পুরোনো দোতলা বাড়ির দুই রুমে মন্টু আর ঝুমকি মিষ্টি সংসার। ভোর হলে দুজনে পাশাপাশি বসে, দুপুরে একসঙ্গে খাবার খায়, আর বিকেলে বাড়ির কার্নিশে বসে সূর্যের শেষ আলোয় ঝিম মেরে বসে থাকে। মিন্টুর বাবার অঢেল টাকা-পয়সা রেখে গেছেন, সেকারণে মন্টু তাদের পৈত্রিক ব্যবসাও ঠিকঠাক সময় দেয় না। কিন্তু কিছুদিন ধরে তাদের সেই সুখের সংসারে যেন অশান্তির কালো মেঘ জমেছে। কারণ একটাই—স্মার্টফোন!
সেদিন দুপুরে ঝুমকি রান্না করতে বসেছে। সেই মুহূর্তে তার বড়বোন টিকলির ফোন এল।
হ্যালো ঝুমকি! কী করছিস?
এই তো, রান্না করতে বসেছি।
কী রান্না করছিস?
রুই মাছ আর সবজি।
ব্যস! শুরু হলো দুই বোনের গপপো।
একদিকে ঝুমকির কাঁচামরিচ কাটা, পেঁয়াজ কাটা, আলু-পটল কাটাকুটি আর একদিকে দুই বোনের বকবকানি—আন্তর্জাতিক মানের গপপো!
টিকলি বলে, জানিস, কাল আমাদের পাশের বাসার ময়না কী করেছে?
ঝুমকি পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বলল, কী করেছে?
ওর নাকি শাশুড়ির সঙ্গে আবার ঝামেলা হয়েছে!
সেকি! কেন?
কাটাকুটি শেষ হয় কিন্তু ঝুমকির কান থেকে ফোন নামল না। একদম এঁটে রইল।
তারপর কী হলো জানিস?" টিকলি প্রশ্ন করে।
কী হলো?
ও নাকি রাগ করে সোজা বাপের বাড়ি চলে যেতে চেয়েছিল। হি হি...হা হা...
ঝুমকি হেসে বলল, আরে বাবা!
এদিকে চুলায় আগুন ধরে, হাঁড়ি বসে, তেল গরম হচ্ছে, পেঁয়াজ ভাজা হচ্ছে, মসলা দেওয়া হচ্ছে—আর টিকলি-ঝুমকির গালগল্পও সমানতালে চলছে। মাছ ভাজার গন্ধে ভেন্টিলেটর ভরে গেল। কিন্তু টিকলির কথার যেন কোনো শেষ নেই। ঝুমকির এক হাতে খুন্তি, অন্য হাতে ফোন। মাছ কড়াইতের গরম তেলে পড়ে, ঝুমকি নেড়েচেড়ে রান্না করতে বলে করছে। এরই মধ্যে টিকলিও ফোনের ওপাশ থেকে চলে—কার বাচ্চা কী করেছে, কার সঙ্গে কার ঝগড়া হয়েছে, কে কোথায় বেড়াতে গেছে, কে নতুন ফোন কিনেছে—দুনিয়ার যত আলতু-ফালতু কথা। এদিকে রান্না শেষ হয়। কিন্তু ফোনের আলাপ তখনও চলছে...কখন শেষ হবে কেউ জানে না!
এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা মন্টু মিয়ার মাথা গরম হয়ে গেল। সে কয়েকবার এদিক-ওদিক তাকাল, রাগে দাঁত কিটমিট করল। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, আরে ঝুমকি! এত কথা বললে যে মাথার নাট-বল্টু সব নষ্ট হয়ে যাবে!
ঝুমকি যেন এক্কেবারে রকেট লঞ্চার! ঝুমকি যেন আগুন হয়ে গেল। চোখ গোল গোল করে তেড়ে এল—কী বললে তুমি?
