বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

রক্তশালিক

রোখসানা ইয়াসমিন মণি

প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

রক্তশালিক

অরুণপুরের রহস্য
অরুণপুর এমন এক গ্রাম যাকে বাইরে থেকে দেখলে গা ছমছম করে। বেশি নির্জন, চুপচাপ, স্থির। এর মধ্যে মানুষ বসবাস করে। কিন্তু অরুণপুরের মানুষ জানে—এই নিস্তব্ধতা নিছক শান্তি নয়, এক অজানা শক্তির দমন। গ্রামটা ভয়ের ভেতর ঝুঁকে থাকে বছরের পর বছর। বলা হয় এখানে রক্তশালিকের ডাক কখনো শুনতে নেই।
এটি সেই নিষেধ, যা শিশুরা জন্মের সাথে সাথে শেখে। বয়স্করা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুখে নিয়ে ঘুরে। কিন্তু এই নিষেধের উৎস কোথায় তা নিয়ে কেউ কথা বলে না।
শুধু গল্প—গল্পের ওপরে গল্প। যেন লোককথার খড়ের উপর জমে থাকা অজস্র ধুলো।
 অরুণপুরে প্রথম ঢুকতেই চারদিকে ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে। আকাশে আলো থাকে, সূর্য থাকে, কিন্ত গ্রামের মাটিতে এসে পৌঁছাতে লজ্জা পায়। বৃক্ষগুলো অপঘ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। পাতার ভেতর লুকিয়ে থাকে অদ্ভুত শব্দের দমবন্ধ নিঃশ্বাস। বাতাস এলেও মনে হয় কারও অনুমতি নিয়ে এসেছে। এই গ্রামের প্রবেশমুখের পাশে আছে বিশাল বটগাছ। ডালে ঝুলে থাকে শত শত পাখির বাসা। কিন্তু কখনো কোনও পাখির ডাক শোনা যায় না।
মানুষ বলে, পাখি সবই আছে, কিন্তু ওরা অন্য কিছুর ভয়ে শব্দ করতে ভুলে গেছে।
এই অরুণপুরেই ফিরে আসে নীলয়। চট্টগ্রাম শহরে থাকা তরুণ, যার শিকড় গ্রামেই। দাদুর মৃত্যুর পর চাচা-চাচীর জোরাজুরিতে বহু বছর পর গ্রামে এসেছে। যদিও আপন চাচা নয়, প্রতিবেশী। কিন্তু তিনি যেভাবে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন নীলয় না করতে পারেনি । গ্রামে এসে চোখে প্রথম ধাক্কা লাগে গ্রামটার পরিবেশ। যেদিকে তাকায়, সেদিকেই অস্বস্তির থাবা।
গ্রামের প্রবেশপথে দাঁড়ানো বয়স্ক কাকীমা দেখে বলেন, শহর থেকে এসেছো বুঝি? তা বাবা সন্ধ্যার পর এখানে বেশি হাঁটা–চলা করতে নেই।

নীলয় হাসে। তাকে অমল কাকা সব বলেছে। সন্ধ্যার পর চলাফেরা করতে নেই।
কাকীমা শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন। তাঁর এমন দৃষ্টি  নীলয়কে ভেতর থেকে চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। রাত নামতেই দেখে—গ্রামের প্রতিটি ঘরের দরজা–জানালা বন্ধ। কেউ একফোঁটা আলো বাইরে বের হতে দেয় না। লণ্ঠনের আলোর ক্ষুদ্র রেখাও মাটিতে পড়তে দেখা যায় না। নীলয় ভাবে—হয়তো লোডশেডিং, অথবা গ্রামীণ অভ্যাস। কিন্তু হঠাৎ দূর থেকে একটুকরো শব্দ ভেসে আসে। খুব টানাটানা, দীর্ঘ, শীষের মতো ডাক।
“টিট্—শা—আ—আ—আ…” শব্দটি অচেনা। না মানুষের, না পশুর। অথবা—সম্ভবত দুয়ের মাঝামাঝি কিছু।
নীলয় অবাক হয়ে বলে,এই শব্দ কীসের? পাশের চৌকাঠে বসে আছেন অমর কাকা। যার  বাড়িতে নীলয় এসেছে।সে দেখে অমর কাকার মুখ কেঁপে উঠেছে।। তিনি বললেন,তুমি ডাক শুনেছো? তোমার শোনা ঠিক হয়নি। শোনার কথা নয়। এই ডাক কাউকে ভালো জায়গায় নিয়ে যায় না।
নীলয় হেসে বলে, কোনো পাখি হবে।
অমর কাকা এবার ঠিকমতো তাকালেন। চোখে ছিল কাঁচঠাসা ভয়ের পাতলা স্তর।
পাখি হয়েও সে পাখি নয়। রক্তশালিকের ডাক এটা।  গ্রামের যে ছেলেপেলে নিয়ম ভাঙে, তারাই এই ডাক সবচেয়ে আগে শোনে। কিন্তু তুমি আজ এসেছো। ওরা বুঝতে পেরে ডাকছে।
নীলয় একরকম অস্বস্তির হাসি দেয়। সে লোককথার গল্পে বিশ্বাস করে না। কিন্তু মনে হয়—আজকের বাতাস অন্যরকম। কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে—দরজার বাইরে।
অথবা শালবনের সীমানায়। অথবা আরও গভীরে। রাতে নীলয় শুতে আসে।
এই প্রথম নীলয়ের ঘুম আসে না। সে শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে তাকায়। সামনে শালবন। দূরে দপদপ করে একটা নীল আলোর ক্ষুদ্র দাগ দেখা যায়।অতিবৃদ্ধরা যাকে “শ্মশানআগুন” বলে সন্দেহ করে।
রাত বাড়ে। শব্দ কমে আসে। কিন্তু একটা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে। যেন পুরো গ্রামটার নিঃশ্বাস আটকে আছে। ঠিক তখনই—“টিট্… শা—আ—আ…”
ডাকটা এবার আরও কাছে। এত কাছে যে মনে হয় জানালার ঠিক ওপাশেই এক অদৃশ্য পাখি দাঁড়িয়ে আছ। যার পালক হয়তো লাল হয়ে ঝরে পড়ছে।
 চোখ হয়তো রাগে জ্বলছে। আর যার ডাকের নিচে চাপা পড়ে আছে মানুষের অশরীরী আর্তনাদ।
নীলয় হতভম্ব হয়ে উঠে বসে। ঘরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেছে। মনে হয় কম্পমান। ঠিক তখনই জানালার কাঠ হালকা কাঁপে। খুব সূক্ষ্ম,নরম, কিন্তু অস্বাভাবিক। যেন কেউ আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছে।  একটা টোকা…আরেকটা টোকা…নীলয় হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়—কিছু একটা ডাকছে তাকে বেরিয়ে যেতে।
অথবা কিছু একটা তাকে ভেতরে আটকে রাখার চেষ্টা করছে। রাতের প্রতিটি শব্দ ঘন হয়ে উঠে। বুকের মধ্যে এক ভয়াবহ উপলব্ধি জাগে—এই গ্রামে কিছু আছে।
লোককথা নয়। গল্প নয়। অরণ্যের কোনো বন্য প্রাণীও নয়। কিছু—যার জন্ম ভয়ের ভেতর। যার অস্তিত্ব অরুণপুরের নিষেধের মাঝেই বেঁচে আছে। আর সে—রাত নামলে ডাকতে আসে।

শালবনের গোপন পথ
ভোরের আলো অরুণপুরকে ছুঁতে না ছুঁতেই নীলয় দরজা খুলে বাইরে বের হয়। রাতের অদ্ভুত শব্দ, জানালায় টোকা, আর সেই বাতাস—সবকিছু তাকে বিব্রত করেছে। এমনকি সকালে উঠে প্রথমেই মনে হয়েছে—গ্রামের এই নীরবতা ভীষণ অস্বস্তিকর। আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু ভারী। গ্রামের উঠোনে হাঁটতেই বাতাসে একটা আতঙ্কের দমবন্ধতা ভাসছে।
মানুষের চোখেমুখে রাতের অসমাপ্ত ভয়ের ছাপ।
গ্রামটা যেন সকালে উঠে আবার শান্ত হওয়ার ভঙ্গিতে অনুশীলন করছে—কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ হচ্ছে না।
অমর কাকা দূর থেকে নীলয়কে দেখে বললেন,ঘুম হয়নি, তাই তো?
নীলয় মৃদু হাসে—এখানে রাতগুলো খুব শব্দহীন।তবে পাখির ডাক রাতকে গম্ভীর করে তোলে।
অমর কাকা কাঁধ ঝাঁকালেন—শব্দহীন রাত মানে শান্তি নয়। এখানে শব্দ না থাকা মানেই কেউ নজর রাখছে।
কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হলেও নীলয়ের মনে অনেক গভীর কিছু দাগ কাটে। ভেতরে একটা অদ্ভুত টান তৈরি হচ্ছে—শালবনের দিকে। গত রাতে যেদিক থেকে অচেনা ডাক এসেছিল। সে অমর কাকাকে জিজ্ঞেস করে,কাকা, ওই শালবনের ভেতরে কি যায় কেউ?
অমর কাকা তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বললেন,হ্যাঁ দিনের বেলা কিছু নারী লতা-পাতা কুড়াতে যায়,যুবকেরা কাঠ সংগ্রহ করতে মরা গাছের ডালপালা কাটতে যায়। কিন্তু সন্ধ্যার পর সেখানে কারও ছায়াও ঢোকে না। শালবনটা ভিন্ন—এখানে অনেক পুরনো কিছু ঘুমিয়ে আছে।
"কী আছে সেখানে?"
যা আছে, তা বলা মানা। যা দেখি—তা দেখা মানা। আর যা শুনি—শোনা মানা। অমর কাকার কণ্ঠ আটকে আসে। ওই বনে একা যাওয়ার দরকার নেই,বাবা।”
 ঠিক তখনই গ্রামের উত্তর দিক থেকে দুটি ছেলে দৌড়ে এসে বলে কাকা ইনি কে? 
অমর কাকা বলেন,আমার ভাতিজা। নাম নীলয়।ছেলেগুলো কৌতূহলী হয়ে বলে দাদা,তুমি শহরের মানুষ—চলো, তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।
অমর কাকা তাদের থামিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু ছেলেরা ইতিমধ্যে নীলয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়।
“এভাবে নিয়ে যাস না—”
নীলয়ের যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করে। অমর কাকা শেষবারের মতো বলে দিলেন,
“দূরে যেয়ো না, শালবনে ঢুকবে না।” কিন্তু ছেলেরা যে পথ ধরে নিয়ে গেল, সেটা শালবনের দিকেই।
শালবনে ঢোকার আগেই নীলয় থেমে যায়। বনের মুখটা সম্পূর্ণ আলাদা। গ্রামের চেয়েও অনেক ঠান্ডা। পাখি কিচিরমিচির করছে, কিন্তু তাদের স্বর যেন দমবন্ধ—গলার ভেতর আটকে থাকা ভয়। পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অল্প আলো। ছেলেদের একজন মাটিতে ইশারা করে। “এইটা দেখো!” নীলয় ঝুঁকে দেখে—অদ্ভুত কিছু পদচিহ্ন।
মানুষের চিহ্নের মতো। কিছুটা লম্বা,গভীর,আর চিরে যাওয়া। এগুলো শুকনো পাতা ডলে চিরে গেছে সোজাসুজি শালবনের দিকে।
নীলয় ভ্রু কুঁচকে বলে,“এটা কি? কার পায়ের ছাপ?”
ছেলেরা জবাব দিতে পারে না। একজন মৃদু গলায় বলে,“কাল রাতে ডাকটা খুব কাছে শোনা গেছিল। আজ সকালে আমরা খেলতে এসে এটা পাই।”
ডাক? নীলয়ের বুক হালকা ধাক্কা খায়। সেই ডাক…
“টিট্—শা—আ—আ…” যা তাকে রাতভর তাড়া করেছে। পদচিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়—এগুলো যেন কোথাও দেখা। তার জানালার নিচেও কিছু একটা দাঁড়িয়েছিল। জানালার কাঠে টোকা দেওয়া আঙুলগুলো…হয়তো এগুলোরই। সে গভীর শ্বাস নিয়ে ছেলেদের বলে, “এই পদচিহ্নগুলো অদ্ভুত।”
ছেলেদের একজন বলে,“আমাদের দাদুরা বলেন—রক্তশালিকের ছায়া নাকি মানুষের মতো হাঁটে। তাই হয়তো।" বাকিটা বলতে সাহস পায় না। নীলয়ের মনে হয়—শালবনের ভেতর কেউ তাকিয়ে আছে।
দৃষ্টির মতো কিছু। যেন পাতার আড়াল থেকে নজর রাখা চোখ।
শালগাছগুলো সোজা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের কাণ্ডে একটা কালো দাগ। শিকড় থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে আগুনের পুড়ে-যাওয়া ধোঁয়ার রেখা।
নীলয় গাছের গায়ে হাত রাখতেই অনুভব করে—গাছটা ঠান্ডা। ঠান্ডার ভেতরেও অদ্ভুত স্পন্দন। যেন গাছের তলায় কিছু কাঁপছে। আর তখনই—বনের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ, খুব টানাটানা একটা শব্দ উঠে—“টিট্… টিট্… শা—আ—আ…”
তিনজনই থমকে দাঁড়ায়। শব্দটা খুব কাছে।
এত কাছে যে মনে হচ্ছে, একদম সামনে দাঁড়ানো কেউ ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলে ডাকছে।
ছেলেরা চিৎকার করে দৌড় দেয়। নীলয় দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর তীব্র ধুকপুক। চোখ গাছের পেছনে আটকে যায়। একটা লাল পালক। মাটির ওপরে, ঠিক শালগাছের গোড়ায় পড়ে আছে।
উজ্জ্বল লাল পালক। যেন সদ্য কারও শরীর থেকে ঝরে পড়েছে।
নীলয় স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ গ্রামে রঙিন পাখি নেই। এই লাল রঙ—এটা খুবই অস্বাভাবিক।
সে যখন পালকটা তুলতে যাবে, ঠিক তখনই বনের অন্ধকার থেকে আরেকটা শব্দ ভেসে আসে—
“ফিরে যাও।” মানুষের কণ্ঠ নয়। পাখির ডাক নয়।
বরং দুয়ের মাঝামাঝি অচেনা, অস্বাভাবিক, ঠান্ডা স্পন্দনের ভয়।
নীলয়ের হাত কেঁপে উঠে।
সে পিছিয়ে যায়, কিন্তু চোখ সরাতে পারে না।
আর তখনই—দূর থেকে আবার সেই ডাক—
“টিট্—শা—আআ…” যেন তাকে অরণ্যের গভীরে ডেকে নিচ্ছে।

