দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। পরদিন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহার ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকারগুলোকে কেন্দ্র করে ‘১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা’ঘোষণা করেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সতর্ক করে জানিয়ে দেন সবার ৬ মাসের কাজের মূল্যায়ন করবেন তিনি। দায়িত্ব পালনের এই প্রথম ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী ১৭ আগস্ট। এ সময়কে সামনে রেখে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের জোর আলোচনা চলছে।
সরকার ও দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ছয় মাসের কর্মদক্ষতা, ভাবমূর্তি এবং দায়িত্ব পালনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল আসতে পারে। এতে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়ার পাশাপাশি নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি। যদিও ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও তাঁর ব্যক্তিগত উৎসের মাধ্যমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের (কর্মদক্ষতা) তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সংগৃহীত এসব তথ্যের এখন চলছে পর্যালোচনা। মন্ত্রণালয়গুলোও পৃথকভাবে তাদের কর্মকাণ্ড জমা দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন ও রদবদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে লেগেছে নতুন হাওয়া। মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল এবং বেশ কয়েকটি শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নতুন মুখ আসার জল্পনা-কল্পনায় দিনভর সরগরম ছিল সচিবালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অন্যদিনের তুলনায় সচিবালয়ের পরিবেশ ছিল কিছুটা ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবরের মতোই সকালে নিজ দপ্তরে বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে শুরু হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক। সেখানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন তারেক রহমান। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল। মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরই সচিবালয়জুড়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা— কে হচ্ছেন পরবর্তী স্থানীয় সরকার মন্ত্রী? কারণ, অনানুষ্ঠানিকভাবে গুঞ্জন রয়েছে, বুধবারই তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে শেষ অফিস করেছেন এবং গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও বিএনপির শীর্ষ মহল থেকে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এই পদ খালি হওয়ার পর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে দল এবং সরকারের মধ্যে জোর লবিং এবং তদবির শুরু হয়েছে। গতকাল দিনভর গুঞ্জন ছিল- বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে তাঁর দপ্তর পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আনা হতে পারে। তবে এই মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর নামও। অপরদিকে যদি সালাহউদ্দিন আহমেদের দপ্তর পরিবর্তন হয় তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিকে। এ ছাড়া একই দিনে শিক্ষামন্ত্রীকেও ডেকে পাঠানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। যদিও এই মন্ত্রীর দপ্তর বদলকেন্দ্রিক তলব করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে শুধু মন্ত্রিসভাই নয়, মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়েও দিনভর ছিল নানা আলোচনা। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হলেও আলোচনায় আছেন সালাহউদ্দিন আহমেদও। আবার রিজভী আহমেদ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলে তাঁর পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়েও বিএনপিতে আলোচনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক ছাত্রনেতা হাবিব উন নবী খান সোহেলের পাশাপাশি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলালের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে দিনভর নানা আলোচনা ও গুঞ্জনের পারদ চড়লেও মন্ত্রিসভায় রদবদল এবং দলের শূন্য পদে নতুন মুখ আনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দল ও সরকারপ্রধান তারেক রহমান শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক এদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিলেন। এই সময়সীমা শেষে মূল্যায়নও হবে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীই বিবেচনা করবেন কারা কারা সফল হয়েছেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা রদবদল প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, গত ৬ মাসে মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে সরকারের ভেতরে ও বাইরে পর্যালোচনা চলছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় ভূমিকা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেসব মন্ত্রী অযাচিত বিতর্কে জড়িয়েছেন বা প্রত্যাশিত কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেননি, তাদের বিষয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর ব্যতিক্রমী কিছু উদ্যোগ যেমন- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা বাসভবনের পরিবর্তে নিয়মিত সকাল ৯টায় অফিস করা শুরু করেন সচিবালয়ে। ভিভিআইপি সুবিধা বাদ দিয়ে সড়কে চলছেন সীমিত প্রটোকলে সাধারণ মানুষের মতোই। নিজের পাশাপাশি অন্যদের ভিভিআইপি সুবিধাও বাদ দিয়েছেন। থাকছেন নিজের বাসায়, ব্যবহার করছেন নিজের গাড়ি, বেতনের ১০ শতাংশ ফিরিয়ে দিচ্ছেন সরকারি ফান্ডে। প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজেকে অতিসাধারণের কাতারে উপস্থাপন করা। জনগণের কল্যাণে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ, বাস্তবায়নে তৎপরতার ফলে সরকারের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রীই এমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেননি, যা সরকারের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা যায়। তবে দু-একজন প্রতিমন্ত্রী তুলনামূলক ভালো ‘পারফরম্যান্স’করছেন বলে মূল্যায়নে বেরিয়ে এসেছে। ১৮০ দিনে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কারো কারো পারফরম্যান্সে প্রধানমন্ত্রী খুশি হলেও অনেকের ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট নন। ফলে কেউ কেউ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়তে পারেন, কারো কারো দপ্তর পুনর্বণ্টন হতে পারে এবং নতুন দু-তিনজন যুক্তও হতে পারেন মন্ত্রিসভায়।
