বেনারসের ঘাটে তখন সকাল নামছে। গঙ্গার জল ধীরে ধীরে আলো ধরে নিচ্ছে। কোথাও ঘণ্টা বাজছে, কোথাও মন্ত্রপাঠ, কোথাও নৌকার দাঁড় জলে ঢুকে আবার উঠে আসছে। সেই ভিড়ের মধ্যে একটি ছেলেকে দেখা যায়—অপু। সে হাঁটছে। তার সামনে কত মানুষ, কত মুখ, কত শব্দ। কিন্তু সে যেন সবকিছুরই একটু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখছে, শুনছে, মনে রাখছে। সে জানে না, এই দেখাগুলো একদিন তার ভিতরে একটি নতুন মানুষ তৈরি করবে।
১৯৫৭ সালে ‘অপরাজিত’ মুক্তি পাওয়ার পর পৃথিবীও যেন প্রথমবার সত্যজিৎ রায়ের দিকে একটু দীর্ঘক্ষণ তাকাল। ‘পথের পাঁচালী’ ইতিমধ্যে আন্দ্রে বাজাঁর মতো চলচ্চিত্র-সমালোচকদের বিস্মিত করেছিল। কিন্তু ‘অপরাজিত’-এর পর রায়ের সিনেমার ভাষা আরও দূরে পৌঁছে গেল—সিগফ্রিড ক্রাকাউয়ার থেকে আকিরা কুরোসাওয়া পর্যন্ত নানা দেশের দর্শক ও সমালোচক বুঝতে শুরু করলেন, ভারতীয় সিনেমা থেকে এমন এক ভাষা উঠে আসছে, যার শিকড় গভীরভাবে স্থানীয় অথচ তার অনুভূতি পৃথিবীর যেকোনো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।

‘অপুর ত্রয়ী’কে তখন ক্রমশ এমন এক সিনেমা হিসেবে দেখা হতে লাগল, যার ভিতরে আছে উদার মানবতাবাদ, আর যার প্রকাশভঙ্গি গড়ে উঠেছে কাব্যিক ও বাস্তবতার মিশেলে। কিন্তু রায়ের সিনেমাকে শুধু ‘সার্বজনীন মানবতার’ গল্প বললে রায়ের আলো ফেলার জায়গাটি চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ অপুকে বোঝার জন্য শুধু তার দুঃখ, আনন্দ, মায়ের প্রতি টান বা নিজের পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোঝা যথেষ্ট নয়। তার চারপাশের পৃথিবীটিকেও চিনতে হয়—বেনারসের ঘাট, বাংলার গ্রাম, ট্রেন, গলির শব্দ, ঘরের ভিতরের নীরবতা, মানুষের ছোট ছোট আচরণ। রায় জানতেন, মানুষের অনুভূতি পৃথিবীর নানা প্রান্তে একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু মানুষ যে পৃথিবীতে বাস করে, সেই পৃথিবীটি সব জায়গায় এক নয়।
এই পার্থক্যই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাকে একই সঙ্গে সহজ এবং জটিল করে তোলে। রায়ের ছবিতে সংলাপ খুব বেশি নেই। অনেক সময় একটি মুখ, একটি শব্দ, একটি দরজা, একটি খালি রাস্তা বা দূরের কোনো সুর এমন কিছু বলে দেয়, যা কয়েক পৃষ্ঠা কথাতেও বলা সম্ভব নয়। ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির সূক্ষ্ম সংকেতগুলো কখনো দর্শকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই না-বোঝার মধ্যেও চলচ্চিত্রটি তার ভাষায় কথা বলে যায়। কারণ দৃশ্যের নিচে, শব্দের নিচে, সংলাপের নিচে আরও কিছু চলতে থাকে।
এগুলোই যেন সিনেমাটির দ্বিতীয় সুর।
সঙ্গীতে একটি মূল স্বর থাকে। কিন্তু সেই স্বরের সঙ্গে আরও অনেক সূক্ষ্ম কম্পন জন্ম নেয়। সেগুলো আলাদা করে সামনে আসে না, অথচ তাদের ছাড়া মূল সুরটি এত গভীর, এত পূর্ণ শোনাত না। সিনেমাতেও তেমন কিছু ঘটে। একটি দৃশ্য যা সরাসরি বলছে, তার নিচে আরও কিছু অনুভূতি নীরবে চলতে থাকে। সেই অদৃশ্য কম্পনই সিনেমাটিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’-এ এই অদৃশ্য কম্পন বারবার ফিরে আসে।
