সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দামেস্ক ও মস্কোর মধ্যে নতুন সমঝোতায় সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটিতে রাশিয়ার উপস্থিতির নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সিরিয়া একদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে, অন্যদিকে রাশিয়াও দেশটিতে সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ পাবে।
রবিবার (৯ আগস্ট) সিরিয়ার নতুন সরকার জানায়, হমেইমিম বিমানঘাঁটির বেসামরিক অংশ এবং তারতুস বন্দরের বাণিজ্যিক অংশ সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। অন্যদিকে সামরিক স্থাপনাগুলোকে যৌথ রুশ-সিরীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার কথা। তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৫ সালে গৃহযুদ্ধের সময় মস্কো সরাসরি বাশার আল-আসাদ সরকারকে সামরিক সহায়তা দেয়। হমেইমিম হয়ে ওঠে রুশ বিমান অভিযানের প্রধান ঘাঁটি এবং তারতুস ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিতে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পরও এসব ঘাঁটিতে রুশ সেনারা অবস্থান করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সমঝোতা মূলত বাস্তববাদী স্বার্থের ফল। সিরিয়ার নতুন সরকার রাশিয়ার পুরোনো ভূমিকা ভুলে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইছে না। কারণ রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সামরিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বহু বছরের। পাশাপাশি সিরিয়ার অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে খাদ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে রাশিয়ার জন্য সিরিয়া কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকায় রুশ প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। ফলে সিরিয়া থেকে পুরোপুরি সরে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসাদের পতনের পরও সিরিয়া রাশিয়াকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে নিজেদের স্বার্থে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে। একই সঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে। ফলে নতুন সিরিয়া সম্ভবত কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে।
রাশিয়া-সিরিয়া সমঝোতাকে তাই পুরোনো জোটের ধারাবাহিকতা না বলে নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সিরিয়া তার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে, আর রাশিয়া চাইছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে। শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা দুই দেশের পারস্পরিক প্রয়োজন ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









