২০২২ সালে ‘ক্রসএইজ’ সিনেমার অসাধারণ সাফল্যের পর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিরেছেন পরিচালক মারি ক্রয়ৎজার। ৭৯তম কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রদর্শিত তার নতুন সিনেমা ‘জেন্টেল মনস্টার’ দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি করেছে। কেউ সিনেমাটির সাহসী বিষয়বস্তুর প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ এর গল্পের কাঠামো ও নির্মাণশৈলী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে সিনেমাটি নিখুঁত হোক বা কিছুটা ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ মনে হোক, এতে বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়ংকর ও কঠিন একটি বিষয়কে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র লুসি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন লেয়া সেদু। তিনি একজন মেধাবী ফরাসি পিয়ানোবাদক। ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি গ্রামাঞ্চলে শান্ত জীবন বেছে নিয়েছেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বামী ফিলিপ এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই প্রশান্ত জীবনের গল্পে হঠাৎ ছেদ পড়ে। অনলাইনে শিশুদের পর্নোগ্রাফি পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ফিলিপ গ্রেপ্তার হলে লুসির জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়।
মারি ক্রয়ৎজারের চিত্রনাট্যের সবচেয়ে সাহসী দিকগুলোর একটি হলো ফিলিপের চরিত্র নির্মাণ। এখানে তাকে প্রচলিত অর্থে কোনো ভয়ংকর অপরাধীর মতো দেখানো হয়নি। বরং সে একজন ‘জেন্টেল মনস্টার’—একজন সমস্যাগ্রস্ত মানুষ, যে একই সঙ্গে একজন স্নেহশীল বাবা এবং যে নিজের মধ্যে ভয়াবহ এক কম্পিউটার-নির্ভর বিকৃতি লুকিয়ে রেখেছে।

সিনেমায় পরিচালক সহজ কোনো ব্যাখ্যা বা সরল সমাধানের পথে যাননি। বরং দেখিয়েছেন, এমন একটি গোপন সত্য কীভাবে শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, পুরো পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারে।
‘জেন্টেল মনস্টার’ শুধু লুসির পরিবারকে ঘিরে এগোয় না। গল্পটি দুই ধারায় এগিয়েছে লুসির জীবনের সংকটের পাশাপাশি তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এলসার জীবন ঘিরেও এগিয়েছে।
এলসাও নিজের এক ধরনের ব্যক্তিগত নরকের মধ্যে বাস করেন। তদন্তের কাজ করতে করতে তিনি মানসিকভাবে ক্লান্ত বা বার্নআউটের কাছাকাছি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আলঝেইমারে আক্রান্ত বাবার দেখাশোনার কঠিন দায়িত্ব।
সিনেমাটির রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিকটি তুলনামূলক দুর্বল। পুরুষতান্ত্রিকতা বা ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’র বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে কিছু অংশে নির্মাণটি কিছুটা সরল ও অগোছালো হয়ে উঠেছে। লুসি পুরুষদের লেখা গানের কথার অর্থ নতুন করে বিশ্লেষণ করেন। অন্যদিকে এলসা বাবার অসুস্থতার মধ্য দিয়ে একজন পুরুষের জীবনের অন্ধকার দিকের মুখোমুখি হন।
দুই নারীই তাদের ভালোবাসার পুরুষদের অন্ধকার দিকের সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হন। তবে একজনের ক্ষেত্রে বিষয়টি যৌন বিকৃতি, অন্যজনের ক্ষেত্রে আলঝেইমারের মতো ভয়াবহ রোগ।
ক্রয়ৎজার দর্শককে কোনো সহজ সান্ত্বনা বা আশাবাদী সমাপ্তি দিতে চাননি। বরং বারবার সম্পাদনার ধরন ও গল্পের আবহ বদলে দর্শককে অস্থির করে তুলেছেন। এতে লুসির মতো এমন একজন মানুষের মানসিক বিভ্রান্তি ও বন্দিত্বের অনুভূতি ফুটে উঠেছে, যে নিজের কাছের মানুষের মধ্যেই একটি ‘দানব’ আবিষ্কার করেছে।
অভিনেত্রী ক্যাথরিন দনুভও পরিবারের সম্পর্কের জটিলতায় তীক্ষ্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক এক মাত্রা যোগ করেছেন।

তবে সব বিতর্কের বাইরে লেয়া সেদুর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি সমকালীন সময়ের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে আবারও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। লুসির চরিত্রে তিনি অবিশ্বাস, আতঙ্ক, চাপা রাগ এবং শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়ার যন্ত্রণা খুব কম সংলাপ ও গভীর নীরবতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
‘জেন্টেল মনস্টার’ সহজ কোনো সিনেমা নয় এবং পরিচালকও সেটি করতে চাননি। এটি অন্ধকার, জটিল এবং গভীরভাবে হতাশাবাদী একটি কাজ। সমকালীন সমাজের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে গিয়ে সিনেমাটি কোনো আপস করেনি।
গল্পের কাঠামোগত কিছু দুর্বলতা থাকলেও ‘জেন্টেল মনস্টার’ দর্শককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। বিশ্বাস, নিজের সঙ্গে সততা এবং ভালোবাসার মানুষটির অন্ধকার দিক আমরা কতটা দেখতে চাই—এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে সিনেমাটি।
সবশেষে, ‘জেন্টেল মনস্টার’ শুধু একজন ‘দানবের’ গল্প নয়; এটি মানুষের সেই নীরবতা ও অস্বীকারের গল্প, যার মুখোমুখি হতে আমরা অনেক সময় নিজেরাও প্রস্তুত থাকি না।
সূত্র: ফিল্ম স্টেজ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









