ইংল্যান্ডের নতুন টেস্ট কোচ হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন ফ্লেমিংকে দেখে মনে হলো, কথাটা তাঁর ক্ষেত্রেই মানানসই—শান্ত, স্থির, রসিক। ম্যানচেস্টারের বাইরে তখন বৃষ্টি নামছে, আর ভেতরে ফ্লেমিং যেন ঝড়ের মাঝেও জাহাজের হাল শক্ত করে ধরে রাখা এক নাবিক।
অবশ্য পাকিস্তানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজে তিনি ছিলেন না। পারিবারিক ও বাণিজ্যিক কিছু দায়িত্ব সামলাতে তখন ব্যস্ত ছিলেন। ইংল্যান্ড সেই সিরিজ ৩-০ ব্যবধানে জিতেছে। দূরে থেকেও সময়টা ফ্লেমিংকে ভাবার সুযোগ দিয়েছে—এই দলকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান, সেটার একটা ছবি হয়তো এ সময়েই পরিষ্কার হয়েছে।
“আমি বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলের দায়িত্বে থাকতে চাই। এটাই আমার লক্ষ্য,” বললেন ফ্লেমিং। আর অ্যাশেজ? নিউজিল্যান্ডের মানুষ হিসেবে ছোটবেলা থেকেই যে সিরিজ দেখে বড় হয়েছেন, সেটির অংশ হওয়াকে তিনি দেখছেন বিশেষ এক মুহূর্ত হিসেবে।
“আমার পুরো ক্রিকেটজীবনজুড়ে অ্যাশেজকে ভালোবেসে দেখেছি। এবার এর অংশ হতে পারা দারুণ ব্যাপার। আমি আর তর সইতে পারছি না।”
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়েও তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট। নিউজিল্যান্ডকে ২০২১ সালে সেই ট্রফি জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ইংল্যান্ড অবশ্য এত দিন প্রতিযোগিতাটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। ফ্লেমিংয়ের চোখে সেটি বদলানো দরকার।
“এটা একটা আকাঙ্ক্ষার জায়গা। ইংল্যান্ড এর চেয়ে অনেক ভালো করতে পারে। ওভার-রেটের ব্যাপারটিও দলের পরিচয় ও খেলার ধরন থেকে আসে। যদি এটা বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শীর্ষ ট্রফি হয়, তাহলে অন্য বড় ইভেন্টগুলোর মতো এটাও জেতার চেষ্টা আমরা কেন করব না?”
ইংল্যান্ডের আগের টেস্ট কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম তাঁর পুরোনো বন্ধু ও সতীর্থ। এবার ম্যাককালাম সাদা বলের দলের কোচ হিসেবে থাকছেন, আর ফ্লেমিং নেবেন লাল বলের দায়িত্ব। এক অর্থে বড় ভাইয়ের মতো ভূমিকায় থাকবেন কি না—এমন প্রশ্নে ফ্লেমিং হেসে বললেন, “তা বলতে পারেন।”
ম্যাককালাম ও বেন স্টোকস মিলে ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটের ধরনটাই বদলে দিয়েছিলেন। সেই আগ্রাসী ক্রিকেট, ভয়ডরহীন ব্যাটিং, খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা—সবকিছুর প্রশংসাই করলেন ফ্লেমিং।
“ওরা যেভাবে টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃতি বদলে দিয়েছে, সেটা অসাধারণ। এর জন্য যে সাহস দরকার ছিল, সেটার প্রতি আমার অনেক সম্মান আছে।”
তবে গত এক বছরে সেই ধারাটা প্রত্যাশামতো এগোয়নি। ফ্লেমিংও সেটি বুঝছেন। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা বাজবলকে ছুড়ে ফেলা নয়। বরং তার সঙ্গে কিছুটা ভারসাম্য যোগ করা।
“আমি ইতিবাচক ক্রিকেটটা খুব পছন্দ করি। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের যেভাবে নিজেদের মেলে ধরার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, সেটাও দারুণ। আমি যদি এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটু ক্রিকেটীয় বোধ যোগ করতে পারি…”
সেখানেই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ। শুধু কীভাবে খেলতে হবে, তা নয়—কোন মুহূর্তে কী করা দরকার, সেটাও বুঝতে হবে দলকে।
আর তার আগে দরকার দলের একটা নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা। খেলোয়াড়েরা ইংল্যান্ডের হয়ে খেলছে—এই অনুভূতিটা যেন শুধু জার্সিতে আটকে না থাকে।
“দলের পরিচয় নিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে। খেলোয়াড়েরা কীভাবে ইংল্যান্ড ও এই দলকে প্রতিনিধিত্ব করবে, সেটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দলের মধ্যে একটা আপন অনুভূতি, একটা belonging তৈরি হওয়া দরকার। আর সেটা তৈরি করতে সময় লাগবে।”
