গর্ভধারণের চেষ্টা করেও সফল হচ্ছেন না? এর একটি কারণ হতে পারে থাইরয়েডের সমস্যা। ঘাড়ের সামনের অংশে অবস্থিত প্রজাপতি-আকৃতির এই ছোট গ্রন্থিটি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। অথচ এটি প্রজনন স্বাস্থ্যসহ শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনিয়মিত মাসিক, বারবার গর্ভপাত বা বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় বারবার ব্যর্থ হওয়ার মতো সমস্যার পেছনে অনেক সময় থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা দায়ী থাকতে পারে।
থাইরয়েডের সমস্যা কি সত্যিই প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে?
হ্যাঁ। গর্ভধারণে সমস্যার অন্যতম সাধারণ, কিন্তু অনেক সময় উপেক্ষিত, কারণ হলো থাইরয়েডের কার্যকারিতার সমস্যা।
থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি, ওজন, মেজাজ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতার জন্য শরীরের বিভিন্ন হরমোনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য থাকা জরুরি। থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা খুব বেশি বা খুব কম হলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে ডিম্বস্ফোটন ও প্রজনন ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
২০২৫ সালে ‘জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন রিসার্চ’ এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করা দম্পতিদের প্রায় ১৫–২০ শতাংশ বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভোগেন। এর মধ্যে প্রায় ৫–১০ শতাংশ ক্ষেত্রে থাইরয়েডজনিত সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই গর্ভধারণে সমস্যা হলে চিকিৎসকেরা প্রাথমিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে প্রায়ই থাইরয়েডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
নিষ্ক্রিয় থাইরয়েড (হাইপোথাইরয়েডিজম) কীভাবে প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে?
গর্ভধারণে আগ্রহী নারীদের মধ্যে হাইপোথাইরয়েডিজম একটি সাধারণ সমস্যা। থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে গেলে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হতে পারে বা সম্পূর্ণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে। আর ডিম্বস্ফোটন না হলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমে যায়।
যে লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা উচিত
- অনিয়মিত মাসিক বা অতিরিক্ত রক্তপাত
- মাসিক চক্র দীর্ঘ হওয়া বা দেরিতে শুরু হওয়া
- গর্ভপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- ওজন বৃদ্ধি
- চুল পড়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- শুষ্ক ত্বক
- অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা
তবে মনে রাখতে হবে, অনেক নারীর ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই নাও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে থাইরয়েড পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
অতিসক্রিয় থাইরয়েড (হাইপারথাইরয়েডিজম) কীভাবে প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে?
হাইপারথাইরয়েডিজমেও প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় অনিয়মিত বা স্বল্প মাসিক, ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা এবং গর্ভধারণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গর্ভপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
যে লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা উচিত
- স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া
- বুক ধড়ফড় করা
- উদ্বেগ বা অস্থিরতা
- অতিরিক্ত ঘাম
- হাত কাঁপা
- অস্বাভাবিক গরম লাগা
থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা খুব কম বা খুব বেশি—উভয় অবস্থাই প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গর্ভধারণের পরও কি থাইরয়েডের স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ?
অবশ্যই। গর্ভাবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে গর্ভপাত, সময়ের আগে প্রসব, গর্ভাবস্থাজনিত উচ্চ রক্তচাপ এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ কারণে যেসব নারী বন্ধ্যাত্ব, বারবার গর্ভপাত বা আইইউআই (IUI) কিংবা আইভিএফ (IVF) চিকিৎসায় বারবার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
পরীক্ষা ও চিকিৎসা
থাইরয়েডের সমস্যা নির্ণয় সাধারণত একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর চিকিৎসা সহজ ও কার্যকর।
প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ এবং জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এতে অনেক নারীর ডিম্বস্ফোটন আবার স্বাভাবিক হয় এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে থাকলে আইইউআই (IUI) ও আইভিএফ (IVF)-এর সাফল্যের সম্ভাবনাও উন্নত হতে পারে।
মনে রাখবেন
গর্ভধারণে সমস্যা হলেই যে থাইরয়েডই একমাত্র কারণ, তা নয়। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিকিৎসাযোগ্য কারণ। তাই এক বছর (বা ৩৫ বছরের বেশি বয়সে ছয় মাস) নিয়মিত চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে, অথবা বারবার গর্ভপাতের ইতিহাস থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থাইরয়েডসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









