অতীতের গুরুত্বপূর্ণ কোনো চলচ্চিত্র নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি হলে অনেক সময় চলচ্চিত্রের ইতিহাসও নতুন করে লিখতে হয়। বিশেষ করে জাতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এমন পুনর্মূল্যায়ন কখনো কখনো একধরনের তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তখন মনে হতে পারে, কয়েক দশক আগে যদি আমরা জানতাম যে মিকিও নারুসে ইয়াসুজিরো ওজুর চেয়ে বড় চলচ্চিত্রকার, বরিস বার্নেট সের্গেই আইজেনস্টাইনের চেয়ে বড়, আর ঋত্বিক ঘটক সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে বড়—তাহলে কী হতো! বাস্তবে এ ধরনের চরম তুলনার কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে ঋত্বিক ও সত্যজিতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা খোঁজারও দরকার নেই। তারা দুজনেই পরস্পরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাদের একজনকে বুঝতে গিয়ে অন্যজনকে ছোট করার কোনো অর্থ হয় না।
তবে এই দুই চলচ্চিত্রকারের মধ্যে একটি পার্থক্য টানা যেতে পারে, যা আমাদের বোঝাপড়াকে আরও গভীর করে। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ছিল একধরনের ‘আর্ট সিনেমা’, যা বলিউডের মতো জনপ্রিয় ভারতীয় বিনোদনধারার বাইরে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছিল। তার চলচ্চিত্রের মানবতাবাদ ও বাস্তববাদ সহজেই বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। অন্যদিকে, বাঙালি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ছিলেন আরও প্রান্তিক এক অবস্থানে—আর্ট সিনেমারও যেন অগ্রবর্তী বা অ্যাভাঁ-গার্দ ধারায়। তিনি জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা রূপ নিয়ে কাজ করলেও জীবদ্দশায় শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমিত এক কাল্ট-খ্যাতির বেশি পাননি। নিজের দেশেও যথেষ্ট স্বীকৃতি তার ভাগ্যে জোটেনি; দেশের বাইরের স্বীকৃতি ছিল আরও কম।

ঋত্বিকের চলচ্চিত্র
তিনি আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র এবং কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন—সত্যজিতের কাজের তুলনায় অনেক বেশি স্নায়ুচঞ্চল, অনেক বেশি র্যাডিক্যাল ও আধুনিক। তার ছবির প্রতিটি মুহূর্তে যেন একধরনের ধাক্কা অনুভব করা যায়। এর একটি কারণ অবশ্যই তার ব্যক্তিগত জীবন। অযান্ত্রিক (১৯৫৮), তার দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় থেকেই তিনি প্রায় নিয়মিত মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। গভীর বিষণ্নতার পর্ব এবং মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে থাকার অভিজ্ঞতাও তার জীবনে বারবার ফিরে এসেছে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। এসব তথ্য তার শিল্পীসত্তার বাইরে পড়ে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন জীবনীমূলক উপাদান নয়। বরং একজন মদ্যপ মানুষের মানসিক গঠনের মধ্যেও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা আজও ঋত্বিকের চলচ্চিত্রসম্ভারকে এত বিস্ময়কর করে রেখেছে—তা বুঝতে সাহায্য করে। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন তীক্ষ্ণ যুক্তিবাদী এবং সম্পূর্ণ আবেগপ্রবণ, এমনকি নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন এক মানুষ। তার চলচ্চিত্রের মেলোড্রামা ক্রমাগত উত্তেজনা ও প্রায় উন্মত্ততার দিকে এগিয়ে যায়। এই মেলোড্রামার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের জীবনে বহন করে চলা বাংলার ইতিহাসের ক্ষতকে বারবার পর্দায় রূপ দিতে পেরেছিলেন।
