ভাগ্যিস মোবাইল ফোনটি কারো হাতে পড়েনি!
কিন্তু মায়ের হাতে পড়তে পারত। রাতে মোহগ্রস্ত হয়ে ঘণ্টাখানেক কথা বলে স্বপ্নসমুদ্রে ডুবে ডুবে কখন যেন ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিল আফরিন। রাত জাগার কারণে সকালে বেশ কয়েকবার মায়ের ডাকাডাকির পরও ঘুম থেকে উঠতে পারছিল না। প্রাইভেট থাকার কারণে সকালের ঘুম কিছুতেই প্রশ্রয় দেন না সাহিদা বেগম। কলেজে ক্লাস ফাঁকি মেনে নিলেও প্রাইভেট কামাই একেবারেই সহ্য হয় না তার।
কখনো প্রাইভেট পড়া বন্ধ গেলে সাহিদা বেগম জ্বলে ওঠেন, এতগুলো টাকা দিয়ে পড়াই- টাকার কোনো দাম নাই! দিন প্রতি কত টাকা যায়- হিসাব আছে?
কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছেই করে না আফরিনের। উঠি উঠি করেও আবার কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। আবার সাহিদা বেগমের ডাকাডাকি শুরু হয়।
আফরিন... আফরিন...।
উম...ম...ম...
ওঠ্, ওঠ্ বলছি। একটা দিন শান্তি দেবে না মেয়েটা।
মায়ের বকা-ঝকায় ঝটপট বিছানা ছাড়তে হয় আফরিনকে। দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে হালকা মেকাপ করে বের হতে যাবে, অমনি মা চেঁচিয়ে ওঠেন।
কই কিছু খেয়ে যাবি না?
না, দেরি হয়ে যাবে।
এখনো অনেক সময় আছে। একদম দেরি হবে না।
এত সকালে একদম খেতে ইচ্ছে করছে না মা।
আমি যে কষ্ট করে খুব ভোরে উঠে রান্না করলাম তার কী হবে?
একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। কী করব বলো মা!
তুই লক্ষ্মীটি হয়ে একটু সময় বোস, আমি খাইয়ে দিই।
তার চেয়ে কিছু টাকা দাও, প্রাইভেট পড়া শেষে খেয়ে নেবো।
রোজ রোজ বাইরের খাবার খেলে অসুখ করবে। তাছাড়া প্রতিদিন এত টাকা কোথায় পাই?
হয়েছে হয়েছে। দিতে হবে না। মুখ গোমড়া করে থাকে আফরিন।
সাহিদা বেগম বলে, তোর বাবার একার চাকরির টাকায় সংসার চলছে, তোর লেখাপড়া চলছে, এতগুলো প্রাইভেট, বাড়িটা করতে গিয়ে টাকা-পয়সা প্রায় শেষ। তোর বাবার ইচ্ছা তোকে মেডিকেলে পড়াবে। পাবলিকে না হলেও অন্তত প্রাইভেটে। মেডিকেল কোচিং-ভর্তির জন্য আগে থেকেই টাকা জমাতে হচ্ছে। সব দিকেই তো নজর দিতে হবে। একটু বুঝবি না তুই?
যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
প্রাইভেট পড়েই তো কলেজে চলে যাবি; সারাদিন না খেয়ে থাকবি?
আর কী করব?
যাসনে, টাকা নিয়ে যা।
না, টাকা দিতে হবে না। হনহন করে দরজা দিয়ে বের হয়ে যায় আফরিন।
টাকা নিয়ে যা বলছি। অত জেদ ভালো না।
সাহিদা বেগম যতই পেছন থেকে ডাকেন, সে ডাক বড় বড় জেদের দেয়ালে লেগে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। অতঃপর সাহিদা বেগম নিজেই মাতৃত্বের মমতায় হেরে যান। দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে ধরেন।
এই নে টাকা। একশ টাকার একটি নোট মেয়ের হাতের মধ্যে পুরে দেন।
আফরিনের হাসি পায়। বলে, সেই তো দিলে, শুধু শুধু এতগুলো কথা শোনালে।
সাহিদা বেগমের ঠোঁটেও হাসি আসে। বলেন, এখন বুঝবি না, মা হলে বুঝবি।
আফরিনের হাসি থামেই না। সাহিদা বেগম ভাবে, মেয়ে টাকার আনন্দে হাসছে। তাই মেয়ের আনন্দ মায়ের ঠোঁটেও ভর করছে। কিন্তু আফরিন ভাবছে, মাকে কত সহজেই বোকা বানানো যায়!
সাহিদা বেগম বলেন, হয়েছে এবার যা, দেরি হয়ে যাবে। আর মনে করে খেয়ে নিস।
আচ্ছা খেয়ে নেবো মা। আফরিন গেট পেরিয়ে চলে যায়।
একাদশ শ্রেণির ছাত্রী আফরিন। বাসায় একটি স্মার্টফোন থাকলেও নিজের সামান্য একটা বাটনফোনও ছিল না এতদিন। ব্যক্তিগত একটি ফোনের অভাব বোধ করছে কিছুদিন ধরে। ক্লাসের টুশি, বৃষ্টি, পাপড়ির মতো অনেকেরই নিজস্ব ফোন আছে। ওদের জীবনে এখন ভরাকটালের ঢেউ; আকাশজুড়ে রংধুনু; অনবরত রিয়েলিটি শো। একটা ফোনের অভাবে আফরিন বন্ধুদের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফোনের কথা বাবাকে বলার একদম সাহস নেই আফরিনের। মাকে বলেছে কয়েকদিন।
একটা মোবাইল কিনে দাও না মা।
বাসায় তো একট মোবাইল আছে। আবার মোবাইল দিয়ে কী হবে?
ওটা তো বাসায় তোমার কাছে থাকে; জরুরি প্রয়োজনে আমাকে কেউ ফোন দিলে পায় না। কখনো কখনো স্যার অফ টাইমে ক্লাস নেন, প্রাইভেট স্যারও কখনো কখনো পড়ার টাইম ঘোরান স্যার একজনকে জানিয়ে দেন, পরে ফোনের মাধ্যমে সবাই জেনে যায়। আমিই শুধু মিস করে ফেলি। বাসায় পড়তে গিয়ে কিছু না বুঝলে ওরা ফোনে একে অন্যের হেল্প নেয়। আর আমার কিছুই হয় না। এরপর পরীক্ষায় খারাপ করলে তো আমাকেই দুষবে।
ওরা তো তোর আব্বার মোবাইলে ফোন করতে পারে? আমার মোবাইলে ফোন করতে পারে? পড়তে গিয়ে কিছু না বুঝলে তো তোর আব্বারে দেখাতে পারিস। তোর আব্বা বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলো। খুব ভালো ছাত্র ছিলো।
তোমাদের যুগের লেখাপড়া এখন নেই। সব সিলেবাস পাল্টে গেছে। এখন সব সৃজনশীল। বুঝলে সব সৃজনশীল।
সে জন্যই তো এতো টাকা খরচ করে প্রাইভেট পড়ছিস। তারপরও যদি প্রয়োজন হয় আমার ফোন দিয়ে ফোন করে সমস্যা সমাধান করবি। আমি বলেছিলাম, তোর আব্বা কিছুতেই এইচএসসি পাসের আগে ফোন কিনে দেবে না।
আফরিনের কান্না আসে। রাগ ধরে। ক্লাসে সবার ফোন থাকবে, শুধু আমার একটা ফোন থাকবে না! রেজাল্ট খারাপ হলে তখন কিছু বলতে পারবে না। ক্রোধ-কান্নার দ্রবণ মিলিয়ে আফরিন একেকদিন ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
অবশেষে ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে বাসায় কাউকে না জানিয়ে এই বাটন ফোনটি কিনে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যাকে বলে। তা আবার লুকিয়ে লুকিয়ে ব্যবহার করতে নিতে হয় কত কৌশল!
আফরিন ভাবে একটি স্মার্ট ফোন থাকলে কি এভাবে টাকা খরচ করে কথা বলতে হতো!। এত এত প্রযুক্তি চারপাশে, আর মধ্যযুগে পড়ে আছে যেন ও।
সাগরকে আফরিন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। সাগরও আফরিনকে ভালোবাসে তেমনি। সমস্যা হচ্ছে সাগরের বাবা গরিব, দিনমজুর। আফরিনের চাকরিজীবী বাবা কিছুতেই এ সম্পর্ক মেনে নেবে না। তা ছাড়া সাগর কেবল ডিগ্রি প্রথমবর্ষের ছাত্র- লেখাপড়া সমাপ্ত করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে সে অনেক দূরের পথ। কিন্তু এতো সব চিন্তা করে প্রেম হয় না। তীব্র আবেগের কাছে নিরস চিন্তার কোনো মূল্য নেই। যৌবনের জোয়ারে অনিয়ন্ত্রিত আবেগের ঢেউ এলে প্লাবিত হওয়াই যেন পরম শান্তি। প্রতিদিন অন্তত একবার দেখা করা চাই-ই চাই। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হলেও চাই।
যদিও ওদের প্রতিষ্ঠান ভিন্ন। আফরিনের বাবা আমজাদ হোসেন ছেলেদের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য মেয়েকে গার্লস কলেজে ভর্তি করেন। কিন্তু মধুর সম্পর্কের রংধনু কোথা থেকে কোথায় ছড়িয়ে যায় তার কোনো ধারণাই রাখে না আমজাদ সাহেব।
আফরিনের হৃদয়জুড়ে সাগরেরই অস্তিত্ব। আফরিন ভাবে, সাগরেরা গরিব তাতে কি? যার হৃদয়ে এক সাগর ভালোবাসা আছে, তার আর কী প্রয়োজন? ভালোবাসা দিয়েই জয় করে নেবে জগতের সব সংকট।
সাগর ধনী-দরিদ্রের প্রশ্ন তুললেও আফরিন থামিয়ে দেয়। বলে, তুমি লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করবে, আমি সে পর্যন্ত অপেক্ষা করব।
প্রাইভেট শেষে কলেজে আসে আফরিন। আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে। ন’টার ক্লাসে স্যার ঢুকে গেছেন। হাজিরাও হয়ে গেছে হয়তো। ক্লাসে যেতে একদম ইচ্ছে করছে না আফরিনের। সাগরের কথা বারবার মনে পড়ছে। গত দুই দিন ধরে ওর সাথে দেখা হয়নি। ফোনকলে আর প্রাণ ভরে না। তা-ও যদি স্মার্টফোন হতো, ভিডিও কলে দু-একবার দেখা যেত প্রিয় মুখখানি। ভাবতে ভাবতে কমন রুমে ঢুকে আফরিন। না, এখানেও কোনো বান্ধবী নেই, পাপড়ি হয়তো ক্লাসে, কিংবা হয়তো এখনো আসেনি। অথবা নতুন বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। দারুণ অস্থির লাগে আফরিনের। ব্যাগের গোপন জায়গায় লুকানো ফোনটি বের করে সাগরকে ডায়াল করে- ফোন বন্ধ! এবার ভীষণ বিরক্তি আর হতাশা ভর করে আফরিনের চোখে। কিছুই আর ভালো লাগে না এই মুহূর্তে। ভাবছে ক্যাম্পাস থেকে এখনই বেরিয়ে যাবে। ঠিক দশটায় গেট বন্ধ হয়ে যায়, খোলা হয় ঠিক দুটায়। দশটার আগে না বের হলে আর বের হওয়া যাবে না। না, অতটা সময় কিছুতেই বন্দি হয়ে থাকা যাবে না। এখনই বের হতে হবে।
এসব ভাবছিলো আফরিন- হঠাৎ শৃঙ্খলা কমিটির দায়িত্বরত শিক্ষকসহ অধ্যক্ষ মহোদয় কমনরুমে প্রবেশ করেন। উপস্থিত ছাত্রীরা দাঁড়িয়ে যায়। যারা ফোন চালাচ্ছিলো টের পেয়ে আগেই লুকিয়ে ফেলে। কলেজে ফোন চালানো নিষিদ্ধ হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে অনেকে চালায়। ভাগ্যিস কেউ ধরা পড়েনি আজ। আফরিন দুই বার ডায়াল করেই যথাস্থানে লুকিয়ে রেখেছিল।
অধ্যক্ষ একেকজনকে এখন ক্লাস আছে কি না জিজ্ঞেস করেন। কী কী সাবজেক্ট আছে প্রশ্ন করে রুটিনের সাথে মিলিয়ে দেখেন। আফরিনের হৃৎকম্পন শুরু হয়। ভাবে- কী উত্তর দেবো এখন? কেনো যে আসতে গেলাম কমনরুমে? হৃদকম্পন শুরু হয়। ঘামছে আফরিন।
এবার আফরিনের পালা। হঠাৎ অধ্যক্ষের ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করে হ্যালো হ্যালো করে বারান্দায় বেরিয়ে যান।
শৃঙ্খলা কমিটির শিক্ষক আফরিনকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার ক্লাস নেই এখন?
