গাজা নিয়ে ম্যাকলমোরের মন্তব্যের জেরে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় একক কনসার্টে গাজা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান। তিনি বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা ছিল ভয়াবহ, আর গাজার বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ ও অন্যায্য। এর আগে ফিলিস্তিনের পক্ষে মন্তব্য করায় র্যাপার ম্যাকলমোরকে শিরানের সফর থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে সফরের অন্য শিল্পীরাও সরে দাঁড়ান।
লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ডে প্রায় পূর্ণ দর্শকের সামনে শিরান বলেন, তিনি কখনো রাজনৈতিক শিল্পী হতে চাননি। তার গান ও কনসার্ট ঐক্য ও মানবতার কথা বলবে, রাজনীতির নয়। তার ভাষায়, “আমি ভক্তদের হতাশ করতে চাই না। কিন্তু এই ঘটনা আমাকে বাক্স্বাধীনতা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন বিতর্কের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছে।”
কীভাবে শুরু হলো বিতর্ক
গত ৫ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সির এক অনুষ্ঠানে মঞ্চে ফ্রি প্যালেস্টাইন বলেন ম্যাকলমোর। এরপর তাকে শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফর থেকে বাদ দেওয়া হয়। শিরান জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি তার নয়। এটি হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্র্যাফটের অনুরোধে। ক্র্যাফটের প্রতিষ্ঠান যে স্টেডিয়ামের মালিক, সেখানে শুক্রবার শিরানের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। শিরান আরও বলেছেন, সফরের প্রমোটরই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিরান এই বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সফরের সহশিল্পীরা সরে যান। আয়ারল্যান্ডের লোকসংগীত দল বিওগা তার সঙ্গে প্রতিটি অনুষ্ঠানে কয়েকটি গান গাইত। ম্যাকলমোরের জায়গায় আসা ডেনমার্কের ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম ও আইরিশ গায়ক অ্যারন রোও সরে দাঁড়ান। বিলি আইলিশের ভাই ও সংগীত-সহযোগী ফিনিয়াস এ বছরের শেষদিকে দক্ষিণ আমেরিকা সফরে শিরানের সঙ্গে থাকার কথা ছিল। তিনিও নাম প্রত্যাহার করেছেন।

স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ
অনুষ্ঠানের আগে স্টেডিয়ামের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী একটি ছোট দল জড়ো হয়। ৩৪ বছর বয়সী হিলারি স্টাইনবার্গ এক বছর আগে টিকিট কিনেছিলেন। পরে টিকিট ফেরত দিয়ে তিনি বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি বলেন, “এই সপ্তাহের আগে পর্যন্ত আমি এড শিরানের বড় ভক্ত ছিলাম। আমার মতে সব শিল্পই রাজনৈতিক, সব সংগীতই রাজনৈতিক। তাই এই সিদ্ধান্তও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।”
অন্যদিকে পেনসিলভানিয়ার স্ট্রাউডসবার্গের ৫৩ বছর বয়সী ডায়ান সাভিটজ কয়েক মাস আগে টিকিট কেটেছিলেন। তিনি বলেন, শিরান কোনো ভুল করেননি। তার মতে, “কনসার্ট হওয়া উচিত গান উপভোগের জন্য। সংগীত মানুষকে কাছে আনে। সবারই মত প্রকাশের অধিকার আছে, তবে প্রতিটি মঞ্চ তার জায়গা নয়।”
অনুদানের ঘোষণা
ম্যাকলমোর বুধবার জানিয়েছেন, তিনি ফিলিস্তিনের ত্রাণ কার্যক্রমে ১০ লাখ ডলার দান করছেন। তিনি ক্র্যাফটকেও সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানান। ক্র্যাফটের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ক্র্যাফট ও শিরান প্রত্যেকে ২০ লাখ ডলার করে দিতে রাজি হয়েছেন। তবে অর্থ কোথায় যাবে, তা জানানো হয়নি। শিরানের প্রতিনিধিরা একাধিকবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।
মুক্ত বিশ্বে এমনটা হওয়া উচিত নয়
এই সপ্তাহের শুরুতে শিরান বলেছিলেন, তিনি গাজা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় জড়াবেন না, কারণ ভক্তরা এসব শুনতে তার অনুষ্ঠানে আসেন না। তিনি জানান, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার আগে পুরো সপ্তাহ ধরে স্টেডিয়ামের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। ভক্তদের হতাশ করা বা সফরের কর্মীদের কাজ হারানোর মুখে ফেলা তিনি কখনো চান না বলেও জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রমোটর ও স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা বেশি হলেও শিরানের মতো তারকা সাধারণত অনুষ্ঠানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ফিলাডেলফিয়ায় শিরান দর্শকদের বলেন, তার কনসার্টে সবার জায়গা আছে। ভিন্ন মত থাকলেও সবাই তার গান গাইতে পারেন, কারণ সেগুলো ভালোবাসা, আশা ও ঐক্যের কথা বলে। মঞ্চে কী হবে তা আগে থেকে অনুমোদন করানোর চর্চা নিয়ে তিনি উদ্বেগও জানান। তার কথায়, “বিশ্বের অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমি এমন ঘটনা দেখি, কিন্তু মুক্ত বিশ্বে এমনটা কখনোই হওয়া উচিত নয়।”
সফরের সাফল্য
পোলস্টারের তথ্য অনুযায়ী, শিরানের লুপ ট্যুর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আয় করা সফর। প্রতিটি শহরে গড়ে সাত মিলিয়ন ডলারের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আয় করা কনসার্ট শিল্পীদের তালিকায় তিনি তৃতীয় স্থানে ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