ঋত্বিক ঘটকের শেষ দিকের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) বিশেষভাবে স্মরণীয়। এটি তার শেষের আগের ছবি এবং দর্শকের সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি। ছবির শুরুতে উৎসর্গ করা হয়েছে ‘চিরকালীন বাংলার অগণিত শ্রমজীবী মানুষকে’। কিন্তু ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে সত্যিই কি কোনো কিছু চিরকালীন? তার ছবিতে আমরা দেখি জায়গা, জনপদ, সম্প্রদায় ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধীর, যন্ত্রণাময় অবক্ষয়। মানুষ একে অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে—সব সময় নিজের ইচ্ছায় নয়, অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে। তারা পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, দিশাহারা হয়, পাগল হয়ে যায়। এমনকি প্রবল প্রতাপশালী তিতাস নদীও যেন ‘অদ্ভুত আচরণ’ করতে শুরু করে—ছবির এক চরিত্রের ভাষায়। মনে হয়, চারপাশের সবকিছুর ভাঙন ও অবক্ষয়ের প্রতিক্রিয়ায় নদীও বদলে যাচ্ছে। ঋত্বিকের কিছু ভুতুড়ে অথচ মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে থাকা দৃশ্যে আমরা দেখি, নদীর বুক ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে, তার তলদেশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তিতাসের তীরের গোকনঘাট গ্রামের জেলেজীবন হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ঋত্বিক একটি জীবনধারার বিলুপ্তির বিষণ্ন ছবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি নস্টালজিক নয়, আবেগসর্বস্বও নয়। ব্যক্তিমানুষের জীবন কিংবা ছোট কোনো সম্প্রদায়ের পরিসরে (এ-ফ্ল্যাট, ১৯৬১), আবার বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় (তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নাগরিক, ১৯৫২)—সব ক্ষেত্রেই তাঁর চলচ্চিত্রের প্রধান কাজ অবিরাম পরিবর্তনের বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করা। বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যে শিল্পায়ন ও আধুনিকতার পরিবর্তন বয়ে গেছে, ঋত্বিক কখনো বিস্মিত হয়ে, কখনো বিষণ্ন দৃষ্টিতে, কিন্তু সব সময় গভীর কৌতূহল নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছেন। এই পরিবর্তন অনিবার্য, তাকে থামানো যায় না। অযান্ত্রিক-এ একটি গাড়ির গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি এই পরিবর্তনকে কখনো কৌতুকের রূপ দিয়েছেন, আবার সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)-এর মতো ছবিতে তাকে রূপ দিয়েছেন মহাকাব্যিক নাটকে।
আধুনিক পৃথিবীর এই রূপান্তরকে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি ঋত্বিক নিজেও ছিলেন একজন আধুনিকতাবাদী শিল্পী—এবং তার ছিল বিপ্লবী আদর্শ। বিশের কোঠায় থাকতেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। তার সমসাময়িক আরেক বাঙালি চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনও এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঋত্বিক সেখানে নাটক লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। এই সময়েই বার্টোল্ট ব্রেখটের নাট্যতত্ত্বের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। একই সঙ্গে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন—বামপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে জনপ্রিয় মানুষের বোধগম্য গল্প বলার রীতির মিলন ঘটানো। ব্রেখটের মতো ঋত্বিকও চাইতেন, দর্শক যেন একদিকে আবেগ দিয়ে নাটক বা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রেখে তাকে বিশ্লেষণও করতে পারেন। এই আবেগ ও বিশ্লেষণের মধ্যে দোলাচল, এই দ্বান্দ্বিক চলাচলই ছিল তার কাম্য। তার কাছে মনে হয়েছিল, এই ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য সিনেমাই সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম। তবে ১৯৭৩ সালে এসে ঋত্বিকের তরুণ বয়সের সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের স্বপ্ন অনেক জটিল, কখনো পরস্পরবিরোধী এক অবস্থায় পৌঁছেছিল। তার অঙ্গীকার তখনো অটুট ছিল। তিনি সব সময় এমন এক ‘কাজের সিনেমা’র কথা বলতেন, যা কোনো না কোনোভাবে মানুষের কাজে লাগবে, একটি উন্নততর পৃথিবী গড়ার স্বপ্নকে সাহায্য করবে। কিন্তু সেই অঙ্গীকারের পাশাপাশি জমেছিল গভীর হতাশাও। তার শেষ দিকের কাজগুলোতে এই তিক্ত-মধুর অনুভূতি স্পষ্ট। তিতাস একটি নদীর নাম শেষ করার কিছুদিন পর তিনি বলেছিলেন, ছবিটি যেন এই শিক্ষাই দেয় যে ‘ইতিহাস নির্মম’। যে পৃথিবী তিনি ছবিতে পুনর্নির্মাণ করেছেন, তা ‘সব হারিয়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ সত্যিই, এ যেন এমন এক নদী, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

ঋত্বিকের জীবন ইতিহাসের গভীর ক্ষতচিহ্নে চিহ্নিত। সেই ক্ষতই তার সংবেদনশীলতার ভিত্তি এবং তার সব ধরনের শিল্পকর্মের উপাদান হয়ে উঠেছিল—নাটক, গল্প, কবিতা, চলচ্চিত্র। ১৯৪০-এর দশকে তার কৈশোর কেটেছে পূর্ববঙ্গে। এই দশকজুড়ে তিনি একের পর এক ভয়াবহ ঐতিহাসিক সংকট প্রত্যক্ষ করেছেন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ, একের পর এক দাঙ্গা, ধর্মঘট ও বিদ্রোহ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগ। ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অবসানের পর ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে তৈরি হয় পাকিস্তান অধিরাজ্য এবং ভারতীয় ইউনিয়ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের পূর্ববঙ্গ যুক্ত হয় পাকিস্তানের সঙ্গে, আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায় ভারতের অংশ হিসেবে। এই দেশভাগের ফলে কোটি কোটি মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়। এই স্থানচ্যুতির পথে প্রাণ হারান অসংখ্য মানুষ। তিতাস একটি নদীর নাম-এর শুরুতে ছবির শিরোনামের সঙ্গে যে বিষণ্ন কথাগুলো ভেসে ওঠে, সেখান থেকেই বোঝা যায়, বাংলার এই অস্থির ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া, নাম-পরিচয়হীন সাধারণ মানুষের বিপুল জনসমষ্টিই ছিল ঋত্বিকের গভীর মনোযোগের কেন্দ্র।
‘দেশভাগ’—শব্দটি নিজেই যেন ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। এমন কোনো চলচ্চিত্রকার কি আছেন, যিনি বিচ্ছেদ, পরিত্যক্ত হওয়া, ভাঙন ও খণ্ডিত হওয়ার এত বিচিত্র রূপ নিয়ে এত গভীরভাবে, এত একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করেছেন? শুধু বৃহত্তর সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কিংবা গল্পের ঘটনাপ্রবাহে নয়, ঋত্বিক তার চলচ্চিত্রের নির্মাণরীতির মধ্যেও বিচ্ছেদের এই যন্ত্রণা হাজির করেছেন। তার সুপরিকল্পিত ফ্রেম, সংগীত ও শব্দের বৈপ্লবিক ব্যবহার এবং সর্বোপরি তার কঠোর, অতিআধুনিক সম্পাদনার ধরন—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে ভাঙনের অনুভূতি। তার ছবিতে কতবার এমন হয়েছে যে তীব্র নাটকীয়তার একটি দৃশ্য যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়! ছবি, সংগীত, অঙ্গভঙ্গি—সবকিছু এক মুহূর্তে থেমে যায়, দর্শকের মনোযোগ থেকে যেন রূঢ়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয় দৃশ্যটি।