আফরিন অস্পষ্ট স্বরে জি স্যার, জি না, জি না করে।
অধ্যক্ষ স্যার ডাক দিলে তিনি আর স্পষ্ট আফরিনের কথা শুনতে পান না। আফরিনের দিকে না তাকিয়েই ‘আসছি স্যার’বলে দ্রুত কমন রুম থেকে বেরিয়ে যান।
সবাই আবার গল্পে-খেলায় মেতে ওঠে। আফরিন হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। বোতলের ছিপি খুলে পানি পান করে। স্বাভাবিক হয়। কিছুক্ষণের জন্য সাগরের কথা মন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, আবার ফিরে আসে প্রবল বেগে।
কমনরুমে আর দাঁড়ায় না আফরিন। এখনই বেরিয়ে যাবে। সাগরের সাথে আজও দেখা না হলে অসুস্থ হয়ে যাবে ও। হেঁটে হেঁটে শিক্ষক পরিষদের কাছে আসতেই ভেতরে অধ্যক্ষের কণ্ঠ শুনতে পায়।
অধ্যক্ষ অন্যান্য শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলছেন, লক্ষ করছি, ইদানীং ছত্রীরা ক্লাস করতে চায় না, কলেজে আসে না ঠিক মতো, আসলেও কেউ কেউ ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় বা কমনরুমে বসে বসে গল্প করে। ফোনের ব্যবহার বেড়ে গেছে মারাত্মক ভাবে। এ ব্যাপারে আপনাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ওদের ক্লাসের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। অনুপ্রাণিত করতে হবে। ক্লাস আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
একজন শিক্ষক বলেন, স্যার, আমরা তো আকর্ষণীয় ক্লাস নেওয়ারই চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করেও সফল হচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের অভিভাবদের ফোন দিলেও কাজ হচ্ছে না। কিছুতে ওদের ক্লাসমুখী করা যাচ্ছে না।
তবু আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আরো আন্তরিক হতে হবে। ক্লাসের প্রতি আরো আকর্ষণ বাড়াতে হবে।
একজন শিক্ষক কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
আফরিন সব শুনে মনে মনে বলে, কীভাবে আকর্ষণীয় করবেন স্যার? বাইরে যদি এর চেয়ে বেশি আকর্ষণ থেকে থাকে?
সেই চুম্বকীয় আকর্ষণে শিক্ষক পরিষদ পেছনে ফেলে আফরিন হন হন করে গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর পাঁচ মিনিট পরে গেট বন্ধ হয়ে যাবে। গেটে দায়িত্বরত কর্মী বলছে- কোথায় যাচ্ছেন? যাচ্ছেন কোথায়?
আফরিন কণ্ঠে জোর দিয়ে বলে, স্যারের পারমিশন নিয়ে যাচ্ছি। দায়িত্বরত কর্মী ভড়কে যায়, আর আফরিন মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়াল দেয়।
ব্যাগ হতে ফোন বের করে সাগরের নম্বরে ফের ডায়াল করতে করতে রাস্তাটা পার হচ্ছিলো আফরিন, হঠাৎ পেছন থেকে সাগর এসে সামনে দাঁড়ায়। মেঘলা মনের দিনটি মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দুজনের কাছে। তবু আফরিন অভিমান ঝাড়তে কার্পণ্য করে না।
সেই কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি! কোথায় ছিলে? আর ফোন কোথায়? আফরিন যেন রাস্তায় দাঁড়িয়েই কেঁদে ফেলবে।
রাতে তোমার সঙ্গে কথা বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তখনই লো-চার্জ ছিলো, সকালে উঠে দেখি কারেন্ট নেই। সো, ফোনও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে।
আর আমি চিন্তা করে করে মরছি। তোমার আর কী? তোমার তো কোনো ভাবনা নেই।
ভাবনা নেই বলেই তো ক্লাস কামাই দিয়ে পথে পথে খুঁজছি।
পথে পথে খুঁজলেই বুঝি আমায় পাওয়া যায়?
তার তো প্রমাণ সামনেই জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে।
হিরো, এটা কেবল তোমার পথে পথে খুঁজে বেড়ানোর ফল না; ক্লাস আর শিক্ষকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গেট দারোয়ানকে বোকা বানিয়ে আমার বের হয়ে আসারও ফল।
দেখা হওয়ার সব ক্রেডিটটুকু সাগর আফরিনকে দিতে প্রস্তুত। সমুদ্রে ঝাঁপ নয়, পাহাড় ডিঙানো নয়, একশ আটটা নীল পদ্ম এনে দেওয়াও নয়, সামান্য এই স্বীকৃতিটুকুতে যদি প্রিয়ার গোলাপ গালে টোল পড়ে, তবে কোন প্রেমিক তা চাইবে না?
এতক্ষণ খেয়াল হয়নি কারও, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে আর পথচারীরা বাঁকাচোখে তাকিয়ে দেখছে এ দৃশ্য। আফরিনের হঠাৎ নজরে আসতেই ঠোঁটের ওপর আনন্দের রেখাটা যেন রোদে শুকিয়ে যায়।
সাগর বলে, কী হলো হঠাৎ?
দেখতে পাচ্ছ না, লোকজন কীভাবে তাকিয়ে আছে?
একটু নিরিবিলি, একটু আড়ালের সন্ধানে ওরা ছোট রাস্তা ধরে এগোয়। কেউ দেখে ফেলতে পারে এই ভেবে প্রথমে ওরা নিজেদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এগোয়, তারপর লোকজন কমে গেলে একদম পাশাপাশি হাঁটে। হাত ধরে হাঁটার ইচ্ছে হলেও সেই সংকল্প নিভৃত করে। পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে ওরা নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়। ভেঙে পড়া একটা গাছের শেকড়ের ওপর বসে। দুজনের দিকে দুজন তাকিয়ে থাকে। এই তাকিয়ে থাকাতে যেন জগতে অপার শান্তি নেমে আসে। নদীর ঢেউ অনবরত পাড়ে এসে লাগে আর তার ছলাৎ ছলাৎ ছড়িয়ে যায় দুজনের বুকের ভেতর।
সাগর বলে, চোখ বন্ধ করো তো।
কেন? কী হয়েছে?
আহা করো না।
আফরিন চোখ বন্ধ করে।
চোখ বন্ধ করলেও সাগর এক হাত দিয়ে আফরিনের চোখ চেপে ধরে। হতে পারে তা একটু স্পর্শের অজুহাত। অন্য হাত দিয়ে পকেট থেকে গিফ্টবক্সটি বের করে আফরিনের হাতে দেয়।
আফরিন অবাক হয়, এ মা! নতুন ফোন পেলে কোথায়! কবে কিনলে?
তোমার জন্য কিনেছি।
আমার জন্য! এতো টাকা পেলে কোথায়?
পেয়েছি।
আহা, কোথায় পেয়েছ? সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি।
থাক না সে কথা।
তোমাকে বলতেই হবে। না হলে এ ফোন আমি নিতে পারব না।
আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস নেই? এইটুকু জেনে রেখো, আমি চুরি করিনি।
ছিঃ! একি বলছো তুমি?
সাগর পলকহীন চেয়ে থাকে।
আফরিন সাগরের হাত ধরে। ইস! তোমার হাতে কী হয়েছে?
সাগর উত্তর দেয় না কোনো।
আফরিন সাগরের দুই হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে- দুই হাতের তালুতে জায়গায় জায়গায় রক্ত জমে গেছে।
আফরিন উতলা হয়ে ওঠে, বলবে না তুমি? বলো কী হয়েছে?
কদিন একটু শক্ত কাজ করেছি।
কী কাজ?
রাজমিস্ত্রির কাজ।
আফরিনের চোখে জল চলে আসে। এত কষ্ট করে তুমি আমার জন্য ফোন কিনেছ? এই ফোন আমি চাই না।
এই ফোন না নিলে আমার হাতে যে ক্ষত হয়েছে তার চেয়ে বড় বড় ক্ষত বুকের ভেতর ছড়িয়ে যাবে, তা কি তোমার ভালো লাগবে?
আফরিন কাঁদতে থাকে।
সাগর বলে, বাবার একার উপার্জনে আমাদের চলে না, তার ওপর লেখাপড়ার খরচ। মাঝে মাঝে এমনিতেই আমাকে কাজে যেতে হয়। এবার কদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করলাম। পরিশ্রম একটু বেশি হলেও টাকার পরিমাণ বেশি। বিএটা পাস হয়ে গেলে হয়তো কিছু একটি চাকরি পেতাম। সে পর্যন্ত মাঝে মাঝে এমন কাজ আমায় করে যেতেই হবে।
আফরিন সাগরের ক্ষত হাতে আদর বুলিয়ে দেয় আর চোখ বেয়ে ঝরনার মতো জল নেমে আসে।
সাগর বলে, আহা, কেঁদো না তো? এটা দুদিনেই ভালো হয়ে যাবে।
ঔষধ লাগিয়েছ?
এই সামান্য ক্ষতের জন্য ঔষধ লাগাতে হয় না, এমনিই ভালো হয়ে যায়।
হ্যাঁ, এমনিই ভালো হয়ে যায়? এইভাবে নিজেকে কষ্ট দেবে!
তুমি কাঁদছো কেন? এবার থামো তো।
কাঁদব না তো কী করব? তুামি বুঝি খুব হাসির কাজ করে এসেছ?
মানুষ দেখলে কী ভাববে?
দুজনকে একসঙ্গে এখানে দেখলে যা ভাববে তার চেয়ে আর কতোটুকু বেশি ভাববে?
তবু কান্না থামাও। আমি তোমার কান্না সহ্য করতে পারি না।
ফোন না কিনে টাকাগুলো বাসার কাজে লাগাতে পারতে।
তুমি বোঝো না কেন, তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে আমার আরো বেশি কষ্ট হয়! এই সব ক্ষত সে কষ্টের কাছে কিছুই না। ফোনকলে অনেক টাকা চলে যায়, তাছাড়া তুমি তো সবসময় ফোন রিসিভ করতে পারো না। চাইলেই তো তোমায় দেখতে পাই না। এখনই ফেসবুকে অ্যাকান্ট খুলে দিচ্ছি। মন চাইলেই মেসেজ করবে। রাতে আমরা ভিডিওকলে কথা বলতে পারব। লক্ষ্মীটি এবার ধরো ফোনটি। তোমার বাবা ফোন কিনে দিলে তো আমাকে আর দিতে হতো না।
নিজের বাবা-মায়ের প্রতি এই মুহূর্তে রাগ ধরে আফরিনের। ভাবে, বাবা একটা ফোন কিনে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো।
আফরিন বলে, আমার বাবা যেন কেমন, শুধু শাসনে রাখে। কোথায় যাই, কী করি, সব দিকে তার নজর। এই যুগে কোনো বাবা এতোটা শাসনে রাখে বলো?
আফরিন কথা বলছে, তবু ওর চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু নামছে।
সাগর ওর হাত দিয়ে আফরিনের অশ্রু মুছে দিতে দিতে বলে, এবার তো ফোন হলো। সুযোগ বুঝে মেসেঞ্জারে কল দেবে। কথা বলার সুযোগ না পেলে অন্তত মেসেজ করবে।
আফরিন বলে, তোমার দেওয়া ফোনের চেয়ে তোমার ভালোবাসা আমার কাছে অধীক মূল্যবান।
জানি তো।
তোমার ভালোবাসা আমি পেয়েছি। এবার ফোনটি তোমার কাছে থাক।
আমার কাছে রাখার জন্য কি ফোনটি কিনেছি?
এই ফোন আমি কীভাবে ব্যবহার করব? বাসায় বাবা-মা দেখে ফেলবে না? জানাজানি হয়ে গেলে কী বিপদে পড়তে হবে বুঝতে পারছ?
কেনো, বাটন ফোনটি যেভাবে রাখো সেভাবে লুকিয়ে রাখবে। বাইরে বেরুলে পরিবেশ বুঝে, লোকজন দেখেশুনে কথা বলবে। আর তুমি তো আলাদা রুমেই ঘুমাও। সবাই ঘুমে গেলেও তো একটু কথা বলতে পারো। ম্যাসেঞ্জারে হাই-হ্যালো করা যায়।
কিন্তু, ফোনের কথা জেনে যায় যদি!
এই যে আমার সঙ্গে প্রেম করছো, বাসায় জেনেছে কেউ?
না।
ফোনের কথাও জানবে না কেউ, লুকিয়ে রাখবে। আর সতর্ক থাকবে।
তবু আমার ভয় করে।
এবার সাগর রেগে যায়, একটা সামান্য ফোন লুকিয়ে রাখতে পারবে না, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করতে ভয় লাগে না?
আমায় বকবে না, ভালো হবে না কিন্তু।
হ্যাঁ, তুমি তো বাচ্চা মেয়ে, তোমার সাথে রাগ করা যাবে না তো।
আমি কিন্তু আবারো কেঁদে ফেলবো।
যে খুকুকে এখনো ভাত খাইয়ে দেওয়া লাগে, সে তো কাঁদবেই। তোমার প্রেম করার দরকার নেই- মায়ের কোলে শুয়ে রূপকথার গল্প শোনো গিয়ে।
আফরিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
এবার কান্না থামাতে সাগরকে দারুণ ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। এমনটি আর হবে না, নিজের কান মলে সরি-টরি বলে কান্না থামায় আফরিনের।
সাগর আফরিনের অশ্রু মুছে দিতে দিতে বলে, এতো ইমোশনাল হলে চলে?
হ্যাঁ, আমিই তো ইমোশনাল, একজন ফোন কিনতে গিয়ে হাত ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলবে, সেটা স্বাভাবিক বিষয়, কোন ইমোশন নেই।
এবার সত্যিই সাগর আবেগী হয়ে ওঠে, আফরিনের কপালে একটা আলতো চুমু এঁকে দেয়। আফরিনের শরীরময় ঢেউ ওঠে। আর সে ঢেউয়ের ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় সাত রঙের লজ্জা।
সাগর হেসে হেসে বলে, এবার তুমিও আমায় দাও।
আফরিন লজ্জা রঙের পাপড়ির ভেতর থেকে চোখ তুলে তাকায়। তারপর দৃষ্টি নিচে নামিয়ে বলে, ঠোঁটে পেইন্ট করা, মানচিত্র এঁকে যাবে যে?
আমার সমস্ত স্বত্বা জুড়ে তো তোমারই মানচিত্র, এঁকে দাওনা অমন লজ্জাবতী ঠোঁটের মানচিত্র, এ জীবন ধৈন্য হোক।
গল্পে গল্পে অনেকটা সময় কেটে যায়। কেউ আবার দেখে ফেলেছে কি না এই দুর্ভাবনা মাথায় নিয়ে ফিরে এসে ফুচকা-চটপটির ছোট্ট দোকানে প্রবেশ করে। চতুর্দিকে লক্ষ রেখে একজন অন্য জনকে ফুচকা খাইয়ে দেয়। কলেজ আওয়ার শেষ হয়। সাগর বিদায় নিয়ে চলে গেলে আফরিন কলেজ গেটের দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতে ছুটির ঘণ্টা শুনতে পায়, দূর থেকে দেখতে পায়- পাপড়ি গেট দিয়ে বের হয়ে আসছে।
পাপড়ি আফরিনকে দেখে হাত নাড়ায়। দূর থেকেই চিৎকার করে ওঠে, কোথায় ছিলি তুই? ক্লাসে পাইনি যে?
