সমৃদ্ধ অর্থনীতির এই বিশেষ আলোচনায় প্রথম তিন কিস্তিতে আমি 'কৃষি', 'মানবসম্পদ' এবং 'গার্মেন্টস শিল্প' নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। আজ এই সিরিজের শেষ এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এক খাত নিয়ে আলোকপাত করব, যা আমাদের দেশের অর্থনীতির চিত্র আমূল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর তা হলো 'পর্যটন শিল্প'।
ভৌগোলিক অবস্থানে বাংলাদেশ এমন এক দেশ যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত আমাদের কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, চায়ের দেশ সিলেটে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা, কিংবা উত্তরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সবই আমাদের এই ভূখণ্ডে বিদ্যমান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এত বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে এখনো নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারিনি। আজ আমাদের আলোচনা হবে কীভাবে এই 'ঘোরার শিল্প' বা পর্যটনকে আমাদের অর্থনীতির চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা যায়।বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বর্তমান চিত্র খুবই নাজুক হলেও এর সম্ভাবনা তুমুল।
বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO)-এর মতে, পর্যটন আজ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক খাতের একটি। অনেক দেশ, যেমন থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, কিংবা পার্শ্ববর্তী নেপাল ও শ্রীলঙ্কা শুধুমাত্র পর্যটন শিল্পের ওপর ভর করে তাদের জাতীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশ সচল রেখেছে। বাংলাদেশে এই খাতের অবদান জিডিপিতে বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা আমাদের সম্পদের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। অথচ সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। আমাদের রয়েছে পাহাড়, সমুদ্র এবং বনাঞ্চলের এক অপূর্ব মিশ্রণ, এক বিশাল সম্ভাবনাময় সম্পদ।
বা বলতে খুব কম দেশেরই থাকে। এই শিল্পের উন্নতির জন্য দরকার আমাদের যত্ন ও সঠিক পরিকল্পনা। এই শিল্প উন্নয়নে সবার আগে জানতে হবে সংকট কোথায়। পর্যটন শিল্পের পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে।
১. অবকাঠামোগত দুর্বলতা।
২. নিরাপত্তাহীনতা।
৩. আবাসন ও যাতায়াত খরচ।
৪. ব্রান্ডিং ও প্রচারণার অভাব।
৫. বিনোদন ও নাগরিক সুবিধার স্বল্পতা।
অথবা আমাদের সোনার বাংলা তুমুল সম্ভাবনার আধার, শুধু কেন আমরা পিছিয়ে থাকবো? এর পেছনের কারণগুলো গভীরে গিয়ে বিচার করতে হবে। এবং এর সমাধান করতে হবে। তবেই এই খাত হবে লাভজনক একটি খাত।
অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর রাস্তাঘাট এবং উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব। যে কারণে চাইলেও অনেকেই বেড়াতে যেতে পারে না।
নিরাপত্তাহীনতা পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই খাতের কোন উন্নতি হবে না। আবাসন ও অতিরিক্ত খরচের বিষয়টাও আমাদের দেশের পর্যটকদের বড় মাথা ব্যাথার কারণ। মানসম্মত হোটেল বা রিসোর্টের স্বল্পতা এবং খাবারের অযৌক্তিক উচ্চমূল্যও এদেশের পর্যটনশিল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে। ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণার অভাবও আছে আমাদের খুব বেশি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একটি 'ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন' হিসেবে তুলে ধরার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং বা প্রচারণার বড় অভাব রয়েছে। যা করা খুবই দরকার।
বিনোদন ও নাগরিক সুবিধার স্বল্পতাও আছে আমাদের পর্যটন শিল্পে। পর্যটন মানে শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা নয়, এর সেখানে নাগরিক বিনোদন এবং নাগরিক সুবিধাও প্রয়োজন রয়েছে।
পর্যটন শিল্পের টেকসই সংস্কার সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে। এই খাতকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে হলে আমরা নিচের সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপগুলো নিতে পারি। বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য একটি পরিকল্পনা যেমনটা হতে পারে।
পর্যটন জোন বা বিশেষ পর্যটন অঞ্চল (এক্সক্লুসিভ জোন) গঠন
আমাদের দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো বর্তমানে বেশ বিক্ষিপ্তভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে পর্যটকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই কারণে এর করতে সুনির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে 'স্পেশাল ট্যুরিস্ট জোন' হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটারের দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকাকে একটি বিশেষ জোনে রূপান্তর করা যেতে পারে। সেখানে শুধুমাত্র পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট এবং বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য 'ইকো-ট্যুরিজম জোন' তৈরি করতে হবে। এই জোনগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমনভাবে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে যাতে প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না হয়। প্রতিটি জোনে একটি করে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার' থাকবে, যেখান থেকে পর্যটকরা গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে গাইডসহ সব সেবা পাবেন।
