বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সুবর্ণরেখা নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য পড়ার পর ছবিটি সম্পর্কে আমার নিজের কিছু কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে। আমি জানি, পরিচালকের বক্তব্য তাঁর তৈরি ছবির মধ্যেই নিহিত থাকে। তবু এ বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
কয়েকজন বিদগ্ধ দর্শক ছবিটি দেখার পর এবং আমার আগের কিছু লেখা পড়ার পর মনে করেছেন, এই ছবির মধ্য দিয়ে আমি যেন হতাশার একটি মতবাদ প্রচার করতে চেয়েছি। তাদের ধারণা, আমি ‘হতাশা’ ও ‘অবক্ষয়’-এর দর্শনে বিশ্বাসী।অবক্ষয়ের এই ব্যাপারটি আমি বুঝতে পারি না। অবক্ষয়ী শিল্পী হওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই। হতাশার কোনো মতবাদ প্রচার করার অসৎ উদ্দেশ্যও আমার নেই। এই ছবির মধ্য দিয়ে আমি যা বলতে চেয়েছি, তা হলো বর্তমান বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের ওপর যে আসন্ন বিপদ ঘনিয়ে আসছে, তা নিয়ে আমার গভীর উদ্বেগ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে এই বিপদ কীভাবে ধীরে ধীরে এক বিরাট দানবের আকার ধারণ করেছে, সেটিই ধরার চেষ্টা করেছি। এই বিপদের প্রথম বলি হয়েছে আমাদের সংবেদনশীলতা। আমাদের ভেতর থেকে এই অনুভব করার ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আমি সেই জায়গাতেই আঘাত করতে চেয়েছি। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা মনে পড়ছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার নামের সঙ্গে আরও কয়েকজন পরিচিত পরিচালকের নাম একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়। তাদের কাজ যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, এভাবে আমাদের একই গোত্রের বলে পরিচয় করানো শুধু ভুল নয়, তাদের এবং আমার—উভয়ের প্রতিই অন্যায়। তারা একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি তৈরি করেন। আমিও ছবি তৈরি করি, তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কে ভালো বা কে মন্দ, সেই বিচার করার প্রশ্ন নেই। প্রশ্নটি হলো, আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।
দেশের সামনে যে বিপদ উপস্থিত, কোনো না কোনোভাবে সেই বিপদকে প্রকাশ না করলে আমার মনে হয়, ছবি তৈরি করার অধিকারই আমার নেই। আমার অধিকাংশ ছবিই এই সমস্যাকে বোঝার নানা চেষ্টা। ‘সুবর্ণরেখা’ ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি যেমন স্লোগান খুঁজে বেড়ানো কোনো উন্মাদ নই, তেমনি শুধু মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ছবি তৈরির ধারণাকেও ঘৃণা করি। আমার মনে হয়, এই মনোভাব নিছক চালাকি, একধরনের প্রতারণা। আমার সব ছবির ভেতরেই এই ভাবনাটি কাজ করে। আক্ষরিক অর্থে সুবর্ণরেখা ছবিতে আমি যে সমস্যাটি তুলে ধরেছি, তা হলো উদ্বাস্তু সমস্যা। কিন্তু ‘উদ্বাস্তু’ কিংবা ‘বাস্তুচ্যুত’ শব্দ দুটি ব্যবহার করে আমি শুধু বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের কথা বোঝাতে চাইনি। এই শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে আরও গভীর একটি সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছি। আমার বক্তব্য হলো, এই সময়ে আমরা প্রত্যেকেই নিজের শিকড় হারিয়েছি, প্রত্যেকেই বাস্তুচ্যুত। ‘বাস্তুচ্যুত’ শব্দটিকে শুধু ভৌগোলিক অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও ব্যাপক ও সাধারণ অর্থে ব্যবহার করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য।

ছবিতে হরপ্রসাদের কথায়, “আমরা অসার, অসহায়।” আবার ছবির শুরুতে ছাপাখানার একজন শ্রমিক বলে, “উদ্বাস্তু! কে উদ্বাস্তু নয়?” এই কথাগুলোর মধ্যেও একই ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের দেশের সামনে যে বিপদ দাঁড়িয়ে আছে এবং যে বিপদ আমাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তার দিকে আঙুল তুলে দেখানো আমার কাছে পবিত্র দায়িত্বের মতো। এই বক্তব্য প্রকাশ করার জন্য গল্পের একটি কাঠামো প্রয়োজন ছিল। আমার কাছে সেই কাঠামো ছিল কেবল এইটুকুই, এর বেশি কিছু নয়। এই কাঠামো কতটা অপ্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। সেসব সমালোচনার বেশির ভাগই যথার্থ। সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার আমার নেই। তবে আমাদের বুদ্ধিমান পাঠকদের বিবেচনার জন্য একটি কথা বলতে চাই। ব্রেখটের থ্রি-পেনি অপেরা নাটকে লন্ডন শহরের কোনো বাস্তব ছাপ নেই। অথচ লন্ডন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার সুযোগ তার ছিল। কিন্তু যান্ত্রিক বা বাহ্যিক স্তরে শহরটির খুঁটিনাটি জানাকে তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেননি। তাতে তার কাজের কোনো ক্ষতি হয়নি, আমাদেরও হতাশ করেনি। আমি ঠিক এই কথাটিই বলতে চাই। অনেক সময় কোনো পরিস্থিতির যান্ত্রিক ও উপরিতলের বিবরণ এড়িয়ে যেতে হয়। কখনো কখনো তাতেই ভালো ফল পাওয়া যায়।