আফরিন ইশারায় পাপড়িকে থামায়। তারপর কাছে এসে ওর হাত ধরে হাসতে থাকে। যেন হিমালয় জয় করে এসেছে।
পাপড়ি অবাক হয়, কোথায় গিয়েছিলি? কী হয়েছে বলবি তো!
বলবো, বলবো, সব বলবো।
বাসায় ফোন সাইলেন্ট রাখে আফরিন। বইয়ের মাঝে, কাপড়ের ভাঁজে, ড্রয়ারের কর্নারে লুকিয়ে রাখে। বাসায় কেউ না থাকলে বা সুযোগ পেলেই দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলে। রাতে সবাই ঘুমে গেলে রুমের দরজা আটকে গভীর রাত পর্যন্ত চ্যাটিং করে, আবার ফোন লুকিয়ে রাখে। বাইরে বের হলে লুকানোর আর প্রয়োজন হয় না, ফোন হাতেই থাকে- তখন আফরিনের নাগাল আর কে পায়?
কিন্তু নাগাল একদিন পেয়ে গেল, আমজাদ সাহেব কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ রাস্তায় মেয়ের সাঙ্গে দেখা। দেখতে পান মেয়ের হাতে স্মার্ট ফোন। আমজাদ সাহেব তীক্ষè নজরে তাকালেন। ভয়ে আফরিনের বুকের ভেতর ভূ-কম্পন শুরু হয়ে গেল। বাবার চোখের দিকে একবার তাকিয়ে আর তাকাতে পারছিল না আফরিন। নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। আমজাদ সাহেব এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন শুধু। জিজ্ঞেস করলেন, ক্লাস কখন?
আফরিন, ভয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল, ক্লাসেই যাচ্ছি বাবা। প্রাইভেট পড়ে এসেছি কেবল। এখনই ক্লাস।
সঙ্গে সহকর্মী থাকায় আমজাদ সাহেব ফোন বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। কিন্তু আফরিনের অবস্থা খারাপ। ক্লাসে গেল, কিন্তু কিছুতেই ক্লাসে মন বসল না। ফিজিক্স ক্লাসে স্যার দুটি প্রশ্ন করলেন, একটিরও উত্তর দিতে পারল না।
স্যার বিরক্তি নিয়ে বললেন, ভেরি স্যাড, এইমাত্র পড়ালাম, কিন্তু বলতে পারছ না, তুমি না এসএসসি তে খুব ভালো রেজাল্ট করেছ! এই কি তার নমুনা। কোথায় থাকে মন?
আফরিনের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। পাপড়ি বোঝায়, সাহস যোগায়, বাড়ি গিয়ে এটা বলবি, সেটা বলবি, দেখবি কিচ্ছু হবে না। প্রয়োজনে আমি তোর সঙ্গে তোদের বাড়ি গিয়ে সাক্ষ দেবো। আঙ্কেল-আন্টিকে বুঝিয়ে বলব।
কিন্তু আফরিন পাপড়ির কোনো পরামর্শে স্বস্তি পায় না। মনের ভয়টা কিছুতেই তাড়াতে পারে না। আর কিছু চিন্তা না করতে পেরে সাগরকে ফোন দেয়। পরবর্তী ক্লাস না করে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যায়, পাপড়িও ওর সঙ্গে যায়। সাগরের সঙ্গে পরামর্শ করে কিছুদিনের জন্য ফোনটি সাগরের হাতে হস্তান্তর করে বাসায় ফিরে আফরিন।
সাহিদা বেগম অবাক হন, আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরলি মা?
শেষ ক্লাস দুটো হয়নি। স্যারদের কি যেন মিটিং আছে। কলেজে বসে বসে কী করব? ভাবলাম বাসায় চলে যাই। পাপড়ি অবশ্য ওদের বাড়ি ডেকেছিল। যাইনি, তোমাকে না জানিয়ে কোথাও গিয়েছি আমি?
সাহিদা বেগম মেয়ের কথা শুনে খুশি হন। আফরিনের মাথায় পাকাপাকি ভাবে দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধলেও স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে। সাবলীল ভাব ফুটিয়ে তুলে বুঝাতে চায় ওর কোনো অপরাধ নেই।
আমজাদ সাহেব বাসায় ফিরে গম্ভীর হয়ে ড্রইং রুমে শোফায় বসেন। সাহিদা বেগম কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, কী ব্যাপার পোশাক ছাড়বে না? ফ্রেশ হবে না?
আমজাদ সাহেব উত্তর দিচ্ছেন না কিছু।
সাহিদা বেগম জিজ্ঞেস করেন, এখুনি আবার বেরুতে চাও নাকি? চা দেবো?
আমাজাদ সাহেব এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আফরিন কোথায়?
বাসায়।
ডাকো ওকে।
সাহিদা বেগম লক্ষ করলেন স্বামীর কণ্ঠস্বর পাল্টে গেছে- যেন ক্রোধ ঝরে ঝরে পড়ছে। বুঝতে পারলেন- কিছু একটা হয়েছে। সাহিদা বেগম ভালো করে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে পাশে বসে হাত ধরেন।
আমজাদ সাহেব বলেন, আফরিনকে ডাকতে বললাম না তোমায়?
কী হয়েছে বলো তো?
ডাকো ওকে।
সাহিদা বেগম ডাকতেই দ্রুত গতিতে চলে এল আফরিন। ও তৈরি হয়েই ছিল- কোনো জড়তা নেই ওর ভেতর।
জি বাবা, ডাকছ আমায়।
আমজাদ সাহেব কণ্ঠ শান্ত করে জিজ্ঞেস করলেন, ফোন পেয়েছ কোথায়?
আমি আবার ফোন পাব কোথায়, বাবা? ওটা তো পাপড়ির ফোন।
পাপড়ির ফোন তোমার হাতে ছিল কেন?
কিছুটা নার্ভাস ফিল করে আফরিন। ভাবে, আব্বা ফোনে কথা বলতেও দেখেছে কি-না, কেননা তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগেও আফরিন ফোনে কথা বলছিল। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি চলে এল আর নার্ভাস না হয়ে বলল, পাপড়ির মায়ের সঙ্গে পাপড়ির ফোনে কথা হচ্ছিল, শুনল আমি ওর সঙ্গে আছি, আমাকে চাইল, আমি কথা বলে কান থেকে ফোনটা নামাতেই তোমার সঙ্গে দেখা।
এমন উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আফরিন ভাবনায় পড়ল, এ কী জবাব দিলো? ওর সঙ্গে তো তখন কেউ ছিল না।
আমজাদ সাহেব বলেন, কই তোমার সঙ্গে তো কাউকে দেখিনি।
একটু হাসার চেষ্টা করে সাহস সঞ্চার করে আফরিন। বলে, আমার একটু পেছনেই তো ছিল ও। দুই হাতে বই ছিল। দেখনি? ও তো বলল, তোমাকে সালাম দিয়েছে। তুমি উত্তর দাওনি।
এতক্ষণে আমজাদ সাহেবকে বোল্ড করা সম্ভব হলো। এবার সাহিদা বেগমও পেয়েছেন মওকা।
তোর আব্বাকে চিনিস না? দুনিয়ার কিচ্ছু খেয়াল করে? তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে দেখতে পেয়েছে। আরও ভাগ্য ভালো যে তোকে চিনতে পেরেছে।
ঘটনা নাটকীয়তায় মোড় নিয়েছে। মা-বাবা এবার একে অপরকে ক্ষেপিয়ে তুলছে। সমস্যা এত তাড়াতাড়ি কেটে যাবে ধারণাই করেনি আফরিন।
উল্টো মায়ের কাছ থেকে কিছু গুণগান শোনা গেল।
স্বামীকে লক্ষ্য করে সাহিদা বেগম বলেন, মেয়েটা একটু খামখেয়ালীপনা করে বটে, কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েদের মতো উচ্ছৃঙ্খল নয়। তুমি চিন্তা করো না।
একটাই তো সন্তান আমাদের, চিন্তাটা একটু বেশিই হয়। যুগ তো ভালো না। চারদিকে কত কি ঘটনা ঘটে যাচ্ছে!
চিন্তা কি আমারও কম হয়, কিন্তু দেখো, আমাদের মান-সম্মান ও ঠিকই রাখবে।
আফরিন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সুবিধা হলো এই যে, পাপড়ির মায়ের প্রসঙ্গে কিছু উপস্থাপন করা গেল। পাপড়ির মা খুব ভালো এবং আফরিনকে নিজের মেয়ের মতো পছন্দ করে। পাপড়িদের বাড়ি গেলে ওর মা আফরিনকে কিছুতেই আসতে দিতে চায় না। মা-বাবা চিন্তা করবে বলে আফরিন জোর করে চলে আসে। এসব প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে আফরিন ভাবে, এবার দু-চারদিন তো পাপড়িদের বাসার নাম করে, ঘুরে বেড়ানো যাবে।
আফরিন মা-বাবাকে এসব কথা বললেও আসলে পাপড়ির মা আফরিনকে একদম পছন্দ করে না।
সাহিদা বেগম মেয়ের মুখে পাপড়ির মায়ের এত গুনগান শুনে বলেন, পাপড়িকেও আমাদের বাড়ি নিয়ে আসিস। শুধু ওদের বাড়ি বেড়ালেই চলবে?
আমজাদ সাহেব শোফা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন, বান্ধবীর বাসায় যাবে, কিন্তু মাত্রা-জ্ঞান বজায় রেখে যাবে। তুমি বিজ্ঞানের ছাত্রী; গল্প-আড্ডার চেয়ে এই সময় তোমার পড়াশুনাটা বেশি জরুরি। এইচএসসি পরীক্ষাটা শেষ হলেই তোমাকে কোচিং এ ভর্তি হতে হবে। মেডিকেল অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে হবে, মেডিকেলে ভর্তি হতে হবে। এগুলো মাথায় রাখবে। প্রতিটি সময়ই মূল্যবান।
বই কিনতে হবে, প্রাইভেট স্যারকে শিটের টাকা দিতে হবে, টিউটোরিয়াল পরীক্ষার ফি দিতে হবে, প্রাক্টিক্যালের জন্য ম্যাটেরিয়াল কিনতে হবে; এরকম নানান অজুহাতে বাড়ি থেকে টাকা নেয় আফরিন।
বিশ দিনের জন্য কলেজ ছুটি। একদম ভালো লাগে না আফরিনের। সকালে প্রাইভেট পড়তে বের হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে হয়। পনেরো-বিশ মিনিট দেরি হলেই বাবা অস্থির হয়ে ওঠেন। মাকে এটা-সেটা বলে বুঝ দেওয়া গেলেও বাবার এককথা, পড়া শেষে সরাসরি বাসায় ফিরে আসবে। বাসায় ফোন করে আবার জেনে নেয় পৌঁছেছে কি-না। বাবার প্রতি আফরিনের রাগ হয়। কিন্তু তার কথা পালন করা ছাড়া আফরিনের উপায় থাকে না। যেদিন বাবা বিকেলে বাড়ি থাকে না, সেদিন মাকে বান্ধবীদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বেড়িয়ে পড়ে।
ছুটি প্রায় শেষ হয়ে আসছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পাপড়ি ফোন করল আফরিনের মায়ের নম্বরে- খালাম্মা, আফরিনকে আজ আমাদের বাড়ি আসতে বলবেন। মা খুব করে বলেছে। আজ আমরা দুপুরে একসঙ্গে খাব। আপনি না করবেন না খালাম্মা।
দারুণ কাজ হলো। আফরিন পাপড়িদের বাড়ির রাস্তায় গেল, কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত যেতে হলো না। প্ল্যান অনুযায়ী সবাই বটতলায় একত্রিত হলো। তিন জুটি ওরা। সাগর-আফরিন, সাব্বির-পাপড়ি, অয়ন-টুশি। আনন্দ হচ্ছে বেশ। একেকজন একেকজনের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ওরা সারাদিন একসঙ্গে কাটাবে। অয়নের ফুফুরা কিছুদিনের জন্য ঢাকায় বেড়াতে গেছে। চাবি অয়নদের বাড়ি রেখে গেছে, আর বলে গেছে মাঝেমাঝে অয়ন গিয়ে যেন খোঁজ-খবর নেয়। ভালোই খোঁজ খবর নেওয়া হবে এবার।
ওরা কিছু খাবার নিয়ে ফুফুদের বাড়ি ওঠে। একদম নিরিবিলি বাড়ি। এক বাড়ি এক ঘর। দারুণ খুশি সবাই। ওরা একসঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে। তারপর জুটি জুটি আলাদা হয়ে যায়।
আফরিন স্নানে। কাপড় গুছাতে গিয়ে লুকানো ফোনটি সাহিদা বেগমের হাতে পড়ে। সাহিদা বেগম মেয়েকে বকতে থাকেন।
সত্যি করে বল, তুই ফোন পেয়েছিস কোথায়? কে ফোন দিয়েছে তোকে?
আফরিনকে আবার নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়।
আফরিন বলে, আমাকে আবার কে ফোন দেবে মা? দেখো না এটা পাপড়ির ফোন।
পাপড়ির ফোন?
পাপড়ি আমাদের বাড়ি এলে ওর হাতে তুমি এই ফোন সেটটি দেখনি?
কি জানি, আমি কি আর ওর ফোনের দিকে তাকিয়ে রয়েছি? তা পাপড়ির ফোন এখানে লুকিয়ে রইল কীভাবে?
