।
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“আপনি ভবিষ্যৎ দেখছেন?
আমি বললাম,
-“হ্যাঁ।”
নজরুল বললেন,
-“তাহলে যান। ফিরে গিয়ে লিখুন।”
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“কিন্তু একটা কথা লিখবেন-আমাকে যেমন করে পড়বেন, তেমনি অন্যকেও পড়বেন। ধর্ম দিয়ে সাহিত্যকে বিচার করবেন না।”
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“আর রাজনীতিকে সাহিত্য থেকে আলাদা করবেন না।”
নজরুল বললেন,
-“আর মানুষকে ধর্ম থেকে বড় করবেন।”
এই তিনটি বাক্য একসঙ্গে আমার মাথার ভেতর ঢুকে গেল-যেন তিনজন তিন দিক থেকে একই প্রদীপে আগুন ধরালেন।
হঠাৎ চিত্তরঞ্জন দাশ ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটা চেক বের করলেন-স্বাক্ষর করা, কিন্তু টাকার ঘর ফাঁকা।
তিনি শরৎচন্দ্রের দিকে বাড়িয়ে বললেন,
-“আপনার লেখার দাম আমি ঠিক করতে পারি না।”
শরৎচন্দ্র হাসলেন, কাশলেন, বললেন,
-“তবে একশো টাকা লিখে দিন। বেশি হলে পাঠক সন্দেহ করবে।”
নজরুল হেসে উঠলেন-
-“একশো টাকায় যদি ইতিহাস কেনা যেত, তবে ইংরেজরা সবচেয়ে বড় গরিব!”
তারপর তিনি আস্তে করে গুনগুন করলেন-
“কারার ঐ লৌহ-কবাট...”
গানটা শুরু হতেই আমি দেখলাম, ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠছে, জানালার বাইরে বাতাসের ভেতর পতাকা নড়ছে, আর আয়নার ভেতরের ভবিষ্যৎ একটু দুলে উঠছে।
শরৎচন্দ্র বললেন,
-“নজরুল, তোমার গান মানুষকে জাগায়, কিন্তু মানুষ ঘুমাতেই ভালোবাসে।”
নজরুল বললেন,
-“তাই তো আমি চিৎকার করি।”
চিত্তরঞ্জন বললেন,
-“আর আমি সংগঠিত করতে চাই।”
আমি বুঝলাম-এই তিনজন একসঙ্গে থাকলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু ইতিহাস যদি” মানে না।
আমি যখন ঘর থেকে বের হলাম, তখন গ্যাসল্যাম্প নিভে গেল। রাস্তার টগবগ শব্দ থেমে গেল।
হঠাৎ আমি আবার নিজের ঘরে।
কম্পিউটারের স্ক্রিন জ্বলছে।
ঘড়ির কাঁটা চলছে-ডিসেম্বর, ২০২৫।
কিন্তু টেবিলের ওপর একটা খাম।
খামের ওপর লেখা-
“লিখুন। ইতিহাসের আদালতে নয়-মানুষের হৃদয়ে সাক্ষ্য দিন।”
আমি খাম খুলে দেখি ভেতরে তিনটি জিনিস-
একটি কাগজে কাশির দাগ,
একটি কাগজে গান লেখা,
একটি কাগজে সংগঠনের পরিকল্পনা।
আমি বসে পড়লাম।
কারণ আমি বুঝেছি-
শরৎচন্দ্রকে অসাম্প্রদায়িক” বলা একটি প্রশংসা নয়, এটি একটি দায়িত্ব।
নজরুলকে বিদ্রোহী” বলা একটি উপাধি নয়, এটি একটি স্থায়ী ডাক।
চিত্তরঞ্জনকে দেশবন্ধু” বলা একটি নাম নয়, এটি একটি অসমাপ্ত কাজ।
আর আমার কাজ-লেখা।
আমার কাজ-পড়ার মতো করে লিখে ফেলা, আর লেখার মতো করে পড়ে ফেলা।
তৃতীয় অধ্যায়
সময়টা সন্ধ্যার মতো-কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দিনের সন্ধ্যা নয়। যেন শতাব্দীর সন্ধিক্ষণ। আলো আছে, অথচ ছায়া বেশি। এই ছায়াগুলো মানুষের নয়-এগুলো চরিত্রের ছায়া, স্মৃতির ছায়া, অসমাপ্ত কথার ছায়া। আমি হাঁটছি, কিন্তু ঠিক কোথায় হাঁটছি জানি না। কখনো মনে হচ্ছে ভাগলপুর, কখনো কলকাতা, কখনো ঢাকা। আবার কখনো মনে হচ্ছে-এই হাঁটা আসলে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের ভেতর দিয়ে হাঁটা।
হঠাৎ দেখি-একজন নারী দূরে দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি রাজলক্ষ্মী।
পিয়ারী বাইজি, আবার সতীনপুত্রের জননী, আবার শ্রীকান্তের আজন্ম প্রেম।
রাজলক্ষ্মীর শৈশবটা সুখের ছিল না-সে সুখ যেন জন্মের আগেই ভুল করে অন্য কারও ঘরে চলে গিয়েছিল। বাপ মরা মেয়ে মামার সংসারে কষ্ট কি বুঝছেলি। কেন তাকে বেছে নিতে হয়েছিল- বাইজির জীবন! দুই বোন মামার সংসারে- দশ বারো বছর বিয়ে হচ্ছে না- এটা সমাজের চোখে অন্যায়। মামা মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন, আর মামীর চোখে থাকত অস্থির হিসেবনিকেশ-কোন মেয়েটাকে আগে পার করা যায়, কত টাকায় দায় সারে।
একদিন এক কুলিন বামুন এল। ধুতি ঝকঝকে, মুখে গম্ভীর ভাব। একশ টাকা চান-নগদ। সেই টাকার ওজন রাজলক্ষ্মীর বুকের ওপর চেপে বসেছিল। সে বুঝতে পারেনি টাকা কী, কিন্তু বুঝেছিল, এই সংখ্যাটার সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ বাঁধা। মামা-মামী দর কষাকষি করলেন, মুখে হাসি রাখার চেষ্টা, কিন্তু হাত কাঁপছিল। নগদে একশ টাকা জোগাড় করা গেল না।
বামুন উঠে গেল। উঠতে উঠতে বলে গেল-
“পঞ্চাশ টাকায় এক জোড়া পাঁঠাও মেলে না, তখন দুজন মেয়ে পার করব কী করে?”
সেই কথাটা রাজলক্ষ্মীর কানে ঢুকে রইল আজীবনের মতো। সে প্রথমবার বুঝল-সে মানুষ নয়, সে হিসাব; সে মেয়ে নয়, সে খরচ। সেদিন সন্ধ্যায় উঠোনে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। আকাশ কিছু বলেনি, শুধু নীরবে শুনেছিল।
বড় বোন গলায় দড়ি নিয়ে বেঁচেছিল। পাঠকের যে মেয়ের জন্য আজ এতো মায়া- তার রূপও গুণে। একটি শুয়োপোকা যেভাবে হয়ে ওঠে প্রজাপ্রতি। কিন্তু এখানেও তার পাখা বাধা সমাজের মেঘলা আকাশে।
রাজলক্ষ্মী কোনোদিন হেঁটে আসেন না-তিনি আবির্ভূত হন। তাঁর সৌন্দর্য চড়া নয়, তবু চোখ সরানো যায় না। কারণ এই সৌন্দর্যের সঙ্গে লেগে আছে অপমান, বঞ্চনা, অসম্পূর্ণতা আর সমাজের নিষ্ঠুর হিসাব। তিনি একদিন একশ টাকার পণে বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা ছিলেন-কিন্তু সেই একশ টাকা না পাওয়ায় একটি মেয়ের মৃত্যু ঘটেছিল। সেই মৃত্যু তাঁর সৌন্দর্যের ভিত।
শ্রীকান্ত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এগিয়ে আসেন না। তিনি সবসময় দূরে থাকেন-কারণ শরৎচন্দ্র জানতেন, বড় প্রেম কাছে টানে না, দূরে ঠেলে দেয়। শ্রীকান্ত রাজলক্ষ্মীর দিকে তাকান-এই তাকানোর মধ্যে স্পর্শ নেই, দখল নেই, আছে শুধু চিরস্থায়ী অপরাধবোধ। রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তের জীবনে প্রেম নয়-তিনি জীবনের ব্যর্থতার সৌন্দর্য।
এই প্রেম ত্রিমুখী-একটি দিক রাজলক্ষ্মী, একটি দিক শ্রীকান্ত, আর তৃতীয় দিক সমাজ। সমাজ তাদের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দেয়ালই শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের প্রকৃত চরিত্র।
এইখানেই হঠাৎ দৃশ্য বদলায়।
একটি আশ্রম।
বৃক্ষের ছায়া।
ভজনের সুর।
এই আশ্রমে বসে আছে গহর।
গহর মুসলমান হয়ে বৈষ্ণব গান লেখে। সে গহর মিয়া থেকে গহর গোসাই হয়েছে-এই রূপান্তর কোনো ধর্মান্তর নয়, এটি একটি আত্মান্তর। গহর এখানে এসেছে কোনো বিদ্রোহ নিয়ে নয়-সে এসেছে ভালোবাসা নিয়ে। তার ভালোবাসার নাম কমললতা।
কমললতা কোনো বিপ্লবী নারী নন। তিনি আশ্রমবাসিনী। কিন্তু তাঁর সেবার মধ্যে আছে এক অদ্ভুত নির্ভীকতা। বসন্তে আক্রান্ত গহরকে তিনি সেবা করেছেন-এই সেবার মধ্যে কোনো ধর্ম ছিল না, ছিল কেবল মানুষের শরীরের দায়। এইখানেই গহর সমাজের কাছে অপরাধী হয়ে ওঠে।
কারণ সমাজ শরীরকে ক্ষমা করে না, যদি শরীর ধর্মের সীমা অতিক্রম করে।
শ্রীকান্ত এই আশ্রমে এসে দাঁড়ান।
তিনি গহরের দিকে তাকান-একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পান।
গহরও সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়, যেমন রাজলক্ষ্মী গ্রহণযোগ্য নয়।
এইখানেই দ্বিতীয় ত্রিমুখী প্রেম তৈরি হয়-
গহর, কমললতা, শ্রীকান্ত।
কিন্তু এই প্রেম দেহের নয়, এটি অস্তিত্বের।
শ্রীকান্ত এখানে প্রেমিক নন-তিনি সাক্ষী।
গহর প্রেমিক-কিন্তু দখলদার নন।
কমললতা নারী- কিন্তু ভোগ্য নন।
এই ত্রিভুজ সমাজ সহ্য করতে পারে না।
একদিন হিন্দু মোড়লরা বলে-গহর ধর্মদ্রোহী।
আরেকদিন মুসলিম মোড়লরা বলে-গহর বিশ্বাসঘাতক।
এই দুই অভিযোগের মাঝখানে গহর দাঁড়িয়ে থাকে-নগ্ন মানুষের মতো। তার দান করা সম্পত্তি, তার গান, তার মানবিকতা-সবই অপরাধ হয়ে ওঠে। আশ্রমে হামলা হয়। কমললতাকে বেরিয়ে যেতে হয়। গহর একা পড়ে যায়-ঠিক যেমন শরৎচন্দ্র নিজেও একা হয়ে পড়েছিলেন।
কারণ গহর কেবল একটি চরিত্র নয়।