ছবিটিতে বারবার কাকতালীয় ঘটনার ব্যবহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগও আমাকে শুনতে হয়। নিঃসন্দেহে ছবিতে বেশ কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে। কিন্তু ছবির মূল ঘটনাটিই হলো এমন এক কাকতালীয় ঘটনা— একজন ভাই তার বোনের কাছে যায়, যে বোন দেহব্যবসা করে। ঘটনাটি নিজেই এত বড় এক কাকতালীয় পরিস্থিতি যে, আমি একে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে নয়, একটি শিল্পরূপ হিসেবেই ব্যবহার করেছি। ছবির একেবারে শুরু থেকেই সচেতনভাবে দর্শককে এই কাকতালীয় ঘটনার রীতির সঙ্গে পরিচিত করিয়েছি। এটিও একধরনের শিল্পকৌশল—মহাকাব্যিক রীতির কাছাকাছি একটি পদ্ধতি। একই সঙ্গে কাকতালীয় ঘটনাটির মধ্যে সামান্য অর্থবহ ইঙ্গিত রেখে তাকে আরও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করেছি। উদাহরণ হিসেবে ভাইয়ের সেই ঘটনাটির কথাই ধরা যাক, যে নিজের বোনের কাছে যায়, অথচ জানে না যে সে একজন যৌনকর্মী। ছবির অন্তর্নিহিত বক্তব্যের দিকে লক্ষ করলে এই ঘটনার অর্থ দাঁড়াতে পারে, লোকটি যে কোনো যৌনকর্মীর কাছেই যেত, সেই নারীই হয়তো তার বোন হতে পারত। এখানে ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে একটি যান্ত্রিক কাকতালীয় পরিস্থিতি। কিন্তু এই বিশেষ ঘটনার মধ্য দিয়েই একটি সাধারণ সত্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আমি ‘সুবর্ণরেখা’কে একটি ক্রনিকল নাটকের আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছি। ছবির শুরু থেকেই তার ইঙ্গিত দিয়েছি। ক্রনিকল নাটকের জন্য যে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রয়োজন, সেগুলোর কথা মাথায় রেখে ছবির ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে বিভিন্ন কার্ড বা লিখিত ফলক ব্যবহার করেছি। সেগুলোতেও ক্রনিকল নাটকের উপযোগী লেখা ও ক্যালিগ্রাফির ধরন অনুসরণ করেছি।নাটকটির বিভিন্ন স্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। কারণ কাঠামোটি তৈরি করার পর আমি নিজেকে তার ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে দিয়েছি। মনের গভীর থেকে অনেক কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে এসেছে। সেসবের সবকিছুকে আগে থেকে পরিকল্পনা করে তৈরি করা হয়নি। তবে যা-ই উঠে আসুক, তা কোনোভাবেই হতাশা নয়।
সীতা ও বিরুর মুখের ব্যবহার এবং বিশেষ ধরনের ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে আমি আশা করি, হতাশাকে অস্বীকার করার একটি অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। আমার ছবিতে অবক্ষয়ের কথা শুনলে আমার সমস্ত সত্তা প্রতিবাদ করে ওঠে। এই মুখগুলো অবক্ষয়ের প্রতিফলন নয়। এই ছবিটি তৈরি করার সময় রবীন্দ্রনাথের শিশুতীর্থ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই প্রভাব শুধু ছবির শেষে দুটি পঙ্ক্তি যোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, সংলাপের বিভিন্ন অংশে, সংগীতে এবং কয়েকটি ঘটনার বিন্যাসে শিশুতীর্থ অনিবার্যভাবে প্রবেশ করেছে। তাই শেষের তিনটি পঙ্ক্তি বাদ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেগুলোর মধ্যে কোনো অন্ধকার বা হতাশা নেই।

ছবিতে বেদ ও উপনিষদ থেকে যে শ্লোকগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো নিয়েও আমি আপনাদের গভীরভাবে ভাবতে অনুরোধ করছি। প্রতিটি শ্লোকের মধ্যেই বিশেষ কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। ছবিটির অর্থ বুঝতে সেগুলো অনেক সাহায্য করে।সুবর্ণরেখা সম্পর্কে আরও অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, ওপরের কথাগুলো যদি মন দিয়ে বিবেচনা করা হয়, তাহলে নতুন করে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন থাকবে না।
ঋত্বিক ঘটক: আর্গুমেন্টস/স্টোরিজ , ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত চলচ্চিত্র-গবেষক আশিস রাজাধ্যক্ষ ও অমৃত গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদিত সংকলন থেকে লেখাটি দৈনিক এদিন অনলাইন লেখাটি অনুবাদ করে ছাপল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