গতদিন ভাইভা ছিল। ওর যখন ডাক পড়ল ফোনটি আমার ব্যাগে রেখে ও ভিতরে গেল। পরীক্ষা শেষে ওর নিতে মনে ছিল না। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম। বাড়ি এসে দেখি পাপড়ির ফোন আমার ব্যাগে।
তা আমাদের কাছে না বলে লুকিয়ে রাখলি কেন?
ভয়ে। সেদিন বাবা একমুহূর্ত পাপড়ির ফোনটা আমার হাতে দেখেছে, তাতেই উকিলের মতো কত জেরা। এবার যদি সেই ফোন বাড়িতে দেখে আমায় কি করবে বলো তুমি?
আমাকে বলতে পারতি?
আহা মা! একটা সমান্য ঘটনা নিয়ে কী শুরু করেছ তুমি? আজকেই তো ফোনটা পাপড়িকে দিয়ে দেবো। তাই তোমাদের বলিনি।
সত্যি বলছিস তো সব?
আমি তবে মিথ্যা বলছি এতসব? তুমি পাপড়ির বাসায় ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করো এখনি। এখনি জিজ্ঞেস করো। তুমি আমায় বিশ্বাস করো না মা? মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে আফরিন।
সাহিদা বেগম একদম চুপ হয়ে যায়।
আফরিন ফোন সেটটা কিছুদিনের জন্য সাগরের কাছে রেখে আসে। আর পাপড়িকে ভালো করে বুঝিয়ে দেয়, মা-বাবা যোগাযোগ করলে কী বলতে হবে। তারপরও আফরিন ভয়ে ভয়ে থাকে, মা যদি বাবাকে জানায়! কিন্তু সাহিদা বেগম কিছুই স্বামীর কাছে প্রকাশ করে না।
দুদিন কেটে যায়। ফোনকল আর চ্যাটিং করতে না পেরে আফরিন ও সাগর অস্থির হয়ে ওঠে। বিকেলে বই হাতে নিয়ে সাগরের কথা ভাবছিল আফরিন; হঠাৎ সাহিদা বেগমের ঘরে ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করলেন সাহিদা বেগম। জি জি করলেন তারপর আফরিনকে ডাকলেন।
আফরিন, তোর ফোন মা।
কে আবার ফোন করেছে আফরিন ভেবে পায় না। গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, কে মা?
তোর প্রাইভেট স্যার।
প্রাইভেট স্যার ফোন করলেন হঠাৎ! বিস্ময় লাগে আফরিনের।
সাহিদা বেগম ফোন দিয়ে অন্য ঘরে চলে যান।
আফরিন বলে, হ্যালো।
শোনো, এখনি চলে এসো। তোমার মাকে বলেছি, গত বৃহস্পতিবারের পড়া মিস হয়েছে, আজ সেটা পড়িয়ে দেবো। বুঝতে পেরেছ?
শুনেই বুঝে ফেলে সাগরের কণ্ঠ, অপরিচিত নম্বর দিয়ে ফোন করেছে। আফরিন গলাটা বাড়িয়ে দেখে নেয় মা আশপাশে আছে কি-না, তারপর স্বরটা আরও নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, এত সাহস পেলে কোথায়? যদি মায়ের কাছে ধরা খেয়ে যেতে?
সাহসের তুমি কী দেখেছ? তোমার জন্য সব করতে পারি।
আর কথা বাড়ায় না ওরা। আফরিন দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে।
আফরিন বেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে আমজাদ সাহেব বাসায় এলেন। হাত-মুখ ধুয়ে আফরিনকে ডাকলেন।
সাহিদা বেগম কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, আফরিন তো প্রাইভেট পড়তে গিয়েছে।
কোথায় আবার পড়তে গেল?
ম্যাথ পড়তে, স্যার ফোন করে বললেন, বৃহস্পতিবার যে পড়াটা মিস হয়েছে তা আজ পড়িয়ে দেবেন।
কে ফোন করেছে বললে?
কেন, স্যার ফোন করেছে। ম্যাথ স্যার। তুমি কি কথা বোঝ না, নাকি?
বুঝিই তো না।
আমার কথা বুঝবে কেন? বাইরের মানুষের কথা বুঝলেই হলো।
কার কাছে ফোন করেছিলেন স্যার?
কেন, আমার কাছে। বাড়িতে আর ফোন আছে নাকি? না আর একটা বৌ আছে তোমার?
কে কথা বলেছে?
প্রথমে আমি কথা বলেছি। তারপর আফরিন বলেছে।
আজাহার সাহেব চায়ের কাপ টেবিলে রেখে ঝিম মেরে বসে থাকেন।
সাহিদা বেগম অবাক হন, কী হলো তোমার আবার?
কিন্তু আফরিনের ম্যাথ স্যারের সঙ্গে যে আমার অফিসের সামনে দেখা হলো। আমরা যে একসঙ্গে চা খেলাম। কই পড়ানোর কথা বা আফরিনের কথা তো কিছু বললেন না? পড়িয়ে থাকলে আমার অফিসের সামনে দেখা হলো কীভাবে?
আজাহার সাহেবের কথা শুনে সাহিদা বেগম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন।
আজাহার সাহেবের চোখ এবার রাগে লাল হয়ে উঠল। সাহিদা বেগমের দিকে আঙুল তুলে বলতে লাগলেন- তুমি মেয়েটাকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছ। শুধু ভাত খাইয়ে দিলে হয় না, মেয়ে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে সে দিকেও খেয়াল রাখতে হয়।
হ্যাঁ, আমারই তো সব দোষ। তুমি বাবা হিসেবে করছটা কী? সারাদিন তো অফিস নিয়েই থাকো, মেয়ের কোনো খোঁজ রাখো কখনও? সব দায়িত্ব যেন আমারই। বলতে বলতেই কান্না চলে আসে সাহিদা বেগমের চোখে।
কথা কাটাকাটি আরও কিছুদূর এগোতো। সাহিদা বেগমের চোখ দিয়ে জল ঝরত আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু কাজের বুয়া চলে আসায় এখানেই তর্কের ইতি টানতে হলো এবং সাহিদা বেগমকে লুকিয়ে চোখের জল মুছতে হলো। চা ঠন্ডা হয়ে গেছে। আজাহার সাহেব চায়ের কাপ রেখে উঠে গেলেন।
আফরিন বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। হাসি-খুশি মেজাজেই ছিল। কিন্তু বাসায় পা দিতেই আবহাওয়ার পরিবর্তন টের পেল। অস্থিরতায় কাটল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর সন্ধ্যাটা পেরিয়ে গেলে যখন বাবা অপ্রচলিত মেজাজে ডাকল তখনই মনে হলো আকাশজুড়ে যে মেঘ করেছে, এখনই তার বজ্রবৃষ্টি শুরু হবে। আফরিনের হার্টবিট বেড়ে গেল।
কোনো কৌশলের ছলাকলাই আজ কাজে এল না। ধমকের পর ধমক খেয়ে একদম চুপসে গেছে আফরিন। চোখ দিয়ে জল নেমে এসেছে ওর।
সাহিদা বেগম কেঁদেকেটে বলছেন, আজ তোর জন্য আমাকে কথা শুনতে হলো।
আজাহার সাহেব এবার আরও রেগে গেলেন, এসব তুমি কী বলছ আফরিনের মা! মেয়ের উচ্ছন্নে যাওয়ার চেয়ে তোমার কাছে কথা শোনাটা বড় হয়ে গেল?
হ্যাঁ, আমার জন্যই তো উচ্ছন্নে গেছে। সাহিদা বেগম কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
দাঁড়াও। ভালো করে শোনো। কাল থেকে আফরিনের কলেজে যাওয়া বন্ধ। প্রাইভেটে যেতে হলে সঙ্গে তুমি যাবে অথবা একজন লোক পাঠাবে। পড়া শেষ হলে আবার নিয়ে আসবে।
আমজাদ সাহেব সিগারেট জ্বালায়। আফরিন মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
রাতের খাবার না খেয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আফরিন। সাহিদা বেগম ব্যর্থ ডাকাডাকি করে চলে যায়। যদিও ঘুম আসে না আফরিনের। ভাগ্যিস আজ ফোনটা নিয়ে এসেছিল সাগরের কাছ থেকে। লাইট নিভে গেলে মা-বাবা ঘুমিয়ে পড়লে সাগরকে ফোন দেয়। জানিয়ে দেয় মা-বাবার কাছে ধরা খেয়ে যাওয়ার কথা। সাগরের কথা বাবাকে বলতে বাধ্য হয়েছে এবং আগামী দিনের মধ্যে সাগরের বাড়িতে বিচার চলে যেতে পারে। আফরিনের কণ্ঠে প্রচণ্ড উদ্বেগ। সাগর উদ্বিগ্ন হলেও আফরিনকে সাহস যোগায়। দুজনের ব্যালেন্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত কথা চলে। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে আফরিন। সাগর ঘর হতে বের হয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। ভাবে, সত্যিই যদি বাড়িতে বিচার নিয়ে আসে! তারপর নিজেই নিজের মধ্যে সাহস জোগায়। যত দুর্যোগই আসুক আফরিনকে হারাতে পারবে না।
সকালে আফরিন প্রাইভেটে যায় না, কলেজেও যায় না। সারাদিন বাড়ি বসে থাকে। বিকেলে পাপড়ি বাসায় এলেও মন খুলে কথা বলতে পারে না, সাহিদা বেগম সারাটি সময় ধরে নজরের মধ্যে রাখেন। আফরিন পাপড়িকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে- কেস সাংঘাতিক জটিল।
গভীর রাতে আফরিনের জানালার কাছে আসে সাগর। দীর্ঘসময় নিয়ে ফিসফিস করে ওরা কথা বলে। সাগর জানায় বাড়িতে নেতা ধরনের দুজন লোক গিয়ে বাবাকে শাসিয়ে এসেছে। বাবা লাঠি নিয়ে পেটাতে এসেছিল ওকে। অনেক কষ্টে প্রতিবেশীরা থামায়। শুনে আফরিনের চোখে জল চলে আসে। জানালা দিয়ে সাগর আফরিনের চোখের জল মুছে দেয়। লোহার গ্রিলের উপর হাতে হাত রেখে মনকে শক্ত করে ওরা। তারপর সাগর বিদায় নেয়।
এভাবেই রোজ গভীর রাতে সাগর আসে। একদিন আজাহার সাহেবের কানে ফিসফিস শব্দ আসে। বাইরের লাইট জ্বালাতেই দেখতে পায় কে একজন আফরিনের জানালা থেকে দৌড়ে পালাচ্ছে। আফরিনের জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। আজাহার সাহেব সাহিদা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে আফরিনের রুমের দরজায় করাঘাত করে ডাকাডাকি করলেও কিছুতেই দরজা খুলে না আফরিন।
দ্বিতী বার অভিযোগ যাওয়ার আগেই বাড়ি থেকে পালায় সাগর। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে কোথাও গা-ঢাকা দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে স্কুল ঝড়েপড়া বাল্য বন্ধু আতিককে ফোন দেয়। আতিক বাল্কহেডের লেবার। বাল্কহেড নিয়ে দেশের বিভিন্ন বন্দরে বন্দরে যায়। আতিকদের বাল্কহেড কাছাকাছিই ছিল। আতিকের আশ্বাস পেয়ে আর এক মুহূর্তও দেরি করে না সাগর। বাল্য বন্ধুকে পেয়ে আতিক দারুণ খুশি হয়।
আফরিনের বাইরে বের হওয়া পুরোপুরিই বন্ধ হয়ে গেল। আমজাদ সাহেব প্রাইভেট শিক্ষকের সঙ্গে ঘটনার সামান্য কিছু শেয়ার করেন। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পরীক্ষার সময়ে আফরিন কেবল পরীক্ষা দেবে; নোট সাজেশন যা প্রয়োজন প্রাইভেট শিক্ষক সংগ্রহ করে দেবেন এবং তিনি সপ্তাহে দু-তিন দিন বাসায় এসে পড়িয়ে যাবেন।
কয়েক দিন আফরিনের ভীষণ কষ্টে কাটে। স্নান-খাওয়া প্রায় ছেড়ে দেয়। সাহিদা বেগম দুশ্চিন্তা করেন, মেয়েকে নিয়ে সে এখন কী করবে! ঢাকায় বোনের বাসায় আফরিনকে নিয়ে কিছুদিন থেকে এলে কেমন হয়, স্বামীর কাছে উত্থাপন করেন। কিন্তু আজাহার সাহেব রাজি নয়।
আজাহার সাহেব বলেন, একদম ঠিক হবে না। মদমাশটা কখন দেখবে সেখানেও হাজির হয়ে যাবে। আমি তো আর যেতে পারব না। তোমাদের পাঠাতে আমি ভরসা পাই না।
কদিন যেতে না যেতে আফরিন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আগের মতো খায়, পড়ে, টিভি দেখে। সাহিদা বেগম মেয়ের আচরণ দেখে স্বস্তি পান। আজাহার সাহেব দুশ্চিন্তামুক্ত হন। যাক মেয়েটার মতিগতি ঠিক হলো। কিন্তু আজাহার-সাহিদা দম্পত্তি জানতেও পারে না মেয়ের কাছে এখনও সাগরের দেওয়া মোবাইল সেট রয়ে গেছে এবং সুযোগ পেলে এখনও ওরা দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলে।
বাল্কহেড থেকে একজন লেবার চলে যাওয়ায় সাগর জায়গাটা দখল করে। তিন বেলা খেয়ে, ফোন খরচ করেও বেশকিছু টাকা জমে হাতে। মাঝেমাঝে বাড়িতেও পাঠায় কিছু। ভাবে, আর কটা দিন গেলেই বাড়ি ফিরবে। আবার পড়াশুনা শুরু করবে। যে করেই হোক আফরিনকে পেতেই হবে।
এর আগে বন্ধুদের আড্ডায় সিগারেটে দু-একটা টান দিলেও কখনও নিয়মিত করেনি সাগর। কিন্তু বাল্কহেডে সব সময় সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকতে হয়। আতিক প্ররোচনা না দিলেও অন্যরা সাগরকে সিগারেট ধরাতে লেগে থাকে।
দেও ভাই, একটান দেও। দেখো কী শান্তি। জগতে এমন শান্তি আর কিছুতে নাই।
একটান, দুটান দিতে দিতে কদিনের মধ্যেই সাগর একবারে একটি সিগারেট শেষ করে ফেলে। এখন আর ওকে অন্যের দানের উপর ভরসা করলে চলে না। নিজের অর্থেই কিনে ফেলে আস্ত প্যাকেট সিগারেট।
দুশ্চিন্তা মাথায় এসে আবার ভর না করতে পারে এমন ব্যবস্থাই করে ফেলতে চান আজাহার সাহেব। সাহিদা বেগমের সঙ্গেও কদিন ধরে আলাপ করছেন। হঠাৎ করেই প্রস্তাব চলে আসে। বাল্যবন্ধু শফিকের বড় ছেলে নাহিদ অস্ট্রেলিয়া থাকে। দুবছর পরে দেশে এসেছে। পুত্রের জন্য আফরিনকে চেয়ে প্রস্তাব করেছে বন্ধু নিজে। আজাহার-সাহিদা দম্পত্তি আনন্দে আত্মহারা। সত্যি যদি আফরিনকে দেখে নাহিদের পছন্দ হয় এর চেয়ে উত্তম আর কিছু হয় না।
আফরিনের কাছে সাহিদা বেগম বিয়ের কথা উপস্থাপন করলে আফরিন প্রতিবাদ করে।
সাহিদা বেগম বলেন, এমন প্রস্তাব কিছুতেই হেলায় ফেলা যাবে না।
আমি কিছুতেই এখন বিয়ে করব না মা। কদিন পরই আমার পরীক্ষা। পরীক্ষার আগে বিয়ে নিয়ে ভাবতে চাই না।
বিয়ের পরও পরীক্ষা দেওয়া যাবে।
আফরিন কেঁদেকেটে বাড়ি ভাসিয়ে দেয়।
সাহিদা বেগম বলেন, ওরা দেখতে চায় দেখুক, দেখলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। তোর বাবা আসতে বলেছে এখন যদি বারণ করি, আমাদের সম্মান থাকে বল?
