ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। কিন্তু ইসলাম একজন মুসলিমের জন্য শুধু আধ্যাত্মিক জীবন নয়, অর্থনৈতিক জীবনেও স্পষ্ট হালাল-হারামের নির্দেশনা প্রদান করেছে। তাই আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার আলোকে মুসলিম সমাজে অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন হলো, ব্যাংকে টাকা রাখা হালাল নাকি হারাম? কোরআনের আলোকে বিশ্লেষণ: আল্লাহ তাআলা ধাপে ধাপে সুদকে (রিবা) নিষিদ্ধ করেছেন।
১। প্রথম ধাপ: তুমি যা সুদ হিসেবে দাও মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির আশায়, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। (সূরা রূম ৩০:৩৯)
২। দ্বিতীয় ধাপ: হে মুমিনগণ! তোমরা সুদ খেয়ো না, দ্বিগুণ-তিগুণ করে, আর আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফল হতে পারো। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩০)
৩। তৃতীয় ধাপ: পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। (সূরা নিসা ৪:১৬১)
৪। চূড়ান্ত ধাপ: হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট রয়েছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও। আর যদি তোমরা তা না করো তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। (সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৮-২৭৯)। সুস্পষ্ট হলো, সুদভিত্তিক অর্থনীতি কোরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ: রাসূল (সাঃ) সুদভিত্তিক লেনদেনের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
১। সুদে জড়িত সবার অভিশাপ: আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, সুদ লিখনকারী ও সুদের সাক্ষী, সকলের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮)
২। লেনদেনে সমতা বাধ্যতামূলক: সোনা বিনিময়ে সোনা, রূপা বিনিময়ে রূপা সমান সমান ও হাতে হাতে হবে; যে বাড়তি নেবে বা দেবে, সে রিবা করেছে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৫৮৪)। শুধু সুদ খাওয়া-খাওয়ানো নয়, বরং এর সঙ্গে সামান্য সম্পৃক্ততাও গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
ফিকহি মাজহাবসমূহের মতামত
হানাফি: প্রয়োজনে আমানত হিসেবে টাকা রাখা জায়েয, তবে সুদ গ্রহণ করা হারাম।
শাফেয়ি: সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখা মাকরূহ তাহরীমি, তবে চরম প্রয়োজনে অনুমোদিত।
মালিকি: সুদকে বৈধ ভাবা কুফরি, এবং এর সঙ্গে জড়িত থাকা গুনাহ।
হাম্বলি: সুদের সঙ্গে সামান্য সহযোগিতাও হারাম; কেবল নিরাপত্তার কারণে রাখা গেলে অনুমোদিত।
সমসাময়িক আলেমদের অভিমত: শায়খ ইউসুফ আল-ক্বারদাবি (রহ.): প্রচলিত ব্যাংক সুদভিত্তিক হওয়ায় সুদ নেওয়া হারাম; তবে নিরাপত্তার কারণে টাকা রাখা জায়েয।
শায়খ ইবনে বায (রহ.): অর্থ নিরাপত্তার জন্য রাখা অনুমোদিত, তবে সুদ গ্রহণ করা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমতুল্য।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.): প্রচলিত ব্যাংক সুদনির্ভর, তাই ইসলামী ব্যাংক বা শরিয়াভিত্তিক অর্থব্যবস্থা একমাত্র হালাল পথ।
ব্যাংকের টাকা রাখা হালাল না হারাম?
১। প্রচলিত ব্যাংক (Conventional)
সুদ গ্রহণ করা স্পষ্ট হারাম।
কেবল নিরাপত্তার জন্য রাখা গেলে জায়েয, তবে সুদ এড়িয়ে চলতে হবে।
২। ইসলামী ব্যাংক (Shariah-based)
শরীয়া বোর্ড দ্বারা অনুমোদিত হওয়ায় এখানে টাকা রাখা হালাল।
মুনাফা গ্রহণ বৈধ, কারণ তা ব্যবসার প্রকৃত লাভ, সুদ নয়।
হালালভাবে টাকা রাখার উপায়
১. ইসলামী ব্যাংকে হিসাব খোলা।
২. প্রয়োজনে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবহার করলে সুদ গ্রহণ না করা।
৩. ব্যাংক প্রদত্ত সুদকে গরিব-মিসকিনদের দিয়ে দেওয়া (সওয়াবের নিয়ত ছাড়া)।
৪. টাকা রাখার নিয়ত হবে নিরাপত্তার জন্য, সুদ অর্জনের জন্য নয়।
সুদ থেকে বিরত থাকা ঈমানের দাবি।
ইসলামী ব্যাংকিংকে সমর্থন করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল পথে সম্পদ সুরক্ষিত রাখা উত্তম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









