কোরআন মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ আসমানি কিতাব। এই কিতাবের একাধিক আয়াতে মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করা হয়েছে।
এসব সম্বোধন দ্বারা যেমন শুধু তাঁকেই উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে আবার কখনো কখনো তাঁকে সম্বোধন করে উম্মতকে নির্দেশ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোরআনে মহানবী (সা.)-কে করা সম্বোধন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কোরআনের সম্বোধনের প্রকারগুলো
আল্লামা ইবনুল আরাবি (রহ.) কোরআনের সম্বোধনের বিন্যাস তুলে ধরে বলেন, ‘কোরআনের সম্বোধন এক ধরনের নয়, বরং তা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে তিনটি আমাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তা হলো :
১. উম্মতের সবাই উদ্দেশ্য: যেসব আয়াতে আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদির সবার উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)
২. শুধু নবী (সা.) উদ্দেশ্য: যেসব আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে খাস হওয়ার ইঙ্গিত থাকে। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
৩. সম্বোধন নবী (সা.)-কে, উদ্দেশ্য সবাই: যেসব আয়াতের বক্তব্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা উম্মতের সবাইকে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তুমি কোরআন তিলাওয়াত করবে, তখন অভিশপ্ত শয়তানের কাছ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৮; আহকামুল কোরআন : ২/৯৯৫)। উল্লিখিত তিন প্রকারের পাশাপাশি আরো কয়েক প্রকারের সম্বোধন পাওয়া যায়। যেমন—
৪. সমগ্র মানবজাতি উদ্দেশ্য: আল্লাহ কোনো কোনো আয়াতে সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
৫. আহলে কিতাবদের সম্বোধন, উদ্দেশ্য সবাই: অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে তাদের প্রশংসা বা নিন্দা করেছেন। যেন মুমিনরা তা করে অথবা তা থেকে বিরত থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে কিতাবিরা! তোমরা কেন আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করো, যখন তোমরাই সাক্ষ্য বহন করো? হে কিতাবিরা! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো এবং সত্য গোপন করো, যখন তোমরা জানো?’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭০-৭১)
নবী (সা.)-কে করা সম্বোধনের বিধান
পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করা হয়েছে তার বিধান সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘নবী (সা.)-কে সম্বোধন করা মানে তাঁর উম্মতকে সম্বোধন করা, যদি না এমন কোনো দলিল থাকে যাতে বোঝা যায় এই সম্বোধন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষায়িত।’
(আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম : ২/৪০৩)
যে সম্বোধন শুধু নবীর জন্য
কোরআনের যেসব সম্বোধন শুধু মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষায়িত তা তিন প্রকার। তা হলো—
১. নির্দিষ্ট হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকা: যেসব আয়াতে সম্বোধন বা বিধান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষায়িত হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে, তা শুধু তাঁর জন্য প্রযোজ্য হবে। যেমন—আল্লাহ বলেছেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।’(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)। আয়াতে ‘এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য’ বাক্য থেকে বোঝা যায় বিধানটি মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষায়িত।
২. নবুয়তবিষয়ক দায়িত্ব: যে আয়াতে নবুয়ত ও রিসালাত বিষয়ক দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হয় তা নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে খাস। যেমন আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে রাসুল! তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করো; যদি না করো তবে তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)
৩. বিশেষ বিধান: আল্লাহ তাআলা তার নবীকে বিশেষ কিছু অবকাশ ও বিধান দান করেছিলেন। এসব বিধানসংক্রান্ত আয়াতে নবীজি (সা.)-কে যে সম্বোধন করা হয়, তা শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গেই বিশেষায়িত বলে গণ্য হবে। যেমন—চারের অধিক বিয়ে করার অনুমতি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদের, যাদের মোহর তুমি প্রদান করেছ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫০)। আল্লাহ সবাইকে সিরাতে মুস্তাকিম দান করুন। আমিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