মন্টু একটু শান্তভাবে বলল, এতক্ষণ ধরে ফোন কানে নিয়ে কথা বললে ব্রেনের ক্ষতি হয়।
আমার মাথা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ঝুমকি মেজাজ চড়িয়ে বলল।
আরে বাস, আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বললাম।
আমার ভালো-মন্দ তোমাকে ভাবতে হবে না! আমি আমার বোনের সঙ্গে একটু কথা বলছি, তাতেও তোমার সমস্যা?
মন্টু এবার বিরক্ত হয়ে বলল, একটু কথা? সেই কখন থেকে কথা বলছ! রান্না শুরু করেছ ফোন কানে নিয়ে, এখন রান্না শেষ—তবুও ফোন কানে! ফোন যেন আঠা দিয়ে কানের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাতে কী হয়েছে?
কিছু হয়নি, কিন্তু কিছু হতে কতক্ষণ! আরে আমি তো তোমার মঙ্গলের জন্যই বলছি গো! সারাদিন ওই স্ক্রিনের নীল আলো চোখের ভেতর ঢুকলে ব্রেন টিউমার হতে সময় লাগবে না। উত্তর পাড়ার জসিমের ছোট বউয়ের নাকি ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছেন শুনলাম!...তারপর টিভি নায়িকা ময়নারও নাকি...!
ঝুমকি রাগে ডানা ঝাপটিয়ে বলল, বাহ! এখন ফোনে কথা বলাও অপরাধ হয়ে গেল?
অপরাধ বলিনি। কিন্তু ফোনে এতক্ষণ থাকা বলা কি ঠিক?
ঠিক-বেঠিক আমি বুঝবো। তুমি আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না! চড়া গলায় বলে ঝুমকি।
দুজনের তর্ক মুহূর্তের মধ্যে ঝগড়ায় পরিণত হলো। তাদের চিৎকার শুনে পাশের বাড়ি থেকে মহিলারা—একে একে ছুটে বাড়ির গেটের সামনে জড়ো হলো। মোল্লার ছোট বউ বলল, কী হয়েছে? এত চেঁচামেচি কেন?
লাভলু মাতুব্বর ঘাড় কাত করে বলল, মনে হচ্ছে সংসারে বড় কোনো ঝামেলা হয়েছে!
মন্টু মিয়া রাগ করে বলল, ঝামেলা তো হয়েছে! আমার বউ সারাদিন ফোন কানে নিয়ে বসে থাকে!
ঝুমকি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল, আর উনি এমন ভাব করছেন যেন আমি ফোনে কথা বললেই সংসার শেষ!
ভিড় দেখে অচেনা এক পথচারিও মুখ বাড়িয়ে বলল, আরে, তোমরা দুজন একটু শান্ত হও। কিন্তু তখন দুজনের কেউ কারও কথা শুনতে রাজি নয়।
মন্টু মিয়া বলল, সকাল থেকে ফোন, দুপুরে ফোন, রান্নার সময় ফোন—সবসময় ফোনে কথা আর কথা। এত কথা তো কোনো কল সেন্টারের মেয়েরাও বলে না!
ঝুমকি পাল্টা বলল, আমার বোন ফোন করেছে। আমি কি তার সঙ্গে দুটো কথা বলব না?
দুটো কথা বলো। কিন্তু দুটো কথা আর দুই ঘণ্টার কথা এক জিনিস নয়!
প্রতিবেশীদের মধ্যে হাসাহাসি শুরু গেল। পরিস্থিতি দ্রুত গম্ভীর হয়ে উঠল। ঠিক তখনই পাশের বাড়ি থেকে ডানা ছুটতে ছুটতে হারেজের বউ এসে তাদের বাড়ির সিঁড়ির সামনে বসল। তার চোখ দুটো লাল, মনে হচ্ছে খুব কেঁদেছে। ঝুমকি তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, কিরে শেফালী, তোর আবার কী হলো?
শেফালী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, আর বলিস না ঝুমকি! আমার স্বামী সারাদিন রিলস আর শর্টস দেখে। আমি ভাত বাড়িয়ে ডাকছি—হারেজ সাহেব, ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আর ও কান থেকে ইয়ারফোন খুলে বলে—এক মিনিট, ভিডিওটা শেষ হোক!