আফরিন কিছুই বুঝতে চায় না। এককথা, কিছুতেই বিয়ে করব না এখন।
আফরিন সাগরকে ফোন দেয়। খুলে বলে সব কথা। সাগর বিচলিত হয়ে ওঠে। বিষাদ নেমে আসে সাগরের বুকে। বহনকারী বাল্কহেড যেন নদীর জলে নয় সাগরের চোখের জলে ভাসছে। সে জল মেঘে ভেসে ঝরছে আফরিনের চোখে।
কেঁদে কেঁদে সাহসী হয় ওরা। শপথ করে- বাঁচতে হলে একসঙ্গে বাঁচব।
সাগর বলে, মা-বাবা যা বলবে, সেই আনুযায়ী চলবে আর সব সময় হাসি-খুশি থাকবে, যেন তারা সন্দেহ না করে। আগে ওরা দেখে যাক, যদি কথা পাকাপাকি হয়ে যায় তখন না হয় আমরা আমাদের মতো করে ভাবব।
তখন কী ভাবব আমরা?
কী ভাবব আবার, তোমায় নিয়ে পালিয়ে যাব।
পালিয়ে যাব!
পালাতে না পারলে তো তোমার ঐ ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে।
সাগর থামে কিছুক্ষণ। আফরিনও নীরব। ফোনকলের ফিসফিসটুকু থেমে গেলে রাতের নিস্তব্ধতা আফরিনের রুমটাকে পুরোপুরিই গ্রাস করে। বাল্কহেডের শ্রমিকেরা গভীর ঘুমে, আফরিনের কন্ঠ থেমে গেলে বাল্কহেডে এসে আছড়ে পরা ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ ভীষণ বেদনা হয়ে সাগরের বুকে লাগে।
সাগর বলে, বরং তুমি ওই ছেলেকেই বিয়ে করো। একটা ভালো জীবন পাবে। আমার কাছে এলে কী পাবে? এই দরিদ্র জীবনের সঙ্গে তাল মিলাতে পারবে না।
আফরিন কেঁদে ওঠে। এসব তুমি কী বলছ! আমি কিচ্ছু বুঝি না; শুধু তোমাকে চাই। তুমি এখনই এসে আমায় নিয়ে যাও।
কান্না থামাও সোনা। কটা দিন অপেক্ষা করো। সে রকম কিছু হলে তোমাকে নিয়ে যাব। তুমি আপাতত সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলো।
আফরিনের হাসি-খুশি ভাব দেখে আমজাদ-সাহিদা দম্পত্তি দুশ্চিন্তা মুক্ত হন। আফরিনের বান্ধবীরা এখন অবলীলায় বাড়ি আসে, কোনোরকম গোয়েন্দাগিরি করেন না সাহিদা বেগম।
মেয়ে দেখে নাহিদের দারুণ পছন্দ হয়। আফরিনের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে আফরিনের মতামত জেনে নেয়। আফরিন বলে, মা-বাবা যা বলবেন, আমি তাতেই রাজি। আফরিনের কথা বলার ধরন নজর কাড়ে নাহিদের। নাহিদ মনেপ্রাণে এমন মেয়েই খুঁজছিল।
বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল। দুপক্ষ মিলে সিদ্ধান্ত নিল- এখন কেবল বিয়েটা হোক, আগামী বছর নাহিদ দেশে ফিরলে আফরিনকে তুলে নেওয়া হবে। আফরিনও ততদিনে পরীক্ষা শেষ করে কোথাও ভর্তি হয়ে যাবে।
পাপড়ি অবাক হয়, বলে, এতদিনের প্রেম অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীর নজরে ব্যর্থ হয়ে যাবে?
আফরিন হাসে, যেন বিদ্যুৎ চমকায়; তার আলোকছটার রহস্যটুকু পাপড়ি উন্মোচন করতে পারে না। অবশ্য পাপড়ির জীবনের রহস্যই কি উন্মোচন করতে পারে আফরিন? অথবা পাপড়িই কি জানে পাপড়ির শরীরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?
সাগরদের বাল্কহেড শীতলক্ষায়। ফিরতে আরও তিন দিন দেরি হবে। বিয়ের বাকি আর মাত্র পাঁচ দিন। ক্রমেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পরে আফরিন- সাগর বিয়ের আগেই ফিরতে পারবে তো!
সাগর জানায়- এক লেবারের মা মারা যাওয়ায় সে বাড়ি চলে গেছে, এই মুহূর্তে যদি আমিও চলে আসি, তা হলে মালিক ক্ষেপে যাবে। পুরো চাপ গিয়ে পড়বে বন্ধুর ওপর। ও আমায় আশ্রয় দিয়েছে। এখন ওকে কীভাবে বিপদে ফেলি? এখনও তো পাঁচ দিন বাকি, মাল আনলোড হলে আমরা আর তিন দিনের মধ্যে ফিরে আসছি। দু-তিনটা দিন তো, একটু ধৈর্য ধরে থাকো সোনা।
এক দিন, দুই দিন করে তিন দিন কেটে গেল। আফরিন আর কিছু ভাবতে পারছে না। সাগরকে ফোন দিলে বলে, আজও ছুটি হয়নি। আফরিন হতাশ হলে সাগর বলে- আহা, আমার উপর আস্থা রাখো। একদম অস্থির হবে না। কাল রাতে তৈরি হয়ে থেকো। ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে আসবে। তোমাকে নিয়ে কীভাবে কোথায় যাব এ নিয়ে কিছু ভেব না। আমার বন্ধু আতিক সব ব্যবস্থা করে রাখবে।
বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসতে থাকে। হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-উৎসবে ভরে উঠে প্রতিটি কক্ষ। কিন্তু আফরিনের ভেতর অনবরত ভাংচুর চলতে থাকে। কী করবে আফরিন ভেবে পায় না। একদিকে মা-বাবার সঙ্গে ছলনা করে পালাতে হবে সে দুঃখবোধ; বিপরীতে মা-বাবার কথা মেনে নিলে সাগরের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে তার যন্ত্রণা। একবার চোখে ভেসে ওঠে লজ্জা-কষ্টে জর্জরিত মা-বাবার বিষণ্ন মুখ, আর একবার সাগরের পোড়া শরীর। না, না, সাগরকে সে ঠকাতে পারবে না কিছুতেই। সাগরকে ভুলে একটা অপরিচিত লোকের ঘর কিছুতেই করতে পারবে না। হাত দিয়ে কান চাপে আফরিন। চোখ দিয়ে জল নেমে আসে। ভাবে আজও তো সাগর এল না।
সাগরকে বারবার ডায়াল করেও পাওয়া যাচ্ছে না। আফরিন দারুণ নিরাশায় ভুগতে থাকে। কী হলো সাগরের! হিসাব মিলাতে পারছে না। রাগধরে আফরিনের, কোনো সমস্যায় পড়লে তো একটি ফোন দিয়ে বা আন্তত একটা মেসেজ দিয়ে জানাতে পারে। বাড়িজুড়ে কত আনন্দ করছে সবাই। আফরিনকে ডেকে যাচ্ছে একে একে; কিন্ত আফরিন ভীষণ মাথা ধরেছে বলে রুমেই শুয়ে থাকে। শ্রাবণের জল উপচে পড়ে আফরিনের চোখ দিয়ে- কাল দুপুরে বিয়ে আর মানুষটির আজ পর্যন্ত কোনো দেখা নেই!
বিয়েবাড়ির কেউ কেউ টিভিতে সংবাদ দেখলেও তাদের কাছে সে সংবাদ গুরুত্ববহন করে না।
।। সংবাদ।।
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর সেন্ট্রাল খেয়াঘাটে বাল্কহেডের ধাক্কায় যাত্রীবাহী নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এখনও নিখোঁজ যাত্রীদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। একাধিক সূত্রে জানা যায়, বন্দর ঘাট থেকে দুটি নৌকা নারয়ণগঞ্জের পাড়ে আসছিল। এ সময় শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝখানে এক সঙ্গে দুটি নৌকাকে ধাক্কা দেয় বাল্কহেডটি। মুহূর্তেই নৌকা দুটি ডুবে যায়। এসময় আশপাশে থাকা নৌকা ও ট্রলার গিয়ে যাত্রীদের উদ্ধার করে। কেউ কেউ সাঁতার কেটে তীরে উঠেছেন। নিখোঁজ যাত্রীদের খুঁজতে উদ্ধার অভিযান চলছে। নৌ পুলিশের ওসি জানান, দুটি নৌকাকে ধাক্কা দেওয়া সেই বেপরোয়া গতির বাল্কহেডটিসহ ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চালক ও লস্কর রয়েছে।
অপেক্ষোর পর অপেক্ষা করেও সাগর আসে না। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে সারারাত আফরিনের নির্ঘুম কেটে যায়।
দূর্ঘটনার পর সাগর ও আতিক পালাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়। জনতা ওদের আটকে রাখে আর পুলিশ এসে থানায় নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ করে। সাধারণ লেবার হওয়ায় আর ওদের নামে মামলা না হওয়ায় আটকের একদিন পর ছাড়া পায় ওরা। ছাড়া পেয়েই সাগর ফোন দেয় আফরিনকে। ততক্ষণে সময় অনেক গড়িয়ে গেছে।
আফরিন সারারাত ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে জ্ঞানশূন্য। দারুণ মনোভঙ্গে ফোন বন্ধ করে রাখে- কী প্রয়োজনে আসবে এই ফোন! কিছুই ভাবতে পারে না ও। নিজেকে মনে হয় খেলার পুতুল। দারুণ শীতল হয়ে যায় আফরিন। যেন খাটের কোণায় বসে থাকা এক বরফের স্তুপ। তারপর কখন যেন সে বরফে আগুন জ্বলে ওঠে। দারুণ জেদ চাপে আফরিনের। পেয়ে যায় ঘুমের ঔষধ। খেতে থাকে একটা একটা করে।
অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে সাগর যখন পৌঁছায়, তখন আফরিন হাসপাতালে। সব শুনে সাগর কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। কীটনাশক খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে সাগর।
একই হাসপাতালে সাগর ও আফরিন। মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুই ভাবতে পারে না; জীবন সম্পর্কে কিছুই উপলব্ধি আসে না ওদের। শুধু অনুভব করতে পারে যন্ত্রণা কত তীব্র হতে পারে; কতটা যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলে মৃত্যুর আঙিনায় পৌঁছানো যায়।
নাহিদের পরিবারে লজ্জায় আঁধার নেমে আসে। কীভাবে কি হয়ে গেল বিন্দুমাত্র অনুমান করতে পারেনি কেউ। গতদিন ঘটনার পর থেকেই আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত-আধাপরিচিতরা একের পর এক ফোন করে যাচ্ছে। কীভাবে যে এত দ্রুত খবর পেয়ে যায় এরা! ভোরে ঘুম ভেঙেছে তাদেরই ফোনে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে একেকজন। তারপর সেই ক্লান্তি নিয়েই শুনতে হচ্ছে তাদের জ্ঞান-বাণী।
কেউ বলছে, বিয়ে কি পুতুল খেলা? বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে হুট করে কেউ সিন্ধান্ত নেয়?
কেউ বলছে, যা-ই বলেন, মেয়ে সম্পর্কে ভালো করে তথ্য জেনে নেওয়া উচিত ছিলো।
কেউ বলছে, আগে জানতে পারলে এই সম্পর্ক স্থাপন করতে আমি নিষেধ করতাম।
তাদের কথার জবাবে নহিদের মা নিলুফা বেগম বলেন, কী সাংঘাতিক মেয়েরে দেখো, তোর আর একজনের সাথে সম্পর্ক আছে, তুই এখানে আবার রাজি হলি কেন?
