ধরো, তুমি একটি বই পুড়িয়ে ফেললে। বইটি আর নেই। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তার গল্প পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না। কাগজ, কালি, ধোঁয়া, ছাই—সবকিছুর অবস্থার মধ্যে কোনো না কোনোভাবে সেই অতীতের চিহ্ন থেকে যায়। প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো যদি ঠিকভাবে জানা থাকে, তাত্ত্বিকভাবে বর্তমান অবস্থা থেকে অতীতের দিকে ফিরে যাওয়ার পথ থাকার কথা।
কিন্তু এবার বইটির বদলে একটি নক্ষত্রকে কল্পনা করো। নক্ষত্রটি নিজের মহাকর্ষে ধসে পড়ে তৈরি করল একটি কৃষ্ণগহ্বর। তারপর কৃষ্ণগহ্বরটিও ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি কৃষ্ণগহ্বরটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে তার ভেতরে যা কিছু পড়েছিল—নক্ষত্রের উপাদান, তার কণাগুলোর কোয়ান্টাম অবস্থা, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক—সেসব তথ্যের কী হবে?
এখানেই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গভীর ধাঁধা—‘ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স’, অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বরের তথ্য-বৈপরীত্য।
প্রশ্নটি দেখতে সহজ। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে দুটি অসাধারণ সফল তত্ত্বের সংঘাত—আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স।
সাধারণ আপেক্ষিকতা আমাদের বলে, মহাকর্ষ আসলে কোনো অদৃশ্য দড়ির মতো টান নয়; ভর ও শক্তি স্পেসটাইমকে বাঁকিয়ে দেয়। সেই বাঁকানো স্পেসটাইমে বস্তু ও আলো চলাচল করে। কোনো নক্ষত্র যখন নিজের মহাকর্ষে এতটাই সংকুচিত হয় যে তার চারপাশে এমন একটি সীমা তৈরি হয়, যেখান থেকে আলোও আর ফিরে আসতে পারে না, তখন আমরা তাকে বলি কৃষ্ণগহ্বর। এই সীমাটির নাম ‘ইভেন্ট হরাইজন’।
একবার কোনো বস্তু এই সীমা অতিক্রম করলে বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে তার ভেতরের খবর পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হয়।
এখানে একটি অদ্ভুত বিষয় আছে। কৃষ্ণগহ্বরকে বাইরে থেকে দেখলে তার ভেতরের বিশাল জটিলতার খুব সামান্যই জানা যায়। একটি সাধারণ কৃষ্ণগহ্বরকে বর্ণনা করতে মূলত তার ভর, বৈদ্যুতিক আধান ও ঘূর্ণনের মতো কয়েকটি বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট। জন হুইলার এই ধারণাকে বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন—কৃষ্ণগহ্বরের “চুল নেই”। অর্থাৎ তার ভেতরে কী ঘটেছিল, তার বিপুল পরিমাণ বিবরণ বাইরে থেকে আর দৃশ্যমান থাকে না।
কিন্তু প্রকৃতি কি সত্যিই তথ্য মুছে ফেলতে পারে?
১৯৭০-এর দশকে স্টিফেন হকিং দেখালেন, কৃষ্ণগহ্বর পুরোপুরি কালো নয়। কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে কৃষ্ণগহ্বর থেকে এক ধরনের বিকিরণ বেরিয়ে আসে—যাকে আমরা বলি **হকিং রেডিয়েশন**। এর ফলে কৃষ্ণগহ্বর ধীরে ধীরে শক্তি ও ভর হারাতে পারে। দীর্ঘ সময় পরে সেটি বাষ্পীভূতও হয়ে যেতে পারে।
এখানেই সমস্যাটি বিস্ফোরিত হয়।
হকিংয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই বিকিরণ প্রায় তাপীয়—অর্থাৎ কোনো গরম বস্তুর বিকিরণের মতো। বাইরে থেকে দেখা বিকিরণে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে পড়ে যাওয়া বস্তুর সূক্ষ্ম তথ্যের স্পষ্ট চিহ্ন থাকার কথা নয়।
ধরো, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বই—একটি বিজ্ঞানবিষয়ক, অন্যটি কবিতার—পুড়িয়ে একই ধরনের ধোঁয়া ও তাপ বের হলো। এখন যদি সবকিছু শেষ হয়ে যায় এবং শুধু সেই তাপীয় বিকিরণটুকু তোমার হাতে থাকে, তাহলে কীভাবে বুঝবে কোন বইটি পুড়েছিল?