গহর হলো শরৎচন্দ্রের নিজস্ব ঝুঁকি।
এইখানেই জাদুবাস্তবতা গভীর হয়।
আমি দেখি-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলঘর।
১৯৩৬ সাল।
মুসলিম ছাত্ররা শরৎচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তারা অভিমানী, কিন্তু আগ্রহী।
তারা অভিযোগ করতে আসেনি-তারা আকাক্সক্ষা নিয়ে এসেছে।
তারা চায়-শরৎচন্দ্র তাদের সমাজ নিয়েও লিখুন।
যেভাবে তিনি হিন্দু সমাজকে চাবুক মেরেছেন, সেভাবেই মুসলিম সমাজকেও প্রশ্ন করুন।
এই আকাক্সক্ষা শরৎচন্দ্রের কাঁধে ভার হয়ে বসে।
কারণ তিনি জানেন-তিনি যদি মুসলিম সমাজের ভেতরের কুসংস্কার লেখেন, তবে তাঁকে ক্ষমা করা হবে না।
গহরের জন্য যে আঘাত এসেছিল-তা কেবল চরিত্রের ওপর ছিল না, লেখকের ওপরও পড়েছিল।
এইখানেই শরৎচন্দ্র থেমে যান।
থেমে যাওয়া মানে কাপুরুষতা নয়-এটি ইতিহাসের নিষ্ঠুর সীমা।
আমি দেখি-শরৎচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে রাজলক্ষ্মী। অন্য পাশে গহর। দূরে শ্রীকান্ত।
তারা কেউ কথা বলছে না।
কারণ এই নীরবতাই তাদের সত্য ভাষা।
রাজলক্ষ্মী জানেন-তিনি প্রেম হয়েও সংসার হতে পারেননি।
গহর জানেন-তিনি মানবিক হয়েও সমাজে স্থান পাননি।
শ্রীকান্ত জানেন-তিনি সব বুঝেও কিছু করতে পারেননি।
আর শরৎচন্দ্র জানেন-তিনি সবচেয়ে কম সাম্প্রদায়িক হয়েও সবচেয়ে বেশি ব্যাখ্যার শিকার হয়েছেন।
এই চারটি জানা একত্রে হয়ে সাহিত্য।
আমি বুঝতে পারি-
শরৎচন্দ্র মুসলমানদের জন্য আলাদা করে লেখেননি, কারণ তিনি মানুষকে আলাদা করে দেখেননি।
এইটাই তাঁর অপরাধ, এইটাই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
সময় আবার বদলায়।
আমি ফিরে আসি।
কিন্তু রাজলক্ষ্মী যায় না।
গহর যায় না।
শ্রীকান্ত যায় না।
কারণ তারা আমাদের প্রশ্ন হয়ে আছে-
আমরা কি এখনো এমন চরিত্র সহ্য করতে পারি?
শ্রীকান্ত এখন এখানে নতুন গোঁসাই। একাকী প্রান্তরে অন্য ট্রেনে যাত্রী হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।
আর কমললতার অন্তহীন ট্রেন এক স্টেশন থেকে এক স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে- এক বস্ত্রে এক কাপড়ে। পৃথিবীতে কেউ কাপড় নিয়ে আসে না। খাদ্য নিয়ে আসে না- সব ধরণীর বুক থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ধরণীর বুকেই থেকে যাচ্ছে।
যাচ্ছে, বেগে, একা নিরানন্দ ট্রেন..
চতুর্থ অধ্যায়
সময়কে কখনো কখনো নদীর মতো মনে হয়-উজান আর ভাটার নিয়মে চলে, অথচ কোথাও কোথাও হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। সেই থেমে যাওয়াই ইতিহাস। আর সেই থেমে থাকা মুহূর্তগুলোর ভেতরেই কিছু মানুষ, কিছু চরিত্র, কিছু প্রেম জমে থাকে-যাদের আর মুক্তি নেই, আবার মুছে যাওয়ার অধিকারও নেই। শরৎচন্দ্রের সাহিত্য এই থেমে থাকা সময়েরই এক দীর্ঘ দলিল।
এই সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটলে প্রথম যাঁর সঙ্গে দেখা হয়, তিনি রাজলক্ষ্মী।
রাজলক্ষ্মী কোনো একক নারী নন। তিনি বহু নারীর সমষ্টি। তাঁর দেহে বহন করে চলেছেন পিয়ারী বাইজির কাম্যতা, কুলিন সমাজের অপমান, বিধবা জীবনের ছায়া, আর শ্রীকান্তের অপ্রাপ্ত প্রেমের দীর্ঘশ্বাস। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আলো ও ছায়ার সীমান্তে-যেখানে সৌন্দর্য আর লাঞ্ছনার ভেদরেখা মুছে যায়।
শ্রীকান্ত তাঁকে ভালোবাসতেন-এই কথাটা বলা সহজ, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। কারণ শ্রীকান্তের ভালোবাসা কোনোদিন পূর্ণতা দাবি করেনি। তিনি রাজলক্ষ্মীকে চেয়েছিলেন দূরত্বের মধ্যে, নিষেধের মধ্যে, অসম্ভবের মধ্যে। এই প্রেম শরীরী হলে হয়তো সহনীয় হতো; কিন্তু এটি ছিল স্মৃতিগত, মানসিক, আজন্ম-আজন্মের মতো। সমাজ এই প্রেমকে ভয় পেত-কারণ এখানে পাপ নেই, কিন্তু নিয়মভাঙা আছে।
এই প্রেমের তৃতীয় কোণ ছিল সমাজ-যে সমাজ একশ টাকার পণে দুটি মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই একশ টাকা না পাওয়ায় একটি মেয়ের মৃত্যুকে অনিবার্য করে তুলেছিল। এই মৃত্যু রাজলক্ষ্মীর সৌন্দর্যের ভিত। এই মৃত্যু শ্রীকান্তের অপরাধবোধের উৎস। এই মৃত্যু শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের নৈতিক কেন্দ্র।
এইখানেই দৃশ্য বদলায়।
একটি আশ্রম।
বৃক্ষের ছায়া।
ভজনের সুর।
এই আশ্রমে বসে আছে গহর।
গহর মুসলমান হয়ে বৈষ্ণব গান লেখে। সে গহর মিয়া থেকে গহর গোসাই হয়েছে-এই রূপান্তর কোনো ধর্মান্তর নয়, এটি একটি আত্মান্তর। গহর এখানে এসেছে বিদ্রোহ নিয়ে নয়-ভালোবাসা নিয়ে। তার ভালোবাসার নাম কমললতা।
কমললতা কোনো বিপ্লবী নারী নন। তিনি আশ্রমবাসিনী। কিন্তু তাঁর সেবার মধ্যে আছে এক অদ্ভুত নির্ভীকতা। বসন্তে আক্রান্ত গহরকে তিনি সেবা করেছেন-এই সেবার মধ্যে কোনো ধর্ম ছিল না, ছিল কেবল মানুষের শরীরের দায়। এখানেই গহর সমাজের কাছে অপরাধী হয়ে ওঠে।
কারণ সমাজ শরীরকে ক্ষমা করে না, যদি শরীর পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে।
শ্রীকান্ত এই আশ্রমে এসে দাঁড়ান। তিনি এখানে প্রেমিক নন-তিনি সাক্ষী। গহরের মধ্যে তিনি নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান। গহরও সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়, যেমন রাজলক্ষ্মী গ্রহণযোগ্য নয়। রাজলক্ষ্মীর অপরাধ নারী হওয়া; গহরের অপরাধ মানুষ হওয়া।
এইখানে দ্বিতীয় ত্রিমুখী সম্পর্ক তৈরি হয়-গহর, কমললতা, শ্রীকান্ত।
এই সম্পর্ক দেহের নয়, অস্তিত্বের।
এবং সমাজ এই সম্পর্ক সহ্য করতে পারে না।
একদিন হিন্দু মোড়লরা বলে-গহর ধর্মদ্রোহী।
আরেকদিন মুসলিম মোড়লরা বলে-গহর বিশ্বাসঘাতক।
এই দুই অভিযোগের মাঝখানে গহর দাঁড়িয়ে থাকে নিঃসঙ্গ মানুষের মতো। তার দান করা সম্পত্তি, তার গান, তার মানবিকতা-সবই অপরাধে পরিণত হয়। আশ্রমে হামলা হয়। কমললতাকে চলে যেতে হয়। গহর একা পড়ে যায়।
এই একাকিত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়-এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল্য।
এইখানে গহর কেবল একটি চরিত্র থাকে না।
গহর হয়ে ওঠে শরৎচন্দ্রের নিজস্ব ঝুঁকি।
কারণ গহরের ওপর যে আঘাত আসে, তার প্রতিধ্বনি লেখকের দিকেও ফিরে আসে। শরৎচন্দ্র বুঝেছিলেন-মানুষকে ধর্মের আগে রাখতে গেলে সমাজ দু’দিক থেকেই আঘাত করে। এই উপলব্ধিই তাঁর সাহিত্যের সবচেয়ে নীরব কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক উচ্চারণ।
শ্রীকান্ত জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে সন্ধ্যা নামছে।
সে ধীরে বলল,
“আমি কোথাও থিতু হতে পারি না, রাজলক্ষী। পথই আমার ঘর।”
রাজলক্ষী চোখ নামিয়ে শান্ত স্বরে জবাব দিল,
“জানি। তবু মানুষ তো কারও কাছে ফিরতে চায়, শ্রী।”
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গহর বলল,
“পৃথিবী তোমার মতো ভবঘুরেদেরই সবচেয়ে বেশি শেখায়।”
কমললতা হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
সে বলল,
“আর সবচেয়ে বেশি কাঁদায়ও।”
চারজন চার পথে থেকেও যেন এক সুতোর টানে বাঁধা-শ্রীকান্তের অস্থিরতা, রাজলক্ষীর নিঃশব্দ ভালোবাসা, গহরের বাস্তববোধ আর কমললতার ত্যাগী হৃদয়। তবু সেই সুতো টানলেই ব্যথা দেয়।
হঠাৎ রাজলক্ষী বলল,
“তুমি যদি কখনো থামতে, আমি কিছু চাইতাম না।”
শ্রীকান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“থামলে আমি আর আমি থাকি না।”
গহর কঠিন গলায় বলল,
“ভালোবাসা মানে শুধু অনুভব নয়, দায়িত্বও।”
কমললতা নিচু স্বরে বলল,
“দায়িত্ব সবসময় দাবি করে না, অনেক সময় ছাড়তে শেখায়।”
কেউ কাউকে দোষ দিল না, তবু কথাগুলো বুকের ভেতর জমে রইল-অভিযোগ না হয়েও ভারী।
কিছুক্ষণ পরে রাস্তায় এক দরিদ্র অসুস্থ মানুষ পড়ে থাকতে দেখে কমললতা নিজের শেষ টাকাটা তার হাতে তুলে দিল।
শ্রীকান্ত অবাক হয়ে বলল,
“নিজের কথা ভাবলে না?