লোককথার ভয়াবহ শুরু
নীলয় পালক না তুলে তাকিয়ে থাকে। এই লাল রং অস্বাভাবিকভাবে জীবন্ত। যেন দপদপ করছে, রক্ত মিশে আছে এর ভেতর। বনের নীরবতা আরো ভারী হয়ে উঠছে। বাতাস হঠাৎ থেমে যায়। গাছের পাতার শব্দ মিলিয়ে যায়। সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে, ঝুঁকে আছে, শ্বাস আটকে আছে—শুধু নীলয়ের কানের ভেতর দিয়ে সেই অদ্ভুত ডাকার প্রতিধ্বনি ঘুরছে।
“টিট্… শা—আ…”
শব্দটা মনে হচ্ছে চারদিকে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু কোনো উৎস নেই। নীলয় দ্রুত গ্রামে ফিরে আসে।
ছেলেরা ইতিমধ্যেই বাড়ি ঢুকে গেছে, ভয় পেয়ে।
নীলয়কে দেখে অমর কাকা এগিয়ে এলেন। চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। 
“তুমি ওদিকে গেলে কেন? বলেছিলাম না?”
নীলয় থতমত—“কিছু তো হয়নি।”
অমর কাকা ঘাড় নেড়ে বললেন, “যা হয়নি, তা সামনে হবে। এখানে সবকিছু দিনে নিরাপদ, রাতে নয়।”
নীলয় বলে, “আমি একটা লাল পালক দেখেছি। খুব অদ্ভুত…।”
কথা শেষ হতেই অমর কাকার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। যেন এক মুহূর্তে তিনি বয়সে আরও দশ বছর বেড়ে গেলেন।
“লাল পালক? কই?”
নীলয় বনের দিক দেখায়।
অমর কাকা হাত উঠিয়ে বললেন,“ওদিকে ইশারা করো না! আর পালক দেখেছো—মানে তোমার দিকে নজর পড়েছে।”
“নজর?” 
“হ্যাঁ। রক্তশালিকের নজর।”
নীলয় কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই গ্রামের আরও কয়েকজন জড়ো হয়ে যায়। ওদের চোখেমুখে ভয়, গলায় গোপন অস্থিরতা। কেউ কেউ মুখ ঢেকে ফিসফিস করছে—“পালক দেখেছে,তাহলে ডাকও শুনবে…।”
“অবধারিত… অরুণপুরে কে-ই বা রেহাই পায়…?”
নীলয় বিরক্ত হচ্ছে। শহরে বড় হওয়া মানুষ—সে এসব অযৌক্তিক গল্প মানে না।
“আপনারা আমাকে এত ভয় দেখাচ্ছেন কেন? একটা পাখির পালক! এতো বড় ব্যাপার?”
ভিড় থেকে একজন বৃদ্ধা বললেন—“পাখির পালক নয়, বাবা। এটা অভিশাপের পালক।”
নীলয় গভীর নিঃশ্বাস নেয়। 
“অভিশাপ আবার কীসের?”
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। কন্ঠ কেঁপে ওঠে। “লোককথা শোনো, তবে অর্ধেক নয়—পুরোটা শোনো।”
চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে। গ্রামের লোকেরা বৃত্ত করে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধা কথা শুরু করেন—“একসময় অরুণপুরে ছিল এক বংশ—ঘুঘুর বংশ। তারা বনদেবতার পূজা করত।
কিন্তু এক রাতে বংশের একজন ছেলে বনদেবতার তপস্যা ভেঙে দেয়। সে তামসিক তাবিজ নিয়ে বনে ঢুকে শালিকদের শিকার করতে যায়। বলে—শালিক খেলে নাকি শক্তি বাড়ে। যা ছিল নিষিদ্ধ, যা ছিল বনের নিয়মের বিরুদ্ধে।” বৃদ্ধার কণ্ঠ ভেঙে আসে।
“বনদেবতা ক্রুদ্ধ হন। এবং তাঁর ক্রোধেই জন্ম হয়—রক্তশালিক।”
নীলয় ভ্রু কুঁচকায়। “এটা কি কোনো পাখি?”
বৃদ্ধা ধীরে মাথা নেড়ে বলেন—“পাখি নয়। পাখির শরীরে লুকোনো এক অভিশপ্ত আত্মা। যার ডানায় লাল আগুনের দাগ।
যার ডাক মৃত্যুবাণ। যে রাতে ভেসে আসে, সে কারও জন্য নয়—শুধু তার শিকারীর জন্য আসে। যার আত্মীয় বংশে কেউ বনদেবতাকে অশ্রদ্ধা করেছে—তাদের রক্তই সে খোঁজে।”
নীলয় বিস্ময়ে চুপ হয়ে যায়। কেউ যেন ওর শিরদাঁড়ায় বরফের টান দেয়। অমর কাকা বলেন, “তোর দাদুর বংশ… ঘুঘুর বংশের শেকড়ই তো। জানিস না?”
নীলয় হতচকিত—“মানে… আমার পরিবারের ওপর এই অভিশাপ?”
“অভিশাপ নয়, নজর।"
রক্তশালিক নজর দেয়, তারপর ডাক দেয়। —”
কথা শেষ করল না কেউই।
অনেক ইতিহাস, অনেক ভয়—এক বাক্যে বলা যায় না।
নীলয় মনে মনে হেসে উড়িয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু পারে না। কারণ—রাতের সেই টোকা,অচেনা ডাক,লাল পালক সবকিছু মিলিয়ে গ্রামবাসীরা যা বলছে, তা নিছক বানানো মনে হচ্ছে না।
বৃদ্ধা আবার বলেন—“যে লাল পালক দেখে, সে কখনোই অযথা দেখে না। এটা রক্তশালিকের চিহ্ন।
যার পায়ে পড়ে, তাকে রাতেই ডাকে।”
নীলয় কাঁপে। “কাল রাতে যে শব্দ শুনেছি—”
গ্রামবাসীরা একসঙ্গে বলে উঠে,“ওটাই! ওটাই ছিল রক্তশালিক!”
চুপ…একটা দীর্ঘ, দমবন্ধ নীরবতা।
তারপর অমর কাকা  বললেন—" সন্ধ্যার পর তুমি বাইরে বেরোবে না। জানালা বন্ধ রাখবে। আগুন জ্বালিয়ে রাখবে। আর কোনো শব্দ শুনলেও দরজা খুলবে না।”
নীলয়ের শ্বাস আটকে আসে। কারণ সে জানে—আজ রাতেও ডাক আসবে। আর এবার আরও কাছে।
আরও স্পষ্ট। আরও ভয়ঙ্কর। মনে এক ভয়াবহ প্রশ্ন জাগে—যদি রক্তশালিক ডাকেই…তাহলে সে কী চায়? এবং কেন আমার দাদুর বংশকে খুঁজছে আজও?

নিষিদ্ধ রাতের প্রথম আঘাত
সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তের অরুণপুর প্রতিদিনের মতোই শান্ত। কিন্তু নীলয়ের চোখে লুকানো আতঙ্কের থকথকে রং। হলুদ আলোয় ফেরার সেই পথগুলো অদৃশ্য স্রোতের মতো ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে দরজা বন্ধ করছে। গরু-ছাগল গোয়ালে তুলছে। উঠোনের বাতাসে সন্ধ্যার কাকের ডাকও হারিয়ে যাচ্ছে।
গ্রামটা অদ্ভুত রীতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীলয় অমর কাকার কথা মনে রাখে। “আগুন জ্বালিয়ে রাখবে বাবা, কোনো শব্দ শুনলেও বাইরে যাবে না।”
 ঘরে একটা কেরোসিন বাতি আছে। লণ্ঠনটা জ্বালাতেই আলো নড়েচড়ে উঠে। মনে হয় বাতিটা ভয়ে কাঁপছে। 
হঠাৎ দরজায় টোকা। ধুপ—ধুপ। নীলয়ের রক্ত জমে আসে। এত তাড়াতাড়ি?
সে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,“কে?”
নরম, খুব মানবিক কণ্ঠে উত্তর আসে—“আমি,পাশের বাড়ির রশিদ।তোমার কাকা হই।  দরজা খোল।”
নীলয় সন্দেহে পড়ে যায়। কণ্ঠটা ঠিকই ওনার মতো।কিন্তু অদ্ভুত কিছু মিশে আছে ভেতরে।
সে দরজা খুলে না। বলল," কিন্তু অমর কাকা বলেছেন সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া মানা। আপনি তাহলে কেন এলেন?”
দরজার ওপাশের মানুষটি মুহূর্তের জন্য নিরব।
তারপর ধীরে টানাটানা গলায় বলছে—“দরজা খোলো নীলয়। অন্ধকার নামছে। তোমায় কিছু বলতে হবে।”
কণ্ঠটা এবার মানুষের ছিল না। চেনা গলার কাঠামোর মধ্যে অস্বাভাবিক কাঁপুনির ছায়া। যেন কারও ঠোঁটের ভেতরে অন্য কোনো ভয়াবহ গলা কথা বলছে। নীলয়ের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। লণ্ঠনের আগুন দপদপ করে উঠে। এমন সময় বাইরে থেকে একটা স্বাভাবিক, শক্ত, পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
“নীলয়! দরজা খুলো,  আমি বাইরে আছি!”
এটাতো সত্যি অমর কাকার কণ্ঠ। অসাধারণ রকম স্বাভাবিক। কোনো অদ্ভুত কম্পন নেই।নীলয় ভাবে, কাকাতো ঘরে তাহলে কাকার মতো ওরা এসেছে? দরজার তক্তার নিচ দিয়ে নীলয় দেখে বাইরে দুটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। একটা অমর কাকার মতো। আরেকটা অন্য কেউ। কিন্তু ছায়াটা একটু লম্বা, একটু বেঁকে যাওয়া, গায়ের কালো রেখা মাটি পর্যন্ত ঝুলে আছে। যেন শুকনো ডানার ছায়া। নীলয়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। এটা মানুষ নয়,অনুকরণকারী। গ্রামের গল্পে শুনেছে মানুষকে নকল করে ডেকে নিয়ে যাওয়ার প্রাণী। আবার শব্দ আসছে, একটুও কি দরজা খুলবে না?”
তারপর আবার অদ্ভুত দ্বিতীয় কণ্ঠ—একেবারে নরম, খুব কাছে, অনেক বেশি পরিচিত সুরে..“নীলয়…আমি…তোর মা…”
নীলয় পাথর হয়ে যায়। চোখ থেকে পানি চলে আসার মতো অনুভূতি। সে জানে, মা মৃত। তার আত্মাকে কেউ ডাকছে। এটিই মানুষকে ভুল করায়।
অমর কাকা চিৎকার করে উঠেন—“ওর কথা শুনবি না! বাইরে বেরোলে তুই আর ফিরে আসবি না!” তার গলা কাঁপছে সত্যিকারের ভয়ে। নীলয় হতবুদ্ধি হয়ে যায়।এতক্ষণ অমর কাকা দরজা খোলার জন্য কী অনুনয় বিনয় করেছেন,আর এখন তিনিই বাইরে থেকে নিষেধ করছেন দরজা না খোলার জন্য। কিন্তু কেন এই দ্বৈত আচরণ?  আর তখন—দ্বিতীয় ছায়া মাটিতে লম্বা হয়ে, পা-দুটি মানুষের মতো করে দরজার দিকে এগিয়ে আসে।
কিন্তু এর পায়ের ছাপ—মানুষের নয়।
দু’টি আঙুলের মতো, তীক্ষ্ণ চিরে যাওয়া রেখা।
ঠিক সেই লাল পালকের পাশে দেখা ছিল যে চিহ্ন।
ছায়াটা দরজার ফাঁকে মুখ ঠেকিয়ে দিলে ভেতর দিয়ে এক হিম শ্বাস ঢুকে যায়।
নীলয়ের চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। ঘরের বাতাস বরফ হয়ে যাচ্ছে। তারপর সেই ছায়া, মানুষের কণ্ঠ নকল করে আবার বলে—“দরজা খোলো। আমি তোমার… দাদু…।”
এই কণ্ঠে কোনো ভুল নেই। ঠিক দাদুর শেষ জীবনের কণ্ঠের মতো। শব্দগুলো গলার ভেতর লোমশ দানবের মতো কাঁপছে, কিন্তু সুরটা মানবিক। নীলয়ের হাত দরজার চাবিতে উঠতেই—অমর কাকা ঝাঁপিয়ে পড়লেন দরজার দিকে।
“নীলয়! থামো! দরজা খুলবে না! তুমি যদি খুলো—তারপর আলো নিভে যাবে, আর তোমাকে শিকার পাবে সে!” নীলয় অমর কাকাকে ঘরে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। কাকা আপনি? অমর কাকা বলেন,সব বিভ্রম! তোমাকে আরো শক্ত হতে হবে।সামনে কঠিন লড়াই আসছে।
হঠাৎ পুরো গ্রাম থেকে শব্দ উঠে—যেন কুকুরের দমবন্ধ চিৎকার। পাখির ডানার ঝাপটা। আরেকটি
“টিট্—শা—আ—আ—আ—…”
ডাকটা  থামছে না। দেয়ালের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, কানে ঢুকে যাচ্ছে, হাড়ে ঢুকে যাচ্ছে।
দরজার ওপাশে ছায়াটা ক্ষিপ্র হয়ে উঠে। এবার একটা মানুষ নয়—দু’টি নয়—তিনটি আলাদা কণ্ঠে একই ডাক একসঙ্গে—একই শব্দে—দরজার তক্তার ওপর চাপড় মারছে।
ধুপ!
ধুপ!
ধুপ!
নীলয় চিৎকার করে। ঘরের বাতি তীব্রভাবে কেঁপে উঠে। তখন সব শব্দ থেমে যায় ফুঁ করে নিভে যাওয়া আগুনের মতো। অমর কাকা নিলয়কে বুকে চেপে ধরেন। বললেন,"তোমাকে বিভ্রমে পেয়েছে।ওরা তোমাকে বিভ্রমে ফেলেছে। ভয় নেই,ওরা ফিরে গেছে। এখন রাতটা যেভাবেই হোক অপেক্ষা করতে হবে। আমার সাথে ঘুমাবে চলো।” অমর কাকার বউ বিন্দুবালা নীলয়কে খাটে শুইয়ে দেয়। আর ওরা নিচে বিছানা পেতে নীলয়কে ওদের কক্ষে নিয়ে ঘুমায়। 
সকালে দেখে—একটা লাল পালক পড়ে আছে।  তাজা, উজ্জ্বল, আর ভয়ংকর। রাতের শিকার সে ছিল। কিন্তু পাওয়া যায়নি। তবে রক্তশালিক ফিরে যাবে না। এটা ছিল মাত্র প্রথম আঘাত।

অচেনা পদচিহ্ন
ভোরের আলো অরুণপুরে ঢোকে খুব সাবধানে।
সূর্য ওঠে ঠিকই, কিন্তু আলো যেন মাটিতে নামার আগে বহুবার থেমে থেমে ভাবে—এই গ্রামে আলো ঢোকানো ঠিক হবে তো? শালবনের মাথার ওপর দিয়ে হালকা কুয়াশা গড়িয়ে পড়ে। জমির ওপর শিশির জমে ।আর সেই শিশিরেই লুকিয়ে থাকে অরুণপুরের সকালের প্রথম ভয়।
সেই ভোরে প্রথম চিৎকার শোনা যায় ক্ষেতের দিক থেকে।
“এইডা কী রে বাবা!” চাষি রমজান আলীর গলা।
ভাঙা, আতঙ্কে কাঁপা। লোকজন দৌড়ে আসে। নীলয়ও আসে। গত রাতের অস্বস্তি এখনো বুকের ভেতর জমে আছে। পানিমাতার অসুস্থতার খবর আগের রাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কেউ ভাবেনি, ভোরটা এমন কিছু নিয়ে আসবে।
ধানক্ষেতের কিনারায় সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে।
মাটির ওপর—ভেজা, কাদামাখা জমিতে—স্পষ্ট কিছু ছাপ। প্রথম দেখায় মনে হয় মানুষের পায়ের ছাপ।
কিন্তু ভালো করে তাকাতেই শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে যায়। পায়ের ছাপগুলো অসম্ভব রকম বড়। মানুষের মতো হলেও পুরোপুরি মানুষের নয়। পায়ের সামনের অংশ লম্বা, আঙুলগুলো অস্বাভাবিকভাবে ছড়ানো। গোড়ালি যেন ঠিকমতো বসেনি। মনে হয় কেউ হাঁটেনি, বরং মাটি টেনে টেনে এগিয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, ছাপগুলো একই গভীরতায় নয়। কিছু জায়গায় পা খুব গভীর, কিছু জায়গায় প্রায় ভেসে থাকা।যেন শরীরের ওজন কখনো ভারী, কখনো হালকা হয়ে গেছে।
রমজান আলী কাঁপা গলায় বলেন,“মানুষের পা হইলে এমন হইতো না।”

অমর কাকা তখন সামনে এগিয়ে এসে মাটিতে বসে পড়েন। ছাপগুলো ভালো করে দেখেন।
তারপর উঠে একটা কথা বললেন,“এগুলো ফিরে আসার ছাপ।”
কথাটা শুনে সবাই চুপ। কারণ অরুণপুরে এই শব্দটা কেউ অকারণে বলে না।
নীলয় জিজ্ঞেস করে,“কী মানে?”
অমর কাকা মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,“যারা বহু বছর আগে যাওয়ার কথা ছিল,যারা ফেরার কথা ছিল তাদের পায়ের ছাপ এমনই হয়।”
একজন বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলেন,“রক্তশালিক…।”
এই নামটা বাতাসে উঠতেই কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে গেল।
নীলয় লক্ষ করে—পায়ের ছাপগুলো ক্ষেত থেকে শালবনের দিকেই গেছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার
শালবনের ভেতরে ঢুকে ছাপগুলো হঠাৎ উধাও।
যেন মাটি সেখানে আর কিছু নিতে রাজি হয়নি।
একটা মেয়ে চিৎকার করে উঠে,“ওখানে তাকান!”
সবাই তাকায়। ধানের শীষের ফাঁকে একটা লাল পালক আটকে আছে। একদম পানিমাতার বাড়ির দিক বরাবর। এই দৃশ্য দেখে অমর কাকা চোখ বন্ধ করেন। তিনি বললেন,“এটাই প্রথম চিহ্ন। ভোরে যে ছাপ পড়ে, সে রাতে ডাক দেয়।”
নীলয়ের বুক কেঁপে উঠে। তার মনে পড়ে—গত রাতের অস্বস্তি। অজানা কাঁপুনি। আর এখন পানিমাতার অসুস্থ মুখ।
একজন প্রশ্ন করে,"কী করব এখন?”
অমর কাকা উত্তর দিলেন না সঙ্গে সঙ্গে। তিনি মাটিতে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলেন।তারপর বললেন,
“আজ সন্ধ্যার আগে কেউ বনে যাবে না।পায়ের ছাপ মুছবে না। কারণ যে এসেছে—সে দেখতে চায়, আমরা দেখেছি কি না।”
এই কথা শুনে অনেকেই পিছিয়ে যায়। কারণ অরুণপুরে বিশ্বাস আছে যে ভয়কে লুকাতে চায়, ভয় তাকে খুঁজে নেয়। কিন্তু যে ভয়কে দেখে ফেলে, তাকে ভয় চিনে নেয়। নীলয় শেষবারের মতো পায়ের ছাপগুলোর দিকে তাকায়। মনে হয়,এই ছাপগুলো হাঁটার নয়। এগুলো ফিরে আসার চিহ্ন। ঠিক সেই সময় দূরে, শালবনের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে আসে “টিট্… শা—আ…”
দিনের আলোয়। ভোরের আলোয়। নীলয় বুঝে এটা শুধু শুরু। আজ ভোরে পায়ের ছাপ। আর খুব শিগগিরই কোনো না কোনো মৃত্যুর আগে হবে শেষ দেখা।

