‘সংস অব ফরগটেন ট্রি’ ছবির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুপর্ণা রায়। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর চলমান নির্যাতন কিংবা ভারতের নানা সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন—সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চেও তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন।
‘দ্য ওয়্যার’ পত্রিকার পক্ষে চিন্তন গিরিশ ১৪ জুলাই ২০২৬-এ এক সাক্ষাৎকারে অনুপর্ণা কথা বলেছেন তার নতুন চলচ্চিত্র, শিল্পের সামাজিক দায়, নারীর শরীর ও স্বাধীনতা, ভালোবাসা, পিতৃতন্ত্র, ফিলিস্তিন নিয়ে তার অবস্থান, সেই বক্তব্যের পর আসা হুমকি ও প্রতিক্রিয়া, এবং কেন তিনি বিশ্বাস করেন—শিল্পের কাজ শুধু বিনোদন নয়, মানুষকে অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানো।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি দাবি করেছেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের সমর্থন তার রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অসংখ্য ভারতীয় ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বার্তা পাঠান।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও ইসরায়েলের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং দেশে ইসরায়েলপন্থী জনমতের উপস্থিতিও স্পষ্ট, তবু এর বিপরীতে প্রতিবাদের কণ্ঠও রয়েছে—অনলাইন ও অফলাইন, দুই ক্ষেত্রেই।
সেই কণ্ঠগুলোর অন্যতম ২৮ বছর বয়সি চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুপর্ণা রায়। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় বেড়ে ওঠা অনুপর্ণা বর্তমানে মুম্বইয়ে থাকেন। তার লেখা ও পরিচালিত ৭১ মিনিটের চলচ্চিত্র ‘সংস অব ফরগটেন ট্রি’ ৪ জুলাই ২০০৫ মুম্বইয়ের এশিয়া সোসাইটি ইন্ডিয়া সেন্টারে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব ‘পর্দা ফাঁস’-এ প্রদর্শিত হয়।
ছবিটি থুয়া (নাজ শেখ)—যিনি অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু জীবিকা নির্বাহ করেন যৌনকর্মী হিসেবে—এবং তার রুমমেট শ্বেতা (সুমি বাঘেল), একজন সেলস এক্সিকিউটিভ—এই দুই নারীর সম্পর্ককে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। শোক, ভালোবাসার অনুসন্ধান, বন্ধুত্ব, মতভেদ এবং একে অপরের প্রতি গভীর টান—এসবই সিনেমাটির গল্পের মূল সুর।
২০০৫-এ অনুপর্ণা রায় ইতিহাস গড়েন। ‘সংস অব ফরগটেন ট্রি’ ছবির জন্য ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজন্তি বিভাগে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার জেতা প্রথম ভারতীয় পরিচালক হন তিনি।

তবে পুরস্কারের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে তার গ্রহণ-বক্তৃতা। সেখানে তিনি বলেছিলেন—
“প্রত্যেক শিশুরই শান্তি, স্বাধীনতা ও মুক্তির অধিকার রয়েছে। ফিলিস্তিনও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের থেমে একবার ভাবার এবং ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব আছে। এতে আমার দেশের অনেকেই হয়তো অসন্তুষ্ট হবেন, কিন্তু তাতে আর আমার কিছু যায় আসে না।”
প্রশ্ন: আপনার ছবিতে শ্বেতা থুয়ার যৌনকর্মী হওয়া পছন্দ করে না। কিন্তু থুয়া পাল্টা বলে, অনেক সময় বিয়েও একই রকম—যেখানে স্ত্রীর কাছে যৌনসম্পর্ক যেন কর্তব্য। ভারতে এখনও বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। বিয়ে ও যৌনকর্মকে পাশাপাশি রাখার ভাবনা কীভাবে এল?
