সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরুর আগেই তাঁর পক্ষে শিক্ষকদের সংগঠিত করে স্মারকলিপি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও স্থানীয় ব্যক্তিদের একাংশের ভাষ্য, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরুর আগে কোনো পক্ষের হয়ে শিক্ষকদের সংগঠিত করা হলে তদন্তের পরিবেশ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারেন এমন শিক্ষকেরাও চাপের কারণে স্বাধীনভাবে মতামত দিতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। গত ৩০ আগস্ট মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দৈনিক এদিনসহ একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
এর পরই বালাগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে একটি সভা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই সভায় উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, তাঁদের সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের বলা হয়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আগামী মাসে অবসরে যাবেন। এরপর বর্তমান সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে আসতে পারেন। তাই তাঁর পক্ষে অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলেও তাঁদের জানানো হয়।
তবে শিক্ষক নেতাদের বক্তব্যে এ বিষয়ে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। শিক্ষক নেতা আসীদ আলী, ছায়াদ মিয়া, লায়েক মিয়া, আব্দুল হাকিম, আব্দুল হান্নান, দিলীপ দাস ও লালমোহন দাস নান্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কেউ বলেন, তাঁরা কোনো শিক্ষকের বিপক্ষে নন। তাঁরা শুধু উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান করছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিশ্বাস করেন না। আবার কয়েকজন শিক্ষক নেতা উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পরামর্শে সভা আয়োজনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এদিকে গত সোমবার বালাগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫২ জন প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের স্বাক্ষরসংবলিত ২১ পৃষ্ঠার একটি স্মারকলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়া হয়। এর অনুলিপি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সিলেট বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক ও সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে শিক্ষকেরা উল্লেখ করেন, সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে মো. মাহমুদুল হাসানকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ভাষা ও উপস্থাপনা একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। তাঁরা সংবাদগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান।
শিক্ষকদের ভাষ্য, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত।
অভিযোগকারী কুলসুমা বলেন, ‘একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাঁর নিজ দায়িত্বে বহাল রেখে কতটুকু নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে, এটাই সমাজের ন্যায়পরায়ণ মানুষের কাছে আমার প্রশ্ন।’
তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালে একজন অভিযুক্ত কর্মকর্তা স্বপদে বহাল থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে সভায় অনুপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি এমন কিছু মানুষ দেখেছেন, যাঁরা সব সময় ক্ষমতাবানদের কাছাকাছি থাকতে চান। তাঁর ধারণা, কিছু শিক্ষক নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এ ধরনের আয়োজন করে থাকতে পারেন। তবে তদন্ত শুরুর আগেই শিক্ষকদের একত্রিত করে কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করায় শেষ পর্যন্ত ওই কর্মকর্তাকেই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।
এ বিষয়ে বালাগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রকিব ভূঁইয়া বলেন, সভার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, তিনি কাউকে তাঁর পক্ষে সভা করার কথা বলেননি এবং এ ধরনের সভার বিষয়ে তিনি অবগত নন। তদন্ত শুরু হলে তদন্ত কার্যক্রমে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
এ বিষয়ে জানতে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাখাওয়াত এরশেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