মৃত্যুর আগে শেষ দেখা
অরুণপুরের মৃত্তিকা স্মৃতিকে ধরে রাখে। সেই স্মৃতি কখনো মিশে থাকে গাছের খোড়লে। কখনো নালার কোল ঘেঁষে বেয়ে আসে। কখনো সন্ধ্যার আড়ালে পুরোনো কণ্ঠে কথন হয়ে ওঠে। পানিমাতা
গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো মহিলা যিনি মন্ত্র পড়েন ও ঝাড়ফু্ঁক করেন—তাঁর মুখে এমন অনেক কাহিনি আছে যা শুনলেই লোকেরা কেঁপে উঠে। খাঁচাভরা কলের মতোই কন্ঠে জীবনের তিক্ততা, শতবর্ষী অভিজ্ঞতার ক্ষত। তবু কেউ ভাবতে পারেনি তাঁর সাথে শেষ দেখা হবে এক অতন্দ্র, অর্বাচীন সতর্কবার্তা হয়ে।
নীলয় যখন গ্রামের বাড়ি পৌঁছায় তখনই রাতের বায়ু তাঁর কাছে অমীমাংসিত ইঙ্গিত মতো ভেসে গিয়েছে। গ্রামে ফিসফিস আওয়াজ—“পানিমাতা বাঁচবে না।” লোকেরা ঘরের দরজা-জানালা টেনে নিচ্ছে যেন কোনো শব্দ বাইরে ঢুকতে না পারে । এখানে খবর ছড়ায় চায়ের কাপের ধোঁয়া ওঠার মতো।
পানিমাতার ঘর গ্রাম থেকে একটু দূরেই শ্মশানঘাটের পথে। একটি পুরোনো ছেঁড়া টিনের ছাদ, ফাটাঘর। নীলয় ঢুকতেই দেখে, ঘর জমে আছে চিরচেনা গন্ধে।
জলখাবার, ধূপ, কয়েকটা পুরনো আসবাবে। পানিমাতা শুয়ে ছিলেন অলস ভঙ্গিতে।  চোখের কোণ কালচে, কন্ঠ জড়। সাথে বসে আছে অমর কাকা আর দুটি নিকট আত্মীয়।
তাঁর হাতে এক প্যাঁচের গামছা। ঘেমে আছে। মুখ কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু শ্বাস ফুরোচ্ছে। নীলয় অজান্তেই তাঁকে কাছে জড়িয়ে ধরে। পানিমাতার ঠান্ডা হাত, কিন্তু স্পন্দন এখনও দুর্বলভাবে টিকে আছে।
অমর কাকার চোখ ভরা জল। তিনি কণ্ঠ কমিয়ে বলেন, “নীলয়—চুপচাপ বসো। ওনার কথা শোনো। ওনার শেষ কথাটা কানে কানে শোনা ভালো।”
পানিমাতা চোখ আলতো খুললেন। কণ্ঠে ভাঙা একটা শব্দ,“নীলয়… তুমি…” । তিনি সামনে তাকান। তারপর আঙুল তুলে কারো দিকে ইশারা করেন।কেউ বুঝলো না ঠিক কার দিকে।
“শোনে… শোন… আমার কণ্ঠ আর শক্ত নেই,” পানিমাতা কাঁদো গলায় বলা শুরু করেন। “শোন, বাচ্চা। ওরা ফিরে আসছে—ওরা পুরনো হিসেব নেবে।” 
তাঁর চোখে অদ্ভুত সরলতা, ভয়ের মতো স্পষ্ট জ্বালা মিশে আছে।
নীলয় বুঝতে পারে—এটা কেবল মৃত্যু-বাণী নয়, এতে আছে উদ্ধেগের আগাম বার্তা। সে কণ্ঠ মৃদু করে জিজ্ঞাসা করে, “কী ফিরে আসছে, মা? কার হিসেব?”
পানিমাতা মুখ কুঁচকে বলেন—“বহু বছর আগে—আমরা ভুল করেছিলাম। এক কসম ভেঙেছিলাম, বনের নিয়ম ভেঙে দিয়েছিলাম। নামটা বললে তোর রক্ত কাঁপবে, বাচ্চা। ওদের নাম বললে তাদের সঙ্গে লড়াই হবে, আর লড়াই ছেলে খেলা না।” তিনি কাঁদছেন।  কণ্ঠে দু’টো সুর মিশে যায়—শপথ ভাঙার লজ্জা ও ভয়ানক তীব্রতা।
নীলয় ধীরে বলে, “মা, কী শপথ ভাঙা হয়েছিল? তুমি বলো—বল কী ভুল হয়েছে?” তিনি জানতেন—জিজ্ঞাসা গ্রামকে থামিয়ে দেয়। কারণ একবার মুখ খুললে, কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে যাবে। বাতাস আবার শালবনের পাতায় গিয়ে উঠবে।
পানিমাতা কষ্ট করে হাসেন। এক রকম বিদ্রুপমিশ্রিত, ক্ষতোক্তির হাসি। “ওটা অনেক আগের কথা তুই জানিস না—তখন আমরা শহরের দিকে চেয়ে থাকতাম। জমি বিক্রি করে ধন-সম্পদ চাইতাম। এক রাতে কয়েকটা লোক বনকে করুণ করে কেটে দিল। ওরা বলেছিল—আমরা খাদ্য দেব, ভাগ্য দেব। আমরা বাতাস বদলে দেব।”
পানিমাতার শব্দ নিঃশব্দ হয়ে আসছে কিন্তু কন্ঠে ভীতি স্পষ্ট। তিনি বলতে থাকেন,“আর তখন আমরা কথা দিয়েছি,শপথ দিয়েছি। সেদিনই আমাদের কপালে দূর্ভাগ্যের ইতিহাস লিখেছি। আমরা জানতাম না বনদেবতা শালিকের রূপে থাকতেন।পরে কি হলো,আমি দেখেছি, পাখির চোখ লাল হয়ে উঠল, গাছ কুঁচকে গেল, নদীতে ঢেউ খেললো অস্বাভাবিক। দিনকয়েক পরই গ্রামে অদ্ভুত মৃত্যু শুরু হলো।”
তিনি বিমর্ষ হয়ে গেলেন। “আমি বলছি—শুনে রাখ, নীলয়—ওরা আবার ফিরে এসেছে। আজ রাতে আমার স্বপ্নে তারা দাঁড়িয়ে ছিল—এরা বদলা চাইছে। আর যাদের বংশে সেই শপথ ছিল, তাদের ওপর দৃষ্টি থাকবে। তুমি সেই বংশের বংশধর।তোমার বংশের আদেশ থেকেই এই বন কাটা হয়েছে। তোমার দাদার বাবা হরিনাথ মুখার্জি এই নিয়ম ভেঙেছেন। আজ গ্রামের সবাই অভিশপ্ত। ”

নীলয়ের চোখ লাল হয়ে উঠে। সে শান্ত ভঙ্গি বজায় রাখে, কিন্তু অন্তর ঠান্ডা হয়ে যায়। “কী করবো আমরা? কে রক্ষা করবে?” সে জিজ্ঞেস করে কণ্ঠ কাঁপা রেখে।
পানিমাতা কানে কানে বলেন—"রক্ত, রক্ত! ওদের তোমার রক্ত চাই। সন্ধ্যার আগে আলো জ্বালাও,কথা ছড়াবে না। আর সবচেয়ে জরুরি—যারা দলে দলে মরে গেল, তাদের নাম রেখে যাও। ওরা আবার আত্মারূপে ফিরে এলে আমরা মারা যাব।” 

 তাঁর চোখে এমন  দৃঢ়তা—মৃত্যুর কাছে থাকা মানুষের যে সতর্কতা থাকে, তাতে কালির মতো গাঢ় এক সতর্কবার্তা যেন লুকিয়ে আছে। শত জিজ্ঞাসা ছিল, কিন্তু কথা আর বাকি রইল না। পানিমাতা একটু করে মাথা নেড়ে শুয়ে পড়লেন। চামড়া কুঁচকে উঠে।  বেদনায় দিগ্বিধা দেখালেন, তারপর হালকা হেসে বলেন,“তোর দাদু বলতেন—যেখানে পাখি চুপ, সেখানে কখনো হাসি আসে না। মনে রাখবে।”
নীলয় হাত ধরে বলে, “ মা, আমি রক্ষা করবো—আমি এবার দেখব। আমার রক্ত দিয়ে হলেও এই গ্রাম বাঁচাব।” কিন্তু পানিমাতা আশার কিরণ দেখলেন না—তবু বললেন, “শোনো শেষ কথা—যদি কেউ চুপে চুপে ডাকে, কথা বলো না। চুপ থাকবে, বুঝেছো? কথাগুলো বলে তিনি থামেন। যেন পৃথিবীর শব্দগুলো ধরা থেকে থেমে গেল। নীলয় বুঝে—কিছু একটা লুকিয়ে আছে। কিছু একটা যা শুধু মৃত্যুর মুখে বলতে পারেন বয়স্করা, আর বাকিদের কাছে তা চিহ্নহীন থাকে।
পানিমাতা শেষ নিশ্বাস টেনে বলেন—“তারা ফেরে। ফিরেই বংশধর খোঁজে। সুতোর ডোর কেটে রাখো।” তারপরেই তাঁর চোখ চুপ করে গেল। কক্ষটা দীর্ঘ এক শূন্যতায় পড়ে থাকে। ঘরের বাতি ঢেউ খেলে, অমর কাকার কণ্ঠ বলে উঠে—“ আমরা প্রস্তুত থাকব।”
নীলয় জানে—এই দেখা কেবল একটি বার্তা নয়, এটি  সূচনা। পানিমাতার মৃত্যু ওর কানের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় সেই অমীমাংসিত সতর্কবার্তা যা চলবে আর গভীর হতে হবে।

অরুণপুরের বিধান
অরুণপুরে সন্ধ্যা নামে খুব ধীরে, কিন্তু নামার পর যেন হঠাৎ করেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মানুষের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য তাড়া শুরু হয়। কেউ উচ্চস্বরে কিছু বলে না, কেউ হাসে না, শুধু কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। গরু বাঁধা পড়ে, হাঁস-মুরগি ঘরে ঢুকে যায়, চুলোর আগুন নিভে আসে। কারণ সবাই জানে—এই গ্রামের একটি বিধান আছে, যা প্রশ্নহীনভাবে মানতে হয়। বাঁশির শব্দ।
সন্ধ্যার ঠিক পরেই, কখনো আজানের ঠিক আগে, কখনো পরে—কোনো এক অদৃশ্য সময়ের ফাঁকে সেই বাঁশির শব্দ ভেসে আসে। কেউ জানে না কে বাজায়। কেউ দেখেনি কোনো বাঁশিও। কিন্তু শব্দটা এতটাই পরিষ্কার, এতটাই কানে ঢুকে যায়, যেন বাতাস নিজেই সুর তুলে হাঁটে।
সেই বাঁশি শোনা মাত্রই অরুণপুরের মানুষ ঘরে ফেরে। যে যেখানে থাকে, কাজ ফেলে, কথা থামিয়ে, পা বাড়ায় বাড়ির দিকে। কেউ দাঁড়িয়ে শোনে না, কেউ জানালা খুলে উঁকি দেয় না। এমনকি শিশুরাও জানে—বাঁশি মানে বাইরে থাকা নিষেধ।
এই বিধান লেখা কোথাও নেই। স্কুলের বইয়ে নেই, মসজিদের খুতবায় নেই, ইউনিয়ন বোর্ডের নোটিশেও নেই। তবু অরুণপুরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষ এই নিয়ম জানে। যারা জানত না, তারা আর কোনোদিন কাউকে জানাতে পারেনি।
গ্রামের প্রবীণরা বলে, এই বিধানের শুরু বহু বছর আগে—যখন অরুণপুরের নামও ঠিক ছিল না। তখন নাকি এই জায়গাটা ছিল জলাভূমি আর জঙ্গলের মাঝামাঝি ফাঁকা জনপদ। সন্ধ্যার পর মানুষ বাইরে থাকত, গল্প করত, আগুন জ্বালাত। সেই সময়েই প্রথম বাঁশির শব্দ শোনা যায়।
প্রথমে মানুষ গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, কোনো রাখালের বাঁশি, অথবা বাতাসের খেল। কিন্তু এক সন্ধ্যায় তিনজন মানুষ একসঙ্গে বাড়ি ফেরেনি। তাদের শেষ দেখা গিয়েছিল বাঁশির শব্দের সময়।
পরদিন সকালে পাওয়া গিয়েছে পায়ের ছাপ—মানুষের মতো, কিন্তু বিকৃত। আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, গোড়ালি যেন মাটিতে ডোবা। সেই ছাপ গিয়েছে গ্রামের শেষ সীমানা পর্যন্ত, তারপর হঠাৎই মিলিয়ে যায়।
এরপর থেকে শুরু হয় বিধান।
বাঁশি বাজলে ঘরে ফিরতে হবে। দরজা বন্ধ করতে হবে। আলো নিভিয়ে রাখতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাঁশির দিকে তাকানো যাবে না।
এই নিয়ম ভাঙার গল্পও আছে। কিন্তু সেসব গল্প কেউ সন্ধ্যার পর বলে না।
মৃত্যুর আগে পানিমাতা যেদিন সতর্কবার্তা দিয়েছেন সেদিনও বাঁশির কথা বলেছেন। “ও শুধু ডাক দেয় না… ও গুনে দেখে কে বাইরে আছে।” তখন কেউ পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় বাঁশির শব্দ স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ ছিল। যেন কারও শ্বাস টানার মতো, থেমে থেমে।
সেই রাতে হরেন নামে গ্রামের এক যুবক নিয়ম ভেঙেছে। বাঁশি শোনার পরেও বন্ধুর সঙ্গে গল্প করেছে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে দেখেছে, সে হেসে বলছে “লোককথা আর কত?” তারপর হঠাৎ থেমে গিয়েছে তার কথা।
পরদিন সকালে হরেনকে আর পাওয়া যায়নি। বাড়ির উঠোনে পাওয়া গেছে কাদা মাখা পায়ের ছাপ। ঘরের ভেতর থেকে শুরু হয়ে বাইরে মিশেছে।
এরপর থেকে কেউ আর প্রশ্ন করে না।
অরুণপুরের বিধান ভয় দিয়ে শেখানো হয়নি। ভয় এখানে বাতাসে ভাসে, মাটির নিচে থাকে, পুকুরের জলে নড়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামলে সেই ভয় সক্রিয় হয়। বাঁশির শব্দ সেই সক্রিয়তার ঘোষণা।
আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো—কিছু রাতে বাঁশি বাজে না। তখন মানুষ আরও বেশি ভয় পায়। কারণ সবাই জানে, বাঁশি না বাজলে মানে ও খুব কাছে এসেছে।
সেই রাতে দরজা বন্ধ করেও মানুষ ঘুমাতে পারে না।
অরুণপুরের বিধান তাই শুধু নিয়ম নয়—এ এক জীবিত সতর্কতা।

