টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে টানা সাত দিন ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন কক্সবাজারের প্রায় তিন লাখ মানুষ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি থাকলেও কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ রয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যায়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় স্থানীয় সোলতান আহমদের দুই বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন সকালে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের তিন বছর বয়সী ছেলে পুষ্পর মৃত্যু হয়। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর বাইরে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও এখনো পানির নিচে রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে আরও সময় লাগবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এক লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। তাদের মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে পানিবন্দি মানুষের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।
তিনি জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









