সরকারি অফিসের কেরানি জাহাঙ্গীর সাহেবের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল না নিজের বাড়ি, না গাড়ি, না বিদেশ ভ্রমণ। তার একটাই স্বপ্ন—পে-স্কেল। চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন বড়বাবু কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন,
—ধৈর্য ধরো। আর কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন পে-স্কেল।
সেই কয়েক মাস ক্যালেন্ডার বদলাতে বদলাতে কয়েক বছরে গড়াল। জাহাঙ্গীর সাহেবও আশাবাদী মানুষ। তিনি ভাবলেন, পে-স্কেল যখন হবেই, তখন এখন খরচ করে লাভ কী! সংসারের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত তিনি ভবিষ্যতের সেই অদেখা দিনের জন্য তুলে রাখলেন।
স্ত্রী বললেন,
—একটা ফ্রিজ কিনি?
—পে-স্কেল হলে।
ছেলে বলল,
—বাবা, একটা সাইকেল?
—পে-স্কেল হলে।
চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করলেন। স্ত্রী বললেন,
—চশমাটা বদলাও।
—এই তো পে-স্কেল হবে, তারপর ভালো ফ্রেমেরটা নেব।
একদিন বাজারে গিয়ে ইলিশের দাম জিজ্ঞেস করলেন।
মাছওয়ালা দাম বলতেই তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
—থাক, পে-স্কেল হলে ইলিশ কিনব। আজ তেলাপিয়া দাও।
মাছওয়ালা মুচকি হেসে বলল,
—চাচা, আপনার পে-স্কেল হতে হতে ইলিশও হয়তো পেনশনে চলে যাবে!
এভাবেই তাঁর জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের শেষে একটা বাক্য জুড়ে গেল—পে-স্কেল হলে। আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত বুঝে গিয়েছিল, কোনো অনুরোধের উত্তরে জাহাঙ্গীর সাহেবের কাছে এর বাইরে দ্বিতীয় কোনো বাক্য নেই।
অফিসে নতুন কেউ যোগ দিলেই কৌতূহল নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করত,
—জাহাঙ্গীর সাহেব, পে-স্কেল কি এবার আসলেই হবে?
জাহাঙ্গীর সাহেব অভিজ্ঞ মানুষের মতো হাসতেন।
—হবে। সরকার কথার খেলাপ করে না। শুধু ক্যালেন্ডারের সঙ্গে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়।
বছর গড়াল। এক সরকার গেল, আরেক সরকার এল। অফিসে বড়বাবু বদলালেন, দেয়ালের রঙ বদলাল, কম্পিউটার এল, ফাইল ডিজিটাল হলো। শুধু জাহাঙ্গীর সাহেবের মুখের সংলাপটা বদলাল না—পে-স্কেল হলে।
অবশেষে একদিন অফিসে হইচই পড়ে গেল। নতুন পে-স্কেল ঘোষণা হয়েছে! সারা অফিসে মিষ্টি। কেউ রসগোল্লা খাওয়াচ্ছে, কেউ জিলাপি। জাহাঙ্গীর সাহেবের চোখে পানি এসে গেল।
তিনি মনে মনে হিসাব করলেন—প্রথমেই একটা ফ্রিজ কিনবেন। তারপর ছেলেকে মোটরসাইকেল। স্ত্রীকে একটা সোনার চুড়ি। নিজের জন্য একটা ভালো চশমা। এতদিনের অপেক্ষা বুঝি সত্যিই শেষ হতে চলেছে।
পরদিন সকালেই তিনি হিসাব শাখায় গেলেন। হিসাবরক্ষক হাসিমুখে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—অভিনন্দন! আপনার বেতন চৌদ্দ হাজার টাকা বেড়েছে।
জাহাঙ্গীর সাহেবের মুখে বহু বছরের অপেক্ষার হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই হিসাবরক্ষক আরেকটা ফাইল বের করলেন।
—আর একটা খবর আছে।
—কী খবর?
—আজ থেকেই আপনার অবসর কার্যকর।
জাহাঙ্গীর সাহেব প্রথমে বুঝতেই পারলেন না।
—মানে?
—আপনার অবসরের কাগজপত্র তো গত সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ে চলে গেছে। তাই নতুন স্কেলের বেতনটা আপনার চাকরিজীবনে আর যোগ হবে না।
কিছুক্ষণ তিনি চুপ করে বসে রইলেন। মনে হলো, এত বছরের অপেক্ষা যেন ঠিক সময়ে এসে দরজায় কড়া নাড়ল, কিন্তু তিনি ততক্ষণে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। স্বপ্নটা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ছুঁয়ে দেখার সুযোগ নেই।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় সহকর্মীরা সান্ত্বনা দিল।
—মন খারাপ করবেন না। অন্তত পে-স্কেলটা তো দেখে গেলেন।
জাহাঙ্গীর সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—হ্যাঁ, বিয়ের কার্ড পেলাম, কিন্তু বিয়েতে যেতে পারলাম না।
সবাই হেসে উঠল।
কয়েক দিন পর বিদায় সংবর্ধনায় বড় সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
—জাহাঙ্গীর সাহেব, আপনার এখন কী পরিকল্পনা?
তিনি গম্ভীর মুখে চা খেতে খেতে বললেন,
—অপেক্ষা করব।
—কিসের?
—পরের পে-স্কেলের।
সবাই অবাক হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
—আপনি তো অবসরে!
জাহাঙ্গীর সাহেব একটু হেসে বললেন,
—আমি না...
সবাই তার দিকে কৌতূহলভরে তাকিয়ে রইল।
—আমার ছেলে। গত মাসেই সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে। ওকে বলে দিয়েছি, কোনো কিছু কিনতে তাড়াহুড়ো করবে না...
—পে-স্কেল হলে কিনবি।
হলরুমে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। জাহাঙ্গীর সাহেব চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন। তাঁর মুখে তৃপ্তির হাসি।
সরকারি চাকরিজীবনের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার হলো—এক পে-স্কেলের প্রতীক্ষা থেকে পরের প্রজন্মের পে-স্কেলের প্রতীক্ষায় উন্নীত হওয়া


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









