আরবরা ইসমাঈল (আ.)-কে ‘আবুল আরব’ এবং নিজেদের ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময় তারা ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর তাওহিদ বা একত্ববাদের শিক্ষা ও বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল।
মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আরব উপদ্বীপের প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় তুলে ধরা হলো—
মূর্তিপূজা
ইসলামপূর্ব যুগে আরব উপদ্বীপে সবচেয়ে প্রচলিত ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। যদিও মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী মানুষ ছিলেন, যারা হানিফ নামে পরিচিত ছিলেন। আরবের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। তবে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পাথর, কাঠ ও ধাতু দিয়ে তৈরি বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। আল্লাহর প্রতি তাদের এই বিশ্বাস ছিল ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর ধর্মের অবশিষ্টাংশ এবং আরবের প্রাচীন নগরীগুলো যেমন—মাদায়িনে সালিহ, আদ ও সামুদের অঞ্চলে প্রচলিত আসমানি ধর্মের উত্তরাধিকার। কিন্তু পরবর্তীকালে তাওহিদের বিশুদ্ধ আকিদা বিকৃত হয়ে যায়। এর পরিবর্তে মূর্তি পূজা ও নানা কুসংস্কারের প্রচলন ঘটে, যা আরব উপদ্বীপের আশপাশের প্রাচীন সভ্যতা—আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়, আমোরীয় ও আমোরাইটদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল।
আরবরা লাত, মানাত, উজ্জা, হুবাল, সুওয়া ও ওয়াদ্দ-এর মতো দেব-দেবীর পূজা করত। পাশাপাশি তারা পূর্বপুরুষদের পবিত্র মনে করত, বিভিন্ন প্রাণীর উপাসনা করত এবং নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, দাবরান, সুরাইয়া ও শিরা নক্ষত্রমণ্ডলীর পূজা করত। তারা জিন, ফেরেশতা ও অগ্নিরও উপাসনা করত।
তাদের অধিকাংশই নবুয়ত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। সমাজে গণক, জ্যোতিষী ও জাদুকরদের প্রভাব ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কারও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
আরবে মূর্তিপূজার জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয় ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল পবিত্র কাবাঘর। মুশরিকরা কাবাঘরের চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। হজের জন্য আগত বিভিন্ন গোত্র এসব মূর্তির পূজা করত এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানি ও মানত পেশ করত।
ইহুদি ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মধ্যে ইহুদি ধর্ম ছিল অন্যতম। ইয়াসরিবের কয়েকটি গোত্র, ইয়েমেন ও ইয়ামামার কিছু ব্যক্তি এই ধর্ম অনুসরণ করত। তারা ধর্মীয় সাহিত্য রচনায় হিব্রু ও আরামীয় ভাষা ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন জীবনে আরবি ভাষায় কথা বলত। আরব সমাজের প্রভাবে তারা অনেক আরবীয় রীতি-নীতি গ্রহণ করেছিল এবং আরবি নামও ব্যবহার করত।
তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে তাওরাত, মিশনা ও তালমুদ অধ্যয়ন করা হতো। এসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে উপাসনালয়, প্রার্থনার স্থান এবং ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
তারা জাদুবিদ্যায় লিপ্ত ছিল, শনিবার কাজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত, আশুরার রোজা পালন করত এবং ইহুদি ধর্মীয় উৎসবগুলো যথাযথভাবে পালন করত।
খ্রিস্ট ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে বিস্তার লাভ করা আরেকটি ধর্ম ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী এবং খ্রিস্টান দেশ থেকে আগত দাসদের মাধ্যমে এই ধর্ম আরব ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে উৎসাহ দিত। কারণ এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত। শাম ও ইরাক অঞ্চল থেকে দাওমাতুল জান্দাল, আইলা, কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং মক্কা, ইয়াসরিব ও তায়েফের কিছু মানুষের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত আহাবিশ গোত্রের লোকজন ও দাসদের মধ্যে এর প্রভাব ছিল।
তবে আরব উপদ্বীপে খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, বিশেষ করে নাজরান। এ ছাড়া বাহরাইনসহ আরও কিছু অঞ্চলেও সীমিত আকারে এর বিস্তার ঘটে। প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্ম ও জ্ঞানের ভাষা ছিল আরামীয়। তবে ওয়ারাকা ইবন নওফলের ঘটনার মতো কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষায়ও ইনজিল লেখা হতো।
মাজুসি ধর্ম
ইরান থেকে মাজুসি বা অগ্নিপূজারি ধর্মও আরবের কিছু অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তারা মূলত অগ্নির উপাসনা করত।
প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় হিরায় এ ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। ইয়েমেনে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করতে পারস্যের সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার পর সেখানে মাজুসি ধর্মের বিস্তার ঘটে। হাদরামাউত ও আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আরও কিছু এলাকাতেও ইরানের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এর সীমিত প্রভাব দেখা যায়।
সাবেয়ি ধর্ম
সাবেয়ি ধর্মের অনুসারীরা মূলত ইরাক ও হাররান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যায় বসবাস করত। মক্কা ও তায়েফে ‘সাবা’ শব্দটি ধর্মত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হতো। মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে ‘সাবেয়ি’ বলত। কারণ তারা শিরক ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল। িএসব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীই ছিল ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়।
তথ্যঋণ : নবীয়ে রহমত ও আর-রাহিকুল মাখতুম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









