মাইকেল সাহেব ভূমি অফিসের কর্মকর্তা। ঘুষ খেয়ে খেয়ে তিনি দোতলা বাড়ি করেছেন। গ্যারেজে চকচকে মোটরসাইকেল, বেডরুমে এসি—কোনো কিছুরই অভাব নেই। শুধু একটা জিনিসের অভাব আছে—সুনাম। এলাকায় তার নামের সঙ্গে ‘ঘুষখোর’ শব্দটা এমনভাবে জুড়ে গেছে যে, অনেকে আসল নামটাই ভুলে গেছে।
একদিন পত্রিকায় খবর বেরোল—উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘সাদামাটা জীবনযাপনকারী সৎ কর্মকর্তা’ খুঁজে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। খবরটা পড়ে মাইকেল সাহেবের চোখ চকচক করে উঠল।
তিনি স্ত্রীকে ডেকে বললেন, “সততার সার্টিফিকেট লাগব না, খালি একটা মঞ্চ আর একটা ক্যামেরা হইলেই হইব!”
তারপর পিয়নকে বললেন,
“মোটরসাইকেলটা গ্যারেজে ঢুকায়া তালা মার। আর স্টোররুমে যে মালামালগুলা পড়ে আছে, ওইখান থিকা একটা সাইকেল নিয়া আস।”
স্টোররুমে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক কোণে ধুলো-মাকড়সার জালে ঢাকা একটা পুরোনো সাইকেল খুঁজে পেল। সাইকেলটার হ্যান্ডেলে মরচে, ঘণ্টি নেই, একটা প্যাডেল বাঁকা হয়ে বাইরে ঘুরে আছে। চাকার অবস্থাও ভালো নয়। মাইকেল সাহেব সাইকেলটা দেখে এমন খুশি হলেন, যেন হাতে পদোন্নতির চিঠি পেয়েছেন।
পিয়ন বলল,
“স্যার, চেইনে তেল দিমু?”
মাইকেল সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিলেন।
“না না! ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ না থাকলে সততা বিশ্বাসযোগ্য লাগে না।”
পরদিন থেকে নতুন নাটক শুরু হলো। রোজ সকালে মাইকেল সাহেব সেই সাইকেলে চড়ে অফিসে যান। সাইকেল ক্যাঁচক্যাঁচ করে, প্যাডেল কাঁপে, আর পেছনে পেছনে হাঁটে তার পিয়ন—হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। টিফিনে অবশ্য মাইকেল সাহেবের জন্য গরম বিরিয়ানি।
এলাকায় গুঞ্জন উঠল,
“মাইকেল সাহেব এত বড় অফিসার, তাও সাইকেলে চড়েন!”
স্থানীয় এক সাংবাদিক খবর পেয়ে ছবি তুললেন। পরদিন ফেসবুকে ছবি দিয়ে ক্যাপশন দিলেন—“সততার প্রতীক—সাদামাটা জীবনযাপনে অনন্য দৃষ্টান্ত মাইকেল সাহেব।”
ছবির নিচে শত শত লাইক পড়ল। মাইকেল সাহেব সারাদিন মোবাইলে নিজের ছবি দেখে মুচকি হাসলেন।
অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত সংবর্ধনার দিন। মাইকেল সাহেব গর্বভরে সাইকেল চালিয়ে মঞ্চের সামনে হাজির হলেন। সাইকেলটা এমনভাবে চালাচ্ছিলেন, যেন তিনি অলিম্পিকে সোনার পদক জিতে ফিরেছেন।
ইউএনও সাহেব মঞ্চে উঠে গদগদ কণ্ঠে বললেন,
“মাইকেল সাহেবের মতো সততা থাকলে দেশটাই পাল্টে যেত। এত বড় পদে থেকেও উনি সাইকেলে চড়েন—ভাবা যায়!”
চারদিকে করতালি পড়ল। মাইকেল সাহেব গর্বে আরও ফুলে উঠলেন।
তিনি সাইকেল থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ বাঁকা প্যাডেলে পা আটকে ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে সাইকেলসহ কাত হয়ে পড়লেন মঞ্চের সামনে। লোকজন কী করবে বুঝতে পারল না—হাসবে, নাকি তাকে তুলবে।
ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে এক বৃদ্ধ লোক ছুটে এসে সাইকেলটা তুলতে গেলেন। সাইকেলটার দিকে তাকিয়েই তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন।
তারপর চিৎকার করে বললেন, “আরে ভাই! এইডা তো আমার সাইকেল!”
মাঠে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল।
বৃদ্ধ লোকটি মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যার, চিনতে পারছেন? কয়েক বছর আগে জমির কাগজ ঠিক করাইতে আপনার অফিসে গেছিলাম।” মাইকেল মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
বৃদ্ধ বললেন, “ঘুষের টাকা দিতে পারি নাই বইলা আপনি কইছিলেন, ‘কিছু একটা জামানত রাখেন।’ আমার কাছে টাকা ছিল না। এই সাইকেলটাই রেখে আসছিলাম।”
চারদিকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
বৃদ্ধ আবার বললেন, “কাগজও আর পাই নাই, সাইকেলও ফেরত পাই নাই। আইজকা দেখি, আমার সেই সাইকেল দিয়া আপনি সততার পুরস্কার নিতে আইছেন!”
মুহূর্তেই মাঠজুড়ে হাসির হুল্লোড় উঠল।
ইউএনও সাহেবের হাতে তখনও মাইক্রোফোন। একটু আগেই তিনি বলেছিলেন,
“এমন মানুষই তো আমাদের দরকার!”
এবার তিনি চুপ।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ অবশ্য থামল না। মাইকেল সাহেব মাটিতে বসে রইলেন। এক হাতে সাইকেলের বাঁকা প্যাডেল, অন্য হাতে মুখ ঢেকে রেখেছেন।
সেদিন তিনি কোনো পুরস্কার পেলেন না। তবে পরদিন চায়ের দোকানে এক লোক আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল,
“মাইকেল সাহেবের সততার খবর শুনছেন?”
লোকটা চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বলল, “হ, শুনছি। মানুষটা সত্যিই সাদাসিধা—নিজের জিনিস বাদ দিয়া অন্যের সাইকেলেই সততা দেখাইছেন!”
চায়ের দোকানে আবার হাসির রোল উঠল।
আর মাইকেল সাহেব? সেদিনের পর তিনি আর সাইকেল নিয়ে অফিসে বের হননি। স্টোররুমের তালাটাও বদলে ফেলেছিলেন। সততার স্মারকগুলো এবার থেকে একটু সাবধানে রাখার জন্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