কমললতা মৃদু হেসে বলল,
“মানুষের কষ্ট দেখলে নিজের কথা ভুলে যাই।”
রাজলক্ষী ধীরে বলল,
“এইখানেই আমরা বড় হই, শ্রীকান্ত।”
গহর নোটবুকে লিখতে লিখতে বলল,
“মানবিকতা কোনো তত্ত্ব নয়, কাজ।”
সেদিন শ্রীকান্ত বুঝল-ভবঘুরে হলেও হৃদয়ের দায় এড়ানো যায় না। কিন্তু সেই দায় মানেই যে মিলন, তা নয়।
রাতে শ্রীকান্ত বলল,
“আমি কাউকে বাঁধতে পারি না, আবার কাউকে ছেড়েও থাকতে পারি না।”
রাজলক্ষী উত্তর দিল,
“ভালোবাসা মানে বাঁধা নয়, পাশে থাকা।”
গহর বলল,
“আর সত্য বলা-নিজের সঙ্গেও।”
কমললতা শেষ কথা বলল,
“যেখানে মানুষ মানুষকে ছোট করে না, সেখানেই প্রেম।”
তারা বুঝলো-
প্রেম মানে পাওয়া নয়, বোঝা।
মানবিকতা মানে উপদেশ নয়, সহানুভূতি।
আর শ্রীকান্তের জীবন-চলার মধ্যেই তার সত্য, আর সেই সত্যের মধ্যেই তার একাকিত্ব।
আর আমি তাদের ভেতরে এখনো প্রেমের রোমান্টিক সাগরে ভেসে বেড়াই। মানুষ সত্যিই মানুষের কি কাজে লাগে। মানুষ এ পৃথিবীতে বিচ্ছিন্ন যাত্রী।
পঞ্চম অধ্যায়
ঢাকা শহরকে একদিন কেবল শহর বলা যেত না। সে ছিল একটি আকাক্সক্ষার জমায়েত। নদী যেমন নানা দিক থেকে এসে এক মোহনায় মিলিত হয়, ঢাকা তেমনি নানা স্বপ্ন, নানা অসমাপ্ত বাসনা, নানা অসন্তোষের মিলনস্থল হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ-যেখানে তরুণদের চোখে ছিল প্রশ্ন, কণ্ঠে ছিল প্রত্যাশা, আর মনে ছিল এক ধরনের নৈতিক সাহস, যা তখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলঘরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি তখন শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন-তিনি ছিলেন একটি সম্ভাবনার নাম। ছাত্রদের চোখে তিনি সেই মানুষ, যিনি হিন্দু সমাজের ভেতরের কুৎসিত সত্যগুলো নির্দয়ভাবে লিখতে পেরেছেন; যিনি নারীর ব্যথাকে গোপন ঘর থেকে টেনে এনে প্রকাশ্য আলোয় দাঁড় করিয়েছেন; যিনি জাতপাতের নৈতিক ভণ্ডামিকে গল্পের কাঠগড়ায় তুলেছেন।
এই ছাত্ররা তাঁকে ডাকেননি অভিযোগ নিয়ে।
তাঁরা এসেছিলেন প্রত্যাশা নিয়ে।
তাঁরা চেয়েছিলেন-শরৎচন্দ্র যদি মুসলমান সমাজ নিয়েও লেখেন, তবে তাদের সমাজের কুসংস্কার, ভণ্ডামি, নারী-নিপীড়ন, শ্রেণিগত নিপীড়ন ভাষা পাবে। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য আত্মসমালোচনার সাহস দেয়।
এই বিশ্বাসই ছিল তাদের শক্তি।
এই বিশ্বাসই ছিল তাদের অনভিজ্ঞতা।
যে সময়কালে শরৎচন্দ্র শ্রীকান্ত’ লিখছিলেন, সেই সময়কালে মুসলিম সমাজের নারী পুরুষের সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কাজী ইমদাদুল হক লিখছিলেন-
রসুলপুর গ্রামটি ছিল পুরনো নিয়ম আর গোঁড়ামির শক্ত দেয়ালে ঘেরা। সেখানে জন্ম নেওয়া ছেলেটির নাম আবদুল্লাহ। ছোটবেলা থেকেই সে দেখত-মানুষ মানুষকে বিচার করে বংশে, ধর্মে আর পোশাকে। যুক্তি বা জ্ঞান সেখানে অপ্রয়োজনীয়, অন্ধ বিশ্বাসই শেষ কথা।
গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি সৈয়দ সাহেব ও তাঁর বেয়াই হাজী সাহেব ছিলেন সেই গোঁড়ামির প্রধান ধারক। তাঁদের চোখে ইংরেজি শিক্ষা ছিল ধর্মনাশ”, আধুনিক চিকিৎসা ছিল ঈমানের শত্রু”, আর নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল মহাপাপ। পীর-মুরিদির অজুহাতে মানুষকে শোষণ করাই ছিল তাঁদের অদৃশ্য কাজ।
কিন্তু আবদুল্লাহ ছিল আলাদা। শহরে পড়াশোনা করে সে জেনেছে বিজ্ঞান, যুক্তি আর মানবিকতার কথা। তার বন্ধু মীর সাহেব, আবদুল কাদের, আবদুল খালেক-সবাই চায় সমাজ বদলাক, মানুষ মুক্ত হোক ভয়ের শৃঙ্খল থেকে। রাবিয়া ও হালিমার মতো নারীরাও ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে-পর্দার আড়ালে বন্দি জীবনই নারীর একমাত্র নিয়তি নয়।
একদিন গ্রামে মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়ল। পীর সাহেব ঝাড়ফুঁক করলেন, তাবিজ দিলেন-কিন্তু রোগ কমল না, বরং মৃত্যু বাড়ল। তখন আবদুল্লাহ শহর থেকে ডাক্তার দেবনাথ সরকারকে ডেকে আনল। তিনি হিন্দু, কিন্তু মানুষ হিসেবে উদার ও মানবপ্রেমিক। তাঁর চিকিৎসায় মানুষ বাঁচতে শুরু করল।
এই ঘটনায় গ্রামে ঝড় উঠল। গোঁড়া দল বলল-“ধর্ম নষ্ট হচ্ছে!” আর নবীন দল বলল-“মানুষ বাঁচছে!” সংঘর্ষ চরমে উঠল। কিন্তু বাস্তব সত্যের সামনে অন্ধতা বেশিদিন টিকল না। মানুষ বুঝতে শুরু করল- অন্ধতা, তা আসলে বুদ্ধির অন্ধতা।
শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের বাতাস বইল। পুরনো দুর্গে ফাটল ধরল। আবদুল্লাহ শুধু একজন মানুষ নয়, হয়ে উঠল আলোর প্রতীক-যে আলো কুসংস্কার ভেদ করে সমাজকে এগিয়ে নিতে চায়।
রসুলপুর পুরোপুরি বদলে যায়নি, কিন্তু পরিবর্তনের পথ খুলে গেছে। আর সেই পথের প্রথম প্রদীপ ছিল-আবদুল্লাহ।
কারণ শরৎচন্দ্র তখন জানতেন-সাহিত্য যতটা শক্তিশালী, সমাজ তার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর। তিনি গহরের কথা ভুলে যাননি। গহর-যে মুসলমান হয়েও মানুষের পরিচয় বেছে নিয়েছিল। যে দুই সমাজের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। গহরকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল কেবল চরিত্র হিসেবে নয়-একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই হলঘরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদের চোখে তখনো দেশভাগ নেই। নেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্ত। নেই সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর কঠিন হিসাব। তারা এখনো বিশ্বাস করত-একজন লেখক চাইলে সব সমাজের কুসংস্কার সমানভাবে আঘাত করতে পারেন, এবং সমাজ সেই আঘাত সহ্য করবে।
এই বিশ্বাস ইতিহাস দেয়নি।
শরৎচন্দ্র সেই প্রত্যাশা ভাঙতে চাননি। কারণ প্রত্যাশা ভাঙা নিষ্ঠুর। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন-সব প্রত্যাশা পূরণ করার দায় সাহিত্য বহন করতে পারে না। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি যদি মুসলমান সমাজের ভেতরের প্রশ্নগুলো লিখেন, তবে সেই লেখা সাহিত্যিক বিতর্কে নয়-পরিচয়ের আদালতে বিচার হবে।
এইখানেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক তৈরি হয়।
সময় এগোয়।
এই ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তীকালে শিক্ষক হন, রাজনীতিবিদ হন, আমলা হন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশার জায়গায় ঢুকে পড়ে হতাশা। দেশ ভাগ হয়। ভাষা ভাগ হয়। বিশ্বাস ভাগ হয়।
শরৎচন্দ্র তখন আর নেই। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।
পরবর্তী প্রজন্মের মুসলমান পাঠক তাঁকে পড়ে ভিন্ন চোখে। তাদের চোখে তিনি আর কেবল মানবতাবাদী নন-তিনি হয়ে ওঠেন এক ধরনের অসম্পূর্ণতা। তারা খোঁজে-আমাদের সমাজ কোথায়? আমাদের নারীরা কোথায়? আমাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কোথায়?