লাল পালকের ছায়া
অরুণপুরে লাল রঙকে কেউ শুভ বলে না। বিশেষ করে সেই লাল যদি রক্তের মতো উজ্জ্বল হয়, অথচ এর কোনো উৎস না থাকে। বাঁশির বিধানের পর মানুষ যেটাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতে শুরু করে তা হলো লাল পালক।
প্রথম লাল পালক পাওয়া গিয়েছে গ্রামের উত্তর প্রান্তের এক কাঁচা টালির ছাদে। ভোরবেলা, শিশির ভেজা আলোয় পালকটা এমনভাবে পড়ে ছিল, যেন কেউ খুব যত্ন করে রেখে গেছে। পালকটি বড় নয়, আবার ছোটও নয়—মাঝারি আকারের। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অরুণপুরে এমন কোনো পাখি নেই যার পালক এমন গাঢ় লাল।
খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ছাদে উঠতে সাহস পায় না। দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ বলে এটা নিশ্চয়ই কোনো পাখি শিকারির কাজ। কিন্তু বৃদ্ধেরা মাথা নেড়ে বলেন—“পাখির পালক হলে রক্তের গন্ধ থাকত না।”
সেই দিন সন্ধ্যায় বাঁশির শব্দ শোনা গিয়েছে আগের চেয়ে খানিকটা কর্কশ। মানুষজন ঘরে ফিরছে তাড়াহুড়ো করে। আর সেই রাতেই দ্বিতীয় লাল পালক পাওয়া যায়—বাঁশবাগানের ধারে, মাটির ওপর।
বাঁশবাগান অরুণপুরের মানুষের কাছে এমনিতেই অশুভ। রাতের বেলা সেখানে বাতাস ঢুকলে বাঁশের ঘষাঘষিতে যে শব্দ হয়, তা অনেক সময় কান্নার মতো শোনায়। সেই বাঁশবাগানের গোড়ায় লাল পালক পড়ে থাকতে দেখে কেউ তুলতে যায়নি। শুধু চারপাশে ছাই ছিটিয়ে দিয়েছে—পুরোনো লোকবিশ্বাস অনুযায়ী।
তৃতীয় পালকটা পাওয়া যায় নদীর ঘাটে।
ঘাটটা এমন এক জায়গা, যেখানে দিনে প্রাণ থাকে।কাপড় ধোয়া, গোসল করা, কথা বলা চলে। কিন্তু সন্ধ্যার পর ফাঁকা। কেউ সেখানে যায় না। ভোরে জাল ফেলতে আসা এক জেলে প্রথম পালকটা দেখে। সে  বলেছে পালকটা পানির ওপর ভাসছিল কিন্তু খুব উজ্জ্বল তার রং।
এই তিন জায়গা—ছাদ, বাঁশবাগান, নদীর ঘাট—গ্রামের তিন প্রান্ত। যেন কেউ খুব পরিকল্পনা করেই পালকগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে। এরপর লাল পালক দেখা মানেই অশুভ সংকেত। লোকেরা বলতে শুরু করে, বাঁশির সঙ্গে পালকের সম্পর্ক আছে। কেউ কেউ বলে, বাঁশি যখন বাজে, তখন কিছু একটা আকাশ থেকে নেমে আসে। তার ডানা আছে। আর সেই ডানার ছেঁড়া অংশই এই পালক।
এক বৃদ্ধ বলেছেন, বহু বছর আগে এমন পালক দেখা গিয়েছিল।  তখন গ্রামের মাঝখানের পুকুর শুকিয়ে গেছে এক রাতেই। আর পুকুরের তলায় পাওয়া গিয়েছে মানুষের ভাঙা হাঁড়।
এখনকার পালকগুলো দেখেও সেই পুরোনো ভয় ফিরে আসে। সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে চতুর্থ পালক পাওয়ার পর। সেটা পাওয়া যায় বৃদ্ধা পানিমাতার বাড়িতে যে মৃত্যুর আগে শেষ সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
লোকজন ফিসফিস করে বলতে শুরু করে—পালক মানে শুধু উপস্থিতি নয়, নির্বাচন। ও বেছে নিচ্ছে।
এরপর থেকে মানুষ ছাদে ওঠে না, বাঁশবাগানের ধারে যায় না, নদীর ঘাটে ভোরের আগে পা রাখে না। কিন্তু তবু লাল পালক থামে না। কখনো একা, কখনো জোড়া, কখনো এমন জায়গায়—যেখানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো অসম্ভব।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যেদিন লাল পালক পাওয়া যায়  সেদিন রাতে বাঁশির সুর একটু বদলে যায়। সুরে যেন একটা কাঁপন থাকে, যেমন থাকে অসুস্থ শ্বাসে। অরুণপুরের মানুষ জানে—বাঁশি সতর্ক করে,কিন্তু লাল পালক জানিয়ে দেয়—সময় ঘনিয়ে আসছে। আর ছায়া শুধু আলো থাকলেই পড়ে। 

শালিক–মন্ত্রের উন্মোচন
অরুণপুরে যখন লাল পালকের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষ একা থাকতে ভয় পেতে শুরু করে। কিন্তু ভয়কে ভাষা দিতে পারছে না কেউ। ঠিক তখনই গ্রামের পুরনো ওঝা—দীনু গোঁসাই—নিজের কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
দীনু গোঁসাই বহু বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল।সে কথা কম বলে। চোখ দুটো অদ্ভুত। একটার দিকে তাকালে মনে হয় অতীত দেখছে, আরেকটার দিকে তাকালে মনে হয় ভবিষ্যৎ শুনছে।
গ্রামের মানুষ তাকে ধরে আনে শ্মশানঘাটের নীল আগুনের পরদিন।
দীনু গোঁসাই প্রথমে প্রশ্ন করে, “পালক কয়টা?”
যখন তাকে বলা হয়—ছাদে, বাঁশবাগানে, ঘাটে, উঠোনে—সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে, “তাহলে ও জেগে উঠেছে।”
লোকেরা ভয়ে একে অপরের দিকে তাকায়।
দীনু গোঁসাই জানায়, যে পাখির পালক তারা দেখেছে, সেটা কোনো সাধারণ শালিক নয়। তাকে বলে রক্তশালিক। নামটা শুনেই কারও কারও শরীর কেঁপে ওঠে। কারণ এই নাম গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো লোককথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ওঝা বলে, রক্তশালিক পাখি নয়—এ এক বাহক। যে জিনিস হাঁটে না, কথা বলে না, কিন্তু চায়—তার বার্তা বহন করে। এই শালিক আসে তখনই, যখন কোনো গ্রাম বা জনপদ নিজের সীমানা ভুলে যায়।
দীনু গোঁসাইয়ের কথায় বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর ইতিহাস।
বহু বছর আগে অরুণপুরের জায়গায় ছিল এক বসতি,  তারা শ্মশানঘাটে গান গাইত, নদীর ঘাটে আগুন জ্বালাত, বাঁশবাগানে রাত কাটাত। তখনই প্রথম রক্তশালিক দেখা দেয়। তার পালক ছিল লাল, আর চোখ ছিল মানুষের মতো স্থির। রক্তশালিক যেখানে বসত, সেখানে পরদিন কেউ না কেউ হারিয়ে যেত।
তখন বনগুলো কেটে ফেলা হচ্ছিল। মানুষ বুঝতে পারেনি রক্তশালিক বনেরই অভিশাপ।
দীনু গোঁসাই আরো বলে, বাঁশির শব্দ আসলে মন্ত্র। এটা কোনো বাদ্যযন্ত্র নয়। এটা শালিক–মন্ত্র। সেই মন্ত্রে বলা আছে—যে ঘরে ঢুকে যাবে, সে বাঁচবে।  যে বাইরে থাকবে, সে গণনায় আসবে।
এই মন্ত্র বাতাসে ভাসে। শালিক সেই মন্ত্র বহন করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। তাই পালক পাওয়া যায় আলাদা আলাদা জায়গায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর কথা তখনই বলে দীনু গোঁসাই “রক্তশালিক একা আসে না। সে আগে আসে দেখতে। পরে আসে নিতে।”
গ্রামের একজন সাহস করে প্রশ্ন করে, “নিতে কাকে?”
দীনু গোঁসাই মাটির দিকে তাকিয়ে বলে, “যাদের ছায়া ভারী।”
এই কথার মানে কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু সবাই টের পায়—নিজের ছায়ার দিকেই এখন ভয়।দীনু গোঁসাই আরও জানায়, নীল আগুন আসলে শালিক
মন্ত্রের শেষ ধাপ। যখন শালিক তার কাজ শেষ করে, তখন আগুন জ্বলে। সেই আগুনে নাম নেই, শরীর নেই শুধু ডাক থাকে।
এবার মানুষ বুঝতে শুরু করে—বাঁশির বিধান, লাল পালক, নীল আগুন—সব একই সূত্রে বাঁধা।
দীনু গোঁসাই সতর্ক করে দেয়, রক্তশালিককে তাড়ানো যায় না। শুধু বিধান মানা যায়। আর যদি কেউ শালিকের চোখের দিকে তাকায়, তবে সে আর নিজের নাম শুনতে পায় না—অন্য কেউ তার নাম ধরে ডাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় দীনু গোঁসাই গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা মন্ত্র পড়ে। মন্ত্রটা ছিল ফিসফিসে, কিন্তু বাতাস কেঁপে উঠেছিল। তারপর সে বলেছে, “এখন থেকে পালক আরও পড়বে। ভয় বাড়বে। কারণ ও বুঝে গেছে—তোমরা জানো।”
রাতে বাঁশির সুর বদলে যায়।
আর ভোরে শ্মশানঘাটের কাছে পাওয়া যায়—একটা ভাঙা শালিকের ডানা। রঙটা ছিল রক্তের মতো লাল।

অরণ্যদেবতার অভিশাপ
অরুণপুরের ইতিহাস কাগজে লেখা নেই। এর ইতিহাস লুকিয়ে আছে অরণ্যের গভীরে, গাছের বাকলে, নদীর কাদায়। দীনু গোঁসাই বলেছে—রক্তশালিক জন্মেছে এক ভুল থেকে। আর সেই ভুলের সাক্ষী ছিল অরণ্যদেবতা।
এক সময় এই অরণ্য ছিল অখণ্ড। মানুষ তখন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেত মাথা নিচু করে, কথা কম বলত, আর কোনো গাছ কাটার আগে মাটি ছুঁয়ে ক্ষমা চাইত। অরণ্যদেবতা তখন ছিলেন রক্ষক—নির্দয় নন, কিন্তু নীরব।
কিন্তু এক বর্ষার রাতে সেই নীরবতা ভাঙে।
লোককথা বলে, তখনকার গ্রামের প্রধান হরিনাথ মুখার্জি  নীলয়ের বাবার বাবা এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয়। জমি বাড়াতে সে অরণ্যের সবচেয়ে পুরোনো শালিকগাছগুলো কাটার আদেশ দেয়। সেই গাছের নিচে ছিল অরণ্যদেবতার বসবাস। কিন্তু লোভ বিশ্বাস মানে না। এই গাছগুলোয় অজস্র শালিক বাসা বেঁধেছিল। অজস্র শালিক থাকত বলেই গাছগুলোর নাম পড়ে গেছে শালিক গাছ। গাছগুলো ছিল ওদের আশ্রয়স্থল। বাসার ভেতরে ছিল হাজার হাজার ডিম। মানুষ গাছ কাটে, বাসা ভাঙে, ডিমগুলো মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। সেই মুহূর্তে অরণ্যদেবতা প্রথমবার ক্রুদ্ধ হন। কিন্তু অভিশাপ সাথে সাথে আসেনি। দেবতা অপেক্ষা করেছিলেন।
সেই রাতেই গ্রামের মানুষ উৎসব করে। আগুন জ্বালে, গান বাজায়, শালিক পাখি ধরে মাংস পুড়ে খায়। কেউ লক্ষ্য করেনি অরণ্যের ভেতর থেকে কেউ তাকিয়ে আছে। পরদিন সকালে শালিকগাছের গোড়ায় পাওয়া যায় এক পাখি তার শরীর কালো, কিন্তু ডানা রক্তলাল।
ওটা ছিল প্রথম রক্তশালিক।
লোকেরা ভেবেছে অদ্ভুত পাখি। কেউ কেউ মারতে চেয়েছে। কিন্তু পাখিটা উড়ে যায়নি। তাকিয়ে ছিল। সেই তাকানোর ভেতর ছিল ভয় জাগানো হিসাব।
দীনু গোঁসাইয়ের কাহিনিতে জানা যায়, অরণ্যদেবতা পাখিকে পাঠাননি শাস্তি দিতে, পাঠিয়েছিলেন স্মরণ করাতে। রক্তশালিক একা ছিল না  সঙ্গে ছিল মন্ত্র। সেই মন্ত্র বাতাসে ভেসে বেড়ায়, বাঁশির সুরে ঢুকে পড়ে।
এই মন্ত্র বলে—যে সীমা ভাঙে, সে সীমাহীন ভয় পায়।
প্রথম যে মানুষ রক্তশালিকের পালক কুড়িয়ে নেয়, সে তিন দিনের মধ্যে হারিয়ে যায়। তার ছায়া পাওয়া যায়, কিন্তু শরীর নয়। তখন মানুষ বুঝতে শুরু করে—এটা কোনো সাধারণ পাখি নয়।
অরণ্যদেবতার অভিশাপ ধীরে ধীরে কাজ করে। তিনি নীল আগুন জ্বালান। সেই আগুনে শরীর খোঁজেন।

দীনু গোঁসাই বলেন, এই শালিক মারলে অভিশাপ যাবে না। অভিশাপ কোনো জীব নয়—এটা এক সম্পর্ক ভাঙার ফল। অরণ্যদেবতা এখনো অপেক্ষা করছেন। প্রতিটা লাল পালক আসলে প্রশ্ন—তোমরা কি এখনো মনে রেখেছো? অরণ্যদেবতার ক্রোধ তাই বিস্ফোরণের মতো নয়। এটা জমে থাকা নীল আগুনের মতো—দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
লোককথা বলে, যদি কোনোদিন রক্তশালিক নিজে মাটিতে পড়ে মরে, তবে অরণ্যদেবতা শেষবারের মতো হাঁটবেন অরণ্য ছেড়ে গ্রামে। সেদিন বাঁশি বাজবে না। আগুন জ্বলবে না। সেদিন শুধু নীরবতা থাকবে।
আর নীরবতার ভেতরেই হবে চূড়ান্ত হিসাব। নীলয় এসব জেনে পানিমাতার কথা স্মরণ করে। বৃদ্ধা এই কথাগুলোই বলে গেছেন। রক্তশালিক আসলে বনদেবতার রূপে ছিলেন।