হরিহরের মৃত্যুর দৃশ্যটির কথা মনে করা যায়। ঘটনাটি সরল—একজন মানুষ অসুস্থ, তারপর মারা যায়। কিন্তু মৃত্যু শুধু একটি চরিত্রের জীবন শেষ করে না। তার সঙ্গে একটি পরিবারের নিরাপত্তা শেষ হয়, একটি শিশুর পৃথিবী বদলে যায়, একটি মায়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে আসে। দৃশ্যের ভিতরে তাই শুধু মৃত্যু নেই; আছে আসন্ন বিচ্ছেদের অনুভূতি। আবার কাশীতে সর্বজয়ার হঠাৎ রান্নার কাজ ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তেও একই ব্যাপার ঘটে। তিনি শুধু একটি কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন না। তার ভিতরে জমে থাকা ক্লান্তি, অপমান, একাকিত্ব এবং অপুর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ভয় যেন সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একসঙ্গে বেরিয়ে আসে।

রায়ের সিনেমায় এই অনুভূতিগুলো সব সময় ভাষায় প্রকাশিত হয় না। দৃশ্য, শব্দ, বিরতি, মুখের অভিব্যক্তি, স্থান এবং সংগীত মিলে তারা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
অপুর জীবনও এমনভাবেই তৈরি হয়। সে কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আধুনিক মানুষ হয়ে যায় না। তার আধুনিক সত্তা তৈরি হয় অসংখ্য ছোট ছোট অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে। সে বেনারসের ঘাটে হাঁটে। অচেনা মানুষ দেখে। তাদের কথা শোনে। কোনো কুস্তিগিরকে দেখে। কোনো কথককে দেখে। স্কুলে যায়। স্কুলের পরিদর্শককে দেখে। ট্রেনে কলকাতার পথে মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। কোনো ফেরিওয়ালা বা বিক্রেতার মুখ তার চোখে পড়ে। এই মানুষগুলো গল্পের দিক থেকে হয়তো অপুর জীবনে খুব বড় কোনো ভূমিকা নেয় না। তারা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় না। কিন্তু তারা অপুর পৃথিবীকে বড় করে। কারণ আমরা প্রত্যেকে অন্য মানুষের মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয় তৈরি করি।
একটি শিশু প্রথমে শুধু নিজের ঘরকে পৃথিবী ভাবে। তারপর সে জানে, ঘরের বাইরে রাস্তা আছে। রাস্তার বাইরে বাজার। বাজারের বাইরে শহর। শহরের বাইরে আরও শহর। প্রতিটি নতুন মুখ তাকে বলে—তুমি একা নও; পৃথিবীতে তোমার মতো আরও মানুষ আছে, যারা তোমার মতো নয়। অপুর আধুনিক হয়ে ওঠার গল্প আসলে এই পার্থক্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার গল্প। এই কারণেই ‘অপরাজিত’কে শুধু একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনি হিসেবে দেখলে ছবিটির গভীরতা কমে যায়। এটি ভারতীয় মধ্যবিত্তেরও একটি গঠনের গল্প। একদিকে গ্রাম ও পুরোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনের স্মৃতি, অন্যদিকে শহর, শিক্ষা, চাকরি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। মানুষ একদিকে নিজের হারানো পৃথিবীর জন্য টান অনুভব করে, অন্যদিকে সেই পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।