নিলুফা বেগমের দুঃসম্পর্কের খালাতো বোন বলেন, বাপ-মা জোর করে বোধহয় বিয়ে দিচ্ছিল।
নিলুফা বেগম বলেন, জোর করে দিলে তো মেয়ের চোখে-মুখে ছাপ থাকবে আপা, কিন্তু আপনি যদি দেখতেন, খুব হাস্যজ্জে¦াল একটা মুখ! নাহিদও একান্তে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল, কথা বলে নাহিদের ভালো লাগল। মেয়ে পজিটিভ, নাহিদ জানাল, মেয়ের মা-বাবা জানাল মেয়েসহ তারা সবাই রাজি। কী করে বুঝব আপা?
তারপরও তোমাদের আর একটু জেনে-শুনে নেওয়া উচিত ছিল।
সবই নাহিদের আব্বার দোষ। মেয়ের বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে অত কিছু ভাবাভাবির ধার ধারেনি।
শফিক সাহেব হঠাৎ ড্রইং রুমে ঢোকেন। নিলুফার মন্তব্য তাকে আহত করল। অন্য সময় হলে তিনি প্রচণ্ড রেগে যেতেন। কিন্তু আজ, অনেক অতিথি ঘরে, এদের সামনে রাগারাগি করা যায় না। নিজেকে সংযত করে বললেন, কথাটা তুমি ঠিক বললে না, নাহিদের মা। আমজাদের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের খাতির তা ঠিক আছে, কিন্তু মেয়েকে তো তোমাদের দেখতে বলেছি, মেয়ে সম্পর্কে তোমাদের খোঁজ খবর নিতে বলেছি। তোমরা দেখেছ, খোঁজ খবর নিয়েছ, কই তোমাদের তো আমি দোষ দিচ্ছি না।
দোষ দিতে আর বাকি রাখলে কই। নিলুফা বেগমের চোখ কাঁদো-কাঁদো।
নাহিদের মামা জুলফিকর সাহেব দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করলেন, মুহূর্তেই সবার কথা থেমে গেল।
জুলফিকর সাহেব শোফায় বসতে বসতে নাহিদকে ডাকলেন। পাশের রুমেই ছিল নাহিদ। ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই মামার সামনে এসে দাঁড়াল। মামাকে এখনও ভয় পায় ও।
মামা বললেন, বসো নাহিদ।
একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে নাহিদ বসল।
মামা বললেন, যা হয়েছে, হয়তো তোমার কল্যাণের জন্যই হয়েছে। এটা নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই। তুমি জ্ঞানী, তোমাকে বোঝানোর কিছু নেই।
আমি স্বাভাবিক আছি মামা। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।
স্বাভাবিক শব্দটা নিজের কানেই এসে ধাক্কা খেল আর বুকের কোথায় কোথায় ছড়িয়ে গেল তা স্পষ্ট টের পেল নাহিদ।
জুলফিকর সাহেবের কণ্ঠস্বরে এবার কিছুটা পরিবর্তন এল, এরপর পাত্রী নির্বাচনের আগে ভালো করে বুঝে-শুনে নিতে হবে; এত ছোট মেয়ে বিয়ে করা ঠিক না। গ্রাজুয়েশন কম্পিলিট হয়েছে, কিংবা অন্তত থার্ড ইয়ারটা শেষ হয়েছে এমন মেয়ে খুঁজো।
নাহিদ বড় মামার সঙ্গে কখনও ফ্রি হয়ে কথা বলেনি। কথা বলা কি, তার সামনেই কখনও সাবলীলভাবে বসতে পারেনি। ছোটবেলা থেকে বড় মামার চোখের দিকে তাকালেই কেমন যেন একটা ভয় লাগে নাহিদের। ছোটবেলায় যতবার তার সামনে পড়েছে ততবারই দু-চারটি ট্রান্সেলেশন জিজ্ঞেস করেছে। নাহিদ লেখাপড়ায় বেশ ভালো, মামার অধিকাংশ প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলেও কেমন যেন নার্ভাস লাগত, লজ্জা লাগত, একটা ভয় ছেয়ে যেত মুখাবয়ব জুড়ে। এত বড় হয়েছে, স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছে, তবু সেই ভিতিটা আজও কাটেনি।
মামার দিক থেকে চোখ নামিয়ে টি-টেবিলের কাচে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে বলে, আমি তো তা-ই চাচ্ছিলাম মামা। কিন্তু মা’র তাতে মত নেই।
নিলুফা বেগম এবার রেগে উঠলেন, মা’রই তো সব দোষ, কিছু হলে বাবা-ছেলে মিলে আমাকেই দোষ দেবে!
জুলফিকর সাহেব বোনকে থামান, হয়েছে হয়েছে, এসব কথা বলে এখন লাভ নেই। ভবিষ্যতে কী করবে তাই চিন্তা করো।
জুলফিকর সাহেব পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা খাম বের করে শফিক সাহেবের হাতে দিলেন।
শফিক সাহেব জিজ্ঞেস করেন, এটা কী ভাইজান?
আমজাদ পাঠিয়েছে। খামটা আমি খুলিনি। অনুমান করছি আংটি ফেরত পাঠিয়েছে।
শফিক সাহেব খামটি হাতে নিলেন। খুলতেই বেরিয়ে এলো আংটি ও নাকফুলের বক্স। সঙ্গে চিরকুট, সমান্যই লেখা- ক্ষমা করো বন্ধু, লজ্জায় আমি মুখ দেখাতে পারছি না।
ঘটনার পর থেকে কেবল রাগ হচ্ছিল শফিক সাহেবের, কিন্তু এই মুহূর্তে বন্ধুর জন্য মায়া হলো ভীষণ।
নিলুফা বেগম বক্স দুটি নিজের হাতে নিলেন, খুলে হাতে নিয়ে দেখলেন ঠিক আছে কি-না।
নিলুফা বেগমের খালাতো বোনসহ উপস্থিত মহিলারা যারা আগে দেখেনি সবাই নিজ নিজ হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল আর অনুমান করার চেষ্টা করল ক’আনা হতে পারে। জুলফিকর সাহেব না থাকলে হয়তো এগুলো নিয়ে আরও অনেক কথা হতো। তবু যা হয়েছে তাতেই বেশ বিনোদন নিয়েই বাড়ি ফিরতে পারবে একেকজন।
বক্স দুটি ঘুরে ঘুরে আবার নিলুফা বেগমের হাতে এল। নিলুফা বেগম একবার ভাবলেন, নিজের কাছে রেখে দেবেন, তারপর কি ভেবে নাহিদকে বললেন, নে এগুলো তোর কাছেই রাখ।
আমি এগুলো দিয়ে কী করব?
নাহিদের ছোট বোন দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়ানো ছিল, এবার মুখ ফুটল, তোমার কাছেই রাখ ভাইয়া, সুযোগ মতো কাউকে পরিয়ে দিও।
নাহিদ ও জুলফিকর সাহেব ছাড়া ঘরভর্তি সবাই একযোগে হেসে উঠল।
অন্য সময় হলে জোরে একটি বকা দিত, কিন্তু নাহিদের অন্তরজুড়ে এখন লজ্জা, সংশয়, ভয়; তাছাড়া মনের কোথায় কোথায় মেঘ জমেছে নিজেই জানে না।
নাহিদ বলে, মা, আমি তো কদিন পরেই অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি। এগুলো আমার কাছে রেখে কী করব?
তোর রুমে লকারে আটকে রাখবি। নে ধর।
হাত বাড়িয়ে নাহিদ বাক্স দুটি ধরে।
নিলুফা বেগম অবাক, এ কি! তোর হাতে এখনও অ্যানগেজমেন্টের আংটি?
নাহিদের মুখাবয়বে এবার আরও লজ্জা ভর করে।
শফিক সাহেব বলেন, ওরা যেহেতু ফেরত পাঠিয়েছে, আমাদেরও তো দ্রুত ফেরত পাঠানো উচিত।
নিলুফা বেগম বলেন, ভাইজানের মাধ্যমে যেহেতু ওরা ফেরত পাঠিয়েছে। আমরাও ভাইজানের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই।
সবাই এক বাক্যে সায় দিলো, সেটাই ভালো হবে।
নাহিদের আঙ্গুলে আংটিটি এখনও ঝলমল করছে। নাহিদ একবার সবার চোখের দিকে তাকিয়ে আংটির দিকে তাকায়। যেন বিদ্যুৎ বের হচ্ছে আংটি দিয়ে, সেই বিদ্যুৎ ছড়িয়ে যাচ্ছে আকাশে। জগত জুড়ে মেঘ ডাকছে, বজ্র বিদ্যুতে কেঁপে উঠছে ভূমি।
সবাই নাহিদের দিকে তাকানো। নাহিদ নিজের আঙুলের দিকে পলকহীন তাকিয়ে। কারও দিকে না তাকিয়ে বলে, আংটি আমিই নিজেই ফেরত দিই?
সবাই বিব্রত। একে অন্যের দিকে তাকায়।
নিলুফা বেগম বলেন, তুই আবার কীভাবে ফেরত দিবি? তোর মামা ফেরত দিক?
জুলফিকর সাহেব বলেন, ও দিতে চাচ্ছে দিক না? ওর তো কোনও কথাও থাকতে পারে।
ওদের সঙ্গে আর কী কথা থাকতে পারে ভাইজান?
তুমি মাথা গরম করো না নিলুফা। বিয়ে হবে না ঠিক আছে, আমজাদের সঙ্গে শফিকের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা তো আর মিথ্যে হয়ে যাবে না।
এই ঘটনার পর কি বন্ধুত্ব রাখা যায়?
শফিক সাহেব বলেন, আমজাদের মনের অবস্থাটাও তো তোমায় বুঝতে হবে নাহিদের মা। না পারছি ওর বাসায় যেতে না পারছি সান্ত¦না দিতে। ফোন করতেও দ্বিধা লাগছে। মেয়েটা ওকে কোথায় নামালো বলো?
আর তোমার কিছু হয়নি? এ পরিবারের কিছু হয়নি? কাল থেকে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না। রাগে গজ গজ করেন নিলুফা বেগম।
শফিক সাহেব বলেন, তুমি থামো এবার নাহিদের মা।
না, থামব কেন আমি? থামব কেন? আমারই তো সব দোষ। কাঁদতে কাঁদতে ভেতরের রুমে চলে গেলেন নিলুফা বেগম।
মুহূর্তেই নীরবতা নামে।
কিছুক্ষণ পরে জুলফিকর সাহেব বলেন, বুঝলে ভাগনে, তোমার মা খুব কষ্ট পেয়েছে, খুব অপমানিত হয়েছে। আমাদেরই বা কি করার আছে বলো। সবই ভাগ্য। তুমি তো আরও দিন-পাঁচেক আছ, এক কাজ করো আগামি দিন সবাই আমাদের বাড়ি চলো, দুদিন থেকে আসবে। এই মুহূর্তে মানসিক রিফ্রেশ দরকার।
বড় মামি কখন এসে শোফার এক পাশে বসেছে খেয়াল করেনি নাহিদ। এবার তার কথায় ঘুরে তাকালো। মামি বলেন, হ্যাঁ আগামি দিনই চলো সবাই। গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
নাহিদ বলে, সরি মামি, আপনি কখন এলেন, একদম খেয়াল করিনি।
সরিটরি পরে হবে, আগে চলো আমাদের বাড়ি, দুদিন থাকবে, দেখি এর মধ্যে পাত্রি খুঁজে পাই কি-না। প্রয়োজনে একবারে বিয়ে দিয়ে ছাড়বো। বিষ পান করার সময়ই দেবো না।
নাহিদ বলে, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে দেখেন, তারা যেতে পারবে কি-না।
শফিক সাহেব বলেন, আমার তো অফিসে বিস্তর কাজ পড়ে আছে ভাবি। ওরা যাক।
না না, তা হবে না, এবার যেতেই হবে ভাই। কোনো অজুহাত শুনব না। মাত্র তো ঘন্টাখানেকের পথ। প্রয়োজনে দুটো দিন আপনি ওখানে থেকেই অফিস করবেন।
দেখুন নাহিদের মায়ের সঙ্গে কথা বলে।
নাহিদ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। পাশেই পড়ে রয়েছে আংটি ও নাকফুলের বাক্স দুটি। নাহিদ নিজ হাতে আফরিনের অনামিকায় পরিয়ে দিয়েছিল আংটিটি। পরাতে গেলে আফরিন লজ্জায় লাল হয়েছিল। যেন নাহিদের সামনে ফুটেছে এক পারস্য রক্তগোলাপ। নাহিদ আংটি পরানোর কথা ভুলে তাকিয়ে রইল। ফটোগ্রাফার ক্যামেরা তাক করে বসে আছে, কিন্তু নাহিদের কোনো হুশ নেই। কেউ একজন বলে বসল, দেখার জন্য সারা জনম পড়ে আছে, এবার আংটিটা পরিয়ে আমাদের উদ্ধার করো ভাই। ঘরময় হাসির রোল পড়ে গেল। নাহিদের চোখে-মুখে ছড়িয়ে গেল লজ্জা। কেউ একজন বলল, কিরে আফরিন, হাতটি ভালো করে তুলে ধর। আফরিন কি একটু কেঁপে উঠেছিল? মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আফরিনের ভীষণ খারাপ লাগছিল? আফরিনের কি কান্না পাচ্ছিল? নতুন এক সম্পর্কের উত্তেজনায়, লজ্জায়, আফরিনের গোলাপ মুখের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নসমুদ্রে ডুবে বিভোর হতে হতে কিছুই বুঝতে পারেনি নাহিদ। নাহিদ তো আর মনপাঠক না, জ্যোতিষীও না- ওর ভাবনায় ছিল কুমারীর ভালোবাসায় রঙিন হয়ে তার স্বপ্নসমুদ্র জয় করা। নাহিদ আলতো ছুঁয়ে আফরিনের অনামিকায় পরিয়ে দিলো বন্ধন। আফরিনও নাহিদের অনামিকায় পরিয়ে দিলো বন্ধন। নাহিদ কি জানত সকল বন্ধন বাঁধতে পারে না!