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি মৌলিক নীতি হলো **ইউনিটারিটি**। সহজ ভাষায়, একটি কোয়ান্টাম সিস্টেমের বর্তমান অবস্থা থেকে তার আগের অবস্থার তথ্য নীতিগতভাবে হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ প্রকৃতি যেন একটি অত্যন্ত জটিল হিসাবের খাতা—তুমি যদি পুরো বর্তমান অবস্থা জানতে পারো, তাহলে অন্তত নীতিগতভাবে অতীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সম্ভব।
কিন্তু কৃষ্ণগহ্বর যদি প্রথমে একটি নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম অবস্থাকে গিলে ফেলে এবং শেষে এমন তাপীয় বিকিরণ রেখে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে দুটি ভিন্ন অতীত একই রকম ভবিষ্যতে পরিণত হতে পারে। সেটি হলে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ইউনিটারিটির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। এটাই তথ্য-বৈপরীত্যের মূল সমস্যা।
তাহলে কি হকিং ভুল করেছিলেন?
এখানে বিজ্ঞানের একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বিজ্ঞান কোনো ব্যক্তির মতামতকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে রাখে না। একটি ধারণা যত বিখ্যাতই হোক, নতুন প্রমাণ এলে সেটিকে বদলাতে হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পদার্থবিজ্ঞানী এমন প্রমাণের দিকে এগোলেন যে কৃষ্ণগহ্বর আসলে তথ্য ধ্বংস করে না। বিশেষ করে স্ট্রিং তত্ত্ব এবং ‘অ্যাডএস/সিএফটি করেসপনডেন্স’ এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। এই দ্বৈততার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি মহাকর্ষীয় জগতের সম্পূর্ণ তথ্য হয়তো অন্য একটি কোয়ান্টাম তত্ত্বে এমনভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে, যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরকে আলাদা করে বর্ণনা করার দরকার হয় না।
এখানে এসে একটি আরও অদ্ভুত ধারণা সামনে আসে: ‘হলোগ্রাফিক নীতি’।
একটি হলোগ্রামে যেমন দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠে ত্রিমাত্রিক বস্তুর তথ্য ধারণ করা যায়, তেমনি মহাবিশ্বের কোনো অঞ্চলের ভৌত তথ্য তার সীমানায় কোনোভাবে এনকোড হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। এটি নিছক কল্পকাহিনি নয়; কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপি এবং কোয়ান্টাম মহাকর্ষের গবেষণা থেকেই ধারণাটি শক্তিশালী হয়েছে।
তারপর এল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়— ‘পেজ কার্ভ’।
১৯৯০-এর দশকে ডন পেজ দেখিয়েছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের বিকিরণের এনট্রপি কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া উচিত—যদি শেষ পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। শুরুতে বিকিরণের এনট্রপি বাড়বে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর তা আবার কমতে হবে। এই বাঁকটাই পরিচিত ‘পেজ কার্ভ’ নামে।
সহজ করে বললে, কৃষ্ণগহ্বর প্রথমে যেন তথ্যকে এলোমেলো করে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিকিরণের সূক্ষ্ম পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে সেই তথ্য ফিরে আসতে শুরু করার কথা।