দ্রষ্টার অশরীরী কথা
অরুণপুরে সবাই জানে—কিছু মানুষ মরে গিয়েও পুরোপুরি মরে যায় না। বিশেষ করে যারা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, তারা সময়ের সঙ্গে বাঁধা থাকে না। এমনই একজন ছিল—মালতী দ্রষ্ট্রী।
মালতী বেঁচে থাকতে খুব বেশি কথা বলত না। সে ভবিষ্যৎ বলত। যখন বিপদ একেবারে কাছে এসে দাঁড়াত। গ্রামের মানুষ তাকে ভয়ও পেত, আবার প্রয়োজনেও ডাকত।
দশ বছর আগে, এক চাঁদহীন রাতে মালতী হঠাৎ মারা যায়। কেউ অসুস্থতার লক্ষণ দেখেনি, কেউ বিষক্রিয়ার চিহ্ন পায়নি। সকালে তাকে পাওয়া গিয়েছে নিজের উঠোনে, চোখ খোলা, মুখে এমন একটা বিস্ময়ের ছাপ যেন কিছু দেখে ফেলেছে, যা বলা যায় না।
তার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় ফিসফাস।
প্রথমে একজন বলেছে, সে রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কাউকে কথা বলতে শুনেছে। কথাগুলো স্পষ্ট ছিল না, শুধু একটি বাক্য বারবার শোনা যাচ্ছিল—
“সময় ফুরোচ্ছে।”
এরপর আরেকজন বলেছে, সে শ্মশানঘাটের দিক থেকে আসতে আসতে মালতীর কণ্ঠ শুনেছে। কিন্তু ঘুরে তাকিয়ে কাউকে দেখেনি। শুধু বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
দীনু গোঁসাই কথাগুলো শুনে চুপ করে ছিল। পরে বলেছে, “যে ভবিষ্যৎ দেখে, সে মরেও কথা বলে। কারণ তার কথা সময়ের জন্য।”
লোকেরা বুঝতে শুরু করে—মালতীর আত্মা ফিরছে।
সবচেয়ে নিশ্চিত ঘটনা ঘটে সেই রাতে, যেদিন লাল পালক পাওয়া যায় মালতীর পুরোনো ঘরের চালায়। ঘরটা বহুদিন তালাবদ্ধ। কেউ সেখানে যায় না। কিন্তু সেই রাতে কয়েকজন স্পষ্ট দেখেছে—ঘরের ভেতরে নীলচে আলো জ্বলছে।
সাহস করে কেউ এগোয়নি। দূর থেকে শোনা গিয়েছে ফিসফিসানি। শব্দগুলো অস্পষ্ট  কিন্তু অর্থ বোঝা যায়।
“বাঁশির পরে দেরি করো না।”
“ছায়াকে বিশ্বাস কোরো না।”
“যাকে ডাকবে, সে আসবে না।”
পরদিন সকালে গ্রামে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়। কিছু মানুষ নিজের নাম শুনে সাড়া দেয় না। কেউ ডাকলে ভাবে—ডাকটা তাদের জন্য নয়। দীনু গোঁসাই তখনই বলেছে, “দ্রষ্ট্রী সতর্ক করছে। নাম হারানো শুরু হয়েছে।”
মালতীর আত্মা নাকি সতর্ক করে, সাহায্য করে না। কারণ ভবিষ্যৎ বদলানো তার কাজ ছিল না কখনো। সে শুধু পথ দেখাত।
এক কিশোর দাবি করেছে, সে মালতীকে স্পষ্ট দেখেছে। রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে নদীর ধারে। তার পা মাটি ছোঁয় না, কিন্তু ছায়া পড়ে। ছায়াটা লম্বা, টানটান।
মালতী নাকি বলেছে, “রক্তশালিক শেষ নয়। ও শুধু চিহ্ন, অরণ্যদেবতা এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।”
এই কথার পর থেকেই মানুষ নতুন করে ভয় পেতে শুরু করে। কারণ তারা বুঝে যায়—এখনো যা হচ্ছে, তা আসল বিপদ নয়।
মালতীর আত্মা যেদিন শেষবার দেখা দেয়, সেদিন বাঁশির সুর একেবারেই বাজেনি। পুরো গ্রাম অস্বাভাবিক নীরবতায় ডুবে ছিল। রাত গভীর হলে শোনা যায় শুধু একটি কথা—সব ঘরের ভেতর একসঙ্গে—“শেষ প্রশ্ন আসছে।”
পরদিন সকালে মালতীর ঘরের দরজার সামনে পাওয়া যায় মাটিতে আঁকা এক চিহ্ন—শালিকের ডানা আর মানুষের ছায়া মিলিয়ে তৈরি। দীনু গোঁসাই দেখে বলে, “এটা মন্ত্র নয়। এটা ঘোষণা।”
অরুণপুরের মানুষ এখন জানে—রক্তশালিক নির্বাচন করে,নীল আগুন সীমা দেখায়, আর দ্রষ্টার অশরীরী কথা বলে দেয়—আর কতটা সময় বাকি।
রাত নামলে এখন সবাই কান পেতে থাকে।
বাঁশির জন্য নয়—মালতীর কণ্ঠের জন্য।
কারণ সে যা বলে, তা কেউ থামাতে পারে না।

লোহিতচাঁদের রাত
অরুণপুরে বছরে একটি রাত আসে—যার কোনো উৎসব নেই, কোনো আনন্দ নেই, কোনো গল্প বলার অনুমতিও নেই। এই রাতকে কেউ ডাকে না, তবু সে আসে। গ্রামবাসীরা শুধু জানে—এই রাতের নাম লোহিতচাঁদের রাত।
এই রাতে চাঁদ স্বাভাবিক চাঁদের মতো থাকে না। আকাশে উঠলে মনে হয়, কেউ যেন রক্তে ডুবিয়ে রেখে আবার তুলে দিয়েছে। লালচে, ভারী, আর নিঃশব্দ। সেই চাঁদের আলো সোজা পড়ে না—বাঁকা হয়ে যায়, লম্বা হয়, কখনো আবার ছায়া থাকে না।
লোহিতচাঁদের রাতে অরুণপুরে প্রতিটি ঘরে তালা পড়ে। শুধু দরজায় নয়—মনের ভেতরেও।
এই প্রথা এত পুরোনো যে, কেউ জানে না কবে শুরু হয়েছে। শুধু জানা যায়, যেদিন প্রথম লোহিতচাঁদ উঠেছে, সেদিন গ্রামে চৌদ্দটি মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। পরদিন তাদের খোঁজে কেউ যায়নি। কারণ শ্মশানঘাটের কাছে পাওয়া গিয়েছে চৌদ্দ জোড়া জুতো—এক সারিতে, নদীর দিকে মুখ করে।
তারপর থেকেই নিয়ম।
লোহিতচাঁদের দিন দুপুর থেকেই অরুণপুর বদলে যায়। বাজার বন্ধ থাকে। পশুদের আগেই ঘরে ঢোকানো হয়। শিশুদের কাউকে একা থাকতে দেওয়া হয় না। কেউ ঝগড়া করে না, কেউ নাম ধরে ডাকে না। এমনকি মৃতদের নামও উচ্চারণ করা নিষেধ।
সন্ধ্যার আগেই প্রতিটি দরজায় তালা পড়ে। কাঠের দরজা, টিনের দরজা, এমনকি বাঁশের বেড়াতেও। ওরা বিশ্বাস করে, দরজা বন্ধ থাকলে খোলা যায় কিন্তু তালা থাকলে ভেতরের জিনিস বাইরে আসে না।
এই রাতে কোনো প্রদীপ জ্বলে না। আলো জ্বালালে নাকি ছায়া দ্বিগুণ হয়।
দীনু গোঁসাই বলেছে, “লোহিতচাঁদের রাতে যারা বাইরে থাকে, তারা মানুষ থাকে না—গণনায় পরিণত হয়।”
এই রাতে বাঁশির শব্দ শোনা যায় না। নীল আগুনও দেখা যায় না। রক্তশালিক উড়ে বেড়ায় না। সবকিছু  থেমে যায়। কিন্তু এই থামাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ তখন শোনা যায় হাঁটার শব্দ।
প্রথমে খুব মৃদু। তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট। জুতোর শব্দ, খালি পায়ের শব্দ, কখনো টেনে নেওয়ার মতো শব্দ। শব্দগুলো কোনো এক দিক থেকে আসে না—চারদিক থেকে আসে। মনে হয়, পুরো গ্রাম জুড়ে কেউ হাঁটছে।
কেউ জানালা দিয়ে তাকায় না। কেউ ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় না। কারণ লোককথা বলে, এই রাতে যদি কেউ বাইরে তাকায়, তবে সে নিজের মুখ দেখতে পায়—কিন্তু চোখ ছাড়া।
মালতী দ্রষ্ট্রীর শেষ কথাগুলোর একটি ছিল এই রাত নিয়ে—“লোহিতচাঁদ মানে হিসাবের খাতা খোলা।”
এই রাতে অরণ্যদেবতা গ্রাম ছাড়িয়ে হাঁটেন। তিনি কারও ঘরে ঢোকেন না। শুধু দরজার সামনে দাঁড়ান। যদি তালা দুর্বল হয়, যদি বিশ্বাস ফাঁকা হয়—তিনি চিহ্ন রেখে যান। সেই চিহ্ন কেউ দেখতে পায় না সঙ্গে সঙ্গে। পরদিন দেখা যায়।
একবার এক ঘরে তালা দেওয়া হয়নি। মানুষটা ভেবেছে, এত বছর কিছু হয়নি—এবারও হবে না। সে নিজের নাম ভুলে গেল। তিন দিনের মাথায় নদীর দিকে হেঁটে জলে মিলিয়ে যায়।
লোহিতচাঁদের আলোয় নদীর জল থেমে যায়। ঢেউ ওঠে না। জল কালচে লাল দেখায়। 
এই রাতে শিশুরা কান্না করে না। কুকুর ডাকে না। পাখি উড়ে না। শুধু ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে—এমন শব্দে, যেন সময় নিজেই ভয় পাচ্ছে।
এক বৃদ্ধা একবার বলেছেন, “এই রাতে তালা শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও দিতে হয়।  যেন ভয়কে ভেতরে ঢুকতে দেয়া না হয়।”
কিন্তু ভয় তো তালা মানে না।
রাত যত গভীর হয়, লোহিতচাঁদ তত নিচে নামে। মনে হয়, সে ছাদ ছুঁয়ে ফেলবে। তখনই শোনা যায় অনেক কণ্ঠ। ওরা সংখ্যা  ধরে ডাকে। এক… দুই… তিন…

এই রাতে কেউ ঘুমায় না। চোখ বন্ধ করে থাকে। নিঃশ্বাস চেপে ধরে। কারণ লোকশ্রুতি বলে—যে ঘুমিয়ে পড়ে, সে দরজা খুলে দেয় স্বপ্নের ভেতর।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে সব শব্দ থেমে যায়। চাঁদ মিলিয়ে যায়। পাখি ডাকে। মানুষ তালা খুলে বাইরে আসে। সবাই দেখে—গ্রাম আছে, ঘর আছে, মানুষ আছে। কিন্তু কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না,  কাকে রেখে গেছে কাকে নিয়ে গেছে। সবাই জানে লোহিতচাঁদের রাত কাকে নিয়ে গেছে,আর কাকে রেখে দিয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর চাইলে পরের বছর তালা কাজ নাও করতে পারে। অরুণপুরের সবাই বেঁচে থাকে তালার ভেতর।

বনের নিচে আরেক বন
অরুণপুরের শালবনকে মানুষ দূর থেকেই ভয় পায়। কিন্তু ওরা যা জানে না, তা হলো—ভয়টা আসলে গাছের ওপরে নয়,নিচে।
শালবনের মাটি অদ্ভুত। পায়ের ভার টেনে নেয়।লোককথা আছে এই বনে হারালে মানুষ দিক ভুলে গভীরতায় নেমে যায়।
লোহিতচাঁদের রাতের পর থেকেই শালবন কিছু বদলে যায়। প্রথমে বদলায় গন্ধ। এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে, পুরোনো নিশ্বাসের গন্ধ। যেন কেউ বহুদিন ধরে মাটির নিচে শ্বাস নিচ্ছে। তারপর বদলায় শব্দ। বাতাস বইলে শালপাতা নড়ে, কিন্তু সেই শব্দের নিচে শোনা যায় আরেকটি আওয়াজ—মৃদু, অবিরাম, যেন কেউ দূরে হেঁটে যাচ্ছে।
শুকনো ডাল কাটতে গিয়ে সেই শব্দ প্রথম টের পায় এক কাঠুরে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। হঠাৎ দেখে—একটা জায়গায় মাটি বসে গেছে। ঠিক গাছের গোড়ায়, গোল করে।
ভয় পেয়ে সে কাছে যায়। লাঠি দিয়ে খোঁচায়। মাটি সরে যায়। নিচে দেখে—একটা সুড়ঙ্গের মতো অন্ধকার মুখ। কাঠুরে ফিরে এসে কিছু বলে না। রাতে চিৎকার করে বলে, “ওখানে নিচে গাছ আছে।”
পরদিন দীনু গোঁসাইকে নিয়ে নীলয় শালবনে যায়।   সুড়ঙ্গের মুখ বড় নয়—একজন মানুষ কষ্ট করে ঢুকতে পারে। কিন্তু ভেতর থেকে বাতাস আসছে। ঠান্ডা, ভেজা, গন্ধযুক্ত বাতাস।
দীনু গোঁসাই মাটিতে বসে কান পাতে। অনেকক্ষণ পর বলে,“এটা শালবনের শিকড় না আরেকটা বন।” এই কথার মানে কেউ বুঝতে পারে না।
সে ব্যাখ্যা করে—অরণ্যদেবতার বন শুধু মাটির ওপরে নয় নিচেও আছে। গাছের শিকড়, নদীর পথ, মৃতদের ছায়া—সব মিলিয়ে এক আলাদা অরণ্য। মানুষ যখন সীমা ভাঙে, তখন সেই নিচের বন ওপরে ওঠার পথ খোঁজে।
সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রথম নামে দুইজন যুবক। হাতে মশাল। প্রথম কয়েক হাত নেমেই টের পায় সুড়ঙ্গের দেয়ালে আঁচড়, নখের দাগ আঁকা। কোথাও কোথাও কাঠের মতো কিছু শিকড় ডালের মতো। আরও নিচে নামলে মশালের আলোয় দেখা যায়—গাছ। কিন্তু উল্টো। শেকড় ওপরে, ডাল নিচে। পাতাগুলো নড়ছে। বাতাস নেই, তবু নড়ছে। যুবকেরা আর এগোয় না। দৌড়ে বেরিয়ে আসে। একজন বমি করে। অন্যজন ফিসফিস করে বলে,” কী দেখলাম এসব!"
এরপর থেকে শালবনের ওই জায়গায় কেউ যায় না। কিন্তু সুড়ঙ্গ নিজেই বদলাতে থাকে। বৃষ্টি হলে মুখ বড় হয়। শুকনো দিনে ছোট হয়। যেন শ্বাস নিচ্ছে।
রাতে শালবনের দিক থেকে আলো দেখা যায়। সবুজাভ অন্ধকার আলো। মালতীর কণ্ঠ শোনা যায়—দূর থেকে, মাটির নিচ থেকে—“ভুল দিক দিয়ে হাঁটছো তোমরা।”
দীনু গোঁসাই জানায়, এই সুড়ঙ্গ কোনো নতুন জিনিস নয়। বহু বছর আগে একবার খোলা হয়েছে। পুরো গ্রাম হারিয়ে যেতে বসেছে। তখনই বাঁশির বিধান আরও কঠোর হয়। লোহিতচাঁদের রাতে তালা দেওয়ার নিয়ম আসে।
কারণ ওই রাতে নিচের বন ওপরে ওঠার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে এক ভোরে। গ্রামের এক শিশু নিখোঁজ হয়। খোঁজ করতে গিয়ে ওর জুতো পাওয়া যায় শালবনের সুড়ঙ্গের মুখে। এই সুড়ঙ্গ থেকে ডাক আসে। যারা ডাক শুনতে পায়,ওরা আর ফিরতে পারে না। কারণ সেখানে রাত–দিন নেই, শুধু অপেক্ষা।
দীনু গোঁসাই শেষবারের মতো শালবনের সামনে দাঁড়িয়ে বলেেন,"বনের নিচে আরেক বন আছে—এটাই শেষ সতর্কতা। এর পরে আর কোনো চিহ্ন থাকবে না।”
সেই রাতে বাঁশির সুর খুব ক্ষীণ হয়। যেন মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। আর গভীর রাতে, যারা কান পাততে পেরেছে  শুনেছে—শিকড় ভাঙার শব্দ।
অরুণপুর তখন বুঝে যায়—ভয় আর বাইরে নেই।
ভয় এখন নিচে। আর যেটা নিচে নামে,একদিন ওপরে উঠবেই।