এই পথ অবশ্য বেন স্টোকসকে ছাড়া হাঁটতে হবে। ফ্লেমিং গত সপ্তাহে বিভিন্ন কাউন্টিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় চেস্টার-লে-স্ট্রিটেও গিয়েছিলেন। সেখানে দেখা হয়েছে স্টোকসের সঙ্গে। তখন সদ্য শেষ করেছেন দীর্ঘ এক বোলিং স্পেল।
স্টোকসের অবসর নিয়ে ফ্লেমিংয়ের অবস্থান পরিষ্কার—সিদ্ধান্তটিকে সম্মান করেন তিনি।

“ও খুব খুশি। মনে হলো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে শান্তিতে আছে। একজন খেলোয়াড় যখন অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা বড় সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ সম্মান আছে।”
ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্লেমিংয়ের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। মিডলসেক্স, ইয়র্কশায়ার ও নটিংহ্যামের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন। ২০০৫ সালে নটিংহ্যামের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন।
সেই সময়টাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্রিকেটের প্রেমে আবার ফিরিয়ে এনেছিল।
“ক্যাপ্টেন্সির শেষ দিকে এসে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা হারানোর মতো অবস্থায় ছিলাম। তখন মিক নিউয়েল আমাকে নটিংহ্যামের অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আবার ক্রিকেটের প্রেমে পড়ে গেলাম। ওই সময়টা আমাকে খুব ইতিবাচকভাবে খেলাটার মধ্যে আটকে রেখেছিল। ওই তিনটি মৌসুম আমার ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলোর মধ্যে ছিল।”
এবার তাঁর চোখ ইংল্যান্ডের পরের প্রজন্মের দিকে। কাউন্টিতে ঘুরে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু প্রতিভা দেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, সময়টাও খারাপ নয়।
“কোচিংয়ের একটা অন্ধকার দিক হলো সময়টা ঠিকভাবে বুঝতে পারা। আমার সৎ মূল্যায়ন হলো, প্রধান কোচ হওয়ার জন্য সময়টা দারুণ। সামনে যে খেলোয়াড়েরা আসছে, তাদের নিয়ে সত্যিই বড় একটা সুযোগ আছে।”
ফ্লেমিং নিজে ১১১টি টেস্ট খেলেছেন নিউজিল্যান্ডের হয়ে। দেশটির অন্যতম সফল অধিনায়কও তিনি। কিন্তু গত ১৮ বছর কেটেছে মূলত চেন্নাইয়ের সঙ্গে, টি-টোয়েন্টির দুনিয়ায়। সেখান থেকে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে আসা তাঁর কাছে যেন ফিরে যাওয়া নিজের শিকড়ে।
“আমি আসলে ভেতর থেকে একজন লাল বলের ক্রিকেটপ্রেমী। কৌশল, নেতৃত্ব, অধিনায়কত্ব, খেলার সূক্ষ্ম দিকগুলো—এসব আমি টেস্ট ক্রিকেট থেকেই শিখেছি।”
বরং সাদা বলের ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে।
“সাদা বলের ক্রিকেটে আমি মূলত মানুষ সামলানো, কৌশল আর নেতৃত্বের ওপর ভর করে নিজেকে তৈরি করেছি। নিজেকে কখনো শুধু সাদা বলের কৌশলবিদ বা খেলোয়াড় হিসেবে দেখিনি।”
আর টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ? সেখানে ফ্লেমিংয়ের কণ্ঠে আশাবাদই বেশি।
“একটা সময় আসবে, যখন কোনো না কোনো জায়গায় কিছু একটা বদলাতে হবে। কিন্তু সেটা টেস্ট ক্রিকেট হবে না। কারণ খেলোয়াড়দের কাছে টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব অনেক বেশি। ক্রিকেটের পুরো ব্যবস্থাটাও টিকে থাকবে। টেস্ট ক্রিকেটও টিকে থাকবে।”
অ্যাশেজ এখনো কিছুটা দূরে। তার আগে অনেক কাজ। নতুন পরিচয় তৈরি করতে হবে, আগ্রাসনের সঙ্গে বুদ্ধি মেশাতে হবে, আর নতুন প্রজন্মকে জায়গা করে দিতে হবে।
ফ্লেমিংয়ের প্রথম দিনের কথায় অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার—তিনি ইংল্যান্ডের বাজবল বদলাতে আসেননি। সেটাকে আরও পরিণত করে তুলতে এসেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