এখনও নাহিদের অনামিকায় আফরিনের পরিয়ে দেওয়া আংটি। একবার ভাবে খুলে ফেলবে, কিন্তু খুলতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে- মন কিছুতেই এই জটিল সত্য মানতে চায় না। মনকে বুঝায়, শাসন করে; কিন্তু আফরিনকে দেখার পর থেকে দিনদিন অবাধ্য হচ্ছে মন। আংটি বিনিময়ের পর থেকে যেন আফরিনই হয়ে উঠেছে প্রতি মুহূর্তের ধ্যান। এমনটি তো হয়নি কখনও। মনেপড়ে নাহিদের, প্রথম যেদিন প্রেমে পড়ে, মাধ্যমিক পাস করে কেবল কলেজে ভর্তি হয়েছে। প্রথম ক্লাস করতে গিয়ে সহপাঠী মনিরার সঙ্গে পরিচয়। অসংখ্য ছেলে তখন অপরূপা মনিরার দিকে তাকিয়ে থাকছে ক্লাসে, মাঠে, পথে। মনিরাকে একবার দেখার জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকছে প্রেমপ্রত্যাশীরা। একটু কথা বলতে পারলেই তারা ধন্য। মনিরার ছবি হৃদয়ে বাঁধাই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে একেকজন। এত প্রতিযোগিতার পর নাহিদই বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল মাত্র দুমাসের। দুমাস যেতে না যেতে মনিরার বিয়ে হয়ে গেল। নাহিদের ভীষণ খারাপ লেগেছে। গোপনে কেঁদেছে। কাছের বন্ধুরা সঙ্গ দিয়েছে, সান্ত¦না দিয়েছে; তারপর একদিন শুকিয়ে গেছে ক্ষত।
কিন্তু আজ নাহিদ কাঁদতে পারছে না। কাউকে বলতে পারছে না। শুধু একা একা পুড়ছে। মুনিরার সঙ্গে ছিল কৈশোর-প্রেম। সে বয়সে যদি মনকে শাসন করতে পারে, আজ কেন পারবে না নাহিদ? নাহিদের মনে পড়ে মারিয়ার কথা। অস্ট্রেলিয়ায় ভর্তি হওয়ার এক বছরের মাথায় মারিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। মারিয়ার অনেককিছুই ভালো লেগেছিল নাহিদের। নাহিদ চেয়েছিল সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায়েই থাকুক- কোনো প্রেমের বন্ধন নয়, বিয়ে নয়, লিভ-টুগেদার নয়। কিন্তু মারিয়া ভুলিয়ে ভালিয়ে নাহিদকে সেদিকেই নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
বার্ষিক শিক্ষাসফরে একটা বাংলোয় উঠেছিল ওরা। সারাদিন খুব মজা করল। রাতের নির্জনে নাহিদ চাঁদ দেখছিল আর দেশের কথা ভাবছিল। কখন মারিয়া এসে ওর পেছনে দাঁড়ায় খেয়াল করেনি। মারিয়া ওর চোখ চেপে ধরে। নাহিদ হাত দিয়ে ছাড়াতে গেলে মারিয়ার হাতের স্পর্শ পায়। মারিয়া আরও শক্ত করে চেপে ধরে। পিঠের সঙ্গে শরীর মিলিয়ে দেয়। নাহিদ বলে, ছাড়ো মারিয়া, আমি তো বুঝতেই পারছি তুমি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। মারিয়া চোখ ছেড়ে নাহিদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আবেদনময়ী রাতপোশাকে মারিয়ার প্রস্ফুটিত ত্বকে বয়ে যায় জোছনার ঢেউ। নাহিদ কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারে না। এমন নান্দনিক দৃশ্য কখনও দেখিনি নাহিদ। নাহিদের মুগ্ধ দৃষ্টিতে ক্রমেই প্রস্ফুটিত হতে থাকে মারিয়া, নাহিদকে বিভোর করে দেয় মারিয়ার বুকের গোলাপ আর তার সুরভী। রাত ওদের উসকে দেয়, নির্জনতা উসকে দেয়, আবেদনময়ী জোছনা উসকে দেয় নন্দনকলায়। মারিয়া নাহিদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শেষ সীমা ছোঁয়ার আগেই নাহিদের ঘোর কাটে। ভাবে, এত দিনের ধৈর্য কি এভাবেই শরীরের তাপে গলে যাবে? নাহিদ মারিয়াকে ছেড়ে দেয়। মারিয়া ছাড়ে না তবু। নাহিদ মারিয়াকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। মারিয়া শক্তিশালী বাঘিনী তখন। নাহিদ যত বল প্রয়োগ করে মারিয়া ততই জড়িয়ে ধরে। অনেক প্রচেষ্টায় নাহিদ উঠে দাঁড়ায়। মারিয়া আবারও এগিয়ে এলে নাহিদ ধাক্কা দিয়ে মারিয়াকে ফেলে দেয়। মারিয়া উঠে দাঁড়ায়। দ্রুত শ্বাস নেয়। ক্রোধে ঘামতে থাকে। চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে নাহিদের এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। দারুণ অপমানবোধ করে। লজ্জায় মুখজুড়ে বিষাদ নেমে আসে। কাঁদতে কাঁদতে নাহিদের কাছ থেকে চলে যায়। তারপর আর কোনোদিন নাহিদের সামনে আসেনি মারিয়া। নাহিদ অনেকবার কথা বলার চেষ্টা করেছে- প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে মারিয়া।
এরপর কতো সুন্দরী মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছে; নাহিদ একটা সচেতন স্তর পর্যন্ত সম্পর্ক গড়িয়েছে। নাহিদ পণ করেছে- চূড়ান্ত সম্পর্ক হবে একটি দেশি মেয়ের সঙ্গে, তাকে বিয়ে করবে, সংসার সাজাবে, মন-প্রাণ-ত্বকের সকল ভাষা ভাগাভাগি করে নেবে।
সেই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনে গুনে যেদিন আফরিনকে প্রথম দেখল, আফরিনের চোখ, নাক, ঠোঁট, চিবুক, চিবুকের তিল, কান, কানের দুল, হাত, হাতের আঙুল সবকিছু ফটোকপি হয়ে গেল নাহিদের চোখে। আফরিনের কণ্ঠ কানে গেঁথে গেল। মনে হলো এই রূপবতীর জন্যই এতকাল প্রতীক্ষায় ছিল। একটা তীব্র ভালোলাগা ছড়িয়ে গেল শরীরজুড়ে। যেন সমুদ্রে একটা ঝড় উঠেছে, তা ক্রমশ আরও ঘনীভূত হয়ে সুপার সাইক্লোনে রূপ নিয়ে হৃদয়জুড়ে আঘাত করছে ভালোবাসি... ভালোবাসি... ভা-লো-বা-সি...।
যেদিন আংটিটা আফরিনের হাতে পরিয়ে দিলো, আফরিনের কোমল হাতের স্পর্শে নাহিদ নতুন করে জেগে উঠল, একটা আংটির বন্ধনে যেন অধিকার প্রতিষ্ঠা করল- আজ থেকে তুমি আমার, তোমার সকল আনন্দ-বেদনা আমার, তোমার গোপন প্রান্তর, তোমার অব্যক্ত কথামালা আমার। নাহিদ আফরিনের চোখে ডুবতে ডুবতে যখন ডান হাতটা তুলে ধরল, আর আফরিন নাহিদের আঙুলে আংটি পরিয়ে দিলো, আফরিনের কোমল হাত নাহিদের কঠিন হাতে ছোঁয়া দিলো, কোমলে-কঠিনে সংলাপ শুরু হলো, শিহরণ ছড়িয়ে গেল বিদ্যুতের বেগে, হাত হয়ে নিউরনে, নিউরন হয়ে আত্মাময়। আংটির বন্ধনে যেন আফরিন জানিয়ে দিলো- আজ থেকে দুজনার ব্যক্তিগত যা কিছু সব আমাদের। তোমার সকল বিষাদ আমার বুকের ভেতর রেখে দিও, সুখ বানিয়ে আমি তা তোমার গলায় পরিয়ে দেবো।
সব ভুল। সব মিথ্যে। নাহিদ কেবল আরব্য রজনীর কল্পনার গালিচায় ভেসেছে। বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি আফরিনের হৃদয়জুড়ে অন্য আলো, যার দ্যুতিতে আফরিন ঝলমল করছে; আফরিনের বাগান জুড়ে অন্য ফুলের সৌরভ, যা বাড়িয়েছে ওর ঠোঁটের মাধুরী।
নাহিদের আঙুলে জড়ানো আংটিটায় আফরিনের ছোঁয়া চিৎকার করছে। দুদিনেই যেন আফরিনময় হয়ে উঠেছে জীবনটা। নাহিদ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছে, বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে, কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না নিজেকে। ওর জন্যই বিষ খেতে হলো মেয়েটার। ভেবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে নাহিদ। আবার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। দীর্ঘসময় নিয়ে একান্তে কথা হয়েছে দুজনার মধ্যে- কই, একটিবারও তো বলেনি ওর সম্পর্কের কথা- জানালে এতটা পথ এগুতো না নাহিদ। এক মুহূর্তও আর দেশে থাকতে ইচ্ছে করছে না নাহিদের।
মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসে সাগর-আফরিন। ওদের দেখতে বন্ধুরা আসে দল বেঁধে। কিছুক্ষণ ওরা আফরিনের কাছে যায়, কিছুক্ষণ সাগরের কাছে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে সাগর জেনে যায় আফরিনের কথা, আফরিনও জেনে যায় সাগরের কথা। দুজনেই শুয়ে শুয়ে ভাবে- শেক্সপিয়র ব্যর্থ ছিলেন, ওরাই যেন এ শতাব্দীর সফল রোমিও-জুলিয়েট।
নাহিদ বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দিকে এলোমেলো ঘুরেফিরে সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারে আফরিন এখন অনেকটাই সুস্থ। বিকেলে রিলিজ নিয়ে বাসায় ফিরে গেছে। সাগরের নামটা জানা ছিল না, হাসপাতালে এসে জানতে পারে নাহিদ।
আফরিনের বাসায় যাবে কি যাবে না ভেবে পায় না নাহিদ। একবার আফরিনের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, সাগরের কথা মাথায় আসতেই সে ব্যাকুলতা উবে যায়। কিন্তু বাসায় বলে এসেছে আংটি-কানের দুল নিজেই ফেরত দেবে। এখন কীভাবে ফেরত দেয়? কিছু চিন্তা না করে আফরিনের বাবার নম্বরে ফোন করে নাহিদ।
দুইবার রিং বাজলে আমজাদ সাহেব রিসিভ করেন, হ্যালো।
আংকেল, আমি নাহিদ।
বল বাবা।
আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কষ্ট করে বাসায় আসতে পারবে? আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত বাবা। অবশ্য তোমার যদি অস্বস্তি লাগে বা কোনো আপত্তি থাকে তবে আমিই বের হচ্ছি। কী করে যে তোমায় মুখ দেখাই!
আমজাদ সাহেবের কণ্ঠ কাঁপছে। হয়তো জলও বেরিয়েছে চোখ বেয়ে। নাহিদ এ প্রান্ত থেকে টের পায় সঙ্কোচমাখা দীর্ঘশ্বাস।
নাহিদ বলে, আংকেল আপনি স্বাভাবিক হোন। এভাবে ভেঙে পড়লে তো আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন। ঠিক আছে, আমি আসছি।
নাহিদ ছোটবেলা থেকে আমজাদ সাহেবকে আংকেল বলে ডাকে। সঙ্কোচ ছিল কীভাবে বাবা ডাকে রূপান্তর করবে। অ্যানগেজমেন্টের দিন সবাই যখন বলল এখন আর আংকেল ডাক চলবে না। নাহিদ সেদিন সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে বাবা ডেকেছিল। কিন্তু আজ কখন যেন আবার আংকেলে রূপান্তরিত হলো একদম ভাবনায় আসেনি।
আফরিনকে যেদিন আনুষ্ঠানিক দেখতে এসেছিল সেদিন নাহিদের সামান্য সঙ্কোচ ছিল, যেদিন অ্যানগেজমেন্ট হলো সেদিন প্রবল সঙ্কোচ ছিল, কিন্তু আজকের সঙ্কোচের কোনো তুলনা হয় না। বাসার কাছাকাছি এসে আর পা এগুচ্ছে না, মনে হচ্ছে ফিরে যায়, কিন্তু আমজাদ সাহেব কে যে কথা দিয়েছে।
ডোরবেলে হাত রাখতেই বাসার ভেতরে নয় যেন বেল বেজে উঠল নাহিদের বুকের ভেতর। সাহিদা বেগম দরজা খুললেন। তার মুখাবয়বে আষাঢ়ের মেঘ। নাহিদের দিকে ছলছল চোখে তাকালেন।
এসো বাবা, ভেতরে এসো।
নাহিদকে ড্রইং রুমে বসতে দিয়ে সাহিদা বেগম ভেতরে গেলেন। নীরব একটা বাড়ি। অথচ কী জাঁকজমক থাকার কথা ছিল। এখন যেন মুমূর্ষের মতো শ্বাস নিচ্ছে তীব্র যন্ত্রণায়।
সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর মতো গুটি গুটি পায়ে আমজাদ সাহেব সামনে এলেন। নাহিদ উঠে দাঁড়াল। কিছুই বলতে পারছে না কেউ। নাহিদ লক্ষ করছে আমজাদ সাহেবের চোখ ফুলে উঠে রক্তাভ বর্ণ ধারণ করেছে। একদিনেই তাকে চেনা যাচ্ছে না। আমজাদ সাহেবের মুখ যেন আটকে আছে কঠিন আঠায়, চেষ্টা করেও মুখ খুলতে পারছেন না।
অনেক প্রচেষ্টায় মুখ খুললেন আমজাদ সাহেব- এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়াতে হবে জীবনে ভাবিনি কোনোদিন। কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল! আমাকে তুমি মাফ করো বাবা। বড্ড অপরাধ করে ফেলেছি।
আমজাদ সাহেব কাঁদছেন। নাহিদের চোখও জলে ভেসে গেছে। দেয়াল ঘড়িতে ঘন্টা পূর্ণ হওয়ার বেল বাজল, কয়টা বেল পড়ল নাহিদ হিসেব করতে পারল না। বিকেল থেকে ঘড়ির দিকে তাকায়নি, অনুমান করতে পারছে না কয়টা বাজে। ঘড়ির দিকে চোখ ঘুরাল, কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আছে চোখের জলে।
আমজাদ সাহেব এবার নাহিদের হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, আমায় ক্ষমা করে দিও বাবা, ক্ষমা করে দিও...