মুখবিহীনদের পদচারণা
অরুণপুরের অন্ধকার রাতগুলো আগের মতো আর সাধারণ নয়। লোহিতচাঁদের রাত, নদীর বুকে পদচিহ্ন, বনের নিচে আরেক বন—সবই মানুষকে ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু মুখবিহীনদের দেখা এখন এক রহস্য।
শুনতে অবাক লাগলেও, ওরা মানুষের মতো কথা বলে না। হাঁটে শুধু। ওরা ধীরে ধীরে ছায়ার মতো জন্ম নেয়।
প্রথমবার মুখবিহীন দেখা যায় শালবনের ধার থেকে। এক জেলে নাম রমেশ,ঘুটঘুটে সন্ধ্যায় ফিরছিল নদী থেকে। হঠাৎ দেখে, রাস্তার এক পাশে মানুষের মতো ছায়া দাঁড়িয়ে। মুখ নেই,চোখও নেই, শুধু কণ্ঠশূন্য মুখে অন্ধকার। ছায়াটা ধীরে ধীরে ওর দিকে এগোয়। রমেশ ভয়ে দৌড়ে পালায়। 
রমেশ পরে জানায়, সে নদীর ধারে ছায়াগুলো দেখেছে। ওরা পা ডুবিয়ে নীরব হাঁটছে। ছায়ার সঙ্গে ওর নিজের ছায়া মিশে যায়। মনে হয়—সে নিজেকে হারাচ্ছে। এবং সত্যিই, রাত শেষে রমেশ নিজের নাম ভুলে যায়। কেউ ডাকলে সাড়া দেয় না।
দীনু গোঁসাই যখন এ কথা শুনলেন, চোখের মধ্যে অদ্ভুত ঝাপসা আলো ফুটে উঠে। তিনি বলেন “মুখবিহীনরা মানুষের ছায়া নয়। ওরা হারানো নামের ধারক। যারা নিজের নাম ভুলে গেছে, তারা এই রাতে বের হয়ে আসে।”
গ্রামে সেই রাতের পরে কেউ একা থাকেনি। শিশুরা ঘরে বসে থাকে, বৃদ্ধারা কোণে কোণে। কারো শ্বাস চেপে আসে, কেউ কেউ কান পেতে বসে। কারণ মুখবিহীনরা শুধু হাঁটে। 
গ্রামের লোকেরা চেষ্টা করে মুখবিহীনদের ছবি আঁকতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ওদের চেহারা ধরার কোনো উপায় নেই। ওরা প্রকাশ্য নয়, শুধু উপস্থিত। চোখ, নাক, মুখ—সবই শূন্য। তবে ছায়া স্পষ্ট। তাদের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ সবই ভিন্ন। কখনো হালকা, কখনো লম্বা, কখনো সঙ্কুচিত।
ওদের শোনার শক্তিও নেই। কেউ কিছু বললে ঘুরে দেখে না। শুধু হাঁটে। কেউ এগিয়ে গেলে, ওরা ধীরে সরে যায়। নদী, ঘাট, ঘর, শালবন—সব জায়গায় ওদের পদচারণা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
শীতের রাতে গ্রামবাসীরা হঠাৎ লক্ষ্য করে—যখন ওরা খোলা মাঠে দাঁড়ায়, তাদের ছায়া লম্বা হয়। আর মুখবিহীনদের ছায়া সেই ছায়ার সঙ্গে মিলিয়ে যায়। মনে হয়, ওরা মানুষকে ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু হাতে কিছু নেই।
একদিন রাতে, মুখবিহীনরা গ্রামের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায়। সকলেই ঘরে। তবে এক বৃদ্ধা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, ওদের পদচারণার আওয়াজ শুনে চোখ বন্ধ করে শুনেন—“ওরা সংখ্যা গুনছে। যারা চেক হয়, তারা হারিয়ে যাবে।”
এই রাতের শেষে, মানুষ জানতে পারে—যারা চোখে দেখেছে, তারা নিজের নামের স্মৃতি হারাচ্ছে। যারা কান দিয়ে শুনেছে, তারা ভয়বোধ হারাচ্ছে।
গ্রামের মানুষ এখন এক নিয়ম মানে—রাত হলে ঘরে তালা দেওয়া, নাম উচ্চারণ না করা, দীনু গোঁসাইয়ের কথায় কান দেওয়া। কারণ মুখবিহীনরা নীরব। কিন্তু নীরবতা ভয় থেকে কম নয়।
শালবনের ছায়া, নদীর তীর, ঘরের উঠোন—সব জায়গা তাদের পদচারণার সাক্ষী। রাত শেষে ওরা অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু যারা দেখেছে, তারা জানে—আগামী লোহিতচাঁদের রাতে আবার দেখা হবে।
অরুণপুরের মানুষ এখন চোখ বন্ধ করে তালা দেয়। তালা দেয় শুধু দরজায় নয়—মনে, ছায়ায়, নামের ভেতরে। কারণ মুখবিহীনরা ফিরে আসবে। আর ফিরে আসার সময় ওদের পদচারণা সবচেয়ে ভীতিকর হবে, নিঃশব্দে, অদৃশ্যভাবে, ঘর-ঘর পেরিয়ে, নদী ও শালবন ভেঙে।

ছায়ার গণনা
অরুণপুরে রাত আসে ভয় নিয়ে, কিন্তু সেই রাতেও থাকে হিসাব। সংখ্যা, গণনা, ছায়ার গঠন—সবই এই গ্রামের লোকশ্রুতিতে জড়িয়ে আছে। মুখবিহীনদের পদচারণা যে এক অব্যক্ত ভয়, তা এখন পরিণত হয়েছে গণনার আতঙ্কে।
রাত শুরু হয়, ঘর-ঘরে তালা, তবে মানুষ জানে—তালা সবকিছু আটকাতে পারে না। কারণ রাতের মূল হিসাব শুরু হয়, ছায়ার গণনায়। গ্রামের প্রত্যেকের হৃদয় বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ জানে, যত বেশি সংখ্যা, তত বেশি ভয়।
দীনু গোঁসাই ঘর থেকে বাইরে তাকায়। ওর চোখে দেখা যায়—ছায়াগুলো গণিতের মতো সাজানো।  তিন… চার… পাঁচ… প্রতিটি সংখ্যা সঙ্গে সঙ্গে তাদের শ্বাসকে টেনে নিচ্ছে।
প্রথমে তিনটি ছায়া। তারপর পাঁচটি। ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়ছে—রাত গভীর, এবং ছায়াগুলো ঘরের উঠোন, বারান্দা, নদীর ধারে একসঙ্গে অবস্থান নিচ্ছে। গণনা শুরু হলে কেউ কথা বলতে পারে না। যদি শব্দ হয়, ছায়াগুলো বিভ্রান্ত হয়। তখন দেখিয়ে দেয় তাদের প্রকৃত সংখ্যা।
রমেশ গননা করতে চেষ্টা করে। তিনটি ছায়া। ওর নিজের ছায়া মিলিয়ে চার। পরের মুহূর্তে সংখ্যা অর্ধেক বেশি। মনে হয়, নদী ওর ছায়াকে ভক্ষণ করছে। সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু চিৎকার ফিসফিস হয়ে যায়।
গ্রামের সবাই বুঝতে পারে—ছায়ার সংখ্যা মানুষের সংখ্যা নয়। তারা গণনা করছে হারানো নাম, ভুলে যাওয়া আত্মা। যারা রাতে ঘরে তালা দিয়ে বসে আছে, তারা নিরাপদ নয়। কারণ সংখ্যার চূড়ান্ত লক্ষ্য কখনো বোঝা যায় না।
এক বৃদ্ধা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলেন,“আমি গণনা করতে পারি না। তবে শুনতে পাচ্ছি… ছায়াগুলো বলছে। এক, দুই, তিন…।”
সত্যিই, ধীরে ধীরে ছায়াগুলো সংখ্যা প্রকাশ করে।  যে ঘরে তালা আছে, সেখানে ছায়াগুলো থেমে থাকে। কিন্তু তালা দুর্বল হলে, ঘরের ভেতরে ঢুকে চিহ্ন রেখে যায়। এরকম এক দূর্বল তালা লাগিয়ে রেখেছে হরিবন নামের এক যুবক।পরের দিন থেকে সে নিখোঁজ। 
অমর কাকাসহ দীনু গোঁসাইয়ের কাছে যায় নীলয়। গ্রামের সকলকে বলে,এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।এর বিহিত চাই।
অমর কাকা বলেন,"এর বিহিত তোমার কছে। তোমার বংশধর যে অন্যায় করে গেছে তার শেষ তোমার হাত দিয়েই করতে হবে।তোমার দাদু, বাবার মৃত্যু, মায়ের মৃত্যু কিছুই স্বাভাবিক ছিল না। তোমাদের পরিবারের সবাই ভীত হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেছে। কেউ এদিকে আসে না।তোমারা তো বেঁচে গেছ।কিন্তু  এই গ্রামের কী হবে?বংশের একমাত্র ছেলে তুমি। পানিমাতা বলে গেছেন এর উপায় আছে। উপায়টি তোমার কাছে। তোমার রক্তে মুক্তি মিলবে গ্রামের।কিন্তু রক্ত কোথায়, কীভাবে দিতে হবে সে উপায়টি বলে যাননি।"  দীনু গোঁসাই মন দিয়ে শুনে বলেন, অবশ্যই আমরা ভেবে বের করব।"
নীলয় কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। দীনু গোঁসাই এগিয়ে এসে আবার বলেন,আমরা খেয়াল করেছি 
“ছায়াগুলো শুধু গণনা করে। আর যারা নাম ভুলে গেছে, তাদের ঘরে ঢুকে যায়। " নীলয় বলে,ওরা শুনতে পায় না। এটাই হবে আমাদের অস্ত্র। ভেবে আরো বের করব কী করা যায়। আলোচনা শেষ হলে যে যার ঘরে চলে যায়।
রাতের গভীরে  ওদের সংখ্যা বেড়ে যায়। চারপাশে শালবন, নদী, ঘর—সব জায়গা ছায়ার উপস্থিতিতে ভরাট। কেউ জিজ্ঞেস করে না—কতজন আছে। কেউ চায় না—কারো নাম উচ্চারণ হোক। কারণ নাম উচ্চারণ মানে সংখ্যা স্থির করা। স্থির সংখ্যা কখনো শান্তি আনে না।
শিশুরা ঘরে বসে, চোখ বড় করে তাকিয়ে। কেউ সাড়া দেয় না। সংখ্যা বাড়ছে। শিশুদের ছায়া মিশছে। বৃদ্ধাদের ছায়া মিশছে। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারছে—নিরাপত্তা শুধু তালার মধ্যে নয়, গণনার মধ্যেও।
হঠাৎ নদীর ধারে, ছায়াগুলো গুচ্ছ হয়ে আসে। সংখ্যা একবারে সাতটি, তারপর বারো। মনে হয়, নদী নিজেই সংখ্যা গণনা করছে। 
গ্রামের এক বৃদ্ধা ফিসফিস করে বলেন,“গণনা শেষ হলে, ওরা চলে যাবে। তবে যাদের সংখ্যা মিলছে না, তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে।”
সত্যিই, ভোরের আগে, সংখ্যা স্থির হয়। ছায়াগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কিন্তু নদী, শালবন, ঘর—সব জায়গার ভেতরই সংখ্যা থেকে যায়। মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—ভয়, ভুলে যাওয়া, হারানো নাম সবই এখন গণনায় আছে।
 গ্রামের মানুষ ঘরের তালা খুলে,নিজেদের নাম উচ্চারণ করে। ওরা জানে—পরবর্তী লোহিতচাঁদের রাতে গণনা পুনরায় হবে।
শুধু ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি থাকে গণনা শেষ হয়ে গেলে। তবে ভয়, পদচারণা, সংখ্যা—সবই অপেক্ষা করে।
কেউ জানে না, আগামী রাতগুলোতে কে হারাবে, কে বেঁচে থাকবে।
অরুণপুরে মানুষ চোখ বন্ধ করে তালা দেয়। শুধুই সেই রাতে। কারণ ওরা জানে—ছায়ার গণনা কখনো ভুল হয় না।

রক্তশালিকের শিকার
অরুণপুরের রাতে এখন শুধু ছায়া বা গণনা নয়, আগের ভয় আবার ফিরে এসেছে—রক্তশালিক।গ্রামের মানুষের শরীরে দেখা দেয় লাল ছোপ এবং অদ্ভুত দাগ। কিছু ত্যাড়া লোক আছে যারা অরুণপুরের নিয়ম ভাঙে—বাঁশির সুর শোনে না, তালা দিতে অস্বস্তি বোধ করে,রক্তশালিকের  নাম উচ্চারণ করে—তাদের শরীরে দেখা দেয় লাল ছোপ এবং অদ্ভুত দাগ।
প্রথম নজির ঘটে এক বছরের আগের লোহিতচাঁদের রাতে। রমেশ, হরিবন, এবং কয়েকজন যুবক শালবনে কাঠ কাটতে গিয়েছে। ওরা তালা দেওয়া, নাম উচ্চারণ না করা—সব নিয়ম উপেক্ষা করেছে। রাত গভীর হলে, শালবনের মধ্যে রক্তশালিক হঠাৎ প্রকাশ পায়।
রক্তশালিক ছোট, চোখ নেই অথচ দেখতে পারে সব। পালক লাল, কিন্তু ঝাপসা, যেন রক্তের সঙ্গে আগুন মিশেছে। সে ধীরে ধীরে ছায়ার মতো নেমে আসে।
যুবকরা প্রথমে হাসে, মনে করে—ছোট পাখি কেমন ভয় দেখাবে? তবে কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা বুঝতে পারে এটা পাখি নয়, শিকারী।
হরিবনের কাঁধে হঠাৎ লাল ছোপ দেখা দেয়। পাখিটা উড়তে থাকে হাওয়ায়। কিন্তু চোখ নেই। এটা দেখে যুবকদের ভয় বাড়ে দ্বিগুণ।
রমেশ লক্ষ্য করে— দাগ বাড়ছে। ছোপ লম্বা হচ্ছে, শরীরের চারপাশে অদ্ভুত রেখা। যুবকরা এই প্রথম ভয় টের পেল। ওরা কুঠার রেখে দিল দৌড়।দীনু গোঁসাইয়ের বাড়িতে এলে তিনি এসব দেখে বলেন "সর্বনাশ! এই কাজ করতে গেলে কেনো তোমরা? গ্রামের সবাই নিয়ম রক্ষা করে চলছে।তার মাঝে এই অনিয়ম।আর রক্ষা নেই বুঝি।"  তিনি যুবকগুলোকে  একটি কক্ষে ভেতরে লন্ঠন জ্বালিয়ে তালা মেরে দিলেন। তিনি জানেন—রক্তশালিক শব্দের প্রতি সংবেদনশীল নয়। সে সব দেখছে। তিনি এও জানেন এগুলো শুধু দাগ নয়—শরীরের ভেতরের ভয়।”
পরদিন সকালে উঠে দেখে যুবকগুলো উধাও। গ্রামের লোকেরা এই গল্প শুনে আতঙ্কিত। দীনু গোঁসাইয়ের বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। এক বৃদ্ধা ফিসফিস করে জানায়,"ছেলেগুলো শালবনের মুখবিহীনদের সঙ্গে ছিল। ওরা সেখানেই নাম হারিয়ে এসেছে।এজন্য রক্তশালিক তাদের নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। 
এরপর থেকে মানুষ শুধু দেখতে পায় দাগের বৃদ্ধি। সেইসাথে দাগে অদ্ভুত লাইন। মনে হয়, এগুলো শুধু রঙ নয়—চিহ্নিত করে যে তুমি ভুল করেছ।
দীনু গোঁসাই জানায়, রক্তশালিকের শিকারি ক্ষমতা শুধু চোখের নয়—মন দেখে, পছন্দ করে, এবং শাস্তি দেয়। যারা নিয়ম মানে, তাদের দাগ হয় না। যারা বাধা ভাঙে, তাদের শরীরে ছাপ। রাত্রি শেষে, যখন আলো আস্তে আস্তে বাড়ে, দাগ কমে না। প্রতিটি দাগ মনে করিয়ে দেয়—শৃঙ্খলা ভাঙলে, ভয় চিরস্থায়ী হয়।
গ্রামের মানুষ এখন প্রতিটি রাতে তালা দেয়। শুধু দরজায় নয়, মনেও। কারণ তারা জানে—রক্তশালিক দেখছে, মাপছে। যে ভুল করবে, তার শরীরে লাল ছোপ উঠবে। সে দাগ শুধু শারীরিক নয়, ভয়ের প্রতীক। কয়েকজনকে নিয়ে নীলয় একদিন নদীর ধারে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
“দাগটা চিরন্তন। কিন্তু এই গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করতে হবে।"
শালবন, নদী, ঘর—সব জায়গা এখন দাগের সঙ্গে জড়িত। কেউ জানে না, আগামী লোহিতচাঁদের রাতে কে শিকার হবে। কেউ জানে না, কত দাগ বাড়বে। তবে এক জিনিস নিশ্চিত—রক্তশালিকের শিকার থেকে কেউ পালাতে পারবে না, যদি তারা নিয়ম না মানে।
রাত শেষ হলেও, দাগ, লাল ছোপ, অদ্ভুত রেখা—সবই থেকে যায়। মানুষ চোখ বন্ধ করে তালা দেয়। শালবন নিঃশব্দ। নদী শান্ত। ঘর-ঘর তালা। সবাই জানে—আগামী রাতে আবার শিকার হবে। আবার রক্তশালিক তাদের মনোযোগে থাকবে।