এই খোঁজের মধ্যেই জন্ম নেয় হতাশা।
এই হতাশা একরকম নয়।
কেউ তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলেন।
কেউ বলেন, তিনি সাহসী ছিলেন না।
কেউ আবার বলেন-তিনি তাঁর সময়ের সীমায় আটকে ছিলেন।
কিন্তু এই তর্কগুলোর ভেতর যে বিষয়টি হারিয়ে যায়, তা হলো-ঢাকার সেই ছাত্রদের আকাক্সক্ষা আসলে কী ছিল।
তারা প্রশংসা চায়নি।
তারা প্রতিনিধিত্ব চায়নি।
তারা চেয়েছিল সমান প্রশ্ন।
কারণ এই আকাক্সক্ষা আজও অসম্পূর্ণ।
এবং এই অসম্পূর্ণতাই শরৎচন্দ্রকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রাখে।
ষষ্ঠ অধ্যায়
কিছু আদালত আছে, যেগুলোতে কোনো কাঠগড়া থাকে না, কোনো বিচারক বসেন না, কোনো রায় ঘোষিত হয় না-তবু সেগুলোই সবচেয়ে কঠোর। এই আদালতের নাম পাঠক। এখানে সাক্ষ্য দেয় বই, প্রমাণ হিসেবে হাজির হয় উদ্ধৃতি, আর রায় লেখা হয় স্মৃতিতে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য বহু আগেই এই আদালতে হাজির হয়েছে।
এবং আজও সেই বিচার শেষ হয়নি।
এই আদালত কোনো একক সময়ে বসে না।
এটি বসে প্রতিটি প্রজন্মে।
প্রতিটি নতুন পাঠকের হাতে।
প্রথম প্রজন্মের পাঠকেরা শরৎচন্দ্রকে পড়েছিল স্বস্তির সঙ্গে। তাদের কাছে তিনি ছিলেন আশ্রয়-যে লেখক নারীর ব্যথা জানেন, দরিদ্রের লজ্জা বোঝেন, জাতপাতের নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্যে আনতে ভয় পান না। এই পাঠকেরা তাঁর লেখায় নিজেদের সমাজকে দেখেছিল, কিন্তু নিজেদের বিচারের মুখে দাঁড় করাতে চায়নি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সমাজের চরম দ্বিচারিতা নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এখানে দেখা যায়, সম্পর্কের অপরাধ যদি ঘটে, তার সমস্ত দায় একতরফা ভাবে নারীর উপরই চাপানো হয়, অথচ পুরুষ-বিশেষত ক্ষমতাবান সমাজপতি ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণির পুরুষেরা-থেকে যায় সম্পূর্ণ প্রশ্নাতীত।
সমাজপতি গোলক চাটুর্জীর মতো চরিত্ররা প্রকাশ্যে ধর্ম, নৈতিকতা ও সমাজরক্ষার বুলি আওড়ালেও গোপনে লালসা চরিতার্থ করে। কিন্তু সেই লালসার ফল হিসেবে যখন কোনো নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, তখন সমাজ তার দিকে আঙুল তোলে। পুরুষের নাম উচ্চারণ করা তো দূরের কথা, তদন্ত বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নও ওঠে না। সমাজের তথাকথিত মানরক্ষার স্বার্থে নারীকেই “পাপিনী” ঘোষণা করা হয়।
গর্ভবতী বামুনের মেয়েটিকে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা এই নির্মম ব্যবস্থার চরম দৃষ্টান্ত। এই বৃন্দাবন যাত্রা আসলে কোনো ধর্মীয় মুক্তির পথ নয়, বরং সমাজের চোখের আড়ালে নারীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার এক নিষ্ঠুর কৌশল। এখানে অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং অপরাধের চিহ্ন লোপাট করাই সমাজের উদ্দেশ্য।
এইভাবে শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন-বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সমাজে নৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হলেও তার দায় বহন করে কেবল নারী। পুরুষের পাপ সামাজিক ক্ষমতা ও মর্যাদার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, আর নারী হয়ে ওঠে বলির পাঁঠা। এই অসম নৈতিকতার বিরুদ্ধেই বামুনের মেয়ে’ এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ।
দ্বিতীয় প্রজন্মের পাঠকেরা তাঁকে পড়েছিল আবেগ নিয়ে। তাদের কাছে শরৎচন্দ্র মানে প্রেম-দেবদাসের আত্মবিনাশ, রাজলক্ষ্মীর অপূর্ণতা, অচলার অপমান, সব্যসাচীর দ্বিধা। এই পাঠকেরা চরিত্রকে ভালোবেসেছিল, কাঠামোকে প্রশ্ন করেনি।
কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম এসে আদালতের চরিত্র বদলে দেয়।
এই প্রজন্ম প্রশ্ন তোলে-
তিনি কাদের কথা লেখেননি?
তিনি কোথায় থেমেছেন?
তিনি কি নিরপেক্ষ ছিলেন, না সুবিধাজনকভাবে মানবতাবাদী?
এইখানেই উত্তরকালীন বিচার শুরু হয়।
প্রথম অভিযোগ আসে-প্রতিনিধিত্বের অভাব।
মুসলমান পাঠক প্রশ্ন করে-আমাদের সমাজ কোথায়? আমাদের নারীরা কোথায়? আমাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেন নেই?
এই প্রশ্নের ভেতরে ক্ষোভ আছে, কিন্তু কৌতূহলও আছে। এটি আক্রমণ নয়-এটি স্বীকৃতির আকাক্সক্ষা। কিন্তু আদালত খুব কমই এই আকাক্সক্ষার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে।
শরৎচন্দ্র যে সময়ে লিখেছিলেন, তখন সাহিত্য ছিল সমাজের আয়না-সংবিধান নয়। লেখক ছিলেন সাক্ষী-বিচারক নন। তিনি নিজের সমাজের ভেতরের কুৎসিত সত্য লিখতে পেরেছিলেন, কারণ সেই সমাজ তাঁকে সেই অধিকার দিয়েছিল। অন্য সমাজ সেই অধিকার দেয়নি-এটি সাহিত্যের ব্যর্থতা নয়, ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা।
দ্বিতীয় অভিযোগ ওঠে-সাম্প্রদায়িক অসচেতনতা।
শ্রীকান্তের একটি বাক্য, একটি শব্দ-“বাঙালি ও মুসলমান”-আজকের পাঠকের কাছে আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই আঘাত অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই আদালত প্রায়ই পুরো গ্রন্থ, পুরো অবস্থান, পুরো সাহিত্যের ভার না মেপে একটি বাক্যের ওপর রায় দেয়।
এই আদালত ভুলে যায়-একই লেখক গহর সৃষ্টি করেছিলেন।
ভুলে যায়-তিনি মুসলমান সাপুড়েকে মানুষের মর্যাদা দিয়েছিলেন।
ভুলে যায়-মহেশ-এ গফুর ও আমিনার নিপীড়নের দায় তিনি হিন্দু সমাজের ঘাড়ে চাপিয়েছিলেন।
আদালত স্মৃতি বেছে নেয়।
পুরো দলিল পড়ে না।
তৃতীয় অভিযোগ আসে-সাহসের অভাব।
প্রশ্ন ওঠে-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রদের আহ্বান সত্ত্বেও তিনি কেন মুসলমান সমাজ নিয়ে বড় উপন্যাস লেখেননি?
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন।
কারণ এর উত্তর সাহিত্যিক নয়-এটি রাজনৈতিক।
গহর চরিত্রের পরিণতি দেখলে বোঝা যায়, শরৎচন্দ্র কী ঝুঁকি নিয়েছিলেন। গহরকে দুই সমাজই প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই প্রত্যাখ্যান কেবল চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না-লেখকের দিকেও ফিরেছিল। এই অভিজ্ঞতার পর আরও এক ধাপ এগোনো মানে ছিল-সাহিত্যকে সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রে ঠেলে দেওয়া।
এই আদালত খুব কমই জানতে চায়-একজন অসুস্থ, একাকী, রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন লেখকের কাছে সেই ঝুঁকি কতটা বাস্তব ছিল।
সব নীরবতা কাপুরুষতা নয়।
কিছু নীরবতা সতর্কতা।
এই আদালতে পাল্টা কণ্ঠও শোনা যায়।
অচলা বলে-আমার অপমান কেউ আগে এমন করে লেখেনি।
রাজলক্ষ্মী বলে-আমার প্রেম কেউ আগে এত নিষ্ঠুর সৌন্দর্যে ধরেনি।
বামুনের মেয়ে বলে-আমার লাঞ্ছনা কেউ আগে প্রকাশ্যে আনেনি।
এই কণ্ঠগুলো আদালতের নথিতে থাকে, কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে থাকে না। কারণ এই আদালত এখন পরিচয়ের বিচার করে, মানবিকতার নয়।
এইখানেই উত্তরকালীন বিচারের সবচেয়ে বড় সংকট।
শরৎচন্দ্রকে সম্পূর্ণভাবে দোষী বলা যায় না।
তাঁকে সম্পূর্ণভাবে নির্দোষও বলা যায় না।
তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন-এবং সেই সময়ের মধ্যেই বন্দি ছিলেন। এই দ্বৈত অবস্থানই তাঁকে জীবিত রাখে।
এই আদালত কোনো রায় দেয় না।
এটি শুধু প্রশ্ন রেখে যায়।
বঙ্কিম যেভাবে আনন্দ মঠে যবন ন্যাড়ার বিরুদ্ধে রেগে গেলেন।
চাকরি করলেন ইংরেজের। দুর্ভিক্ষের কারণ ইংরেজ। দেওয়ান ক্লাইভ। রেজা খা পুতুল।
খাজনা উঠলো জীবিতের খাজনা মৃতের আত্মীয়দের কাছ থেকে। একেই বলে কুখ্যাত নাজাই খাজনা।
বাংলার এক গ্রামে যবনী শাসকদের খুব অত্যাচার চলছিল। তারা গ্রামের মানুষদের ওপর কর বসাত, ঘরবাড়ি লুট করত, মন্দির ভেঙে দিত। ভয়ে অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়।
গ্রামের কাছে এক গভীর জঙ্গলে ছিল একটি গোপন আশ্রম-নাম আনন্দ মঠ। সেখানে কিছু সন্ন্যাসী থাকতেন। তারা সংসার ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু দেশের কথা ভুলে যাননি। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মাতৃভূমিকে রক্ষা করা।
একদিন এক যুবক সেখানে আসে। যবনী সৈন্যদের হাতে তার পরিবার কষ্ট পেয়েছে। সন্ন্যাসীরা তাকে সাহস দেন এবং দেশরক্ষার কাজে দীক্ষা দেন।
সন্ন্যাসীরা গোপনে গ্রামবাসীদের সাহায্য করতেন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতেন। একদিন যবনী সৈন্যরা গ্রামের মন্দির ভাঙতে এলে সন্ন্যাসীরা বাধা দেন। সাহসের সঙ্গে লড়াই করে তারা শত্রুদের পরাজিত করে।
গ্রাম আবার শান্ত হয়। মানুষ ফিরে আসে। কিন্তু সন্ন্যাসীরা কোথাও থেমে থাকেন না। দেশের মুক্তির জন্য তারা আবার জঙ্গলে চলে যান।
সপ্তম অধ্যায়
কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো সময় পেরিয়ে আরও ভারী হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে তেমনই এক প্রশ্ন-তিনি নারীর দুঃখ এত গভীরভাবে লিখলেন, অথচ তার উপন্যাসে কোনো বিধবা নারীর বিবাহ সম্পন্ন হলো না কেন?