আমার আর সহ্য হয়নি, ভাতের প্লেট রান্নাঘরে রেখে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে এসেছি। শেফালীর কথাটা শুনে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
লাভলু মাতুব্বর আবার বলল, শুধু আমরা কেন, পাশের গ্রামের শুক্কুর আলীর সংসার তো এই টিকটক আর মোবাইলের কারণে আলাদা হয়ে যাওয়ার জোগাড়! শুক্কুর আলী নাকি সারাদিন মোবাইলে হিরো আলমের গান শোনে!
মন্টু মিয়া তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, গ্রামের সব সংসারেই তো এখন এই এক বালাই! শুধু গ্রামে কেন, শহরের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। আমিও সেদিন শহরে কাজে গিয়ে দেখেছি, বারান্দায় বসে এক দম্পতি চা খাচ্ছিল, স্বামীর হাতে ফোন, স্ত্রীর হাতেও ফোন। কেউ কারও মুখের দিকে তাকানোর ফুরসত নেই। চা জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেল, অথচ দুজনের আঙুল স্ক্রিনের ওপর তরতর করে চলছে! আজকের দিনে স্মার্টফোনের নীল আলোর নিচে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে সবার সুখের বাসা। সবার ঘরেই একই অভিশাপ। মোবাইলের কারণে কত সংসার যে ভেঙে যাচ্ছে!
ঝুমকির এবার একটু গায়ে লাগল। মেজাজ চড়া করে বলল, মানুষের মতো কথা বলো না তো! আমার বোন একটু খোঁজখবর নিলে তোমার এত গায়ে লাগে কেন?
এরপর মন্টু আর ঝুমকির মধ্যে আবার তর্ক শুরু হলো। চলল আরো কিছুক্ষণ। স্বামীকে ছেড়ে ছাড়া টুনটুনি ভাবি ঝুমকির কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, এই মোবাইলের কারণে আমার সংসারটা ভেঙে গেছে। এখন তোর সংসারটাও ভেঙে যাক তা আমি চাই না, আমরা কেউ-ই চাই না ঝুমকি। একটু ভেবে দেখ। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো— মোবাইলের স্ক্রিনের আলোয় নয়, বরং একে অন্যের চোখের আলোয় সংসার বেঁচে থাকে।
ঝুমকিকে সান্ত্বনা দিয়ে টুনটুনি বাবি তার বাবার বাড়ির দিকে চলে গেল।
ঝুমকি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। টুনটুনি ভাবির কথাগুলো ঝুমকির মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো পেটাতে লাগল। একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা ভেবে তার নিজের ওপরই চরম ঘৃণা হলো। কেন যে সে ওই ফালতু বকবকানিতে এত সময় নষ্ট করতে গেল!
হঠাৎ দেখল ঘরের কোণে ধুলো জমেছে। নিচে মন্টু মুখ ভার করে বসে আছে। তার নিজের ওপর খুব রাগ হলো। কেন যে সে এত কথা বলতে গেল! ঝুমকি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঝুমকি মোবাইল ফোনটাকে চালের ড্রামের ভেতর রেখে দিল। তারপর মন্টুর কাছে এসে তার পিঠ খুটে দিতে দিতে বলল, আমায় ক্ষমা করে দাও মন্টু সোনা।
মন্টু মুচকি হেসে ঝুমকিকে কাছে টেনে নিল।
বাড়িরে উঠোনে তখন বিকেল গড়িয়ে আসছে, আকাশে নরম রোদ, গাছের পাতায় মৃদু বাতাস। আর ঝুমকির মন থেকে মোবাইল নামক কালো মেঘটা যেন ধীরে ধীরে কেটে গেল।
(অবশ্য রাত ১২টা বাজার পর যখন মন্টু ঘুমিয়ে পড়বে, তখন ঝুমকি বিবি আবার বালিশের তলা থেকে ফোন বের করে টিকলিকে কল দেবে কি না—সেটা অবশ্য অন্য গল্প!)


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