মৃত মানুষের ফেরত
অরুণপুরে রাত আসে শুধু ভয় নিয়ে নয়।
এবার আসে মৃত মানুষের ছায়া নিয়ে। ব্যাপারটা টের পায় নীলয়। সে অরুণপুরে থেকে অনেককিছু বুঝতে চেষ্টা করে। গত একটি মাস পুরো শালবন ঘুরে ঘুরে দেখেছে।দেখে বুঝেছে যত আপদ সব বনকে ঘিরে। এখানেই সমস্ত অভিশাপ। মানুষের মুক্তিও এই বনে।তবে তার জন্য অনেক হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হবে।
গ্রামের লোকশ্রুতি বলে, যারা নিয়ম ভাঙে, তাদের দেহে রক্তশালিক চিহ্ন রাখে। কিন্তু মৃতদের ফেরার ঘটনা সে দিন থেকে বহু আগের। কেউ এই কাহিনী শুনলেও বিশ্বাস করে না। তবে ঘটনা ঘটে এবং প্রত্যেকবার নির্ভয়ে থাকা মানুষগুলো ভয় পায়।
সেদিন রাত ছিল চাঁদের আলোয় পূর্ণ। বাতাস নিঃশব্দ।
রাতে জানালার ফুটোয় চোখ রাখে অমর কাকা ও নীলয়। ওরা জানালায় এমনভাবে ফুটো করেছে যেন এখান থেকে বন আর নদী দেখা যায়।রাত গভীর হলে ওরা দেখে  রমেশের মতো কেউ নদীর ধারে দাঁড়ায়। বন থেকে একটি পরিচিত ছায়া ধীরে ধীরে ওর দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে সে ভাবে—শুধু ছায়া। তবে যত কাছে আসে, মনে হয়, ছায়ার ভেতর মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, মৃত। অমর কাকা বলে হরিবনের আত্মা জেগে উঠেছে। মৃত মানুষটির চোখ খোলা, মুখ নিঃশব্দ। সে এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। এরপর হরিবনের হাত ধরে গ্রামের দিকে হাঁটতে থাকে।
অমর কাকা  ফিসফিস করে বলেন,“ফেরার সময় ওরা শুধু দেহ নয়। মৃত আত্মার ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয় নিয়ে আসে। 
নীলয়ের গা হিম হয়ে আসে। গ্রামে  মৃত মানুষ ফিরেছে। পদচারণার সঙ্গে লাল ছোপ আছে—রক্তশালিকের চিহ্ন। মৃতদের শরীরে দাগ, লাল ছোপ, এবং অদ্ভুত রেখা মিশে আছে। যারা আগের রাতের রক্তশালিকের শিকার হয়েছে, তাদের পিছু নেয় ফেরার ছায়া। কেউ চিৎকার করে না। কেউ দৌড়ে পালায় না। কারণ মৃতরা শব্দে নয়, শুধু উপস্থিতি দিয়ে মনকে চেপে ধরে।
নীলয় বুঝতে পারে—মৃত মানুষ শুধু ভয় দেখাচ্ছে না,সাথে পথ দেখাচ্ছে। যারা মৃতদের সাথে একত্রিত হয়, ওরা শিখে যায়—নিরাপদ থাকা মানে নিয়ম মানা, নাম উচ্চারণ না করা, তালা দেওয়া।
এক রাতে, গ্রামে একজন শিশুর বাবা তালা দিতে ভুলে যায়। রাতেই শিশুর ঘরে ঢোকে মৃত মানুষের ছায়া। শিশু কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু বাবার মন জ্বলে ওঠে। ছায়া ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে লাল ছোপের মতো দাগ তৈরি করে। বাবা উপলব্ধি করে এটি রক্তশালিকের চিহ্ন নয়, মৃত মানুষের ফেরার পরীক্ষা।
দীনু গোঁসাই বলেন,“মৃতরা ফিরে আসে শুধু শাস্তি দিতে নয়। তারা ভয়ের ভিতর পাঠ দিয়ে শিক্ষা দেয়। যে নিয়ম মানে, তার ক্ষতি হয় না। যে ভুল করে, তার দাগ, ছায়া, এবং দমনশীলতা সবই মিলিত হয়ে যায়।” সেদিন ওই শিশু এবং বাবা উধাও হয়ে যায়।গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করে—মৃত মানুষের ছায়া একে একে বাড়ছে। তারা নদীর ওপর দিয়ে আসে, শালবনের নিচে চলে যায়, ঘরের উঠোনে অবস্থান নেয়। ছায়াগুলো সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ধীরে ধীরে নীলয় বুঝতে পারে—মৃত মানুষ ছায়া গণনা করছে, মুখবিহীনদের পদচারণার মতো। ওরা শান্তি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে।
নীলয় বুঝে রক্তশালিক এবং মুখবিহীনরা একসঙ্গে মিলিত হলে, মৃত্যু ও ছায়ার ভয় এক হয়ে যায়। সে এটা বোঝে লোহিতচাঁদের রাতে ওদের ফেরত আসার সম্ভাবনা সবসময় থাকে।

চূড়ান্ত অন্ধকার
অরুণপুরে রাত আসে ভয় নিয়ে। তবে এই রাতটা আলাদা। আগের সব রাত—ছায়ার পদচারণা, মুখবিহীনদের সংখ্যা, রক্তশালিকের লাল ছোপ, মৃত মানুষের ফেরত—সব কিছু মিশে এক চূড়ান্ত অন্ধকারে ঢুকে গেছে।
চাঁদ নেই, বাতাস স্থির, নদী নিঃশব্দ। শালবনের ছায়া এত দীর্ঘ যে তা নদীর ওপারে পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে। গ্রামের ঘরগুলো অন্ধকারের ঢেউয়ে ঢেকে গেছে। কেউ বাইরে দেখার সাহস রাখে না। কেউ নাম উচ্চারণ করে না।
মৃত রমেশ নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। শালবনের ভিতর লাল ছোপ, মুখবিহীন ছায়া, মৃত মানুষের অদৃশ্য পদচারণা, সব মিলিয়ে একত্রিত হয়ে ভয়ঙ্কর ছায়ার জাল তৈরি করে। মনে হয়, এই জাল গ্রামের সবাইকে একসাথে খুঁজে বের করছে।
একটা শিশুর কান্না ভেসে আসে। মুহূর্তে ঘরের সব আলো নিভে যায়। গ্রামের মানুষের হৃদয় একই সঙ্গে ধড়ফড় করে ওঠে। কেউ বুঝতে পারে না—নদী, শালবন, ঘর—সব কেমন অন্ধকারে মিলেছে।
দীনু গোঁসাই ফিসফিস করে বলে,
“এটাই চূড়ান্ত অন্ধকার। যেখানে ছায়া, দাগ, পদচারণা, লাল ছোপ—সব একত্র হয়। যারা শেষ পর্যন্ত নিয়ম মানবে না, তারা হারাবে। যে হারাবে, তার নামও হারাবে।”
গ্রামের কেউ বাইরে যায় না। তবে বাইরে যারা রয়েছে—যুবক, কাঠুরিয়া, জেলে—তাদের উপর অদ্ভুত চাপ। মৃত মানুষের ছায়া ধীরে ধীরে নদীর ধারে এবং শালবনের ভিতর গণনা শুরু করে। ধীরে ধীরে ওরা ছায়ার সঙ্গে মিশে যায়। রক্তশালিকও উড়ে বেড়াচ্ছে—লাল পালক ঝাপসা হয়ে ভয় ছড়াচ্ছে।
হঠাৎ এক যুবক যার নাম শামীম অনুভব করে—শালবনের ভিতর অদ্ভুত ধ্বনি হচ্ছে। বাঁশির সুর নেই। মনে হয়, ছায়া চিৎকার করছে। ধীরে ধীরে, ছায়া নদীর ওপর চলে আসে। মুখবিহীনদের পদচারণা ওর চারপাশে ঘূর্ণায়মান। মৃত মানুষেরা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ফেলে। সে নদীতে স্নান করতে গিয়েছে।মধ্য দুপুরে সূর্য যখন তাপ ছড়াচ্ছে তখন এই ঘটনা ঘটে। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে—চূড়ান্ত অন্ধকার শুধু রাতেই নয়, এটি সব সময়ের ভয়ের সমাহার। দাগ, লাল ছোপ, পদচারণা, গণনা, মৃত মানুষের ছায়া—সব মিলিয়ে এক বিশাল অদৃশ্য শক্তি তৈরি করেছে।
রাত্রির মধ্যবর্তী সময়, নীলয় জানালার ফুটো দিয়ে দেখে রমেশের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। তার হা বিশাল হয়ে উঠছে। মনে হয় সমস্ত বন এর ভেতর ঢুকে যাবে।
হঠাৎ নদীর ধারে লাল ছোপ ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, রলক্তশালিক প্রমাণ দিচ্ছে—চূড়ান্ত শৃঙ্খলা না মানলে অন্ধকার ধরে রাখবে। ছায়াগুলো নদীর উপরে, ঘরের উঠোনে, শালবনের ভিতরে একত্রিত হয়ে গ্রামের মানুষকে পরখ করতে এগিয়ে আসছে। নীলয় ধীরে ধীরে অনুভব করে—ভয় ওর শরীরে প্রবেশ করছে।
অমর কাকা টের পেয়ে দ্রুত জানালার ফুটো বন্ধ করে দেন। নীলয়ের চারপাশে আগুনের তাপ সৃষ্টি করে তাকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রাখেন। নীলয়ের শরীর হালকা হতে থাকে। ওর মনে হয় সে ভয়মুক্ত। হঠাৎ ভারমুক্ত হওয়ায় খুব অবাক হয়। অমর কাকা নিশ্চিন্ত হন নীলয়কে সুস্থ হতে দেখে।নীলয় বলে ,কাকা, গ্রাম অভিশাপ মুক্ত করার উপায় পেয়েছি মনে হচ্ছে। কাকাকে অবস্থা জানালে তিনি বলেন, "চূড়ান্ত অন্ধকারে সব ভয় একত্র হয়। পাখি, ছায়া, মৃত মানুষ, সংখ্যা—সব মিলিয়ে ওরা পরীক্ষা নেয়। যারা শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে, বেঁচে যাবে। যারা ব্যর্থ হবে, তাদের নাম, আত্মা, শ্বাস—সব হারাবে।”

ভোর হয়ে আসে। প্রতিটি পদচারণা, দাগ, ছায়া—সবই ভয়ঙ্কর শক্তি হিসেবে কাজ করে। নদীর ধারে অল্প আলো ছড়ায়। শালবনের ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মৃত মানুষের ছায়া অদৃশ্য হয়ে যায়। রক্তশালিক উড়ে চলে যায়। মুখবিহীনদের গণনা শেষ হয়। চূড়ান্ত অন্ধকার কিছুটা হালকা হয়।
তবে গ্রামবাসীরা জানে—পরবর্তী লোহিতচাঁদের রাতে আবার শুরু হবে। চূড়ান্ত অন্ধকার সবসময় অপেক্ষা করে। শুধুমাত্র যারা নিয়ম মেনে চলে, বেঁচে যায়। যারা ব্যর্থ হয়,  হারায়—নাম, আত্মা, হৃদয় সবকিছু।

১৯ রক্তশালিকের রাত
ভোর হয়ে আসে, শালবনের ভেতর অদৃশ্য ছায়া মিলিয়ে যায় নদীর ধারে। বাতাস স্থির, কিন্তু স্থিরতার মধ্যে ভয়কে বোঝা যায়। নীলয় আর দেরী করে না। অমর কাকাকে নিয়ে দৌড়ায় দীনু গোঁসাইয়ের বাড়িতে।
রাতের সবকথা খুলে বলে। নীলয় বলে উপায় পেয়েছি গ্রামকে মুক্ত করতে। এরজন্য অনেক মূল্য চুকাতে হবে।পূর্বপুরুষের পাপের মূল্য।সে তার পরিকল্পনা জানায়।গ্রামের সকল মানুষকে একত্র করে।সে জানায় অদৃশ্য, ছায়া, রক্তশালিক সবগুলোকে বনের ভেতর এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। সব একত্র  হলে বনের চারপাশে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে।এরা আগুনকে ভয় পায়। গ্রামের একজন মধ্যবয়স্ক লোক বলে উঠেন, আগুন জ্বালাতে লাকড়ি দরকার। এত লাকড়ি কোথায় পাব? অমর কাকা বললেন,সবাই দেবে লাকড়ি।যার ঘরে যত লাকড়ি আছে সব নিয়ে যেতে হবে বনে।এইসব লাকড়ি বনের চারপাশে রেখে আসতে হবে।অমর কাকার বউ বিন্দুবালা বললেন,দিনের বেলায় আমরা সবাই দলবেঁধে বনে যাব।বন থেকে শুকনো কাঠ, খড়ি,পাতা কুড়িয়ে বনের চারপাশে রেখে আসবো।যতদিন কাঠ,লতাপাতায় বন ঢেকে না যাবে ততদিন আমরা এগুলো সংগ্রহ করতে থাকব।নীলয়ের কথাটি পছন্দ হয়।দীনু গোঁসাই বলেন,বনকে না হয় আগুন দিয়ে অভিশাপ মুক্ত করবে কিন্তু গ্রামের কী হবে? ওরাতো গ্রামেও পদচিহ্ন রেখে গেছে। নীলয় বুঝে যায়।সে বলে,যেদিন বনে আগুন দিব সেদিন গ্রামের প্রতিটি ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হবে।ভস্ম করে ফেলা হবে সব পুরাতন চিহ্ন। কিছুই রাখবো না।শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে রেখে আসতে হবে। গ্রামের বিত্তবানেরা পেট্রোল কেরোসিনের ব্যবস্থা করবে। বনে আর গ্রামে সাহসী মানুষ থাকবে। শিশু আর নারীরা সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি। পোড়া গ্রাম ধুয়ে মুছে অভিশাপ মুক্ত করে তোলা হবে। যারা স্বচ্ছল গৃহস্থ ওরাই গরীবদের সাহায্য করবে নতুন বাড়ি গড়ার জন্য। গ্রামে শোরগোল ওঠে।কেউ বাড়িতে আগুন দিতে রাজী নয়।দীনু গোঁসাই হুঙ্কার ছাড়ে। তাহলে মরো গিয়ে তোমরা।আর কখনো আমার কাছে  আসবে না।আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাই।আমার সংসারে কেউ নেই।এই গ্রামে না থাকলে কিছুই আসবে যাবে না।গ্রাম তোমাদের। তোমাদের জন্য ফিরে এসেছি।আমি চললাম।
আরেকজন বয়স্ক লোক বলেন,"সামর্থ্য লোকেরা সাহায্য করবে কেন? নীলয় করুক। ওর দাদার কারণেই এই অবস্থা। ওকে বলেন সব ব্যবস্থা করতে।সেদিন যদি ওর দাদার বাবা হরিনাথ মুখার্জি অনুমতি না দিত তবে ষণ্ডা পাণ্ডারা কি সাহস পেত বয়স্ক গাছগুলো কাটার?আজ বনদেবতার অভিশাপ আমাদের ওপর,তা কি ওর দাদার বাবা  হরিনাথ মুখার্জী মশায়ের জন্য নয়?"
অমর কাকা বলেন,দেখেন আপনাদের কথা ঠিক আছে।কিন্তু এইজন্য মুখুজ্জ্যে মশায়কে মূল্য চুকাতে হয়েছে জীবন দিয়ে।পুরো বংশ নির্বংশ হয়ে গেছে। ওরাতো কেউ বেঁচে নেই। শুধু নিলয় বেঁচে আছে ওর মামার জন্য। তিনি এসে ওকে নিয়ে চলে যান বলে। সে আজ এখানে কেন? আপনাদের জন্যই। না হলেতো এই গ্রামে ওর আসার দরকার নেই। সে কীভাবে এসেছে আপনারা কি জানেন? ওকে আমি আনিয়েছি।অনেক কাকুতি মিনতি করে। গ্রাম থেকে একের পর এক মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রাম। শেষে পানিমাতার আশ্রয় নিলাম। পানিমাতা মন্ত্র ফুঁকে বললেন, মুখুজ্জ্যে মশায়ের কোন বংশধরই পারবে এই অভিশাপ থেকে গ্রাম এবং বনকে রক্ষা করতে। ওর রক্ত লাগবে রক্ত শালিকের তৃষ্ণা মেটাতে। কিন্তু রক্তশালিককে কীভাবে সামনে আনা যায় এই ব্যাপরটাই এতদিন খুঁজে চলেছে সে।কোন উপায়ই  পাচ্ছে না।শেষে গতরাতে ভয় পেয়ে যখন কুঁচকে যাচ্ছে আমি ভয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম।কারণ,সেও তার নাম ভুলে যেতে বসেছে।দ্রুত আমি এবং ওর বিন্দুকাকী মিলে চারিদিকে আগুন ধরিয়ে দিই।আগুনের কুন্ডলীতে পড়ে সে তার নাম মনে করে এবং ভয়মুক্ত হয়।তখনই নীলয় পেয়ে যায় গ্রাম অভিশাপ মুক্ত করার কৌশল। নীলয় এখানে এসেছে ওর মামা মামী কেউ জানে না।ওরা জানে সে ভার্সিটির হলে আছে। এদিকে নীলয় আসার পর দীনু গোঁসাইকে নিয়ে আসি। আপনারা জানেন মুখুজ্জ্যে মশাইয়ের কোন বংশধর বেঁচে নেই।একমাত্র নীলয় ছাড়া। সে আসার পর সব রক্তশালিক, ছায়া মানুষগুলো হন্যে হয়ে ওকে খুঁজছে।গ্রাম চষে বেড়াচ্ছে তাকে মেরে ফেলার জন্য। ওরা জনে নীলয়ের হাতে ওদের বিনাশ হবে।তাই ওকে ধরার জন্য ওরা সবাই জেগে উঠেছে। আজ আমাদের জন্য ওর জীবন বিপদের মুখে। এখন আপনারা বলেন তাকে সাহায়্য করবেন?  যদি না করেন তবে তাকে আমি চলে যেতে বলি।আর দীনু গোঁসাইয়ের কথা তো শুনলেন। সেও চলে যাবে। এতদিন পানিমাতা জীবিত ছিলেন সেই ভরসায় গ্রামে ছিলাম। এখন তিনিও নেই, আমিও চলে যাব এই গ্রাম ছেড়ে। এত মৃত্যুভয় নিয়ে এখানে থাকা সম্ভব না।আমি গ্রামটাকে বাঁচানোর জন্য  একটা শেষ চেষ্টা শুরু করেছিলাম।এখন তোমরা যখন একেকজন একেক কথা বলছো তাহলে আমার আর করার কিছু নেই। থাকো তোমরা গ্রামে।" অমর কাকা থামলেন। গ্রামে গুঞ্জন শুরু হলো। এক বৃদ্ধা মহিলা বলেন,ওই মিয়ারা, অমর ঠিকইতো বলেছে। এই যে এতক্ষণ কথাগুলো বললো সে কার জন্য? এই যে ছেলেটা আসলো ওর জীবনতো আরো বিপদে আছে।সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে সে তোমাদের বাঁচাতে আসছে আর তোমরা এতটুকু করতে পারবে না? বৃদ্ধের কথায় সবাই সায় দিল।সিদ্ধান্ত হলো নীলয়,অমর কাকা, দীনু গোঁসাই যা বলবে তাই হবে। শুরু হল নতুন কর্মযজ্ঞ। 

