প্রাত্যহিক প্রয়োজন পূরণের জন্য মানুষকে আর্থিক লেনদেন করতে হয়। লেনদেনের মাধ্যমে সবার প্রয়োজন পূরণ হয়।
পারস্পরিক এই লেনদেন যেন সুদ ও জুলুমের হাতিয়ার না হয় এবং তা পরে সন্দেহ, ঝগড়া ও বিবাদের উৎস না হয়; সে জন্য ইসলাম কিছু বিধান ও শর্ত আরোপ করেছে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো।
আর্থিক লেনদেনের অর্থ
সাধারণ অর্থে আর্থিক লেনদেন হলো বেচাকেনা করা। হানাফি মাজহাব অনুসারে বেচাকেনা বলা হতো সেবাকেও সম্পদের পারস্পরিক বিনিময়কে।
আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, ‘মালিক হওয়া ও বানানোর উদ্দেশ্যে সম্পদের পারস্পরিক বিনিময়।’ অবশ্য পরবর্তী যুগের আলেমেরা পণ্যের মতো সেবাকেও আর্থিক লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
লেনদেন শুদ্ধ হওয়ার শর্ত
আর্থিক লেনদেন শুদ্ধ হওয়ার শর্তগুলো হচ্ছে—
সুনির্দিষ্ট অর্থ জ্ঞাপক শব্দ ব্যবহার
আর্থিক লেনদেন এমন শব্দের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে, যার মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের আগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। আমি বিক্রি করলাম, আমি ক্রয় করলাম।
সরাসরি বেচা বা কেনা শব্দ ব্যবহার না করেও লেনদেন সম্পন্ন করা যাবে যদি তাতে বিক্রির আগ্রহ ও ক্রয়ের সম্মতি প্রকাশ পায়। যেমন ক্রেতা বলল, আমি ১০০ টাকা দিয়ে পণ্যটি নিতে চাই। বিক্রেতা বলল, আমার আপত্তি নেই।
আবার মুখে শব্দ উচ্চারণ না করেও লেনদেন সম্পন্ন হতে পারে। যদি ক্রেতা ও বিক্রেতার আচরণে সন্তুষ্টি ও সম্মতি প্রকাশ পায়। যেমন ক্রেতা কোনো কথা না বলে পণ্যের মূল্য বিক্রেতার হাতে দিয়ে পণ্য নিয়ে চলে গেল এবং বিক্রেতাও কোনো আপত্তি না করে মূল্য রেখে দিল।
ক্রেতা ও বিক্রেতা যোগ্য হওয়া
আর্থিক লেনদেন শুদ্ধ হওয়ার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের যোগ্য হওয়া আবশ্যক। ক্রেতা ও বিক্রেতার যোগ্য হওয়ার অর্থ হলো—
ক. বালেগ হওয়া। নাবালগ শিশুর লেনদেন চূড়ান্তরূপে অনুমোদিত নয়।
খ. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া। কোনো পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির লেনদেন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
গ. নিজের ওপর কর্তৃত্ব থাকা। এর অর্থ হলো ব্যক্তি স্বাধীন হওয়া। কেননা ইসলামী শরিয়ত দাস-দাসীকে মালিকের অনুমতি ছাড়া আর্থিক লেনদেন করার অনুমতি দেয়নি।
উভয় পক্ষের সম্মতি থাকা
ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষের সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া লেনদেন শুদ্ধ হয় না। হুমকি দিয়ে বা জোর করে কোনো কিছু কিনলে বা বেচলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে ফাসেদ চুক্তি বলে গণ্য হয়। এমন চুক্তি রহিত করা এবং পণ্য ও অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক।
পণ্য সম্পদ ও বিনিময়যোগ্য হওয়া
যে পণ্য, মাল ও অর্থের বিনিময় করা হবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পদ হতে হবে। তা বিনিময়যোগ্য ও বিক্রয়যোগ্য হতে হবে। যেমন উড়ন্ত বন্য পাখি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিক্রয়যোগ্য নয়। কারণ তার ওপর ব্যক্তির মালিকানা থাকে না এবং পাখিটি বিনিময়যোগ্যও নয়; কিন্তু শিকারি শিকার করার পর বন্য পাখি বিক্রয়যোগ্য হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফকিহ আলেমেরা নিম্নোক্ত শর্ত আরোপ করেন—