সাহানা বেগম ট্রে হাতে ফল নিয়ে আসে। স্বামীকে এমন করতে দেখে বলেন, আহা কি করছ তুিম? ছেলেটা এসেছে, ওকে স্বাভাবিক ভাবে বসতে দাও। বসো নাহিদ।
আমজাদ সাহেব বলেন, ওদের কাছে যে আমরা অপরাধী হয়ে থাকলাম।
নাহিদ শোফায় বসতে বসতে বলে, না আংকেল, এখানে আপনাদের কোনো দোষ নেই। আসলে সবই আমাদের ভাগ্য। তবু আফরিন বেঁচে আছে এটাই সবচেয়ে বড় অনন্দ। আমজাদ সাহেব আবার গুটি গুটি পায়ে ভেতরের রুমে চলে গেলেন।
সাহিদা বেগম বলেন, খাও বাবা। নাহিদের খাওয়ার বিন্দুমাত্র রুচি নেই। ফলের টুকরাগুলো তাকিয়ে আছে নাহিদের দিকে। নাহিদ ভাবে, আজ এ বাড়ির জামাই থাকার কথা- সেখানে পরিচয় এখন বহিরাগত।
সাহিদা বেগম আরও একবার খেতে বললে নাহিদকে একটুকরো ফল মুখে দিতে হয়।
নাহিদ জিজ্ঞেস করে, আফরিন এখন কেমন আছে আন্টি?
শরীর এখনও খুব দুর্বল। সুস্থ হতে এখনও হয়তো কিছুদিন লাগবে।
নাহিদ লক্ষ করে, কথা বলতে গিয়ে আন্টির কণ্ঠও ভারি হয়ে উঠছে।
সাহিদা বেগম বলেন, কী ভূত চেপেছিলো মেয়েটার মাথায়, বাবা-মায়ের কথাও একবার ভাবল না।
সাহিদা বেগমের চোখ বেয়ে জল নেমে আসে। আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বলেন, তোমার আংকেল এই ধাক্কা যে কীভাবে সামলে উঠবেন, তাই ভাবছি।
নাহিদ কোনো কথা বলতে পারে না, কী বলবে বুঝতে পারে না।
সাহিদা বেগম বলেন, তোমার তো অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় হয়ে এলো।
হ্যাঁ আন্টি, একুশ তারিখ দেশ ছাড়ছি, বাড়ি থেকে বিশ তারিখ যাব।
আবার কিছু সময় কেটে যায়। সাহিদা বেগম বলেন, তুমি বসো, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি।
নাহিদ বলে, আমি একটু আফরিনের সঙ্গে দেখা করতে চাই আন্টি।
সাহিদা বেগম নাহিদকে নিয়ে আফরিনের রুমে যায়। আফরিন শুয়ে ছিল, উঠে বিছনায় বসে।
নাহিদ বলে, আহা উঠতে হবে না, তুমি শুয়ে থাকো। তবু বিছানায় উঠে বসে বিদ্ধস্ত আফরিন। যে মৃত্যুযন্ত্রণা বয়ে গেছে তার ছাপ রয়ে গেছে শরীরজুড়ে। এলোমেলো চুল দেখে চেনাই যাচ্ছে না আফরিনকে। আফরিন যেন অন্তর জুড়ে কাঁদছে। ওর শরীরের প্রতিটি লোমকূপ কাঁদছে। এই মুহূর্তে হয়তো নিজের চেয়েও সাগরের জন্য বিচলিত।
সাহিদা বেগম একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বসতে বলেন। নাহিদ বসে।
আমি চা করে আনছি। তোমরা কথা বলো। সাহিদা বেগম এলোমেলো বিছানাটা টেনে সোজা করতে করতে বলেন। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে যান।
কি বলবে নাহিদ বুঝতে পারছে না। আফরিন মাথা নিচু করে বসে আছে। বাইরে কোথাও রবীন্দ্র সংগীত বাজছে। জানালা ডিঙিয়ে তার সুর এসে বুকে বিঁধছে আর উসকে দিচ্ছে ক্ষরণ।
যদি তারে নাই চিনি গো, সে কি...
সে কি আমায় নেবে চিনে
এই নব ফাল্গুনের দিনে?
জানি নে জানি নে
নাহিদ বলে, তুমি অন্তত আমার সাথে শেয়ার করতে, এই বিপদে কেন পড়তে গেলে বলো?
আফরিন এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল, আমি কেন মরে গেলাম না?
তুমি মরে গেলে কী হতো? আমরা কষ্ট পেতাম, তোমার মা-বাবার কী হতো? তুমি তো তাদের একটাই সন্তান। তারপর আইনের ঝামেলা। লোকলজ্জা।
এখনই বা মানুষের সামনে দাঁড়াব কীভাবে?
তুমি মারা গেলে তোমার মা-বাবা যেভাবে দাঁড়াতেন। কিংবা এখনও যেভাবে দাঁড়াবেন। তুমি দাঁড়াবে তোমার মা-বাবার মুখের দিকে চেয়ে আর তারা দাঁড়াবেন তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আপনার যে ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেল।
ক্ষতিটা দেখলে, ক্ষতটা দেখলে না।
চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আফরিনের কিছুই বলার থাকে না। জানালা থেকে গান ভেসে আসছে-
সে কি আমার কুঁড়ির কানে কবে...
সে কি আমার কুঁড়ির কানে
কবে কথা গানে গানে
পরান তাহার নেবে কিনে
এই নব ফাল্গুনের দিনে?
জানি নে জানি নে
নাহিদ হাতটা আফরিনের সামনে তুলে ধরে। আংটিটা ঝলমল করে ওঠে। তার ঝলকে চমকে ওঠে আফরিন।
নাহিদ বলে, তুমি পরিয়ে দিয়েছিলে, এবার তুমিই খুলে নাও।
প্রতিশোধ নিচ্ছেন।
সবার উপর প্রতিশোধ নেওয়া যায় না।
নাহিদ হাতটা তুলেই ধরে থাকে।
আফরিন বলে, আমার সহ্য করার ক্ষমতা নেই। আংটিটার প্রতি ঘৃণা জমলে আপনি প্লিজ খুলে রেখে যান।
ঘৃণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কীভাবে ঘৃণা করা সম্ভব? সত্যি আফরিন তোমাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি।
গানের স্বর আরও উঁচু হয়েছে-
সে কি আপন রঙে ফুল রাঙাবে?
সে কি মর্মে এসে ঘুম ভাঙাবে?
আপন রঙে ফুল রাঙাবে?
সে কি মর্মে এসে ঘুম ভাঙাবে?
আফরিনের চোখ দিয়ে জল ঝরছে। সাহিদা বেগম চা হাতে এলে আফরিন ওড়নায় মুখ লুকাল। নাহিদ বিব্রতবোধ করছে। সাহিদা বেগম আর দাঁড়ালেন না। চা রেখে চলে গেলেন।
নাহিদ বলে, তবে আমার এ ভীষণ ভালোবাসা সাগরের প্রতি তোমার ভালোবাসার মতো নয়, কিংবা তোমার প্রতি সাগরের ভালোবাসার মতোও নয়। আমি হয়তো কখনও বিষপান করতে পারব না।
নাহিদের চোখ ভিজে ওঠে, কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, জীবনকে উপভোগ করতে আমি যে কোনো যন্ত্রণা ধারণ করতে প্রস্তুত।
ফেরত পাঠানো গয়নার বাক্স পকেট থেকে বের করে আফরিনের সামনে রাখে নাহিদ।
আফরিন জিজ্ঞেস করে, এ গুলো? তোমার বাবা ফেরত পাঠিয়েছেন। এ গুলো তোমার জন্যই তৈরী করেছিলাম। অন্য গহনাগুলো তো আর হস্তান্তর করার সুযোগ হলো না। অন্তত এটা রাখলে আমার ভালো লাগবে। বিয়েটাই তো চূড়ান্ত না, ভাববে একজন সুহৃদ ভালোবেসে দিয়েছে, যার চূড়ান্ত ভালোবাসার শক্তি নেই।
বিপর্যস্ত মানুষকে আর কত আঘাত দেবেন? অবশ্য এতে যদি আপনার আঘাত সামান্য কমে তবে দিন, মাথা পেতে নেব।
আঘাত দেওয়ার জন্য বলিনি। এটা রাখলে সত্যি আমার ভালো লাগবে।
আমারটাও রেখে যাবেন, আপনারটাও রেখে যাবেন সে কেমন কথা? আমি যেটা দিয়েছি অন্তত সেটা নিয়ে যান।
পরতে পারব না যে?
রেখে দেবেন।
নাহিদের চোখ আবার ভিজে ওঠে। আফরিনেরও।
আফরিন ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, চা তো ঠান্ডা হয়ে গেল।
নাহিদ জোর করে হাসার চেষ্টা করে, হ্যাঁ তাইতো।
নাহিদ চলে গেলে সাহিদা বেগম আমজাদ সাহেবের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিছু বলবে?
কি সুন্দর ছেলে, দেখলে? এমন ছেলে হাজারে একটা হয়? লাখে একটা হয়?
সব কিছু নষ্ট করে দিয়ে এখন এসব বলে কী লাভ?
আফরিনকে খুব পছন্দ না করলে কি এতকিছুর পরও এ বাড়িতে আসে।
ও আংটি ফেরত দিতে এসেছিল।
তুমি মনে করেছো শুধু আংটি ফেরত দিতে? আংটি ফেরত দিতে আসে কেউ? অন্য কারও কাছেও তো পাঠিয়ে দিতে পারত? ও নিজে চলে এসেছে মূলত আফরিনের টানে।
তোমার বুদ্ধির দৌড় ওই পর্যন্তই।
আমার বুদ্ধির তুমি হিসেব করতে থাকো; তুমি জানো আফরিনের সঙ্গে ও কতক্ষণ কথা বলেছে? আমার মনে হয় আফরিন রাজি হলে এখনও বিয়ে করবে।
তোমার মাথার বুদ্ধি পুরাটাই গেছে দেখছি। আফরিনের সঙ্গে দেখা করেছে এটা ওর মানবতা, আর আফরিনকে বা আমাদেরকে দেখিয়ে গেছে ও কতো যোগ্য পাত্র ছিল, যাকে ছোঁয়ার যোগ্যতা আফরিনের নেই। এসবের পরে কোনো ছেলেই কোনো মেয়েকে বিয়ে করে না। সামান্য সম্পর্ক থাকলে সেই বিয়ে ভেঙে যায়। কেন নাহিদ ওকে বিয়ে করবে? নাহিদের মা-বাবা কীভাবে ওকে মেনে নেবে? আর তোমার মেয়ে তো তোমার মেয়ে। ওকে নিয়ে আমি আর কিছু ভাবতে চাই না। সাগর না কি নাম, বদমাশটা সুস্থ হলে বিয়ে পড়িয়ে দাও। মান-সম্মান যেটুকু ছিল সবই তো গেছে। আর কি যাবে?
কি বলছ তুমি? ওই বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে খাওয়াবে কি? মেয়েটিকে কি জলে ভাসিয়ে দেবো?
আর কি করবে? আবার কি ঘটনা ঘটায় তার ঠিক আছে?
এক বার না হয় ভুল করেই ফেলেছে। ওকে বুঝিয়ে বলি, দেখি ফেরান যায় কিনা। তুমি অতটা ভেঙে পড় না। অসুস্থ হয়ে যাবে যে। সাহিদা বেগম স্বামীর কাধ ছোঁয়। চুলে আদর দেয়।
আমজাদ সাহেব সাহিদা বেগমের হাত ধরে বলে, বড্ড অসহায় লাগছে, আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না আফরিনের মা। সাহিদা বেগমের চোখেও শঙ্কা ফুটে ওঠে। তবু স্বামীকে সান্ত¦না দেয়- দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
লাইট জ্বলছে। তবু যেন আঁধার নামছে রুম জুড়ে। নাহিদ চলে যাওয়ার পরে আফরিন কেবল ছটফট করছে। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় নাহিদকে শত্রু মনে হয়েছে আফরিনের। অ্যানগেজমেন্টের সময় শত্রু মনে হয়নি, উল্টো অপরাধবোধ কাজ করেছে; বারবার মনে হয়েছে- একটি সরল মানুষকে এভাবে ঠকাচ্ছি। কিন্তু কিছুই তো করার ছিল না আফরিনের। নাহিদের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু একটু মায়া জমেছিল। আংটিই যেন মায়া বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় নাহিদ যেন রাজ্যের মায়া ঢেলে দিয়ে গেছে। এত সবের পরেও একটা মেয়েকে এভাবে ভালোবাসা যায়- কোনোদিন ভাবনায় আসেনি আফরিনের। নাহিদের প্রতি কেমন একটা টান অনুভব করছে। আংটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে আংটিতে জেগে উঠেছে নাহিদের সজল চোখ। নাহিদের মায়া জলে ডুবতে থাকে আফরিন। হঠাৎ সাগরের মুখ ভেসে ওঠে। সাগর চিৎকার করে বলছে, আমরা মৃত্যুকে জয় করেছি আফরিন। আমরা পরীক্ষা দিয়েছি পৃথিবীর কাছে। আমরা ভালোবাসায় উত্তীর্ণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