কর্মযজ্ঞের রাত
 আজ রাতটি আলাদা।আকাশে লোহিতচাঁদ উদিত হয়েছে। লাল আলো নদীর ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।আজ রাতেই মুক্তির সূচনা ঘটবে।
এটি রক্তশালিকের রাতও। আজ রাতেই গ্রামের নিয়ম, অভিশাপ, ছায়া, লাল ছোপ, মৃত মানুষের ফেরত সব একত্রিত হয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
নীলয় এবং গ্রামের সাহসী যুবকরা দুইদলে ভাগ হয়েছে। একদলে প্রায় পাঁচশো যুবক ও মুরব্বী শ্রেণির লোক গ্রামে রয়েছে। হাতে মশাল আর কেরোসিনের ডিব্বা নিয়ে তৈরী। রাতে বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ। তবুও ওরা জানের মায়া ছেড়ে মশাল জ্বালিয়ে একে অপরকে ধরে গ্রাম বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে । ওরা বনের দিকে নজর রাখছে। ওখানে আগুন জ্বলতে দেখলেই গ্রামের প্রতিটা ঘরে আগুন দেয়া হবে। গ্রামের সব নারী শিশুদের পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে স্বজনদের বাড়ি প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র দিয়ে। নীলয়, অমরকাকা,দীনু গোঁশাই  এবং আরো হাজার হাজার যুবক, বয়স্করা বনে। রক্তশালিককে বের করে আনতে হবে। দীনু গোঁশাই আগেই বলে রেখেছেন এরজন নীলয়ের শরীর কেটে রক্ত বের করে বনের ভেতর যে গুহা ওটায় ছিটিয়ে দিতে হবে। রক্তের গন্ধ পেলেই বের হবে রক্তশালিক। নীলয়ের মনে পড়ে পানিমাতার কথা।তিনি বলেছিলেন তার রক্তে অরুণপুর অভিশাপ মুক্ত হবে।  সে রক্ত দিতে এগিয়ে আসে। যুবকেরা বন ঘিরে ফেলে। অমরকাকা,দীনু গোঁসাই, নীলয় সুড়ঙ্গপথে দাঁড়ায়। নীলয়ের হাত চিড়ে দেয় দীনু গোঁসাই। রক্ত ছড়িয়ে পড়ে  সুড়ঙ্গপথে।
ওরা  দেখতে পায়—শালবনের ভেতর এক অদ্ভুত গভীর সুড়ঙ্গপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। তাতে মুখবিহীন ছায়া চলাচল করছে। ওদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। মুহূর্তেই নীলয়ের শরীরের ওপর ঝাপটাতে থাকে অসংখ্য রক্তশালিক। লাল আগুনের ডানা খসে পড়ছে নীলয়ের গায়ে।মৃত ছায়ারা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সুড়ঙ্গপথে। দীনু গোঁসাই জোরে চিৎকার দিলেন আগুন জ্বালো।গ্রামবাসীরা আগেই লাকড়ির স্তূপে কেরোসিন পেট্রোল ঢেলে রেখেছে।নির্দেশ পাওয়া মাত্র আগুন জ্বেলে দিল।মুহূর্তেই বনের চারিদিক আগুনের দাউদাউ শিখা ঘিরে ফেলে।বনের আগুন দেখে গ্রামের মানুষ তাদের বাড়িঘরে দিল আগুন।আগুন জ্বলছে বনে, আগুন জ্বলছে গ্রামে। দেখা গেল বনের প্রতিটা গাছের গোড়ায় সুড়ঙ্গ। এগুলো ফেটে অসংখ্য মৃত ছায়া বের হয়ে আসছে। এগুলোর গগন বিদারী চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।নীলয়কে টেনে গুহায় নিয়ে যাচ্ছে মুখবিহীন ছায়া।অমর কাকা চিৎকার করছেন নীলয়ের জন্য আগুন জ্বালো। সাথে সাথে ওদের সাথে থাকা লোকজন মশালে আগুন দিয়ে নীলয়কে ঘিরে নিয়েছে। রক্তশালিকের আঁচড়ে নীলয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। রক্তশালিক ওর মাথার চুল ছিঁড়ে নিয়েছে।গালের দুই পাশে আঁচড়।ঘাড়ের মাংস খুবলে তুলে নিয়েছে। দীনু গোঁশাই চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন।তিনি আগুনের কুণ্ডলীর ভেতর বসে ধূপ ছিটাচ্ছেন। তার মাথার ওপর অনেক রক্ত শালিক ডানা ঝাপটাচ্ছে। ডানা থেকে পালক ঝরে আগুনের তাপে গলে গলে পড়ছে।একটা পালক ঝরে তো একটা মুখবিহীন ছায়া ধোঁয়ার মত হয়ে অদৃশ্যে মিলে যাচ্ছে। এদিকে অমর কাকাকে একটি মুখবিহীন ছায়া পেঁচিয়ে ধরে।অমর কাকা চিৎকার করতে পারছেন না।একটি যুবক অমর কাকার গলা বরাবর মশাল ছুঁড়ে মারে। আগুন দেখে ছায়া ধোঁয়ার মত মিলে যায়। সারাবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।ধোঁয়ার দাপটে লোকদের হাতে মশাল টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হচ্ছে। এদিকে বনের চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে চিৎকার আসছে। মুখবিহীন ছায়াগুলো ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে কিছুতেই বের হতে না পেরে আগুনের স্পর্শে এসে ধোঁয়ায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।নীলয় ক্ষতবিক্ষত। নীলয়ের অবস্থা দেখে অমর কাকা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। ওর যদি খারাপ কিছু হয়? এই গ্রামকে বাঁচাতে হলে নীলয়কে বেঁচে থাকতে হবে।রক্তশালিক ওর হাতে ধরা দেবে।ওই সেই শালিককে আগুনে নিক্ষেপ করবে।তারপরই মুক্ত হবে সবাই।অমর কাকা নীলয়কে, বলেন, ওঠো বাবা ওঠো।চোখ মেলো। রক্ত শালিক তোমার মাথার ওপর উড়ছে।ওকে ধরো। নীলয় নড়ার শক্তি পাচ্ছে না।ঘাড় থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।হাতের রক্ত এখনও বন্ধ হয়নি।মাথার চুল ছিন্নভিন্ন।কয়েকজন যুবক ধরে তাকে দাঁড় করায়।সে তাদের গায়ের ওপর ঝুলে পড়ে। সে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কয়েকশো রক্তশালিক তার রক্ত খাওয়ার জন্য ঘাড়ের চারপাশে উড়তে থাকে।আগুনের শিখার জন্য ওকে ঠোকরাতে পারছে না।একজন যুবক বুদ্ধি করে একটি মশাল সরিয়ে ফেলে।আগুন না পেয়ে সে নীলয়কে ঠোকরাতে আসে।অমনি যুবকটি লাফ দিয়ে ওর দুইহাত দিয়ে যতটা পেরেছে রক্তশালিকদের ধরে ফেলে।ধরেই নীলয়ের হাতে দিয়ে বলে আগুনে ছোঁড়ো নীলয়! নীলয় গাছে ঠেস দিয়ে রক্তশালিকগুলো আগুনে ছুঁড়তে থাকে। যুবকটি একের পর এক ধরছে আর নীলয় সেগুলো আগুনে ছুঁড়ছে। এভাবে ছোঁড়ার পর বনে গর্জন হতে থাকে।বনের চিৎকারে সবাই ভয় পেয়ে যায়।অমর কাকা সাবধান করেন,কেউ ভয় পাবে না।এটাই রক্তশালিকের  শেষ অস্ত্র ভয় দেখানো।তোমরা যদি কেউ ভয় পাও তাহলে আমাদের মৃত্যু অবধারিত। তোমরা আগুনের শিখা বাড়াও।আমরা লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে আছি।অমর কাকার নির্দেশে গ্রামবাসী আগুনের ওপর আরো কাঠ দিয়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়।দাউদাউ আগুনে জ্বলতে থাকে বনের চারপাশ।চারিদিকে ধোঁয়ার কুন্ডলী পাক খেয়ে খেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।যত আগুন বাড়ছে তত ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে চারপাশ। বজ্রপাতের মত গর্জন তুলে শালবনের বিশাল বৃক্ষটি মাঝখান দিয়ে ফেটে যায়। ডাল চিড়ে বের হয়ে আসে বড় রক্তশালিক। তার দুটি ডানা গাছের চূড়া সমান লম্বা। চোখহীন মুখাবয়বে লাল লাল ছোপ। সারা শরীরে লম্বা লম্বা দাগ।সে বের হয়ে হুঙ্কার ছাড়ে। বলে, আজ তোদের সবাইকে মরতে হবে। বনে তোরা আগুন দিয়েছিস সেই শাস্তি পাবি। হুঙ্কারে বনে কম্পন উঠে।দীনু গোঁসাই মন্ত্র পড়ে আগুন থেকে বের হয়ে এলেন।তার হাতে গরম ছুরি।নীলয়ের বুকের রক্ত দরকার। নীলয় শুনে বলে তার বুকের চামড়া কেটে নেয়া হোক। অমর কাকা কাঁদছেন। নীলয় গোঙাতে গোঙাতে বলে, পরে কেঁদো কাকা।আগে এটাকে শেষ করতে দাও। অমর কাকা নীলয়ের শার্ট খুলে বুক বের করলেন।এরপর নীলয়ের বুক থেকে রক্ত বের করে ছুরিতে মেখে নীলয়ের হাতে তুলে দিলেন।নীলয়ের নড়াচড়ার শক্তি নেই।কয়েকজন মিলে তাকে রক্তশালিকের সামনে নিয়ে যায়।নীলয়কে দেখে রক্তশালিক বলে, এসেছিস তাহলে। রক্তশালিক তার বিশাল পায়ের থাবায় নীলয়কে তুলে নিয়ে উড়াল দেয়।নীলয় রক্তশালিকের পায়ে ঝুলতে থাকে। পায়ের থাবা থেকে কোনরকম মাথা উঁচু করে ওর বুক খুঁজতে থাকে। এরপরই হাতে থাকা রক্তমাখা ছুরিটি বসিয়ে দেয় রক্তশালিকের বুকে। মুখুজ্জ্যে বাড়ির শেষ বংশধর নীলয় মুখুজ্জ্যের রক্তের ছোঁয়ায় রক্তশালিক ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে মাটিতে এসে পড়ে।সাথে সাথে দীনু গোঁশাই,অমর কাকা তাদের হাতের মশালের আগুনে পুড়িয়ে দেয় রক্তশালিককে।মুহূর্তেই সমস্ত বন কাঁপিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে আকাশের ওপর মিলিয়ে যায়। আর অমনি শত শত হাজার হাজার রক্তলাল পালক বনের ওপর উড়তে উড়তে আগুনে পড়ে মিলিয়ে যায়। এরপর বনের সুড়ঙ্গ মিলিয়ে যায়।
নদীর ওপরে যে কালো ছায়া ছিলো তা হাওয়ায় মিশে আলোর  বিভা ফুটে ওঠে।ভোর হয়ে আসে।
রক্তশালিকের রাত শেষ হয়েছে। গ্রামবাসীর সাহস আর নীলয়ের শৃঙ্খলা ছাড়া  এই রাত শেষ হওয়া সম্ভব ছিলো না। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। শালবন নিঃশব্দ, নদী শান্ত। অরুণপুরে নতুন আশা এবং মুক্তির বাতাস আসে। অশুভ আত্মাদের বিতাড়িত করে গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করায় সারা গ্রামে আনন্দের রোল ওঠে। নীলয়কে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।গ্রামের যুবকরা তাকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে তোলে।প্রচুর রক্তক্ষরণে মৃত্যুর দোরগোড়ায় চলে যায় সে। তার এই আত্মত্যাগ এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ায় গ্রামবাসী কৃতজ্ঞতায় মাথা নোয়ায়।তাদের বাড়িঘর পুড়ে গেছে। বিশাল ধ্বংসস্তুপের মাঝে দাঁড়িয়েও ওদের কোন আফসোস হয় না।ওরা বলে,নীলয়ের এই ত্যাগের কাছে আমদের এইসব ক্ষতি অর্থহীন।সে আমাদের বাঁচিয়েছে।গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করেছে।
এভাবেই রক্তশালিকের রাত অতিক্রম করে মাথা তুলে দাঁড়ায় অরুণপুরের মানুষ। 

অভিশাপ থেকে মুক্তি
দীনু গোঁশাই বললেন,বনদেবতার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। না হলে লোহিত চাঁদের রাত থেকে আমরা সম্পূর্ণ মুক্তি পাবো না। এর জন্য একশো রকমের ফুল,পবিত্র জল,আর সুগন্ধি ফুলের গাছ নিয়ে বড় শালগাছের শেকড়ের কাছে রেখে আসতে হবে।পবিত্র জল গাছের শেকড়ে ঢেলে আসতে হবে।ফুলগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে।আর পাশেই রোপন করে দিতে হবে কামিনী ফুল গাছ। যতদিন গাছে ফুল না আসবে ততদিন শালগাছ ও কামিনী ফুল গাছের গোড়ায় জল ঢালতে হবে। বনদেবতা ফুলের গন্ধ ভালবাসেন। যতদিন ফুলের ঘ্রাণ থাকবে বনদেবতা আমাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন। একটি গাছও কাটা যাবে না। কেউ যদি বনে গাছ কাটতে আসে গ্রামবাসী সবাই মিলে প্রতিহত করবে।
নীলয় সুস্থ হয়ে ওঠে। ওর মামা মামী ছুটে আসেন।নীলয়ের এই অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেন,আবার আনন্দিতও হন রক্ত আর আঘাতের বিনিময়ে সে গ্রামকে অভিশাপ মুক্ত করেছে। নিজের বাস্তুভিটায়ও  ফিরে আসতে পারবে। বিগত বছরগুলোতে যারা রক্তশালিকের কারণে প্রাণ হারিয়েছে সবার আত্মার শান্তি চেয়ে প্রার্থনা করা হয়।প্রার্থনার দিন গ্রামবাসী চাঁদা তুলে ভোজের আয়োজন করে।পাশের গ্রামের মানুষদের নিমন্ত্রন করা হয়। যারা ভয়ে কখনো এই গ্রামে ঢুকত না।  সবাই সবাইকে সহযোগিতায় গ্রামের সংস্কার করে।
অরুণপুরে শান্তি ফিরে আসে।  অদৃশ্য শক্তি, ভয় এবং অভিশাপ—সব গ্রামের মানুষদের ওপর থেকে সরে যায়। 
গ্রামের বুড়োরা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হাসে। ওরা জানে—রক্তশালিকের অভিশাপ আর কারো ওপর প্রভাব ফেলবে না। ওরা চোখে চোখ রেখে বলে—“ যারা সত্যি সাহসী এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ, তাদের জন্য আজ গ্রাম বেঁচে গেল।  আজ থেকে আর কোনো বিপদ নেই।”
নীলয়ের যাবার সময় ঘনিয়ে আসে। অরুণপুরকে সমস্ত অদৃশ্য ভয়, রক্তশালিকের অভিশাপ, লাল ছোপ এবং মুখবিহীন ছায়া থেকে মুক্ত করে সে সবার থেকে হাসিমুখে বিদায় নেয়। প্রতিটি ভয়, ছায়া ও রহস্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটিয়ে সে গ্রামের মানুষের ভক্তি ও ভালবাসা নিয়ে প্রস্থান করে নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.