এই প্রশ্নে অভিযোগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে হতাশা। কারণ পাঠক আশা করেছিল-যে লেখক এতটা সাহস দেখিয়েছেন, তিনি হয়তো এখানেও সীমা ভাঙবেন।
রাজলক্ষ্মী বিধবা নন, কিন্তু তিনি বিধবার চেয়েও নিঃসঙ্গ। তিনি বিবাহিত হয়েও সংসারের অধিকারহীন। সমাজ তাঁকে দিয়েছে দেহের অনুমতি, কিন্তু সম্মানের নয়। শ্রীকান্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনো সামাজিক চুক্তিতে বাঁধা পড়েনি-এবং পড়তেও পারত না।
রাজলক্ষ্মীকে বিয়ে দেওয়া মানে ছিল সমাজের সবচেয়ে শক্ত নিষেধ ভাঙা: পতিতা নারীর সামাজিক পুনর্বাসন। শরৎচন্দ্র সেই জায়গায় যাননি। তিনি রাজলক্ষ্মীকে প্রেম দিলেন, আত্মসম্মান দিলেন, স্মৃতির অমরত্ব দিলেন-কিন্তু সামাজিক মুক্তির সিল দিলেন না।
কারণ বিয়ে এখানে মুক্তির প্রতীক ছিল না।
এটি ছিল সমাজের অনুমোদনের সিল।
তারপর আসে অচলা।
অচলা পরিত্যক্তা। তাঁর স্বামী তাঁকে ত্যাগ করেছে সন্দেহের বশে। অচলা পাপ করেননি-কিন্তু তাঁর ওপর সন্দেহ আরোপ করা হয়েছিল। এই সন্দেহই তাঁর জীবনকে ভেঙে দিয়েছিল।
অচলার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে কোনো সমাধান হতো না। কারণ তাঁর দুঃখের মূল ছিল বিয়ের অনুপস্থিতি নয়-বিয়েকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতা। শরৎচন্দ্র অচলার যন্ত্রণা লিখেছেন, তাঁর আত্মসম্মান লিখেছেন-কিন্তু তাঁকে নতুন সংসার দেননি।
এরপর আসে কিরণময়ী।
কিরণময়ী বিধবা, দৃঢ়, স্বনির্ভর। তাঁর জীবনে নতুন করে বিয়ে ঘটালে গল্পটি ‘সংস্কার আন্দোলনের’ গল্প হয়ে যেত। শরৎচন্দ্র সে পথে যাননি। তিনি কিরণময়ীকে ব্যক্তিত্ব দিলেন, কিন্তু সামাজিক বিজয় দিলেন না-কারণ সেই বিজয় তখনো মিথ্যা হতো।
কমললতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও জটিল।
তিনি বিধবা নন, কিন্তু সামাজিক নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ। তাঁর প্রেম গহরের সঙ্গে-একজন সীমান্তচরিত্র মানুষের সঙ্গে। এই প্রেমের পরিণতি যদি বিয়ে হতো, তবে গল্পটি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সহজ রোমান্টিক কল্পনায় পরিণত হতো। শরৎচন্দ্র সেই সহজ সমাধানে যাননি।
তিনি জানতেন-সমাজ এই বিয়ে সহ্য করবে না। আর সাহিত্য যদি সমাজের সহনশীলতার চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়, তবে তা সাক্ষ্য না হয়ে কল্পনা হয়ে দাঁড়ায়।
সবশেষে আসে বামুনের মেয়ে।
এই মেয়ের নাম নেই। তাঁর পরিচয়ই তাঁর লাঞ্ছনা। তাঁর জীবনে পুনর্বিবাহ কোনো সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থিতই নয়। শরৎচন্দ্র তাঁকে বিয়ে দেননি-কিন্তু তাঁর যন্ত্রণা এমনভাবে লিখেছেন, যা বিয়ের চেয়েও স্থায়ী দলিল হয়ে আছে।
এইখানেই অভিযোগের মূল।
শরৎচন্দ্র নারীর মুক্তি কল্পনা করেছিলেন-কিন্তু সেই মুক্তি প্রায়ই ছিল মানসিক, নৈতিক, স্মৃতিগত। সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নারীর পুনর্বাসনের গল্প তিনি খুব কমই বলেছেন।
এটা কি সাহসের অভাব?
নাকি সময়ের নিষ্ঠুর সীমা?
শরৎচন্দ্র সমাধান দেননি।
তিনি প্রশ্ন রেখে গেছেন।
কারণ তিনি জানতেন-সমাধান দিলে সমাজ নিজেকে নির্দোষ ভাববে।
অষ্টম অধ্যায়
একটি সমাজকে যদি নারীর চোখ দিয়ে দেখা যায়, তবে সেখানে তিনটি ঘর পাওয়া যায়।
একটি ঘরে প্রেম আছে, কিন্তু স্বীকৃতি নেই।
একটি ঘরে স্বীকৃতি ছিল, কিন্তু প্রেম নেই।
আর একটি ঘরে আছে প্রেম ও স্বীকৃতির আকাক্সক্ষা-কিন্তু দুটোই নিষিদ্ধ।
রাজলক্ষ্মী, অচলা ও কমললতা-এই তিন নারী এই তিনটি ঘরের বাসিন্দা।
তাদের সময় এক নয়, অবস্থান এক নয়, শ্রেণি এক নয়। তবু তাদের নীরবতা একই সূত্রে বাঁধা। এই নীরবতা কোনো অভাব নয়-এটি এক ধরনের অভিযোজন।
রাজলক্ষ্মী জানতেন, সমাজ তাঁকে কী নামে ডাকে। পিয়ারী বাইজি-এই নামের ভেতর সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সম্মান নেই। তাঁর দেহের ওপর সমাজের অধিকার ছিল, কিন্তু তাঁর অনুভূতির ওপর কোনো অধিকার ছিল না। রাজলক্ষ্মীর মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল এই দ্বৈততার ভেতরেই।
শ্রীকান্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনোদিন সামাজিক চুক্তি হয়ে ওঠেনি। এই না-হওয়াটাই ছিল তার প্রকৃত রূপ। রাজলক্ষ্মী প্রেমকে কখনো দাবি করেননি, কারণ দাবি করলে হারাতে হবে-এই জ্ঞান তাঁর আত্মরক্ষার কৌশল হয়ে উঠেছিল। তিনি প্রেমকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন দূরত্বে, স্মৃতিতে, অপূর্ণতায়।
এই আত্মসংযম তাঁকে দৃঢ় করেছে, আবার নিঃসঙ্গও করেছে। রাজলক্ষ্মীর দুঃখ উচ্চকিত নয়। তাঁর দুঃখ অভ্যস্ত, সংযত, প্রায় অলংকারের মতো বহন করা। সমাজ তাঁর জীবনে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তিনি সেটিকে প্রকাশ্যে নয়-নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
অচলা রাজলক্ষ্মীর বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সমাজস্বীকৃত নারী-স্ত্রী, গৃহিণী, সংসারের কেন্দ্র। কিন্তু এই বৈধতার ভেতরেই তাঁর সবচেয়ে গভীর ক্ষত। অচলার মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে অপমানের মধ্য দিয়ে।
তিনি পাপ করেননি। তবু তাঁর ওপর সন্দেহ আরোপ করা হয়েছিল। এই সন্দেহই তাঁর জীবনের নৈতিক ভিত ভেঙে দিয়েছিল। অচলা যুক্তি দিয়েছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন, নিজের নির্দোষতা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজ অচলার কণ্ঠ শুনতে চায়নি।
কারণ স্ত্রী যদি প্রশ্ন তোলে, তবে সংসারের কাঠামো নড়ে যায়।
অচলার নীরবতা রাজলক্ষ্মীর মতো কৌশল নয়। এটি পরাজয়ের ফল। তাঁর আত্মসম্মান লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই লড়াই তাঁকে ক্লান্ত করেছে। অচলার যন্ত্রণা ব্যক্তিগত নয়-এটি প্রাতিষ্ঠানিক।
এরপর আসে কমললতা।
কমললতা এই দুই নারীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সমাজের চোখে পবিত্র-আশ্রমবাসিনী। কিন্তু তাঁর মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তিনি প্রশ্ন করেন।
গহরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ কোনো আকস্মিক আবেগ নয়। এটি একটি সচেতন নৈতিক নির্বাচন। তিনি জানতেন, এই প্রেম তাঁকে সমাজচ্যুত করবে। তবু তিনি পিছিয়ে আসেননি। কমললতার সাহস নির্বুদ্ধিতা নয়-এটি ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
রাজলক্ষ্মী প্রেমকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
অচলা প্রেমে আঘাত পেয়েছিলেন।
কমললতা প্রেমকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন।
এই তিনটি অবস্থানই সমাজের কাছে অপরাধ।
কমললতা জানতেন-তাঁর পবিত্রতার ধারণা খুব ভঙ্গুর। একটি অভিযোগেই তা ভেঙে পড়বে। তবু তিনি গহরকে সেবা করেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন। এই ভালোবাসা কোনো সামাজিক পুরস্কার পায়নি। বরং তাঁকে আশ্রম ছাড়তে হয়েছিল।
কিন্তু কমললতার পার্থক্য এইখানেই-তিনি নিজেকে অপরাধী ভাবেননি।
এই তিন নারীকে এক রেখায় দাঁড় করালে দেখা যায়-
রাজলক্ষ্মী বাঁচতে শিখেছেন হার মেনে।
অচলা বাঁচতে শিখেছেন লড়াই করে।
কমললতা বাঁচতে শিখেছেন ঝুঁকি নিয়ে।
তিনজনই একা।
তিনজনই সমাজের নিয়ম ভেঙেছেন-কেউ নীরবে, কেউ প্রকাশ্যে।
শরৎচন্দ্র এই তিনটি পথের কোনো একটিকে বিজয়ী করেননি। তিনি জানতেন-বিজয় দেখালে গল্প মিথ্যা হয়ে যাবে। তিনি তাদের মুক্তি দেননি, কিন্তু দোষীও করেননি।
এইখানেই তাঁর নারী-চিন্তার প্রকৃত শক্তি।
শরৎবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মহিম কি শেষ পর্যন্ত অচলাকে ফিরে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। চোখে যেন রেললাইনের মতো দুটো সমান্তরাল রেখা-কোথাও গিয়ে মিলবে, অথচ মিলবে না। তারপর বললেন,
-হয়তো নিয়েছিল, হয়তো নেয়নি।
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম,
-কেন আপনি নিশ্চিত করে জানবেন না?
