“যতক্ষণ না আপনি সেখানে ছিলেন, ততক্ষণ আপনি জানেন না যুদ্ধ কী।” এই কথাটিই যেন ১২ বছরের ইউক্রেনীয় কিশোরী ইয়েভা স্কালিয়েতস্কার ডায়েরির মূল সুর। তার বই ‘ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ওয়ার ইজ: দ্যা ডাইরি অফ এ ইয়ং গার্ল’ যুদ্ধের মধ্যে একটি শিশুর জীবন কীভাবে মুহূর্তে বদলে যায়, তার অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও হৃদয়স্পর্শী দলিল।
খারকিভের বাসিন্দা ইয়েভা যুদ্ধের আগে দাদি ইরিনার সঙ্গে শহরের উপকণ্ঠের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকত। তাদের বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যেত রাশিয়ার সীমান্তের দিকে চলে যাওয়া বিশাল ফাঁকা মাঠ। যুদ্ধ শুরুর আগের ইয়েভার জীবন ছিল আর দশটি শিশুর মতোই স্বাভাবিক—বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি, ছবি আঁকা, বোলিং খেলা এবং স্কুলে ইংরেজি শেখা ছিল তার পছন্দের বিষয়।
কিন্তু ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সেই স্বাভাবিক জীবন এক মুহূর্তে বদলে যায়। রাশিয়ার আগ্রাসন ও খারকিভে বোমাবর্ষণ শুরু হলে ইয়েভা ও তার দাদি বাধ্য হন বাড়ির বেসমেন্টে আশ্রয় নিতে। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে দেখা, বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং প্রতিদিন রাতে বোমার আতঙ্ক—এসবই ধীরে ধীরে তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
ইয়েভার ডায়েরির সঙ্গে রয়েছে তার দাদির তোলা বেশ কিছু ছবি। ছবিগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায়, কীভাবে ধীরে ধীরে শিশুটির মুখে ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের ছাপ ফুটে উঠছে। বইটিতে ইয়েভার স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কিছু বার্তাও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে সহপাঠীদের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি একে অপরকে সাহস দেওয়া এবং ভালো থাকার আশায় বার্তা বিনিময়ের দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
যুদ্ধ যত এগোয়, ইয়েভার প্রিয় শহরটিও ধ্বংস হতে থাকে। পার্ক, মঠ ও সুন্দর পুরোনো ভবনে ভরা খারকিভ ধীরে ধীরে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নে ভরে যায়। একসময় ইয়েভার প্রিয় অ্যাপার্টমেন্টেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তখন ইয়েভা ও তার দাদি শহর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

চলে যাওয়ার ঠিক আগে ইয়েভার সঙ্গে চ্যানেল ফোরের এক সাংবাদিকের দেখা হয়। তিনি ইয়েভার সাক্ষাৎকার নেন। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর সেই সাক্ষাৎকার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের জন্য ইয়েভা পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে।
এরপর ইয়েভা ও তার দাদি ইউক্রেন পেরিয়ে বুদাপেস্ট হয়ে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে পৌঁছান। সেখানে গ্যারি ও ক্যাথরিন নামে এক সহৃদয় দম্পতি তাদের আশ্রয় দেন।
বইটির শেষ অংশে ইয়েভার বন্ধুদের জীবনের কথাও উঠে এসেছে। হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথনের মাধ্যমে যাদের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় হয়েছে, যুদ্ধ তাদের জীবনেও কী পরিবর্তন এনেছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ সেখানে রয়েছে। এই অংশটি পড়া অত্যন্ত কষ্টকর এবং চোখে পানি এনে দেয়।
ইয়েভার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরলতা। সে কোনো জটিল ভাষা ব্যবহার করেনি। স্কুল ও টেলিভিশন থেকে শেখা ইংরেজি দিয়েই সে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে এমন সংযত, স্পষ্ট ও নির্ভুল ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরা সত্যিই বিস্ময়কর।
‘ইউ ডোন্ট নো হোয়াট ওয়ার ইজ’ শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়। এটি যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর ভয়, বিচ্ছেদ, অনিশ্চয়তা এবং আশার দলিল। মানুষের মধ্যে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হচ্ছে, তখন ইয়েভার এই ডায়েরি মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধ কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়; এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ভেঙে যাওয়া জীবন এবং শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
ইয়েভা স্কালিয়েতস্কার You Don’t Know What War Is: The Diary of a Young Girl from Ukraine বইটি ব্লুমসবেরি প্রকাশ করেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









