আজ সকালে আপনি যে ডিমটি খেয়েছেন, সেটির ইতিহাস হয়তো আপনার ধারণার চেয়েও পুরোনো। এত পুরোনো যে, তখন মানুষও আজকের মানুষ ছিল না।
প্রায় ৩৫ লাখ বছর আগে তানজানিয়ার লায়েটোলিতে একদল মানবসদৃশ পূর্বপুরুষ হেঁটে গিয়েছিল আগ্নেয় ছাইয়ের ওপর। তাদের পদচিহ্ন আজও সেখানে রয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে মেরি লিকির নেতৃত্বে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেই পদচিহ্ন আবিষ্কার করেন। কাছেই পাওয়া যায় জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পাখির ডিম। পাখিটি ছিল ফ্রাঙ্কোলিন—মাটিতে বাসা বানানো এক ধরনের গিনি ফাউল। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না সেই ডিম কে খেয়েছিল। কিন্তু অনুমানটি যথেষ্ট যুক্তিসংগত: সম্ভবত কোনো প্রাচীন মানবপূর্বপুরুষ বাসা থেকে ডিম নিয়ে খেয়েছিল।
অর্থাৎ ডিম খাওয়ার ইতিহাস কৃষি বা রান্নাঘরের ইতিহাসের চেয়েও পুরোনো।

প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ডিয়েপক্লুফ রক শেল্টারে মানুষ আগুন জ্বালাত। সেই প্রাচীন রান্নাঘরের চারপাশে পাওয়া গেছে অস্ট্রিচের অসংখ্য ডিমের খোসা। একটি অস্ট্রিচের ডিমে প্রায় ১৮ থেকে ২৪টি মুরগির ডিমের সমান পুষ্টি থাকতে পারে। শিকারি-সংগ্রাহকদের কাছে এটি ছিল প্রায় নিখুঁত খাদ্য: পুষ্টিকর, বহনযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে সংরক্ষণযোগ্য।
মানুষের জন্য খাদ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম খুব সহজ: যে খাবার কম পরিশ্রমে বেশি শক্তি দেয়, মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অস্ট্রিচের ডিম সেই পরীক্ষায় ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছিল।
খোসাটিও নষ্ট হতো না। খালি খোসা পানি রাখার পাত্রে পরিণত হতো। কোথাও কোথাও তার গায়ে আঁকা হয়েছে প্রাচীন মানবশিল্পের নিদর্শন। অর্থাৎ মানুষ ডিম খেয়ে শুধু পেট ভরায়নি; তার খোসাকেও প্রযুক্তিতে পরিণত করেছে।
কখনো অবশ্য এই সম্পর্কের ফল এত ভালো ছিল না।
অস্ট্রেলিয়ায় মানুষ পৌঁছানোর সময় সেখানে বাস করত জেনিওর্নিস—প্রায় সাত ফুট লম্বা, ৫০০ পাউন্ডের বেশি ওজনের এক বিশাল উড়তে না-পারা পাখি। মানুষ তার বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ করত এবং আগুনে সেঁকে খেত। মানুষের আগমনের পর পোড়া ডিমের খোসা পাওয়া যায়; প্রায় ৪৭ হাজার বছর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড থেকে জেনিওর্নিসের ডিমের খোসা অদৃশ্য হয়ে যায়।
জেনিওর্নিস কি মানুষের ডিম-খাওয়ার অভ্যাসের কারণে বিলুপ্ত হয়েছিল? আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু ঘটনাগুলোর সময়কাল একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়: কোনো প্রাণী যখন মানুষের খাদ্য হয়ে ওঠে, তখন তার ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?
মুরগি: বন্য পাখি থেকে খাদ্য-কারখানা
মুরগির গল্প শুরু হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল বনমুরগি বা রেড জঙ্গলফাউল থেকে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে, মানুষ সম্ভবত এই পাখিকে গৃহপালিত করতে শুরু করে। থাইল্যান্ডের বান নন ওয়াট প্রত্নস্থানে পাওয়া মুরগির হাড় এবং ধানচাষের বিস্তারের মধ্যে সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভবত ধানই মানুষ ও বনমুরগিকে কাছাকাছি এনেছিল। জমিতে ধান জন্মাল, বনমুরগি সেখানে খাবার খুঁজতে এল, মানুষ তাদের লক্ষ্য করল। তারপর শুরু হলো দীর্ঘ এক সম্পর্ক।
মানুষ শিগগিরই আবিষ্কার করল, মুরগির আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। রেড জঙ্গলফাউল বছরে দুই থেকে চারবার ডিম পাড়তে পারে। অর্থাৎ একটি ডিম নিয়ে নিলে পাখিটি আবার ডিম পাড়তে পারে।
হাজার হাজার বছর পর এই বৈশিষ্ট্যকে মানুষ এমনভাবে কাজে লাগাবে যে আধুনিক মুরগি প্রায় একটি জৈবিক উৎপাদন-যন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেই যাত্রার শুরু ছিল একটি বন্য পাখি ও মানুষের পারস্পরিক কৌতূহল থেকে।
মুরগি ইউরোপে পৌঁছায় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৯০০ সালের দিকে। কিন্তু ইউরোপীয়রা প্রথমে তাকে খাবার হিসেবে দেখেনি। দূরদেশ থেকে আসা অদ্ভুত সুন্দর পাখিটি ছিল বরং মর্যাদা, কৌতূহল ও ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ। ইতালির প্রাচীন সমাধি ও ধর্মীয় স্থানে মুরগির হাড় পাওয়া গেছে।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ সালের দিকে ইতালিতে মুরগি ও ডিম খাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে রোমান সাম্রাজ্য তাদের খাদ্যাভ্যাসকে আরও দূরে নিয়ে যায়। রোমানরা মুরগি, হাঁস, কোয়েল, রাজহাঁস, অস্ট্রিচ, এমনকি ময়ূরের ডিমও খেত। ডিম বিক্রির জন্য বিশেষ ব্যবসায়ীও ছিল।