শরৎবাবু হালকা হেসে জানালার বাইরে তাকালেন। চলন্ত ট্রেনের শব্দে তাঁর গলা একটু ভেঙে গেল।
-আমি তো তাদের বাইরে থেকে দেখি। এক স্টেশনে ওঠে, আরেক স্টেশনে নামে। তারপর তারা অন্য স্টেশনে হারিয়ে যায়। ভেতরের কামরায় কী কথা হয়, কে কাকে ধরে রাখে, কে ছেড়ে দেয়-সেসব তো দর্শকের জানার কথা নয়।
কিছুক্ষণ পরে আমি আবার জিজ্ঞেস করেছিলাম,
-তাহলে অন্নদা দিদি? কেন তার দিদিও খুনির সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলেন? বৈবাহিক সম্পর্ক কি সত্যিই এতটাই দৃঢ়?
শরৎ করুণ হেসে বললেন,
-দৃঢ়? মৃত্যুর চেয়ে বড় কিছু আছে নাকি? সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছেই মাথা নোয়ায়। হয়তো জাতই বড় হয়ে দাঁড়ায়। অন্নদা মুসলমান সাপুড়ের সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল, কারণ একদিন সে তার স্বামী ছিল-এই পরিচয়টাই তখন সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে চেনা আশ্রয়।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তিনি থামিয়ে দিলেন।
-কিন্তু মৃত্যুর কোনো স্বামী থাকে না। মৃত্যুর কাছে পৌঁছোলে মানুষ শুধু মানুষই থাকে-না স্ত্রী, না স্বামী, না হিন্দু, না মুসলমান।
শাখা-সিঁদুর তখন আর প্রতীক থাকে না। ধীরে ধীরে মুছে যায়, ঠিক যেমন রঙ ধুয়ে গেলে কাপড়ের আসল তন্তু বেরিয়ে আসে। অন্নদাও সেই রঙহীনতার মধ্যেই মিলিয়ে গিয়েছিল। অনন্তের সামনে সব পরিচয় ফিকে হয়ে যায়, শুধু শূন্যতার নীরবতা থাকে-যেখানে ভালোবাসা, অপরাধ, সংসার সব একসঙ্গে নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
নবম অধ্যায়
শতবর্ষ পরে আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়েছি। এই দাঁড়ানো কোনো ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়-এটি সাহিত্যের স্বাভাবিক অধিকার। কারণ আপনি যাঁকে সৃষ্টি করেছিলেন, তিনি আমাদের ভেতর রয়ে গেছেন। আর যিনি রয়ে গেছেন, তাঁকে প্রশ্ন করা যায়।
আমি আপনাকে দেখছি-শরীর ভাঙা, কণ্ঠে কাশি, চোখে দীর্ঘ ক্লান্তি। কিন্তু এই ক্লান্তির ভেতর কোনো অনুশোচনা নেই। আছে দেখার অভ্যাস। আপনি মানুষকে দেখতেন-খুব কাছ থেকে, আবার খুব দূর থেকে। এই দূরত্বই আপনাকে গল্পকার করেছে।
আমি জানতে চাই-
আপনিই কি শ্রীকান্ত?
এই প্রশ্ন সহজ, কিন্তু স্তরবহুল। শ্রীকান্ত আপনার নাম নয়, আপনার জীবনীও নয়। তবু তাঁকে ছাড়া আপনাকে ভাবা যায় না। শ্রীকান্ত ঘুরে বেড়ায়, স্থির হয় না, কোথাও দীর্ঘকাল থাকে না। আপনিও কি তাই ছিলেন না?
শ্রীকান্ত কোনো কেন্দ্র মানে না। তিনি সংসার চাননি, অথচ সংসারের আকর্ষণ অস্বীকারও করেননি। তিনি বিপ্লবী নন, আবার নৈতিকতাবর্জিতও নন। এই দ্বিধাই কি আপনার নিজের যাত্রাপথের প্রতিচ্ছবি নয়?
তাহলে ইন্দ্রনাথ?
ইন্দ্রনাথ কি কেবল একটি চরিত্র, নাআপনার জীবনের সেই তরুণ বিদ্রোহ-যে একবার আসে, তারপর আর ফিরে আসে না? আপনি তাঁকে লিখেছেন আকর্ষণ নিয়ে, কারণ তিনি আপনাকে স্থির হতে দেননি। ইন্দ্রনাথ আপনাকে পথে নামিয়েছিলেন। আর পথই তো আপনার সাহিত্যের সবচেয়ে বড় রূপক।
কিন্তু পথের মাঝেই রাজলক্ষ্মী।
শতবর্ষ পরে আমি আপনাকে প্রশ্ন করি-
রাজলক্ষ্মীকে আপনি বিয়ে করলেন না কেন?
এই প্রশ্ন শুধু একটি চরিত্রের নয়। এটি আপনার ন্যারেটর সত্তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন। আপনি জানতেন-রাজলক্ষ্মীকে বিয়ে দেওয়া মানে তাঁকে উদ্ধার করা নয়, বরং তাঁকে আরেকটি কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া। রাজলক্ষ্মী স্বাধীন ছিলেন তাঁর অপূর্ণতায়।
আপনি তাঁকে বিয়ে দেননি।
আপনি তাঁকে স্মৃতিতে অমর করেছেন।
তবু অভিযোগ থেকে যায়-আপনি বঞ্চনার গল্প লিখেছেন।
হয়তো আপনি বিশ্বাস করতেন-এই দেশ সুখের চেয়ে বঞ্চনাতেই বেশি সত্য। আপনি সুখের গল্প লেখেননি, কারণ আপনি জানতেন-এই সমাজে সুখ টেকে না, কিন্তু দুঃখ দলিল হয়ে থাকে।
এইখানে রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তিনি আপনার অন্য প্রান্ত। তিনি দূর থেকে দেখতেন; আপনি ভেতরে ঢুকে লিখতেন। তিনি সৌন্দর্য খুঁজতেন ভাষায়; আপনি খুঁজতেন জীবনের ক্ষতে।
পথের দাবী-এর প্রশ্নে এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছিল। তিনি একে উত্তেজক বলেছিলেন; আপনি জানতেন-উত্তেজনা ছাড়া কিছু সত্য বলা যায় না।
এটি ঈর্ষার গল্প নয়।
এটি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্ব।
শতবর্ষ পরে দাঁড়িয়ে আমি বুঝি-আপনি নিরপেক্ষ ছিলেন না। আপনি পক্ষ নিয়েছিলেন নিপীড়িতের। কিন্তু আপনি জানতেন-সব পক্ষ নেওয়া প্রকাশ্যে করা যায় না। কিছু পক্ষ নেওয়া হয় নীরবতায়।
এই নীরবতাই আজ আমাদের প্রশ্নের জায়গা।
এটি কেবল আপনাকে আপনার সৃষ্টির সামনে দাঁড় করায়।
শতবর্ষ পরে।
একজন লেখক আরেকজন লেখকের সামনে।
দশম অধ্যায়
যদি শরৎচন্দ্র আজ লিখতেন, তবে প্রথমেই তিনি অবাক হতেন।
এই অবাক হওয়া বিস্ময়ের নয়-এটি এক ধরনের দীর্ঘ নীরবতা। কারণ তিনি যে সমাজ ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেই সমাজ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু বদলেছে এমনভাবে, যাতে পুরোনো প্রশ্নগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তিনি দেখতেন-নারী এখন রাস্তায় হাঁটে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, চাকরি করে, কথা বলে। কিন্তু সেই কথার মূল্য এখনো নির্ভর করে কে শুনছে তার ওপর। নারী এখন দৃশ্যমান, কিন্তু স্বতন্ত্র নয়। এই দৃশ্যমানতা নতুন এক ধরনের নজরদারি তৈরি করেছে। শরৎচন্দ্র এই জায়গায় থামতেন। কারণ তিনি জানতেন-দুঃখের রূপ বদলালেও দুঃখ মুছে যায় না।
আজকের রাজলক্ষ্মী হয়তো বাইজি নন।
তিনি হয়তো কর্পোরেট অফিসে কাজ করেন, হয়তো সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমান, হয়তো স্বাধীন।
কিন্তু তাঁর প্রেম এখনো সামাজিক অনুমতির অপেক্ষায়।
শরৎচন্দ্র তাঁকে আজও বিয়ে দিতেন না।
কারণ আজও বিয়ে নারীর চূড়ান্ত মুক্তি নয়-এটি কেবল সামাজিক নিরাপত্তার নতুন চুক্তি।
আজকের অচলা হয়তো বিবাহবিচ্ছিন্ন।
তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করেন।
কিন্তু সমাজ তাঁর সন্দেহ ত্যাগ করেনি।
শরৎচন্দ্র আজও অচলাকে একা রাখতেন-কারণ একাকিত্বই এখনো সবচেয়ে সত্য অবস্থান।
আজকের কমললতা হয়তো আশ্রমে নেই।
তিনি হয়তো কোনো এনজিওতে কাজ করেন, অথবা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলেন।
তিনি ধর্ম ও মানবিকতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন।
শরৎচন্দ্র তাঁকে আজও নির্বাসিতই রাখতেন।
কারণ সমাজ এখনো প্রশ্নকারী নারীকে ক্ষমা করে না।
যদি শরৎচন্দ্র আজ লিখতেন, তবে তিনি ধর্ম নিয়ে কম লিখতেন।
কারণ আজ ধর্ম বিশ্বাস নয়-এটি পরিচয়ের অস্ত্র।
তবু তিনি ধর্ম এড়াতেন না। তিনি ধর্মকে ঢুকিয়ে দিতেন দৈনন্দিন আচরণে-
কে কার সঙ্গে বসতে পারে,
কে কার সঙ্গে বিয়ে করতে পারে,
কোন মৃত্যুতে কত শব্দ হয়।
রাজনীতি নিয়ে তিনি আরও সতর্ক হতেন।
পথের দাবী আজ লিখলে বই বাজেয়াপ্ত হতো না-
বরং লেখক চরিত্রহীন বলে অভিযুক্ত হতেন।
এই অভিযোগ তিনি চিনতেন।
তিনি আজ রাজনীতিকে লিখতেন চরিত্রের মধ্য দিয়ে, স্লোগানের মধ্য দিয়ে নয়।