অনুপর্ণা রায়: পুরো ছবিটাই আসলে এমন এক মানসিক বিচ্ছিন্নতার কথা বলে, যা বহু নারী অনুভব করেন। সম্পর্কে পুরুষ শারীরিক ঘনিষ্ঠতা চান, কিন্তু আবেগের জায়গায় অনুপস্থিত থাকেন। এর ফলে নারীরা ধীরে ধীরে নিজের শরীর থেকেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
আমার নিজের জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি জানি, অনেক নারীর জীবনেও এটি বাস্তব। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের জীবনই তো গল্পের সবচেয়ে বড় উৎস।
অনেকেই বলেন, আমার ছবি তাঁদের নিজের জীবনের মতো মনে হয়। কারণ ছবির গল্প সত্যের ভেতর থেকেই এসেছে।
একজন বিবাহিত নারীর সামনে অনেক সময় বেরিয়ে আসার কোনো পথ থাকে না—যদি না তিনি সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস পান। অসংখ্য বিষমকামী নারীর কাছে যৌনসম্পর্ক ভালোবাসার প্রকাশ নয়; বরং সামাজিক দায়িত্ব। এটা বেদনাদায়ক, কিন্তু সমাজের প্রত্যাশার কারণে তারা তা মেনে নেন। এই বিষয় নিয়ে আরও অনেক বেশি কথা বলা দরকার।
প্রশ্ন: ছবিতে নীতিনের স্ত্রীর একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত দেখা যায়। তিনি স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে যেতে চান না, তাই অন্য এক নারীকে অর্থ দিয়ে সেই কাজ করানোর কথা ভাবেন। এই উপকাহিনি কীভাবে তৈরি হলো?
অনুপর্ণা: আমি নতুন কিছু করতে চেয়েছিলাম। সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়, পুরুষেরা কাউকে ভাড়া করে। আমি উল্টো পরিস্থিতি দেখাতে চেয়েছি।
একই সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের আরেকটি স্তরও তুলে ধরতে চেয়েছি। এই নারী নিজে সেই সম্পর্কে থাকতে চান না, কিন্তু অন্য একজন নারীকে সেই অবস্থায় পাঠাতে তাঁর আপত্তি নেই।
প্রশ্ন: এটাকে কি গৃহস্থালির কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিজের পেশাগত জীবনের জন্য সময় বের করে নেওয়ার মতোই ভাবা যায়?
অনুপর্ণা: হ্যাঁ, সে ভাবেও দেখা যেতে পারে। নীতিনের স্ত্রী বুঝতে পারেন, যৌনকর্মও এক ধরনের শ্রম, যার বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। যদি অন্য কেউ তাঁর বদলে সেই কাজ করতে পারে, তবে তিনিও নিজের মতো করে বাঁচতে পারবেন।
প্রশ্ন: ছবিতে শ্বেতা যৌনকর্মের সঙ্গে থেরাপির তুলনা করে। তার মতে, দুটিই এমন সেবা, যার জন্য মানুষ অর্থ দেয়। আবার দেখা যায়, থুয়া নিজেই একজন থেরাপিস্টের কাছে যান। ভারতীয় সিনেমায় এমন চরিত্র খুব একটা দেখা যায় না। এই ভাবনা কীভাবে এল?
অনুপর্ণা: (হেসে) আপনার প্রশ্নগুলো খুব ভালো লাগছে।
থুয়া একজন যৌনকর্মী, আবার অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নও দেখে। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব জটিল ছিল। বাবার আচরণে তার মা কষ্ট পেয়েছেন—সেই স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে। শৈশবের বন্ধু ঝুমাকে হারানোর যন্ত্রণা থেকেও তিনি বেরোতে পারেন না।
এই সবকিছু মিলিয়েই তাঁর ভেতরে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
তাই আমার কাছে এটা খুব স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি একজন শিক্ষিত, আধুনিক নারী হিসেবে থেরাপিস্টের কাছে যাবেন। বাইরে থেকে তার জীবন যতই ঝলমলে মনে হোক, ভেতরে তিনি সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছেন। সেই কারণেই তার থেরাপির প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ছবিতে ‘শুকিয়ে যাওয়া’ বিষয়টি একদিকে বাস্তব শারীরিক সমস্যা, অন্যদিকে রূপক অর্থেও এসেছে। থেরাপিস্ট চান থুয়া চিকিৎসকের কাছে যাক। কিন্তু ছবিতে কখনও স্পষ্ট করে বলা হয় না, এটি উদ্বেগ, ভ্যাজিনাইটিস, ফাইব্রয়েড, লুপাস, এন্ডোমেট্রিওসিস, ক্যানসার নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে। বরং মনে হয়, থুয়া যেন এই শুষ্কতাকে জীবনেরই এক অনিবার্য সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছে।
অনুপর্ণা রায়: (হাসি) এই শুষ্কতার মূল কারণ পিতৃতন্ত্র।
আমার কাছে পানি শুধু পানি নয়। এটি সংযোগ, স্মৃতি আর মুক্তির প্রতীক। আমার আগের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রান টু দ্য রিভার’ (২০২৩)-তেও পানির গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। ছবিটি এমন এক মেয়ের গল্প, যার সারাজীবনের স্বপ্ন একটি নদী দেখা। এই গল্পের অনুপ্রেরণা আমার নানিকে ঘিরে। জীবনের অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনও কোনো নদী দেখার সুযোগ পাননি।
প্রশ্ন: ‘সংস অব ফরগটেন ট্রি’-এ একটি অসাধারণ দৃশ্য আছে। শ্বেতা ঝুমার ভূমিকায় অভিনয় করে, আর সেই সুযোগে থুয়া নিজের সবচেয়ে গভীর অনুভূতির কথা বলে। সে জানায়, ছেলে হয়ে জন্মালে ঝুমাকেই বিয়ে করতে চাইত। দৃশ্যটিতে থুয়া কাপড় কাচছে, চারপাশে পানির উপস্থিতি। এখানে কি ‘নিজের নোংরা কাপড় ধোয়া’—এই বহুল ব্যবহৃত প্রবাদটিকেও ব্যঙ্গ করেছেন?
