হিমেল এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। গ্রামের ছেলে হলেও তাকে দেখে গ্রামের ছেলে মনে হওয়ার কোনো উপায় নেই। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, লম্বা গড়ন, বাদামি চুল আর হালকা নীলচে চোখ—গ্রামের মানুষ তাকে দেখলে প্রায়ই ফিসফিস করে বলত, ওরে বাবা! এ আবার কোন দেশের পোলা? কেউ বলত, ইংরেজদের নাতি মনে হয়!
হিমেল অবশ্য এসব শুনে খুব মজা পেত। আয়নায় নিজেকে দেখলেই মনে হতো, আসলেই আমি একটু আলাদা তো!
একদিন অনেকদিন পর তার মামা বেড়াতে এলেন। মামাও বেশ স্মার্ট মানুষ। তবে হিমেলের মনে মনে বিশ্বাস—মামা ভালো, কিন্তু আমি এক ধাপ এগিয়ে!
মামা সঙ্গে করে এনেছেন চকচকে নীল রঙের দামি ব্লেজার আর একেবারে নতুন আইফোন। দুপুরে ভাত খেয়ে মামা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। হিমেলের মাথায় তখন এক মহাপরিকল্পনা।
মামা তো ঘুমাচ্ছে... ব্লেজারটা একটু পরে দেখি। আইফোন দিয়ে দু-চারটা ছবি তুললে ক্ষতি কী!"এই দু-চারটা ছবি তুলতে তুলতেই সে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে চলে গেল।
পড়ন্ত দুপুর। রাস্তা একেবারে ফাঁকা। চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
হিমেল কখনো রাস্তার ছবি তোলে, কখনো গাছের, কখনো আবার নিজের। এমন সময় দুই ভদ্রলোক হাঁটতে হাঁটতে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
একজন মুগ্ধ হয়ে বলল, বাহ! ভাই, আপনাকে তো একেবারে বিদেশি মনে হচ্ছে!
আরেকজন যোগ করল, হাতে আইফোন, গায়ে কী সুন্দর ব্লেজার! আপনি কি বিদেশ থাকেন?
এই প্রশ্ন শোনামাত্র হিমেলের বুকের ভেতর অহংকারের বেলুন ফুলতে শুরু করল। সে গলা একটু ভারী করে, ঠোঁটে আধা-হাসি এনে বলল, ইয়েস, ম্যান! আমি আমেরিকা প্রবাসী! লোক দুটি একসঙ্গে বলল, ওহ! তাই নাকি?
হিমেল থামার পাত্র নয়। সে আরো বলে, আমেরিকায় আমার অনেকগুলো ব্যবসা আছে। দুই মাস পরপর বাংলাদেশে আসি। দেশটাকে খুব মিস করি, বুঝলেন? দুজনই মাথা নাড়ল। ওহ! অনেক বড়লোক তাহলে!
হিমেল আরও ভাব নিয়ে বলল, টাকা-পয়সা তো জীবনের সবকিছু নয়। ঘোরাঘুরি করা হচ্ছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি কিন্তু আমেরিকা থেকে কানাডা, ইউরোপ, চায়না, হংকং, থাইল্যান্ড অনেক ট্রাভেলিং করি। দিস ইজ মাই গুড হেবিট।
এই কথা শেষ হতেই একজন পকেট থেকে ছোট্ট একটা ছুরি বের করল। ঠিক বলেছেন। তাই যা আছে, সব বের করেন।
অন্যজন বলল, ডলারগুলো আগে দেন। তারপর আইফোন। তারপর ব্লেজার। হিমেলের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও। সে তোতলাতে লাগল, না... মানে... আসলে... ইয়ে, হু আর ইউ?
লোকটা ছুরি একটু নাড়িয়ে বলল, আমেরিকান ইংলিশ আমেরিকাতে গিয়ে বলবেন। আগে মালপত্র দেন। বেশি দেরি করবেন না। পাবলিক এসে গেলে কিন্তু আমরা অপারেশন সাকসেস করতে পারবো না।
হিমেল এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ভাই, এই আইফোনটা আমার না...
জানি। এখন থেকে আমাদের।
ব্লেজারটাও আমার না।
এখন সেটাও আমাদের।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই আইফোন গেল, ব্লেজার গেল, এমনকি হিমেলের বিদেশি ভাবটাও উধাও হয়ে গেল। দুই ছিনতাইকারী চলে যেতে যেতে একজন আরেকজনকে বলল, আজকের শিকার ভালোই হলো!
আরেকজন হেসে উত্তর দিল, আমেরিকা থেকে সরাসরি আমাদের কাছে আমদানি হয়েছে!
হিমেল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে লাগল।
ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, এখন মামাকে কী বলব?
বাড়িতে ঢুকতেই মামা ঘুম থেকে উঠে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে, আমার ব্লেজার কেমন লাগল? হিমেল মাথা নিচু করে বলল, মামা... ব্লেজারটা এত ভালো লেগেছে যে... আরেকজনও পছন্দ করে নিয়ে গেছে!
মামা অবাক হয়ে বললেন, মানে?
হিমেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, ভাব দেখাতে গিয়ে ব্লেজারও গেল, আইফোনও গেল!
সেদিনের পর থেকে হিমেল একটি শিক্ষা পেয়েছিল, যে সম্পদ নিজের নয়, তা নিয়ে বড়াই করতে গেলে কখনো কখনো নিজের মান-সম্মানও হারাতে হয়। ভাব দেখাতে গিয়ে অনেক সময় সত্যিই সর্বনাশ ডেকে আসে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









