কিছু যাত্রা আমাদের পাহাড়, নদী কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যায়। আবার কিছু যাত্রা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের ভেতরে—স্মৃতি, বিবেক আর আশার গভীরে। ইমতিয়াজ আলীর নতুন চলচ্চিত্র ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ ঠিক তেমনই একটি যাত্রার গল্প। এটি শুধু হারিয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরে যাওয়ার গল্প নয়; বরং একটি দেশের নিজের মানবিক চেতনায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এই ছবিটি অতীতের ক্ষতকে উসকে দেওয়ার পরিবর্তে মনে করিয়ে দেয়—স্মৃতির আসল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, মানুষকে আরও মানবিক করে তোলা।
‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সমাজে হতাশা, অবিশ্বাস এবং বিভাজনের রাজনীতি ক্রমশ বাড়ছে। এই চলচ্চিত্র তাই কেবল দেশভাগের গল্প নয়, বরং আশারও গল্প।
ছবিটি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় এম. এস. সাত্যুর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘গরম হাওয়া’ এবং সাদাত হাসান মান্টোর কালজয়ী গল্প ‘টোবা টেক সিং’। ইমতিয়াজ আলীর নির্মাণ এবং নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত ‘কিনু’ চরিত্রটি যেন সেই সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের উত্তরাধিকার বহন করে। এখানে অনুকরণ নয়, বরং মানবিকতার একই ধারার নতুন প্রকাশ দেখা যায়।

ছবির নামই যেন একটি প্রতিশ্রুতি—‘আমি আবার ফিরে আসব।’
কিন্তু কে ফিরে আসবে? একজন উদ্বাস্তু মানুষ? হারিয়ে যাওয়া প্রেম? অতীতের স্মৃতি? নাকি সেই ভারতের স্বপ্ন, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বাস করতে পারত? ইমতিয়াজ আলী এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন না। বরং দর্শককেই ভাবতে দেন। ধীরে ধীরে বোঝা যায়, এই ফিরে আসা কোনো ভৌগোলিক প্রত্যাবর্তন নয়। এটি মানবিক মূল্যবোধে ফিরে আসার আহ্বান—সহমর্মিতা, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে ফিরে যাওয়ার আহ্বান। আজকের পৃথিবী দ্রুতগতির। আমরা দ্রুতগতির সড়ক, উন্নত প্রযুক্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই যেন আমরা কোথায় যাচ্ছি, সেই প্রশ্নটি হারিয়ে ফেলেছি।
স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে ভারতের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা শুধু একটি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা ছিল না। সেটি ছিল এমন একটি সমাজ গড়ার স্বপ্ন, যেখানে ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ হবে না; বরং একসঙ্গে বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে উঠবে। এই ভাবনা কখনোই মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ নেই—এমন ধারণার ওপর দাঁড়ায়নি। বরং শত শত বছরের সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা থেকেই এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, ভিন্নতা নিয়েও মানুষ শান্তিতে একসঙ্গে থাকতে পারে আজ সেই আত্মবিশ্বাস অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। আর ঠিক এই কারণেই ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’-র মতো একটি চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছবিটি কোনো বক্তৃতা দেয় না, কোনো রাজনৈতিক ভাষণও শোনায় না। এটি শুধু অতীতকে মনে করিয়ে দেয়। আর সহমর্মিতার সঙ্গে স্মৃতিচারণ অনেক সময় তর্কের চেয়েও গভীর প্রভাব ফেলে। তবে স্মৃতি নিজে কখনো নিরপেক্ষ নয়। একটি জাতি কীভাবে তার অতীতকে মনে রাখে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এক ধরনের স্মৃতি মানুষকে মুক্ত করে, আরেক ধরনের স্মৃতি তাকে ঘৃণার বন্দি বানায়। একটি স্মৃতি ভবিষ্যতের পথ দেখায়, অন্যটি মানুষকে অতীতের ক্ষতের মধ্যেই আটকে রাখে। উপমহাদেশের দেশভাগ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। এতে লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, অসংখ্য পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, পরিচিত জনপদ একদিনে সীমান্তের দুই পাশে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু দেশভাগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ভূখণ্ডের ছিল না। আরও বড় ক্ষতি ছিল মানুষের মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া। দেশভাগ নিয়ে যাঁরা শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা কখনোই ঘৃণাকে উসকে দেননি।