অনুপর্ণা: যখন আমি ছবিটি বানাচ্ছিলাম, তখন অনেকেই বলেছিলেন, কিছু ‘স্কিন শো’ রাখা উচিত। কিন্তু আমার কাছে সেটি জরুরি মনে হয়নি। আমি অস্বস্তি, দ্বিধা আর বাস্তব সম্পর্কের ভঙ্গুরতাকে দেখাতে চেয়েছি। মানুষ যখন ভালোবাসে, তখন সম্পর্ক শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে যত্ন থাকে, মতভেদ থাকে, দুর্বলতা থাকে। আমার ছবিগুলো সবসময় আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আসে। আমি যা জানি না, তা নিয়ে লিখতে পারি না।
প্রশ্ন: অনেকেই আপনার ছবিকে সমকামী প্রেমের গল্প হিসেবে দেখছেন। অথচ প্রচারে ছবিটিকে সে ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। দর্শকদের এই ব্যাখ্যা আপনি কীভাবে দেখেন?
অনুপর্ণা: আমি অবশ্যই দুই নারীর ভালোবাসা দেখাতে চেয়েছি। কিন্তু আমি চাইনি, তাদের সম্পর্ককে তাড়াহুড়ো করে কোনো নির্দিষ্ট নাম বা পরিণতি দেওয়া হোক। আমি তাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা দিতে চেয়েছি। জীবনের মতোই সেখানে জটিলতা আছে, বিভ্রান্তি আছে, প্রশ্ন আছে, বিস্ময় আছে।আমি নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে পারি না। ভবিষ্যতে যদি এই ছবির সিক্যুয়েল বানাই, তাহলে হয়তো থুয়া আর শ্বেতার সম্পর্ক অন্য দিকে মোড় নেবে। তবে একটা কথা নিশ্চিত—আমি কখনও ভূতের সিনেমা বানাব না। কারণ আমি জীবনে কোনো ভূত দেখিনি! (হাসি)
প্রশ্ন: ছবির আরেকটি দৃশ্যে শ্বেতা থুয়ার অডিশনের ভিডিও ধারণ করছে। সেখানে থুয়া যে চরিত্রে অভিনয় করছে, সে বলে—‘যখন মাঠ পুড়ছে, ঘর পুড়ছে, মানুষের খালি পেট আগুনে জ্বলছে, তখন তোমার কবিতা অর্থহীন মনে হয়।’ এটি কি ‘শিল্প শুধু শিল্পের জন্য’—এই ধারণার সমালোচনা?
