মানুষের শারীরিক যত্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মনের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেদিন আমাদের মন খারাপ থাকে, সেদিন শরীরও যেন ভালো লাগে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, স্বাস্থ্য হলো শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা। তাই কেবল রোগমুক্ত থাকাই নয়, ভয়, উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকাও সুস্থ জীবনের অপরিহার্য শর্ত। পাশাপাশি জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সক্ষমতাও সামাজিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে অনেকেই শারীরিক ও সামাজিকভাবে সুস্থ থাকলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনো খুবই সীমিত।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা অন্যতম। এসব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান, প্রসবোত্তর সময় ও মাতৃত্বের মতো স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় তাদের শরীরে ব্যাপক হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে। একই সঙ্গে পরিবার ও সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে তারা নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে প্রায়ই অবহেলা করেন।
এর পাশাপাশি নারীরা আয়-বৈষম্য, যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, অবহেলা এবং যৌন ও শারীরিক সহিংসতার মতো নানা সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হন। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার হন। পরিবার ও সমাজে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়ায় তাদের সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে। আবার থাইরয়েডের সমস্যা, স্থূলতা বা ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতির মতো শারীরিক কারণেও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু অনেক নারী এসব সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। অন্যদিকে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় জনবলও অত্যন্ত অপ্রতুল।
ডব্লিউএইচওর ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.৪১ জন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। প্রতি এক লাখে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র ০.০৭ জন, নার্স ০.১৯ জন, মনোবিজ্ঞানী ০.০৭ জন, সমাজকর্মী ০.০০২ জন, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ০.০০২ জন এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ০.০২৮ জন। এই পরিসংখ্যানই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে।
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিষণ্ণতা। টানা অন্তত দুই সপ্তাহ মন খারাপ থাকা বা কোনো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বিষণ্ণতার প্রধান লক্ষণ। এছাড়া নিজেকে তুচ্ছ বা গুরুত্বহীন মনে হওয়া, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সিদ্ধান্তহীনতা, ওজনের ওঠানামা, খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত নীরবতা বা অস্থিরতা, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও এর লক্ষণ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিষণ্ণতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ৫ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন এবং পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রায় চার গুণ বেশি এ সমস্যায় ভোগেন। এর পেছনে জৈবিক পরিবর্তন, লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ভূমিকা, সহিংসতা ও সামাজিক কুসংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মনের সুস্থতা বজায় রাখতে সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবন সামলাতে গিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়। তাই কাজের পরিকল্পনা করে এগোনো প্রয়োজন। পাশাপাশি অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে বর্তমানকে উপভোগ করা, অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করা, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেস চর্চা করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজেকে ভালোবাসা ও নিজের উন্নয়নে প্রতিদিন কিছুটা সময় ব্যয় করা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের চিন্তা, আচরণ, সম্পর্ক ও জীবনযাপনের মানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
লেখক : নাজমুন নাহার হেলেন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