কয়েক দশক আগে কিছু দর্শক ও সমালোচক ঋত্বিকের এই নির্মাণরীতিকে তার ‘খসখসে’ বা অসম্পূর্ণ শৈলীর প্রকাশ বলে মনে করেছিলেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, তার হাতে থাকা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো এমন হয়েছে। কিন্তু একুশ শতকের দর্শকের চোখে ও কানে এখন তার চলচ্চিত্রভাষা অনেক বেশি পরিশীলিত ও অস্থির—যেমন জঁ-লুক গোদার কিংবা লিন রামসের চলচ্চিত্রভাষা। ঋত্বিক ছিলেন বিচ্ছেদের কবি। ১৯৬০ সালের মেঘে ঢাকা তারা নির্মাণের সময়েই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের দুটি আপাতবিরোধী পদ্ধতিকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছিলেন। একটি হলো মিজ-আঁ-সেন—যেখানে একটি দৃশ্যের ভেতরে চরিত্রগুলোর অবস্থান, চলাচল ও বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যটি মন্টাজ—যেখানে একটি শটের সঙ্গে পরবর্তী শটের সংঘর্ষ, দৃশ্যগত বৈপরীত্য ও সম্পাদনার ছন্দ প্রধান হয়ে ওঠে। বাস্তবে ঋত্বিক তার সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আইজেনস্টাইনের মন্টাজের নীতিকে চলচ্চিত্র নির্মাণের উভয় পর্যায়ে প্রয়োগ করেছিলেন। তার প্রতিটি ফ্রেমের ভেতরেই যেন এক যুদ্ধ চলত, আর প্রতিটি কাট সেই দৃশ্যকে আরও খানিকটা ভেঙে দিত।
তিতাস একটি নদীর নাম নির্মিত হয়েছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস অবলম্বনে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে, লেখকের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর। অদ্বৈত মল্লবর্মণের পরিচিতির একটি বড় কারণ ছিল, তিনি সেই চরম দারিদ্র্যের ভেতর থেকে উঠে এসেছিলেন, যে দারিদ্র্যের ছবি ঋত্বিকের চলচ্চিত্রেও দেখা যায়। উপন্যাসের কাহিনি ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকের। ফলে আক্ষরিক অর্থে এটি দেশভাগের সময়কার গল্প নয়। কিন্তু ঋত্বিক তার চলচ্চিত্রে দেশভাগের ক্ষতকে অতীতের আরও বিস্তৃত ইতিহাসের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। যে ইতিহাস তিনি দেখেছেন, যে ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নিজে বেঁচে থেকেছেন, তার প্রতিটি স্তরেই তিনি দেশভাগের অভিজ্ঞতাকে খুঁজে পেয়েছেন। আবার অন্য এক অর্থে ছবিটি তার নির্মাণকালীন বাস্তবতার খুব কাছাকাছি ছিল। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৭১ সালে। এটিও ছিল আরেকটি বিভাজনের পরিণতি। তবে পঞ্চাশের দশক থেকেই ঋত্বিকের কিছু সহকর্মীর মনে হয়েছিল, তিনি যেন দেশভাগের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের মধ্যেই অতিরিক্তভাবে আটকে আছেন। ভারতীয় গবেষক মইনাক বিশ্বাসের ভাষায়, ঋত্বিক ‘সেই ঘটনাকে ক্রমাগত এমন এক রূপকে পরিণত করছিলেন, যার মধ্যে তার সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতায় ঘটে যাওয়া সব বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংসের অর্থ ধরা পড়ে। কখনো কখনো তিনি নিজের দেশের সর্বব্যাপী অবক্ষয়কেও কেবল দেশভাগের ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন।’ কিন্তু আজ তার অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। একদিকে তিনি দেশভাগের ভয়াবহ বিপর্যয়কে ঘিরে থাকা অস্বীকারের বিশাল কুয়াশার বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। অন্যদিকে, ভারতের সামাজিক আধুনিকতাকে চালিত করা অগ্রগতির সরল ও একপেশে উদ্যাপনেরও বিরোধিতা করছিলেন।

তিতাস একটি নদীর নাম-এর কাহিনি বিশুদ্ধ মেলোড্রামা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে এই ধারাকে ঋত্বিক গর্বের সঙ্গে নিজের উত্তরাধিকার বলে দাবি করেছিলেন। তিনি ভারতীয় দর্শকের কাছে পরিচিত নানা সাংস্কৃতিক আদিরূপ ব্যবহার করেছেন—দুঃখী মা, জ্ঞানী কিংবা পাগল বৃদ্ধ, গ্রামের গুজবপ্রিয় মানুষ, লাজুক ও নিষ্পাপ নববধূ। কিন্তু তারপরই তিনি গল্প বলার প্রচলিত রীতিকে কখনো সূক্ষ্মভাবে, কখনো সাহসী ও উসকানিমূলক ভঙ্গিতে ভেঙে দেন। ব্রেখটীয় নাট্যভাবনার সঙ্গে সংগতি রেখে ছবিটি একটি ভাঙাচোরা, ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন মেলোড্রামা। এর দুটি