অনুপর্ণা: এই দৃশ্যের পেছনে একটি বাস্তব ঘটনা আছে। আমার এক অভিনেত্রী বন্ধু একটি অডিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি তাকে সংলাপ পড়ে সাহায্য করছিলাম। সেই সময় আমি ইতিহাসবিদ জয়া চট্টোপাধ্যায়ের Bengal Divided, The Spoils of Partition এবং Shadows at Noon পড়ছিলাম। তখন আমার মনে হলো, থুয়া এমন এক চরিত্রে অভিনয় করতে পারে, যে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার একজন যৌনকর্মী।একজন পুরুষ তার কাছে এসে প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করছে। তখন সে বলে—
‘যখন মাঠ জ্বলছে, ঘরবাড়ি জ্বলছে, মানুষের ক্ষুধা জ্বলছে—তখন তোমার কবিতা অর্থহীন।’
বাংলায় অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আবেগপ্রবণ। আমার এই কথা শুনে হয়তো তাঁরা রাগ করবেন। কিন্তু আমি যখন দেখলাম, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের উত্তাল সময়েও তিনি প্রেমের কবিতা লিখছেন, তখন আমার ভেতরে প্রশ্ন জেগেছিল। হয়তো রবীন্দ্রনাথকে আমি পুরোপুরি বুঝিনি। এটি আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, শিল্প কেবল আত্মপ্রদর্শনের জন্য হতে পারে না। শিল্পকে বর্তমান সময়ের সত্য বলতে হবে।

প্রশ্ন: এই কথাটি আমাকে ফিলিস্তিনি-লেবানিজ কবি মারওয়ান মাখুলের একটি কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়—
‘রাজনীতি নয়—এমন কবিতা লিখতে হলে
আগে আমাকে পাখির গান শুনতে হবে।
আর পাখির গান শুনতে হলে
যুদ্ধবিমানকে নীরব হতে হবে।’
এই কবিতাটি আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
অনুপর্ণা: অসাধারণ!
এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের সময় শিল্পীদের নীরব থাকার অধিকার নেই। আমাদের কথা বলতে হবে। মানুষ যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে চায়, তাকেই তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। অবশ্যই সুন্দর জিনিসের দিকে তাকানো ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের এমন সাহসও থাকতে হবে, যাতে আমরা অস্বস্তিকর, নির্মম এবং ভয়াবহ বাস্তবতার দিকেও চোখ মেলতে পারি। আমি কখনও কোনো চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ে পড়িনি। তবে আমার শিক্ষকেরা আমাকে শিখিয়েছেন—সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি এমন একটি শিল্পমাধ্যম, যার কাজ আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে বুঝতে শেখানো এবং সেই পৃথিবী নিয়ে কথা বলা।
প্রশ্ন: ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার গ্রহণের সময় ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলার সাহস কোথা থেকে পেলেন? সুসান সারান্ডন বা হাভিয়ের বারদেমের মতো শিল্পীদেরও ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার কারণে পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। আপনার কি ভয় লাগেনি?
অনুপর্ণা রায়: ২০২৩ সালে রাশিয়ায় গিয়েও আমি ফিলিস্তিনের কথা বলেছিলাম। ২০২৫ সালে ভেনিসে সেই সুযোগ আবার এলে, সেখানেও বলেছি। কেউ আমাকে সাহসী বলেছে, কেউ বোকা বলেছে। এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—যা সঠিক মনে করি, তা করা। হ্যাঁ, আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। তাই বিষয়টি নিয়ে আমার পরামর্শদাতা অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, "না বেটা, এটা কোরো না। এর পরিণতি তুমি জানো।" তিনি একজন বাবার মতোই আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে বলেছিলেন। আমি তাঁর কথা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমি জানতাম, যদি সেদিন চুপ থাকি, তাহলে সারাজীবন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকব। শুধু নিজের সিনেমা নিয়েই যদি ভাবি, তাহলে নিজেকে শিল্পী বলব কীভাবে? আমি ফিলিস্তিনের কথা বলব, মণিপুরের কথা বলব, গুজরাটের কথাও বলব।
প্রশ্ন: ভেনিসে সেই বক্তব্যের পরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হুমকি এল, সেগুলো কীভাবে সামলেছেন?