অপু এই দুই টানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। সে যেতে চায়। আবার তার ভিতরের কোনো জায়গা তাকে ফিরিয়ে ডাকে।
এ দ্বন্দ্বটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও গভীরভাবে আছে। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’-এর পাতায় অপু শুধু একটি চরিত্র নয়; তার চারপাশে একটি সম্পূর্ণ জীবন ছড়িয়ে আছে। ঘর, পথ, নদী, গাছ, মানুষ, উৎসব, দারিদ্র্য, কৌতূহল, মৃত্যু, স্বপ্ন—সবকিছু মিলে তার স্মৃতির পৃথিবী তৈরি হয়। বিভূতিভূষণের লেখার একটি বিশেষ ক্ষমতা হলো, তিনি কখনো কখনো এমন কিছু বাক্য বা দৃশ্য পাশাপাশি রাখেন, যেগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে হয়। একটি জায়গার কথা শেষ হতে না হতেই অন্য জায়গার একটি দৃশ্য আসে। বর্তমানের সঙ্গে অতীত মিশে যায়। বাইরে দেখা কোনো দৃশ্য হঠাৎ মনের ভিতরের কোনো পুরোনো আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে।
স্মৃতি তখন সরল রাস্তায় হাঁটে না। সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। একটি গন্ধ তাকে বহু বছর আগের দিনে নিয়ে যায়। একটি শব্দ তাকে অন্য মানুষের মুখ মনে করিয়ে দেয়। একটি আলো তার ভিতরে অচেনা কোনো আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে বিভূতিভূষণের গদ্যে এইসব বিচ্ছিন্ন অনুভূতি কখনো কখনো এমনভাবে পাশাপাশি এসে দাঁড়ায় যে তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। একটি দৃশ্য আরেকটি দৃশ্যকে ব্যাখ্যা করে না; বরং তার সঙ্গে কাঁপতে থাকে।
সত্যজিৎ রায় যেন এই সাহিত্যিক প্রকাশকে সিনেমার ভাষায় নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন।
তার ক্যামেরা সব সময় গল্পের মূল ঘটনাকে অনুসরণ করে না। কখনো সে একটু থামে। কোনো মুখের দিকে তাকায়। কোনো শব্দ শুনতে দেয়। কোনো চরিত্রকে পাশ দিয়ে চলে যেতে দেয়। কোনো জায়গাকে কিছুক্ষণ নিজের মতো করে থাকতে দেয়। এই থেমে থাকা আসলে থেমে থাকা নয়। এর মধ্যে দর্শকের নিজের অনুভূতি ঢুকে পড়ে।
ধরা যাক, বেনারসের ঘাটে অপুর হাঁটা। আমরা জানি না, সে ঠিক কী ভাবছে। ক্যামেরা তার মনের ভিতর ঢুকে পড়ে না। বরং তার চারপাশের পৃথিবীকে আমাদের সামনে খুলে দেয়। মানুষ, ঘাট, ধর্মীয় আচার, নদী, শব্দ, শরীর—সব মিলিয়ে একটি অনুভূতির ক্ষেত্র তৈরি হয়। অপু যেমন এই পৃথিবীকে প্রথমবার আবিষ্কার করছে, দর্শকও যেন তার সঙ্গে সেই আবিষ্কারে অংশ নেয়।
এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দৃষ্টি নয়। বরং দুই ধরনের দৃষ্টি একসঙ্গে তৈরি হয়—অপুর এবং দর্শকের। অপু যেমন অন্য মানুষকে দেখে, দর্শকও অপুকে দেখে অন্য মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। এই পারস্পরিক দেখাদেখিই অপুর সত্তাকে তৈরি করে। এখানে সেই অচেনা মানুষগুলোর গুরুত্ব বোঝা যায়। বেনারসের কথক, পেহেলওয়ান, স্কুলের পরিদর্শক, ট্রেনের বিক্রেতা—তারা অপুর জীবনের কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়। কিন্তু তারা তার পৃথিবীর প্রান্তগুলোকে খুলে দেয়। তারা যেন ছবির ভিতরে ছোট ছোট জানালা।
