চার বছর আগে র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলেছেন আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমণি। তার দাবি, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় তাকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে’ ও ‘বিশেষ মহলের স্বার্থে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এতে তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শুক্রবার মধ্যরাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে পরীমণি র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি লেখেন, সম্প্রতি একটি অনলাইন টকশোতে দেরিতে হলেও আপনি এমন কিছু সত্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছে—২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীতে তার বাসায় দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর নামে নাটকীয়তার পর তৎকালীন র্যাব প্রধান ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে তাকে অন্যায়ভাবে, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং বিশেষ মহলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

পরীমণি লেখেন, পরবর্তীতে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং টানা ২০ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তার জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করেছে, তা শুধু তিনি ও আল্লাহই জানেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সত্য প্রকাশের প্রত্যাশা জানিয়ে পরীমণি বলেন, সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়। সময় লাগতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরদিন চাপা রাখা যায় না।
গ্রেপ্তারের পর নিজের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি ওই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন। যেভাবে তাকে অপদস্থ করা হয়েছে এবং তার সম্মান, নৈতিকতা ও চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীকে ব্যবহার করে একজন নারী শিল্পীর জীবন যেভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে, তিনি শুধু চান ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এমন অভিজ্ঞতার শিকার না হন।
পরীমণি আরও বলেন, এত দিন পর তিনি কোনো ক্ষোভ বা প্রতিশোধের কথা বলতে চান না। তিনি শুধু সত্য, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পক্ষে কথা বলতে চান।
রাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, হয়তো রাষ্ট্রীয় সেই সাজানো মামলা থেকে আদালত তাকে অব্যাহতি দেবেন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে জীবন, সম্মান ও মানসিক শান্তি তিনি হারিয়েছেন, তা কি আর ফিরে পাবেন? মানুষের মনে তাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে?

নিজের ভাবমূর্তি প্রসঙ্গে পরীমণি লেখেন, তিনি কখনো চাননি তার পরিচয় একজন বিতর্কিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি ঘটনার অভিঘাত তার জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার দায়ভার তাকে এখনো বহন করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কাউকে ছোট বা অপমান করতে চান না। তিনি শুধু চান, ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এ ধরনের অন্যায়ের শিকার না হন। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকুক এবং সেই আস্থার ভিত্তি হোক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও জবাবদিহি।

কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পরীমণি বলেন, পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু, সাংবাদিক ও অসংখ্য ভক্তের ভালোবাসা ও সমর্থন তাকে বারবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে তিনি লেখেন, অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে চান না। তিনি মুক্ত আকাশে পরীর মতো উড়তে চান। কাজ, সন্তান, পরিবার ও দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চান।

স্ট্যাটাসের শেষ অংশে পরীমণি লেখেন, সত্যকে কখনো চিরদিন চাপা রাখা যায় না। ন্যায়বিচারের পথে হাঁটা কখনো বৃথা যায় না। সবাই যেন তার জন্য দোয়া করেন, যাতে আরও ভালো কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারেন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমণিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া ঢাকা বোট ক্লাবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া দুটি মামলাও বিচারাধীন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