অনুপর্ণা: অনেক হুমকি পেয়েছি। আমার বাবা-মাকেও হয়রানি করা হয়েছে। লোকজন তাদের গিয়ে বলেছে, "আপনাদের মেয়ে নাকি বামপন্থী হয়ে গেছে।" এগুলো আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। আমার তো বাম, ডান বা মধ্যপন্থী হওয়ার বিলাসিতা নেই। আমি এখনও নিজের লিঙ্গ-পরিচয় নিয়েই লড়াই করছি! এই রাজনৈতিক তকমাগুলো পুরুষেরা তৈরি করেছে। ওগুলো তাদের কাছেই থাক।
কলকাতায় বসে অনেকেই মনে করেন, তাঁরা গোটা পৃথিবীর হয়ে কথা বলতে পারেন। অথচ পুরুলিয়া, মেদিনীপুর বা মালদায় যাওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেন না। আর বাংলাকে যারা ভালোবাসার কথা বলেন, তাঁদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে শুধু রবীন্দ্রনাথ, আলু পোস্ত আর মাছের ঝোল। শুধু নস্টালজিয়া আর ভুয়ো দেশপ্রেম দিয়ে কোনো সমাজ এগোতে পারে না। আমাদের জেগে উঠতে হবে। যে বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে।
প্রশ্ন: ২০২৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের একটি প্রতিনিধিদল ইসরায়েলে গিয়েছিল যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে। আবার ২০১৮ সালে মুম্বইয়ে 'শালোম বলিউড' অনুষ্ঠানে অমিতাভ বচ্চন, করণ জোহর, ইমতিয়াজ আলি, ঐশ্বরিয়া রাইসহ অনেকেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। অধিকৃত ফিলিস্তিনে শুটিংয়ের জন্যও ইসরায়েল আর্থিক প্রণোদনা দেয়। এদিকে ‘ফ্লিম ওয়ার্কাস ফর ফিলিস্তিন’ আন্দোলনের শিল্পীরা ইসরায়েলের চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ না করার অঙ্গীকার করেছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
অনুপর্ণা: এসব তথ্য আমি আগে জানতাম না। মানুষ এসব করছে কেন? কয়েকটা টাকার জন্য? আমাকে ইসরায়েলের সিনেমা সাউথ ফেস্টিভ্যাল’-এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি যাইনি। তারা যত অর্থই দিক না কেন, আমার কাছে নীতিই বড়। শিল্পীদের একটা অবস্থান নিতে হবে। আমি এটা বলছি না যে সব ইসরায়েলিকে বয়কট করতে হবে। একেবারেই না। ইসরায়েলেও এমন মানুষ আছেন, যারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মী এবং তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে, সে কথাও বলতে হবে।
প্রশ্ন: এখন কী নিয়ে কাজ করছেন?
অনুপর্ণা: নতুন ছবির নাম ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’। শুটিং শেষ হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ট্রেলার প্রকাশ করতে পারব। ছবিটি প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে। এর মধ্যে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গারও উল্লেখ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রযোজক আমাকে কতটা রাখতে দেবেন, সেটা এখনই বলতে পারছি না। এখন অনেক ভালো স্বাধীন ছবি তৈরি হচ্ছে। নিধি সাক্সেনার ‘সিক্রেট অফ এ মাউন্টেন সার্পেন্ট’, ত্রিবেণী রাইয়ের ‘সিইপ অফ মমো’, রোহন কানাওয়াড়ের ‘সাবার বান্দা’, শৌনক সেনের ‘অল দ্য ব্রেথস’—এসব কাজ আমাকে আশাবাদী করে। কিন্তু স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য সময়টা খুব কঠিন। কোনো বড় তারকার—কোনো 'কুমার' বা 'খান'-এর ছবি মুক্তি পেলেই ছোট ছবিগুলো প্রেক্ষাগৃহ থেকে প্রায় হারিয়ে যায়। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবু লড়াই থামানো যাবে না।

২০২৬ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে নেটপ্যাকের সেরা এশীয় ছবির পুরস্কার পেয়েছে বাংলার স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুপর্ণা রায়ের ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’। মুম্বইয়ের প্রান্তিক জীবন ও চার অভিবাসী শ্রমিকের গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটিতে হিন্দি, সিলেটি ও মারাঠি ভাষার ব্যবহার রয়েছে। অভিবাসন, নগরজীবনে টিকে থাকা, আকাঙ্ক্ষা, লিঙ্গ ও দারিদ্র্যকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরায় নেটপ্যাক জুরি ছবিটির প্রশংসা করে। ১১ সেপ্টেম্বর ভেনিসের ‘ওরিজোন্তি’ বিভাগে ছবিটির প্রিমিয়ার হয় এবং প্রায় সাত মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন পায়। ভেনিসে এটি অনুপর্ণার টানা দ্বিতীয় সাফল্য। ২০২৫ সালে প্রথম ছবি ‘সংস অব ফরগটেন ট্রি’-এর জন্য তিনি সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