সাম্প্রতিক দশকে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে ‘রেপ্লিকা ট্রিক’, ‘গ্র্যাভিটেশনাল পাথ ইন্টিগ্রাল’ এবং ‘রেপ্লিকা ওয়ার্মহোল’-এর মতো পদ্ধতি। ২০২১ সালের একটি বিশদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, হকিং বিকিরণের সূক্ষ্ম এনট্রপি গণনায় এমন সংশোধন পাওয়া যায়, যা ইউনিটারি কৃষ্ণগহ্বর-বাষ্পীভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘পেজ কার্ভ’ পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবশ্যই দরকার। এর অর্থ এই নয় যে পদার্থবিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বরের রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান পেয়ে গেছেন। বরং আমরা এমন কিছু গণনাগত কাঠামো পেয়েছি, যা তথ্য সংরক্ষিত থাকার ছবির সঙ্গে মেলে। কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রীয় সিঙ্গুলারিটিতে আসলে কী ঘটে, অথবা কীভাবে ভেতরের জ্যামিতি ও বাইরের কোয়ান্টাম তথ্যের সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে—এসব প্রশ্ন এখনো গবেষণার বিষয়। জোসেফ পলচিনস্কির পর্যালোচনাতেও তথ্য-বৈপরীত্যকে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের অসম্পূর্ণ বোঝাপড়ার একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আর এখানেই বিষয়টি তরুণদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়।
আমরা প্রায়ই মনে করি বিজ্ঞান মানে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর, যেগুলোর উত্তর বইয়ের শেষ পাতায় লেখা আছে। কিন্তু প্রকৃত বিজ্ঞান অনেক সময় ঠিক উল্টো। একটি ভালো উত্তর আরও ভালো প্রশ্ন তৈরি করে।
কৃষ্ণগহ্বর আমাদের এমনই একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
যদি তথ্য হারিয়ে যায়, তাহলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মৌলিক নিয়ম নিয়ে আমাদের ধারণায় সমস্যা আছে। আর যদি তথ্য হারিয়ে না যায়, তাহলে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর ও বাইরে স্থান, সময় এবং তথ্যের সম্পর্ক সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণায় নিশ্চয়ই কিছু অসম্পূর্ণতা আছে।
অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রেই আমাদের পুরোনো মানচিত্রে একটি ফাঁকা জায়গা রয়েছে।
এই কারণেই কৃষ্ণগহ্বরের তথ্য-বৈপরীত্য শুধু একটি দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুর সমস্যা নয়। এটি আসলে একটি আরও বড় প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়: ‘বাস্তবতার সবচেয়ে মৌলিক উপাদান কী—পদার্থ, স্থান, সময়, নাকি তথ্য?’
হয়তো একদিন আমরা আবিষ্কার করব, এগুলো একে অপরের থেকে আলাদা কোনো জিনিস নয়। হয়তো স্থান ও সময়ও কোনো গভীরতর কোয়ান্টাম কাঠামো থেকে উদ্ভূত। আর কৃষ্ণগহ্বর—যে বস্তুটিকে একসময় মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ধ্বংসযন্ত্র বলে মনে হতো—হয়তো সেই গভীর কাঠামোরই সবচেয়ে পরিষ্কার সংকেত বহন করছে।
মহাবিশ্ব তখন আর শুধু নক্ষত্র, গ্রহ ও গ্যালাক্সির সমষ্টি থাকবে না। সেটি হয়ে উঠবে এক বিশাল তথ্যব্যবস্থা, যেখানে কোনো ঘটনা পুরোপুরি মুছে যায় কি না—এই আপাত সরল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা বাস্তবতার প্রকৃত অর্থের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।
কৃষ্ণগহ্বর তাই হয়তো মহাবিশ্বের স্মৃতি মুছে ফেলার যন্ত্র নয়।
হয়তো বরং সে আমাদের শেখাচ্ছে—‘মহাবিশ্ব কোনো তথ্য সত্যিই হারাতে দেয় কি না, সেটিই এখনো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