একটি জানালা দিয়ে দেখা যায় ধর্মীয় শহর। অন্যটি দিয়ে দেখা যায় শরীর ও শক্তির পৃথিবী। আরেকটি দিয়ে শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের জগৎ। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা যায় চলমান আধুনিকতা। অপু সেই জানালাগুলোর সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের পৃথিবী তৈরি করে।

বিভূতিভূষণের উপন্যাসেও একই ব্যাপার ঘটে। তার চরিত্রেরা শুধু ঘটনাকে অতিক্রম করে না; তারা জায়গা, মানুষ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে নিজেদের তৈরি করে। একটি মানুষ তার চারপাশের পৃথিবী থেকে আলাদা কোনো দ্বীপ নয়। সে অন্য মানুষের দৃষ্টি, স্পর্শ, আচরণ, অনুপস্থিতি ও স্মৃতির ভিতর দিয়ে নিজেকে চিনতে শেখে।
এই জায়গায় সাহিত্য ও সিনেমা একে অন্যের খুব কাছে চলে আসে। তবে দুটির ভাষা এক নয়।
বিভূতিভূষণ শব্দের সাহায্যে পাঠকের মনে এমন একটি জায়গা তৈরি করতে পারেন, যেখানে বাস্তব এবং প্রায়-স্বপ্নের জগত পাশাপাশি থাকে। একটি গাছ সত্যি গাছ, আবার সেই গাছই স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি নদী সত্যি নদী, আবার তার জল সময়ের মতো বয়ে যায়। কোনো দৃশ্য হঠাৎ বাস্তবের মাটি ছেড়ে এক ধরনের নীরব, প্রায় অতীন্দ্রিয় অনুভূতিতে পৌঁছে যায়।
রায় সেই জায়গায় পৌঁছান অন্যভাবে। তিনি শব্দ কমান। ছবি রাখেন। আবার ছবির ফাঁকে শব্দ রাখেন। তারপর সেই দুটির মাঝখানে একটি নীরবতা তৈরি করেন। সেই নীরবতায় দর্শকের নিজের স্মৃতি এসে বসে। তাই ‘অপরাজিত’ দেখার সময় আমরা শুধু অপুর জীবন দেখি না। আমাদের নিজেদের বড় হয়ে ওঠার কথাও মনে পড়ে। কোনো এক সময় আমরাও হয়তো বাড়ি ছেড়েছি। কোনো পরিচিত জায়গা থেকে বেরিয়ে অচেনা শহরে গিয়েছি। নতুন মানুষের মুখ দেখেছি। নতুন ভাষা শুনেছি। তখন বুঝিনি, কিন্তু পরে হয়তো বুঝেছি—বাড়ি থেকে যত দূরে যাই, বাড়ির স্মৃতি তত গভীরে চলে যায়।
অপুও তেমনই। সে ভবিষ্যতের দিকে এগোয়। কিন্তু তার পিছনে একটি পৃথিবী হাঁটতে থাকে। বিভূতিভূষণের সাহিত্য এবং রায়ের সিনেমার সবচেয়ে বড় মিল হয়তো এখানেই। দুজনেই জানেন, মানুষের জীবন শুধু বড় ঘটনাগুলোর সমষ্টি নয়। মানুষের ভিতর জমা হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র দৃশ্য—একটি দুপুর, একটি নদী, একটি মুখ, একটি শব্দ, একটি পথ, একটি বিদায়। বহু বছর পরে কোনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে সেই দৃশ্যগুলোর একটি আবার ফিরে আসে।
তখন মানুষ বুঝতে পারে, সে যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে বেশি কিছু নিজের ভিতরে বহন করে চলেছে। ‘অপরাজিত’ তাই শুধু অপুর গল্প নয়। এটি স্মৃতির গল্প। এটি আধুনিক হয়ে ওঠার গল্প। এটি মা ও সন্তানের দূরত্বের গল্প। এটি একটি পুরোনো পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীতে পা রাখার গল্প। আর তার গভীরে আছে মানুষের সেই চিরন্তন প্রশ্ন—আমি কোথা থেকে এসেছি, আর কোথায় যাচ্ছি?