মান্টোর ‘টোবা টেক সিং’ আমাদের কাউকে ঘৃণা করতে শেখায় না। বরং ঘৃণার অসারতা বুঝতে শেখায়। দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিষণ সিং যেন ভারত ও পাকিস্তান—দুই রাষ্ট্রেরই বিবেক হয়ে ওঠেন। একইভাবে অমৃতা প্রীতমের বিখ্যাত কবিতা প্রতিশোধের আহ্বান নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া মানবিকতার জন্য গভীর শোক। ভীষ্ম সাহনির ‘তমস’ দেখায়, যখন ভয় যুক্তিকে হারিয়ে দেয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এই লেখকরা পুরোনো ক্ষতকে আবার রক্তাক্ত করতে চাননি। তাঁরা চেয়েছেন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই ক্ষত সারিয়ে তুলতে, যাতে স্মৃতি ঘৃণার উত্তরাধিকার না হয়ে পুনর্মিলনের শক্তি হয়ে ওঠে। ঠিক এই জায়গাতেই ইমতিয়াজ আলীর ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ দেশভাগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাজ কষ্টকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং সেই কষ্ট যেন ভবিষ্যতের ভাগ্য হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা। একটি পরিণত সমাজ তার ট্র্যাজেডিকে কখনো ভুলে যায় না। তবে সেই ট্র্যাজেডিকেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি বানায় না। স্মৃতির প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা মানুষের মধ্যে আরও বেশি সহমর্মিতা সৃষ্টি করে, সংকীর্ণতা নয়।আর এ কারণেই ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ শুধু অতীতের চলচ্চিত্র নয়—এটি আমাদের বর্তমান সময়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য।
ফিরে আসার ব্যাকরণ: ঘরে ফেরা মানে শুধু একটি ঠিকানায় ফিরে যাওয়া নয়
ইমতিয়াজ আলীর চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে আসে এক ধরনের যাত্রার গল্প। তাঁর চরিত্ররা শুধু কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ভ্রমণ করে না; তারা পথে বের হয় নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। তার ছবিতে ‘বাড়ি’ মানে কেবল একটি ঠিকানা নয়। বাড়ি হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ভাঙাচোরা মানুষটি আবার নিজেকে সম্পূর্ণ করে তুলতে পারে।
‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’-তে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখানে শুধু একজন মানুষের ঘরে ফেরার গল্প বলা হয় না। বরং প্রশ্ন তোলা হয়—ভারত কি আবার সেই উদারতা, সহমর্মিতা ও বহুত্ববাদের চেতনায় ফিরে যেতে পারবে, যা একসময় তার গণতান্ত্রিক কল্পনাকে প্রাণ দিয়েছিল? নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত কিনু চরিত্রটি তাই শুধু একজন বৃদ্ধ নন। তিনি যেন একটি হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতির রক্ষক। তাঁর চোখে একই সঙ্গে ইতিহাসের সাফল্য ও ব্যর্থতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে।
কখনও মনে হয়, মান্টোর ‘টোবা টেক সিং’-এর বিষণ সিং যেন অবশেষে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু এসে দেখেছেন, সবচেয়ে কঠিন সীমান্ত আর মানচিত্রে নেই; সেটি মানুষের মনেই তৈরি হয়েছে। কিনুর উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়। তিনি চিৎকার করে কিছু বলেন না। বরং তাঁর নীরবতাই দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি মনে করিয়ে দেন, একটি দেশ শুধু ভূখণ্ড হারালে ছোট হয় না; মানুষ যখন একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা হারায়, তখনই একটি জাতি সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ছবির ‘আমি ফিরে আসব’ আসলে কোনো কল্পিত সোনালি অতীতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়। অতীতকে রোমান্টিক করে দেখলে ইতিহাসের সত্য আড়াল হয়ে যায়। প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই গড়ে তোলা। তবু অতীতের কিছু স্মৃতি আমাদের জন্য মূল্যবান। কারণ সেগুলো নিখুঁত কোনো সময়ের গল্প নয়; বরং মানুষ কেমন সমাজে বাস করতে চেয়েছিল, তার সাক্ষ্য।
অনেকেই এখনও এমন পাড়ার কথা মনে করেন, যেখানে ঈদ, দুর্গাপূজা বা অন্য উৎসব ছিল সবার। এমন স্কুলের কথা মনে পড়ে, যেখানে ধর্মের পরিচয় বন্ধুত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত না। রেলগাড়ির দীর্ঘ যাত্রায় অচেনা মানুষ একে অপরের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেত। গ্রামের মানুষ বিপদের সময় ধর্ম নয়, মানুষকে আগে দেখত। এসব স্মৃতি হয়তো পুরোপুরি নিখুঁত বাস্তবতার ছবি নয়। কিন্তু এগুলো আমাদের জানায়, মানুষ আসলে কেমন সমাজ গড়তে চেয়েছিল।
ইমতিয়াজ আলী তার ছবিতে ইচ্ছা করেই সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে গেছেন। কারণ তিনি জানেন, শুধু সংবিধান লিখে দিলেই মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয় না। সংসদ আইন করতে পারে, আদালত বিচার দিতে পারে। কিন্তু তারা কাউকে সহানুভূতিশীল বা মানবিক হতে বাধ্য করতে পারে না। সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণের মাধ্যমে।
যেমন—দাঙ্গার সময় প্রতিবেশীকে আশ্রয় দেওয়া, শিক্ষক যখন ছাত্রকে কৌতূহলী হতে শেখান, ঘৃণা নয়; শিল্পী যখন প্রচারণার বদলে সত্য ও জটিল বাস্তবতাকে তুলে ধরেন; কিংবা সাধারণ মানুষ যখন সংঘাতের বদলে কথোপকথনের পথ বেছে নেন। ইতিহাসের বইয়ে এসব ঘটনার খুব কমই উল্লেখ থাকে। অথচ একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে এই নীরব মানবিক কাজগুলোর মধ্যেই।
‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ সেই নীরব শক্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ছবিটি বলে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না; বরং মানুষের হৃদয়ে যতদিন সহমর্মিতা, বিশ্বাস এবং একসঙ্গে বেঁচে থাকার ইচ্ছা বেঁচে থাকবে, ততদিন আশা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।

স্মৃতি যখন আরোগ্যের পথ দেখায়
‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ শেষ পর্যন্ত হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বরং এটি আমাদের সময়ের অস্থিরতা ও উদ্বেগকে স্বীকার করেও আশার কথাই বলে। তবে ছবির আশা কোনো আবেগপ্রবণ কল্পনা নয়। এর ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, ইতিহাস আমাদের বন্দি করে রাখে না—আমরাই চাইলে তাকে বন্দিশালায় পরিণত করি।
প্রতিটি প্রজন্ম অতীতের কিছু অসমাপ্ত দায়িত্ব উত্তরাধিকার হিসেবে পায়। কিন্তু সেই দায়িত্ব কীভাবে পালন করবে, তা নির্ধারণ করার স্বাধীনতাও তাদের থাকে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ পুরোনো ক্ষতকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে রাখা নয়। বরং সেই ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে একই ভুল আর কখনও না ঘটে সম্ভবত দেশভাগের স্মৃতিও আমাদের এ কথাই শেখায়।এর উদ্দেশ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া নয়। কিংবা অতীতের অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ করা নয়।
যারা দেশভাগে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ নতুন করে আরও মানুষকে সেই একই যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দেওয়া নয়। বরং তাদের কষ্ট আমাদের আরও মানবিক করে তুলুক, ঘৃণার সহজ প্রলোভন থেকে দূরে রাখুক এবং পুনর্মিলনের গুরুত্ব বুঝতে শেখাক—এটাই হওয়া উচিত সেই স্মৃতির আসল অর্থ। এই কারণেই আরোগ্য বা ক্ষত সারিয়ে তোলা স্মৃতির বিপরীত কিছু নয়। বরং স্মৃতির সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই।
এ কারণেই ছবির নাম—‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ (আমি আবার ফিরে আসব)—শুধু একটি সংলাপ হয়ে থাকে না। এটি একটি প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। হয়তো এখানে ফিরে আসছে সহমর্মিতা। হয়তো ফিরে আসছে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। হয়তো ফিরে আসছে সংবিধানে উচ্চারিত ভ্রাতৃত্বের সেই আদর্শ, যা নানা সংকটের মধ্যেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
আবার হয়তো ফিরে আসছে সেই সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠস্বর, যিনি এখনও বিশ্বাস করেন—দেশপ্রেমের পরিচয় রাগ, বিদ্বেষ কিংবা শত্রুতা নয়; বরং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মানবিকতাই প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি। শেষ পর্যন্ত ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃত প্রত্যাবর্তন কোনো ভৌগোলিক জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়। প্রকৃত প্রত্যাবর্তন হলো কিছু মৌলিক মূল্যবোধে ফিরে আসা।
‘বাড়ি’ শুধু একটি ঠিকানা নয়। বাড়ি এমন এক মানসিক ও নৈতিক পরিসর, যেখানে স্বাধীনতার সঙ্গে সহমর্মিতা, বৈচিত্র্যের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে মানবিকতা পাশাপাশি অবস্থান করে। আমরা অনেক সময় মনে করি, যে ভারত একদিন বহুত্ববাদ, সহাবস্থান ও মানবিকতার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই ভারত যেন হারিয়ে গেছে। কিন্তু ছবিটি বলছে, সেই স্বপ্ন এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে সেটি নিজে থেকে ফিরে আসবে না।আমাদেরই তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
যেমনটি সাদাত হাসান মান্টো তার লেখায় দেখিয়েছেন, যেমনটি ‘গরম হাওয়া’ আমাদের শিখিয়েছিল, তেমনি ইমতিয়াজ আলীও নীরবে মনে করিয়ে দেন—অতীতের ট্র্যাজেডির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো মানে সেই ক্ষতকে বারবার রক্তাক্ত করা নয়। বরং সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে পুনর্মিলন, সহাবস্থান এবং মানবিকতা ঘৃণার ওপর বিজয়ী হয়।
তখনই ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ শুধু একজন মানুষের ফিরে আসার গল্প থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি জাতির নিজের সেরা সত্তায় ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার।
আর হয়তো সেটিই এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য—এটি আমাদের অতীতকে মনে করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের প্রতি নতুন আস্থা জাগায়। স্মৃতিকে প্রতিশোধের ভাষা নয়, সহমর্মিতার ভাষায় পড়তে শেখায়। সেই কারণেই ‘ম্যায়ন ভাপাস আউঙ্গা’ শুধু দেশভাগের চলচ্চিত্র নয়; এটি মানবিকতা, পুনর্মিলন এবং আশার এক গভীর শিল্পভাষ্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