আজকের সব্যসাচী হয়তো আর বোমা বহন করতেন না-
তিনি বহন করতেন তথ্য, নথি, অথবা নীরব প্রতিবাদ।
শরৎচন্দ্র আজও নিম্নবর্গ নিয়ে লিখতেন।
কারণ শ্রেণি আজও সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য।
তিনি দেখতেন-দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু লজ্জা কমেনি।
আজও গফুর আছে, আজও আমিনা আছে-শুধু তাদের নাম বদলেছে।
তিনি আজ মুসলমান সমাজ নিয়ে লিখতে ভয় পেতেন না।
কিন্তু তাড়াহুড়ো করতেন না।
কারণ আজ আত্মসমালোচনা সবচেয়ে বড় বিলাস।
তাই তিনি হয়তো আবার একটি গহর লিখতেন-
যে কোনো এক ধর্মের নয়,
যে পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে,
এবং ঠিক সেই কারণেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
শরৎচন্দ্র আজ সামাজিক মাধ্যম নিয়ে লিখতেন না।
তিনি লিখতেন-নীরবতার অভাব নিয়ে।
আজ মানুষ কথা বলে বেশি,
কিন্তু শোনে কম।
এই না-শোনাটাই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকট।
যদি শরৎচন্দ্র আজ লিখতেন, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উচ্চারণ হতো নীরবতা।
এই নীরবতা ভীরুতা নয়-এটি প্রতিরোধ।
কারণ আজ সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হলো-চুপ করে সত্য বলা।
একাদশ অধ্যায়
শতবর্ষ পেরিয়ে, সার্ধশত জন্মবর্ষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি আর আপনাকে অভিযুক্ত করতে চাই না।
আমি আপনাকে রক্ষা করতেও চাই না।
আজ আমি শুধু বলতে চাই-ধন্যবাদ।
কারণ আপনি আমাদের গল্প শিখিয়েছেন।
আপনি দেখিয়েছেন-গল্প মানে ঘটনা নয়, গল্প মানে অভিজ্ঞতা।
জীবনকে সাজিয়ে নয়, ভেঙে লিখতে হয়।
আপনি মহান-এই কথাটা কোনো অলংকার নয়।
আপনি মহান, কারণ আপনি মানুষের ভেতরে ঢুকতে পেরেছিলেন।
কারণ আপনি দেখিয়েছিলেন-সাহিত্য শুধু শিক্ষিত শ্রেণির জন্য নয়,
এটি ঘরছাড়া মানুষের জন্য,
পরিত্যক্ত নারীর জন্য,
দ্বিধাগ্রস্ত পুরুষের জন্য।
আজ আমি একজন লেখক হিসেবে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একটি অনুরোধ করতে চাই-
আমাকে গল্প লেখার গোপন চাবিকাঠিটা বুঝিয়ে দিন।
আমি জানি, আপনি কোনো সূত্র দেবেন না।
কোনো তত্ত্ব দেবেন না।
কোনো “কীভাবে লিখতে হয়” তালিকা বানাবেন না।
তবু আমি বুঝি-
আপনার চাবিকাঠি ছিল দেখার ভঙ্গি।
আপনি মানুষকে দেখতেন তার সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে।
আপনি কাউকে নায়ক বানাতে যাননি।
আপনি কাউকে খলনায়ক বানাতে চাননি।
আপনি জানতেন-
গল্প তখনই সত্য হয়,
যখন লেখক উদ্ধার করতে যায় না।
আপনি রাজলক্ষ্মীকে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু তাঁকে বিয়ে দেননি।
কারণ আপনি জানতেন-বিয়ে দিলে গল্প শেষ হয়ে যাবে।
আপনি অচলাকে নির্দোষ প্রমাণ করেননি।
কারণ আপনি জানতেন-সমাজ নির্দোষতা মানে না।
আপনি কমললতাকে পুরস্কৃত করেননি।
কারণ আপনি জানতেন-প্রশ্নের মূল্য সমাজ নেয় নির্বাসন দিয়ে।
আপনি চরিত্রদের বাঁচাননি।
আপনি তাদের বেঁচে থাকতে দিয়েছেন।
এইখানেই আপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
আজ, আপনার সার্ধশত জন্মবর্ষে, আমি শুধু এই প্রতিশ্রুতি দিতে চাই-
আমরা হয়তো আপনার মতো গভীর হতে পারব না,
আপনার মতো জনপ্রিয়ও হতে পারব না,
কিন্তু আমরা চেষ্টা করব আপনার মতো সৎ হতে।
আপনি গল্পের ভেতরেই থাকবেন।
রাজলক্ষ্মী আপনার পাশে বসে থাকবে-নীরবে।
অচলা দূরে থাকবে-কিন্তু মাথা উঁচু করে।
কমললতা প্রশ্ন ছাড়বে না।
আপনি পথে থাকবেন।
কারণ আপনি জানতেন-স্থিরতা গল্প মারে।
আমরা পড়ব।
আমরা প্রশ্ন করব।
আমরা ফিরে আসব।
কারণ আপনি আমাদের শিখিয়েছেন-
গল্পের শেষ বলে কিছু নেই।
শুধু খোলা দরজা থাকে।
সেই দরজা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সাহসই সাহিত্য।
দ্বাদশ অধ্যায়
ইনহাস্ত ওয়াতানাম
হঠাৎ নজরুলের কণ্ঠ শোনা গেল-একটা অট্ট হাসির ঢেউ পেরিয়ে যেন কাশির ঘরে ঢুকে পড়ল আগুন। আমি চমকে উঠলাম। হাসতে হাসতে আসছিলেন, কিন্তু আমাদের কথোপকথন শুনে থমকে গেলেন। চোখে সেই পুরোনো ঝিলিক-যেটা শুধু কবির নয়, বিপ্লবীরও; যেটা গান গায়, আবার বন্দুকের শব্দও বুঝে ফেলে।
তিনি বললেন,
-“শরৎবাবু আপনাকে গল্প লেখা শেখাতে যাবেন না। উনি শিখিয়েছেন কেবল ক্ষতকে ভাষা দিতে। কিন্তু আজকাল ক্ষতও ভয় পায়-ভাষা বেরোলে আরও রক্ত ঝরে।”
শরৎচন্দ্র জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে সেই ক্লান্ত হাসি-যেন হাসলে ব্যথা বাড়ে, তবু না হাসলে অপরাধ হবে। নজরুল তাঁর দিকে তাকালেন না। সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-
-“আপনি কি দেখেছেন কয়েকদিন আগে ঢাকায় একটি ছেলে দিনের বেলা প্রকাশ্যে গুলি খেলো? আমারই মতো গরীব-মক্তবে পড়া। আমার মতো তাকে সমাজের সুবিধাবাদিরা রাজনীতিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই-রিকশায় ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছিল ঢাকায়। ঠিক যেমন আমি একদিন স্বপ্ন চেয়ে বেড়িয়েছিলাম। স্বপ্নও ভোটের মতো-যার হাতেই যায়, তারই হয়।”
আমি গিললাম। বললাম,
-“হ্যাঁ।”
নজরুল বললেন,
-“রিকশা চলছিল, আর ছাদ থেকে মহিলারা ময়লা পানি মারছিল। সে হাসছিল। বলছিল-ভালো লাগলো, আরো মারতে পারেন। দেখেছেন? মানুষ যখন মরতে বসে, তখনও হাসি দিয়ে অপমানকে ছোট করতে চায়। এই হাসি আমার হাসি। জাহান্নামে বসেও আমি হাসতে চেয়েছি।”
তিনি একটু থামলেন, তারপর গলায় স্বর নামিয়ে আনলেন-হাসির ভিতরে যে কথাটা থাকে, সেটা যেন আরও ধারালো হয়ে উঠল।
-“সে আমার কবিতা পড়তো।”
এই বাক্যটা বলার পর তাঁর চোখের দিকে তাকানো যায় না। চোখে জল ছিল না, তবু চোখে এক ধরনের ভেজা আগুন। যেন পানি নেই, কিন্তু পোড়া আছে। তিনি বললেন-
-“আমি যেভাবে জামানত হারিয়েছিলাম, সেভাবে সে জীবন হারিয়েছে। আমারই মতো-ইচ্ছের বাইরে। স্বজনের সম্মতি ছাড়াই আমার পাশে তাকে কবর দিয়েছে। আপনি বুঝেন? কবরও আজকাল রাজনীতি করে। মরার পরেও মানুষের ইচ্ছা থাকে না।”
শরৎচন্দ্র হালকা কাশলেন। নজরুল আবার হাসলেন-কিন্তু এই হাসি এবার কর্কশ, যেন দাঁতে পাথর ঘষা।
-“আমিও যদি আজ এ কথা বলতে যাই-তাহলে আমাকেই তারা আবার হত্যা করবে। কারণ আমি তো চৌত্রিশ বছর বোবা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। বোবা হয়ে থাকলে মানুষ তোমাকে সহ্য করে। কথা বলতে গেলে ভয় পায়।”
আমি সাহস করে বললাম,
-“এখন সমস্যা কী?”
নজরুল বললেন,
-“সমস্যা হলো-তখন আমাদের শত্রু ছিল নির্দিষ্ট। পুরো দেশে সাদা নেটিভ মিলে কয়েক লক্ষ। আর সবার লক্ষ্য ছিল এক। আজ ব্রিটিশ নেই, পাকিস্তান নেই। আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু হয়ে গেছি। আগে ছিল শত্রু অভিন্ন। এখন স্বার্থ অভিন্ন। আগে লড়াই ছিল মুক্তির জন্য। এখন লড়াই-কে কার থেকে কী কাড়বে, কে কার মুখ বন্ধ করবে।”
বাইরে শহরের আলো কাঁপছিল। ভেতরে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যেন তিনজন আলাদা শতাব্দী থেকে এসে এক ঘরে দাঁড়িয়ে বর্তমানকে চাপা দিচ্ছেন। চিত্তরঞ্জন নেই, কিন্তু তাঁর ছায়া আছে-যেন সংগঠনের অনুপস্থিতিই আজকের সবচেয়ে বড় সংগঠন।
শরৎচন্দ্র মৃদু হেসে বললেন,
-“কবি, এত তুমি এত বাস্তববাদী কিভাবে হলে?”