তবে সবার আগে এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে নিশ্চিত এগিয়ে আছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়ে কাজ শুরু হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, মন্ত্রী-আমলারা ভেবেছিলেন লাল বাতির গাড়িতে চড়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাবেন। কিন্তু তাদের সেই ভাবনায় ছেদ পড়ার সময় এসেছে। ব্যর্থ, অলস এবং কাজের চেয়ে বাগাড়ম্বর বেশি করা মন্ত্রীদের গত পাঁচ মাসের প্রতিদিনের আমলনামা এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেবিলে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই হাতে নিয়েছেন ব্যর্থ মন্ত্রীদের ডানা ছাঁটার। এই ছয় মাসের ডেডলাইনে বড় ‘পলিটিক্যাল সার্জারি’ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত একটি অতি গোপন স্পেশাল পারফরম্যান্স উইং দিন রাত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ডায়েরি নোট করছে; কোন মন্ত্রী কয় ঘণ্টা ফাইলে সই করলেন; কোন ফাইল কতদিন আটকে থাকল; কার কাজের গ্রাউন্ড রেজাল্ট শূন্য- সব এখন পরিষ্কার। সবচেয়ে বড় যে রোগটি ধরা পড়েছে তা হলো মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যকার অহমিকা এবং সমন্বয়হীনতা। এক টেবিলে বসেও নাকি হেভিওয়েট মন্ত্রী আর তার প্রতিমন্ত্রী একে অপরের মুখ দেখাদেখি করেন না। ফলে, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে থাকছে দিনের পর দিন। কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতেই মন্ত্রিসভার আকার শুধু পুনর্গঠনই করা হবে না বরং বেশ কয়েকজনকে সোজা সাইডলাইনে পাঠিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়, সরকারের প্রথম ৬ মাসে বেশ কিছু অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল, যার মধ্যে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল কাটা কর্মসূচি, কৃষিঋণ মওকুফ, নিত্যপণের বাজার নিয়ন্ত্রণ, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোকে যানজট, দূষণমুক্ত করে বাসযোগ্য করা, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানদের সম্মানী প্রদান, হেলথ কার্ড প্রদান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু, তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের মাঝে উপকরণ ও ট্যাব বিতরণ, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস, সবুজ বেষ্টনী ও কোটি বৃক্ষরোপণ, জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ ও নতুন সোর্স যুক্ত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সার্বভৌমত্ব, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্স খাত সুরক্ষায় জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন। এক্ষেত্রে ‘কৃষক কার্ড’এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’পাইলটিং কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর নিকট সরকারি সুবিধা সরাসরি পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
এছাড়া কৃষিঋণ মওকুফ ও সার-বীজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি মন্ত্রণালয় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। জাতীয় গ্রিডে রুফটপ সোলার ও সৌর বিদ্যুৎ সংযোজন বৃদ্ধিসহ গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় গতিশীলতা দেখিয়েছে। তবে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারকে বিব্রত করতে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট সৃষ্টি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং সরকারকে সমালোচনার মুখেই ফেলেছে।
যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে সরকার। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশানুরূপ উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। বরং রাজধানীসহ সারাদেশেই কিশোর গ্যাংয়ের দৌড়াত্ম্য, ছিনতাই, জুলাই হত্যাকাণ্ডের আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে খুব বেশি সক্রিয় দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সরকারের এই ৬ মাসে সারাদেশে নদী ও খাল পুনঃখনন, পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্যোগও অন্যতম মাইলফলক। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির অধীনে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে যে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণে প্রথম ১৮০ দিন সময়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, সমালোচনা ও সরকারকে বিব্রত করেছে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড। এছাড়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, বিনিয়োগ আনা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান সচল করতে যাদের দায়িত্ব সেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বা সংস্থাও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফলে তরুণদের নতুন কর্মসংস্থানের পথও বন্ধ রয়েছে। এতে করে দিন দিন বেকার সংখ্যাও বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাও সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ৬ মাস হতে চললেও এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগীদের সরাতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বরং মাঝে মাঝেই তাদের নতুন করে পদায়ন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে এই মন্ত্রণালয়টি।