অংশের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট ও কঠোর বিভাজন। গল্প এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রের জীবনে চলে যায়; কোনো একটি কাহিনিসূত্রকে একটানা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা এখানে নেই। সে সময়ের বিশ্ব চলচ্চিত্রে এ ধরনের কৌশল খুব একটা দেখা যেত না। ঋত্বিকের ছবিতে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষের সব আবেগ, সংকট ও বিপর্যয়ের শুরু শৈশব ও কৈশোরের গঠনপর্বে। ছবির শুরুতে আমরা দেখি বাসন্তী নামের এক কিশোরীকে। বড় হয়ে যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন রোজি সামাদ। বাসন্তী স্বপ্ন দেখে, একদিন সে কিশোরকে বিয়ে করবে। কিশোরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র। কিশোরের সঙ্গে সব সময় থাকে তার বন্ধু সুবল। সময়ের সঙ্গে তারা দুজনই যুবক হয়ে ওঠে। একদিন নদীপথে তারা পৌঁছায় অন্য এক গ্রাম উজানীনগরে। সেখানে কিশোরের বিয়ে ঠিক হয় রাজার ঝির সঙ্গে। রাজার ঝির চরিত্রে অভিনয় করেছেন কবরী চৌধুরী।
স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার সেই একটিমাত্র ক্ষণস্থায়ী রাতেই তাদের গর্ভে আসে একটি সন্তান। অথচ স্বামীকে ভালো করে দেখার সুযোগও রাজার ঝির আর হয় না। নৌকায় করে ফিরে আসার পথে, নদীর বুকে, লাজুক রাজার ঝি তখনো কিশোরের দিকে ঠিকমতো তাকাতে পারে না। এমন সময় তাদের দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। রাজার ঝিকে অপহরণ করা হয়। সে বেঁচে যায় এবং কোনোভাবে তিতাসের তীরে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এই ঘটনার অভিঘাতে কিশোর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। রাজার ঝি যে বেঁচে আছে, সে কথা আর কোনো দিনই তার জানা হয় না। এদিকে বাসন্তীর বিয়ে হয় সুবলের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পরদিনই সুবল মারা যায়। আর এই পর্যন্ত পৌঁছাতেই ছবির মাত্র ত্রিশ মিনিট কেটেছে—যে ছবির মোট দৈর্ঘ্য ১৫৬ মিনিট! ছবির সব ঘটনা পর্দায় দেখানো হয় না। কোনো কোনো ঘটনা আমরা জানতে পারি অনেক পরে, অতীতের কোনো সূত্র ধরে। যেমন বাসন্তীর বিয়ের ঘটনাটি। গল্প নির্মাণের জন্য ঋত্বিক সময়ের মধ্যে বড় বড় লাফ দিতে ভালোবাসতেন। সময়ের অনেকখানি অংশ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিতেন। তার কাছে ঘটনার প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ছবির ভেতরে তৈরি হওয়া শক্তিশালী প্রতিধ্বনি। যেমন ছবির শুরুতে ছোট্ট বাসন্তী তিতাসের ‘শেষ ফোঁটা’ নিয়ে যে কথা শোনে—‘যা না থাকলে আমাদের আত্মা পৃথিবী ছেড়ে যেতে পারে না’—সেই কথাই ফিরে আসে ছবির শেষ দৃশ্যে।
ঋত্বিক নিজেই বলেছিলেন, মেলোড্রামার প্রচলিত উপাদানগুলোকে আরও তীব্র করে তোলাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অস্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহ, যন্ত্রণাদায়ক কাকতালীয় ঘটনা এবং চরিত্রগুলোর অজান্তে একে অন্যের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া—এসবের মধ্য দিয়েই তিনি ব্রেখটের মহাকাব্যিক নাট্যরীতির দিকে এগোতে চেয়েছেন। যেমন বাসন্তী ও রাজার ঝি পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠে, অথচ কেউই জানে না তাদের অতীতের সম্পর্কের কথা। আবার রাজার ঝি পাগল কিশোরের প্রেমে পড়ে। সেও জানে না, এই মানুষটিই তার হারিয়ে যাওয়া স্বামী। সে মনে করে, কিশোরের হারানো জীবনসঙ্গীর জায়গা সে হয়তো পূরণ করতে পারবে। মেলোড্রামার যেসব ঘটনা চরিত্রের সচেতন ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে, যেসব ঘটনা মানুষকে ভাগ্য কিংবা আকস্মিকতার নিষ্ঠুর চক্রের হাতে তুলে দেয়, ঋত্বিক সেসবের মধ্যেও রাজনৈতিক তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছিলেন। কারণ তিনি শুধু ব্যক্তিমানুষের ইচ্ছা বা চেতনা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তার আগ্রহ ছিল সেই বৃহত্তর শক্তিগুলোর প্রতি, যেগুলো মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ সেই শক্তিগুলোকে বোঝার একমাত্র পথও হলো এই মানুষগুলো—ইতিহাসের দীর্ঘদিনের নির্যাতিত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট, অসহায় শিকার।