নজরুল বললেন,
-“আমি তো শুধু প্রেম পেতে চেয়েছিলাম। প্রেম দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরাধীন দেশ। ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হলে গান গেয়ে, পান খেয়ে ঘুরে বেড়াবো-বাউন্ডুলে। করাচি, নওশেরা-সব জায়গা আমার হবে, কারণ স্বাধীনতা মানে চলার অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতা হলো কেবল পতাকা নয়। স্বাধীনতা হলো মানুষকে বাঁচতে দেওয়া। আর মানুষকে বাঁচতে দেয় কে?”
শরৎচন্দ্র এবার আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ক্লান্তির ভিতরে এক ধরনের বিদ্রƒপ-যেমন অসুখের মানুষ সত্যিটা বলে দিতে পারে, কারণ হারানোর কিছু থাকে না। বললেন-
-“বুঝলে যুবক, ওসব লেখাপড়া ছাড়ো। আমার মতো আফিম খেয়ে ঝিমুতি থাকো। আর আফিমে যদি আস্থা না থাকে-তাহলে রাজলক্ষ্মীর সাথে প্রেম করো। আমি তো পারিনি। তুমি চেষ্টা করে দেখো।”
নজরুল খিলখিল করে উঠলেন-কিন্তু হাসিটা মাঝখানে ভেঙে গেল। যেন হাসিটাই বুঝে গেল, এই কথা কৌতুক নয়, আর্তি। শরৎচন্দ্রের “রাজলক্ষ্মী” মানে শুধু একজন নারী নয়-অসম্ভবের সঙ্গে শান্ত সহবাস। এমন প্রেম, যা পাওয়া যায় না; তবু তার দিকে না তাকালে বাঁচাও যায় না। রাজলক্ষ্মী মানে এক ধরনের নৈতিক জেদ-যে জেদ বলে, “আমি সমাজের দেওয়া নাম মানি না।”
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই মিনুর ফোন বেজে উঠল।
ফোনের রিংটা এই ঘরের ভেতর অদ্ভুত লাগল-যেন শতাব্দীর ভিতর আধুনিকতা ঢুকে পড়ল, যেন গ্যাসল্যাম্পের আলোতে হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। আমি ফোন ধরলাম।
মিনু বলল,
-“তোমার জন্যও এখানে একটা বৃত্তি ম্যানেজ করে ফেলেছি। বলল, সে তোমার ইচ্ছা।”
এই “ইচ্ছা”-এই শব্দটাই আমাকে থামিয়ে দিল। কারণ আমি এতক্ষণ যে কথাগুলো শুনছিলাম, সবই তো ইচ্ছাহীনতার ইতিহাস। যে ছেলেটা গুলি খেল, তার ইচ্ছা ছিল কি? যে কবর, তার ইচ্ছা ছিল কি? নজরুলের বোবা হয়ে বেঁচে থাকা-সে কি ইচ্ছা? শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মীকে না-পাওয়া-সে কি ইচ্ছা?
আমি বললাম,
-“ইনহাস্ত ওয়াতানাম।”
শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই মনে হলো, আমি এক অচেনা ভাষায় নিজের সবচেয়ে চেনা কথাটা বললাম। আমার ভেতরে একটা দেশ নড়ল-মানচিত্র নয়, স্মৃতি; সীমানা নয়, ক্ষত। আমি বুঝলাম, আমি এতদিন “ভালোবাসা”কে ছুঁতে ছুঁতে আসলে “দেশ”কেই ধরেছি। দেশ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়-দেশ মানে সেই জায়গা যেখানে অপমানও চেনা, যেখানে কষ্টও আপনার বলে মনে হয়।
মিনু একটু হাসল-কণ্ঠে পুরোনো পরিচয়ের মতো ছোঁয়া। বলল,
-“এতকাল বলে আসছ-ইনহাস্ত ইশক, প্রেমন।”
আমি চুপ করে গেলাম। কারণ সে ঠিকই বলেছে। আমি এতকাল বলেছি-প্রেমই সব। প্রেমই শেষ সত্য। কিন্তু আজ নজরুলের মুখ থেকে শুনে বুঝলাম-প্রেমকে যদি দেশ খেয়ে ফেলে, তবে প্রেম থাকে না; আর দেশকে যদি স্বার্থ খেয়ে ফেলে, তবে দেশও থাকে না। তখন থাকে কেবল মানুষের একা হয়ে যাওয়া-একটা জনতার ভেতর একা হয়ে যাওয়া, সবচেয়ে ভয়ংকর একাকিত্ব।
শরৎচন্দ্র ধীরে বললেন,
-“প্রেম আর দেশ-দুইটাই তো শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য। মানুষকে বাদ দিলে ওসব শব্দ কেবল স্লোগান।”
নজরুল আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখে আগুনের ওপর একটা ছায়া-যেটা ক্লান্তি নয়, নিরাশা নয়; বরং এমন এক সতর্কতা, যা কেবল যারা বেশি ভালোবেসেছে, তারাই পায়। বললেন-
-“শোনো, তুমি যদি এখন ‘দেশ’ বলো, সবাই তোমাকে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে চাইবে। তুমি যদি ‘প্রেম’ বলো, সবাই তোমাকে দুর্বল ভাববে। তাই সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হলো-মানুষ বলা। মানুষ বললে দুই পক্ষই ভয় পায়। কারণ মানুষ মানে প্রশ্ন, মানুষ মানে দায়, মানুষ মানে-কেউ কারও মালিক নয়।”
আমি বুঝলাম, এই কথাই তো শরৎচন্দ্র আগেও বলেছিলেন-হিন্দু-মুসলমান নিয়ে যত কথা হয়, তার চেয়েও বড় কথা মানুষ নিয়ে কত কম কথা হয়। আজ নজরুল সেটাকে নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিলেন-মানুষ বলা মানে আজ বেঁচে থাকা কঠিন; কিন্তু মানুষ না বললে বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন।
আমি ঘরের দিকে তাকালাম। জানালার বাইরে শহর-একটা শহর যেখানে আলো বেশি, ছায়া বেশি। গ্যাসল্যাম্প নেই, কিন্তু অন্ধকার আছে। অন্ধকার এখন বিদ্যুতের আলোতেও থাকে-কারণ অন্ধকারের নাম এখন “ভয়”-যা আলোতেও লুকায়, শব্দেও লুকায়, চুপেও লুকায়।
শরৎচন্দ্র আবার কাশলেন। কাশির মধ্যে যেন একটা বাক্য আটকে ছিল। তিনি বললেন-
-“তুমি লিখো। কিন্তু মনে রেখো-তোমার লেখাকে কেউ বাঁচাবে না। তুমি নিজে বাঁচিয়ে রাখবে। চরিত্রদের দিয়ে, সত্য দিয়ে, আর সবচেয়ে বেশি-সংযম দিয়ে।”
নজরুল বললেন,
-“আর ভয় পেয়ো না। ভয় পেলে লেখা মরে। ভয় পেলে দেশও মরে। ভয় পেলে প্রেমও মরে।”
মিনুর ফোনটা তখনও কানে লেগে আছে। “বৃত্তি”-একটা সুযোগ, একটা পালানোর রাস্তা, অথবা একটা ফিরে আসার প্রস্তুতি-আমি নিশ্চিত না। কিন্তু আমি বুঝলাম, প্রশ্নটা “যাব কি যাব না” নয়। প্রশ্নটা হলো-আমি যেখানে থাকি, সেখানে আমি কী বলি? কী লিখি? কীভাবে মানুষকে মানুষ বলে দেখি?
আমি আবার বললাম,
-“ইনহাস্ত ওয়াতানাম।”
এবার শব্দটা বদলে গেল। প্রথমবার এটা ছিল ঘোষণা। এবার এটা হলো স্বীকারোক্তি-দেশ মানে আমার দায়, আমার লজ্জা, আমার অসমাপ্ততা। আর ঠিক তখনই বুকের ভেতর থেকে আরেকটা বাক্য উঠল-যেটা মিনু বলেছিল, যেটা আমি এতদিন গর্ব করে বলতাম-
-“ইনহাস্ত ইশক, প্রেমন।”
আমি বুঝলাম-দুইটা বাক্য পরস্পরের শত্রু নয়। তারা একে অপরের পরীক্ষা। দেশ যদি প্রেমকে হত্যা করে, তবে দেশ জিতেছে নয়-দেশ হেরেছে। প্রেম যদি দেশকে অস্বীকার করে, তবে প্রেম বড় নয়-প্রেম শিশুসুলভ। দেশ আর প্রেম-দুইটাই আসলে মানুষের দিকে ফিরে যেতে চায়। মানুষটাই যদি মাঝখান থেকে হারিয়ে যায়, তখন দেশ হয় কারাগার, প্রেম হয় বিলাসিতা।
নজরুল হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বললেন-হাসির ভিতরে যে শোক থাকে, সেই স্বরে-
-“ও ছেলেটা আমার কবিতা পড়তো। তুমি লিখো এমনভাবে, যাতে আর কোনো ছেলে কবিতা পড়ে কেবল মরতে না শেখে-বাঁচতে শেখে।”
শরৎচন্দ্র চোখ নামিয়ে বললেন,
-“আর কোনো রাজলক্ষ্মী যেন শুধুই স্মৃতি না হয়-মানুষ হয়।”
এই দুই বাক্য আমার মাথার ভেতর একটা দরজার মতো খুলে গেল।
আমি টেবিলে বসে কলম ধরলাম। স্ক্রিনে কার্সর জ্বলছে-ছোট্ট এক আলোর দাগ, যেন গ্যাসল্যাম্পের শেষ শিখা। বাইরে শহর, ভেতরে তিনটি শতাব্দী, আর মাঝখানে আমি একজন লেখক, যে এখনও নিশ্চিত না, কিন্তু পালাতে চায় না।
আমি লিখলাম
দেশ আমার, কারণ মানুষের রক্ত এখানে পড়ে।
প্রেম আমার, কারণ মানুষ এখানে কাঁদে।
আর আমার লেখা কারণ মানুষ এখানে কথা বলতে চায়, কিন্তু ভয় পায়।
আমি থামলাম না। কারণ থামলে আবার কেবল শব্দ থাকবে, মানুষ থাকবে না।
আর মানুষ না থাকলে ইনহাস্ত ওয়াতানামও মিথ্যে, ইনহাস্ত ইশক প্রেমনও মিথ্যে।
ঘড়ির কাঁটা চলছে ডিসেম্বর, ২০২৫।
কিন্তু আমি জানি, সময় কেবল সামনে যায় না। সময় ফিরে ফিরে আসে-একটা গুলির শব্দ হয়ে, একটা কবিতার পঙ্ক্তি হয়ে, একটা কাশির দাগ হয়ে, একটা ফোনকল হয়ে।
আর আমি লিখে যাচ্ছি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