ওই সূত্রগুলো আরো জানায়, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত কাজের চাপে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই আবার প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, কেউ কেউ সরকারকে প্রতিনিয়ত বিব্রত করছেন। ফলে বর্তমানে যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন তাদের একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রেখে বাকিগুলো থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এদের মধ্যে শেখ রবিউল আলম সড়ক পরিবহন, সেতু, রেল ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এখানে নতুন মুখ হিসেবে শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে শেখ রবিউল আলমকে রেল ও নৌ পরিবহনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের বিষয়ে সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ফলে এই দুটি মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিনের মতামতের ওপর। তিনি দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলে এই মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন অনেকটা নিশ্চিত। তবে তিনি দায়িত্ব নিতে না চাইলে টিকে যেতে পারেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়া সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, পানিসম্পদ, ভূমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পাট ও বস্ত্র, তথ্য ও সম্প্রচার, বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর কেউ কেউ বড় দায়িত্বে, কারো কারো দপ্তর পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। আর নতুন করে মন্ত্রিসভার আলোচনায় আছেন- গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, সেলিমা রহমান, রুহুল কবির রিজভী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গিয়াসউদ্দীন রিমন, রকিবুল ইসলাম বকুল, মাহামুদুর রহমান মান্না, ড. মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ, হুমায়ুন কবিরের নাম।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ব্যারিস্টার নওশাদ জামিরের নামও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক রাজনীতির ভারসাম্য মেলাতে এবার ভাগ্য খুলতে পারে প্রথম দফায় মন্ত্রীশূন্য থাকা বৃহত্তর নোয়াখালী বেল্টের নেতাদের দু-একজনের। তাদের মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চলের প্রবীণ নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুবুদ্দিন খোকন, বরকতউল্লাহ বুলু এবং জয়নুল আবেদিন ফারুকের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হতে পারে যে কাউকে। কৌশলগত কারণে নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদী থেকে দুজন তরুণ এমপি এবং নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে একজন প্রভাবশালী নারী এমপির নাম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে আসল চমক থাকছে টেকনোক্র্যাট কোটায়। এ তালিকায় নাম রয়েছে আওয়ামী আমলের সবচেয়ে বেশি মামলার শিকার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের।
অন্যদিকে হেভিওয়েট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি একই অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মতো দুটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলাচ্ছেন। সূত্র বলছে, বয়সে প্রবীণ আমির খসরু নিজেই এখন হাঁপিয়ে উঠেছেন এবং তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়টি অন্য কারো হাতে ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাখতে চাইছেন। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তার দপ্তরেও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা প্রবল।
এদিকে সরকারের প্রথম ৬ মাসে দলের সংসদ সদস্যদের আমলনামাও সংগ্রহ করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যেসব সংসদ সদস্য দলীয় কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ, নতুন করে গ্রুপ সৃষ্টি, দুর্নীতি-অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা সরকারের উন্নয়ন কাজে ধীরগতির পরিচয় দিয়েছেন তাদের তালিকা সংগ্রহ করছেন প্রধানমন্ত্রী। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তথ্য ও দলীয় জরিপের মাধ্যমে এমপিদের কার্যক্রম মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের প্রথম ৬ মাসে অন্তত ৩০ জন বিতর্কিত এমপির তালিকা এখন প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে।
গোয়েন্দাদের দেওয়া একাধিক তালিকায় ‘কমন’ কয়েকটি নাম রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন- ঢাকা বিভাগের ৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জন, রাজশাহী বিভাগের ৩ জন, খুলনা বিভাগের ২ জন, বরিশাল বিভাগের ৭ জন, সিলেট বিভাগের ৩ জন, রংপুর বিভাগের ২ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জন। বিতর্কিত এসব সংসদ সদস্যকে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী তলব করে সতর্ক করে দেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে কেউ কেউ ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর রেড সিগন্যালে থাকায় আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন-বঞ্চিত হবেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