ইতিহাস প্রায় ঋত্বিককেও নিজের শিকার করে নিয়েছিল। শুধু তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিহাসের অভিঘাত পড়েছিল, তা-ই নয়। ১৯৭৬ সালে তার মৃত্যুর সময় তার শেষ এবং সবচেয়ে পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র যুক্তি তক্কো আর গপ্পো নির্মাণ শেষ হয়ে গেছে দুই বছর আগে। কিন্তু ছবিটি তখনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পায়নি। পরে তার স্ত্রী সুরমা ঘটক বলেছিলেন, তিনি আফসোস করেন—ইন্দিরা গান্ধী যেহেতু ঋত্বিকের কাজের অনুরাগী ছিলেন, তাই ছবিটি মুক্তির জন্য তার কাছে অনুরোধ করা উচিত ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে ঋত্বিকের কাজ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে আশির দশক থেকে। কিন্তু তার চলচ্চিত্রসম্ভার এবং ছবিগুলোর মূল উপাদান ক্রমশ অবহেলা ও অযত্নের মধ্যে পড়ে যায়। ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে—বিশেষ করে তার ছেলে ঋতবান ঘটকের নিরলস প্রচেষ্টায়—এই অবস্থা বদলাতে শুরু করে। তিতাস একটি নদীর নাম-এর মূল ক্যামেরা নেগেটিভ ও শব্দের নেগেটিভ অসম্পূর্ণ অবস্থায় ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত ছিল। অন্যদিকে, বার্লিনের বুন্ডেসআর্কাইভ-ফিল্মআর্কাইভের কাছে ছিল ছবিটির একটি সম্পূর্ণ পজিটিভ প্রিন্ট। এই উপাদানগুলো পরে ওয়ার্ল্ড সিনেমা প্রজেক্টের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারা ইতালির বোলোনিয়ার সিনেমাতেকা দি বোলোনিয়ার ‘ল’ইমাজিনে রিত্রোভাতা’ পরীক্ষাগারে ছবিটির পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। ২০১০ সালের মে মাসে সেই কাজ শেষ হয়। ডিজিটাল পুনরুদ্ধারের সময় ছবির শুরুর শিরোনামগুলোও নতুন করে তৈরি করা হয়। সংরক্ষণের জন্য এই কাজের মাধ্যমে একটি নতুন ৩৫ মিলিমিটার ইন্টারনেগেটিভও প্রস্তুত করা হয়।
দীর্ঘ ও ঘুরপথ পেরিয়ে অবশেষে ছবিটি তার সর্বোত্তম রূপে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটকের শিল্পীসত্তার যথাযথ স্বীকৃতিও ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুরমা ঘটক তার প্রয়াত স্বামীর এই নতুন করে পাওয়া খ্যাতির দিকে তাকিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ঋত্বিক কি তবে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন? মৃত্যুর পর যে ভালো ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, তিনি কি তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন?
তিতাস একটি নদীর নাম-এর নির্মাতার ক্ষেত্রে এই ভাবনাটি বড়ই মানানসই। ছবিটিতে ভূতের গল্পের মতো একটি বিশ্বাসের কথা আছে—‘মৃত্যুর পর মা শত্রু হয়ে ওঠে’, কারণ সে জীবিতদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয় এবং তাদেরও নিজের অবস্থানে টেনে নিতে চায়। ঋত্বিক ঘটক জীবদ্দশায় ছিলেন এক অস্থির, যন্ত্রণাবিদ্ধ আত্মা। আজ তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেই অশান্ত আত্মা, যিনি নিজের ভূমিকম্প-লিপির মতো চলচ্চিত্রভাষায় ইতিহাসের ক্ষত, মানুষের বিচ্ছেদ ও বিপর্যয়ের কম্পনকে ধরে রেখেছেন। তার চলচ্চিত্র আমাদের তাড়া করে ফেরে—যেন ইতিহাসের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