ডিম: শুধু খাদ্য নয়, প্রযুক্তিও
রোমানরা বুঝেছিল, ডিম শুধু সিদ্ধ বা ভাজার বস্তু নয়। এটি রান্নাঘরের এক ধরনের রাসায়নিক যন্ত্র।
ডিমের সাদা অংশ উত্তাপে জমে যায়। কুসুমে থাকে চর্বি ও প্রোটিন। জল ও তেলের সঙ্গে মিশলে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন খাদ্য। রোমান রান্নার বই ‘দে রে কোয়িনারিয়া’-তে ডিমের কাস্টার্ড, অমলেটসহ নানা পদ ছিল।
আজ আমরা যাকে মেয়োনিজ বলি, তার মতো সস তৈরির ধারণাও সম্ভবত খুব পুরোনো। ডিমের কুসুম, তেল ও ভিনেগার—এই সাধারণ উপাদানগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে মানুষ বহু শতাব্দী আগেই নতুন খাদ্য তৈরি করেছিল। ডিমের সাদা অংশ ফেটিয়ে ফেনা বানানোর কৌশলও প্রাচীন।
এখানে একটি বড় মানবিক সত্য দেখা যায়। মানুষ কোনো সম্পদ হাতে পেলে শুধু সেটি ব্যবহার করে না; তার সম্ভাবনাও আবিষ্কার করতে থাকে। ডিম তার একটি ভালো উদাহরণ।

যখন ডিমেরও ঋতু ছিল
আজ আমরা সারা বছর ডিম কিনতে পারি। কিন্তু এটি মানব ইতিহাসে বেশ নতুন এক সুবিধা।
প্রাচীন পৃথিবীতে পাখিরা মৌসুমি ডিম পাড়ত। বসন্তে ডিমের প্রাচুর্য দেখা দিত, অন্য সময়ে কমে যেত। তাই মানুষ ডিম সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। রোমানরা আচার দেওয়া ডিম খেত।
চীনের ‘পিদান’, অর্থাৎ ‘সেঞ্চুরি এগ’, সংরক্ষিত ডিমের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। নামটি শতবর্ষী হলেও ডিমটি একশ বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয় না। ক্ষারীয় পদার্থ, লবণ, ছাই বা কাদার মিশ্রণে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস রেখে ডিমের রাসায়নিক গঠন বদলে দেওয়া হয়। ফলাফল—স্বচ্ছ বাদামি সাদা অংশ এবং সবুজাভ, নরম কুসুম।
এটি দেখতে আজকের ডিমের মতো নয়। গন্ধও সবার কাছে সুখকর নয়। কিন্তু এখানেও মানুষ একই কাজ করেছে: প্রকৃতির সীমাকে প্রযুক্তি দিয়ে একটু দূরে ঠেলে দিয়েছে।
তাই পরের বার ফ্রিজ খুলে এক ডজন ডিম বের করার সময় বিষয়টিকে খুব সাধারণ বলে মনে নাও হতে পারে।
একটি ডিমের ভেতর আসলে কয়েক মিলিয়ন বছরের মানব-ইতিহাস লুকিয়ে আছে। একসময় মানুষকে অস্ট্রিচের বাসার কাছে যেতে হতো, কখনো ঝুঁকি নিয়ে বন্য পাখির ডিম সংগ্রহ করতে হতো। পরে মানুষ মুরগিকে নিজের পাশে নিয়ে এল। তারপর মুরগিকে বদলে ফেলল নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী।
আজ আমাদের শুধু ফ্রিজ খুলতে হয়।
কিন্তু সেই সহজ কাজটির পেছনে আছে মানুষের দীর্ঘ এক যাত্রা—খাদ্য সংগ্রহ থেকে কৃষি, বন্য প্রাণী থেকে গৃহপালন, রান্না থেকে খাদ্যপ্রযুক্তি, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক পৃথিবী, যেখানে কয়েক মিলিয়ন বছরের ইতিহাস একটি ছোট্ট ডিমের খোসার ভেতরেও ধরা পড়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