কানেক্টিভিটি ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা এখনও ভঙ্গুর। পর্যটকদের যাতায়াত আরামদায়ক ও দ্রুত করতে পরিবহন ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। ঢাকা-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প একটি বিশাল অর্জন, তবে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ 'ট্যুরিস্ট কোচ' বা 'লাক্সারি ডাইনিং ট্রেন' চালু করা যেতে পারে, যেখানে ভ্রমণই হবে বিনোদনের অংশ। নৌ-পর্যটন বা রিভারক্রুজ ট্যুরিজমের জন্য আধুনিক ক্রুজ শিপ বা বিলাসবহুল লঞ্চের ব্যবস্থা করতে হবে যা ঢাকা থেকে সরাসরি বরিশাল, সুন্দরবন বা সেন্টমার্টিন যাবে। এই ক্রুজগুলোতে পর্যটকদের জন্য খাদ্য-খাওয়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বিমান করিডোর আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং টিকেটের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকার বিশেষ ভর্তুকি বা কর ছাড় দিতে পারে। পর্যটন এলাকায় ইলেকট্রিক কার বা পরিবেশবান্ধব শাটল বাস সার্ভিস চালু করা জরুরি।
ডিজিটাল পর্যটন ও 'স্মার্ট অ্যাপের' বৈশ্বিক ব্যবহার এদেশও চালু
বর্তমান যুগে পর্যটন সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নির্ভর। সরকারকে একটি উন্নতমানের কেন্দ্রীয় 'স্মার্ট ট্যুরিজম অ্যাপ' চালু করতে হবে। এই অ্যাপে বাংলাদেশের প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের ঐতিহাসিক তথ্য, হাই-রেজোলিউশন মানচিত্র, ভেরিফাইড হোটেল বুকিং, যাতায়াতের রিয়েল-টাইম সময়সূচী এবং নিকটস্থ থানার নম্বর যুক্ত থাকবে। বিদেশি পর্যটকরা যেন দেশ ছাড়ার আগেই তাদের পুরো ট্যুর এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রি-প্ল্যান করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ফ্রি হাই-স্পিড ওয়াইফাই এবং প্রতিটি নিদর্শনের পাশে কিউআর কোড ভিত্তিক তথ্য বোর্ড থাকতে হবে, যা স্ক্যান করলে পর্যটক নিজের ভাষায় ঐ স্থানের ইতিহাস শুনতে বা পড়তে পারবেন। এর মাধ্যমে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা হবে সহজ ও আধুনিক।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা জোরদার
বাংলাদেশের প্রতি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে 'ভিসা অন অ্যারাইভাল' সুবিধা ১০০টিরও বেশি দেশের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। আমাদের ই-ভিসা প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সহজ করতে হবে যেন ঘরে বসে মাত্র কয়েক মিনিটে ভিসা পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় নিয়োজিত ট্যুরিস্ট পুলিশ'কে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত এবং প্রশিক্ষিত করতে হবে। বিদেশি পর্যটকরা যেন এদেশের মাটিতে নিজেদের পূর্ণ নিরাপদ বোধ করেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে বিদেশিদের ভ্রমণে যে আইন জটিলতা বা বিধিনিষেধ রয়েছে, তা শিথিল করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্রমণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য প্রতিটি বড় শহরে 'ট্যুরিস্ট হেল্প ডেস্ক' থাকা অত্যন্ত জরুরি।
থিম পার্ক, কালচারাল সেন্টার ও বিনোদন সুবিধার বিস্তার
মানুষ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে আসে না, তারা আনন্দ ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা চায়। আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের থিম পার্ক, ওয়াটার পার্ক এবং ওয়াটার স্পোর্টসের (যেমন: সার্ফিং, প্যারা-সেইলিং, স্কুবা ডাইভিং) পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কক্সবাজার বা কুয়াকাটার মতো সমুদ্র সৈকতে রাতের বেলা আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রতিটি বড় পর্যটন কেন্দ্রে একটি করে 'কালচারাল ভিলেজ' গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য, লোকশিল্প এবং বাঙালি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে পর্যটকরা আমাদের দেশি কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হতে পারবে, যা বিশ্বমঞ্চে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
ইকো-ট্যুরিজম ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা
পর্যটন যেন পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন এবং সিলেটের হাওড় অঞ্চলগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে 'জিরো ওয়েস্ট' পলিসি গ্রহণ করতে হবে। পর্যটন এলাকাগুলোতে সম্পূর্ণ প্লাস্টিক মুক্ত জোন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