ক. পণ্য ও সম্পদের ওপর ব্যক্তির মালিকানা থাকা অথবা মালিকের পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়া।
খ. তা হস্তান্তরের যোগ্য হওয়া।
গ. তার মূল্যমান ও উপকার থাকা।
ঘ. পণ্যটি হালাল ও পবিত্র হওয়া।
ঙ. সম্পদের সঙ্গে অন্যের অধিকার যুক্ত না থাকা। যেমন বন্ধকি বা যৌথ সম্পত্তি বিক্রি করা।
অজ্ঞতা মুক্ত হওয়া
আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পণ্য ও মূল্যের প্রজাতি, ধরন, পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে অস্পষ্টতা অজ্ঞতা না থাকা আবশ্যক। একইভাবে পণ্য ও মূল্য বিনিময়ের সময় নিয়ে অস্পষ্টতা না থাকা।
ধোঁকা ও প্রতারণা মুক্ত হওয়া
আর্থিক লেনদেন শুদ্ধ হওয়ার জন্য তা সব ধরনের ধোঁকা ও প্রতারণা মুক্ত হওয়া শর্ত। ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউ প্রতারণার শিকার হলে শরিয়ত তাকে লেনদেন রহিত করার অধিকার দিয়েছে। যেমন—ক্রেতা পণ্যে কোনো ত্রুটি পেলে এবং বিক্রেতা প্রদত্ত মূল্যে ভেজাল পেলে লেনদেন চুক্তি ভেঙে দিতে পারেন।
অন্যায় শর্তারোপ না করা
লেনদেনের প্রচলিত নিয়ম ও শরিয়তের বিধান অনুসারে যা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন বিষয়ের শর্তারোপ করলে লেনদেন চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। যেমন—ক্রেতা বা বিক্রেতা অন্য পক্ষকে এ কথা বলা যে আমাকে কিছু টাকা ঋণ হিসেবে দিলে আমি লেনদেন করব।
আর্থিক লেনদেনের শিষ্টাচার
প্রাজ্ঞ আলেমেরা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এমন কতগুলো বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে বলেন, যা লেনদেন শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত নয়, তবে এর মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভ করা যায়। তা হলো—
১. নিয়ত শুদ্ধ করা: আলেমেরা বলেন, মুমিন মানুষের কল্যাণ এবং নিজের বৈধ প্রয়োজন পূরণের নিয়ত করবে। বিশেষত ব্যবসায়ী এই নিয়তে ব্যবসা করবে যে আমি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করব এবং তাদের সহযোগিতা করব।
২. সর্বাবস্থায় ক্ষতি পরিহার: লেনদেনের সময় ব্যক্তি নিজেকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবে, তেমনি অন্যের ক্ষতি করা থেকেও বেঁচে থাকবে। এমনকি প্রতিপক্ষ ক্রেতা বা বিক্রেতার যদি বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার অভাব থাকে তবে সুযোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৩. সংশয়পূর্ণ লেনদেন পরিহার: মুমিন শুধু হালাল ও হারামেরই বিবেচনা করবে না, বরং সে সংশয়পূর্ণ বিষয়গুলোও পরিহার করবে। কেননা সংশয়পূর্ণ বিষয়গুলো মানুষকে সীমা লঙ্ঘন ও হারামে লিপ্ত করে।
৪. অন্যায় দরদাম না করা: লেনদেন করার ইচ্ছা না থাকলে অহেতুক দরদাম করে পণ্যের মূল্য বাড়াবে না, বরং যার প্রয়োজন তাকে কেনার সুযোগ দেবে।
৫. দালালি বা মধ্যে দালালি: যখন কোনো দুই ব্যক্তি পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ের জন্য কথা বলে, তখন তাদের কথা শেষ হওয়ার আগে অন্য কেউ কেনা বা বেচার নতুন প্রস্তাব না দেওয়া।
তথ্যঋণ: আল ফিকহু আলাল মাজাহিবিল আরবায়া, আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, হেদায়া ও বাদাউস সানায়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