সত্যজিৎ রায় এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতার মতো করে দেননি। বিভূতিভূষণও দেননি। তারা বরং একটি পথ দেখিয়েছেন। সেই পথে কখনো গঙ্গার ঘাট পড়ে, কখনো বাংলার গ্রাম, কখনো রেললাইন, কখনো কলকাতার রাস্তা। পথে মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। কোনো মানুষ গল্পে বড় হয়ে ওঠে, কোনো মানুষ শুধু এক মুহূর্তের জন্য দেখা দেয়। কিন্তু প্রত্যেকেই অপুর পৃথিবীতে সামান্য একটি ঢেউ তোলে।
সেই ঢেউ হয়তো তখন বোঝা যায় না। বহু বছর পরে বোঝা যায়। সিনেমার ভাষায় সেই ঢেউকে ধরা যায় দৃশ্য ও শব্দের সূক্ষ্ম মিলনে। সাহিত্যের ভাষায় ধরা যায় স্মৃতি, বিচ্ছিন্ন বাক্য, প্রকৃতির বর্ণনা এবং মানুষের মনের গোপন কম্পনে। এই কারণেই বিভূতিভূষণ সত্যজিৎ রায়ের কাছে শুধু একটি গল্পের উৎস ছিলেন না। তার সাহিত্য রায়ের দেখার চোখকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বিভূতিভূষণ তাকে শিখিয়েছিলেন, জীবনের মূল ঘটনাটির পাশে আরও কত অদৃশ্য ঘটনা ঘটে। একটি মানুষের ভিতরে যেমন একটি গল্প থাকে, তার চারপাশের পৃথিবীতেও তেমন অসংখ্য গল্প চলতে থাকে।
রায় সেই অদৃশ্য গল্পগুলোকে সিনেমায় জায়গা দিয়েছিলেন। তাই ‘অপরাজিত’ শেষ হওয়ার পরও অপু যেন পুরোপুরি চলে যায় না। বেনারসের ঘাটে তার হাঁটা থেকে যায়। ট্রেনের শব্দ থেকে যায়। সর্বজয়ার মুখ থেকে যায়। একটি ঘরের নীরবতা থেকে যায়। আর থেকে যায় সেই ছেলেটির চোখ—যে পৃথিবীকে প্রথমবার দেখছে, কিন্তু জানে না যে দেখার মধ্য দিয়েই সে নিজেকে তৈরি করছে। হয়তো এটাই সিনেমা ও সাহিত্যের সবচেয়ে অপূর্ব মিলনস্থল। একজন লেখক শব্দ দিয়ে একটি পৃথিবী তৈরি করেন। একজন চলচ্চিত্রকার আলো, ছায়া, মুখ, শব্দ ও নীরবতা দিয়ে সেই পৃথিবীর আরেকটি দরজা খুলে দেন।
দরজা দিয়ে ঢুকলে দেখা যায়—অপু এখনও হাঁটছে। তার সামনে অচেনা পৃথিবী। তার পিছনে পুরোনো পৃথিবীর দীর্ঘ ছায়া।আর মাঝখানে, খুব নিঃশব্দে, অসংখ্য দৃশ্য ও শব্দ একে অন্যের সঙ্গে মিশে একটি সুর তৈরি করছে। মূল সুরটি আমরা শুনতে পাই। কিন্তু তার সঙ্গে যে অসংখ্য অদৃশ্য কম্পন কাঁপছে, সেগুলোই হয়তো আমাদের মনে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে স্মৃতি হয়ে আছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









