ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে গাজীপুরে সংঘর্ষে আহত হয়ে পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে সাভারের আশুলিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে জিরাবো এলাকায় এসে জড়ো হন পোশাকশ্রমিকেরা। বিক্ষোভ শেষে বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর চালান তারা। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ৭০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে, টানা পাঁচদিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের পর গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক।
আশুলিয়া: জিরাবো থেকে দুই-আড়াই হাজার শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে মিছিল বের করেন। মিছিলটি ঘোষবাগ, নরসিংহপুর ও সরকার মার্কেট হয়ে বেরন এলাকার এনভয় গার্মেন্টসের সামনে শেষ হয়। এর আগে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জামগড়া এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরাও কাজ না করে আব্দুল্লাহপুর–বাইপাইল সড়কে এসে জড়ো হন। এ সময় তারা অন্যান্য কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেন। ধাওয়া দিয়ে কয়েকজনকে আটকের চেষ্টা করলে তারা পুলিশের ওপর হামলার চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ ঘটনার পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কায় আশুলিয়ার ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল আটটার দিকে আশুলিয়ার আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা প্রবেশ করে কার্ড পাঞ্চের মাধ্যমে হাজিরা নিশ্চিত করেন। তবে, তাঁরা কাজ বন্ধ করে কারখানায় বসে থাকেন। পরে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলে সকাল সাড়ে আটটার দিকে জামগড়া এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। পুলিশ তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একটি গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। পরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সাভার ও আশুলিয়ার পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। তবে কিছু জায়গায় অস্থিতিশীলতার শঙ্কা থাকায় এবং কিছুটা অস্থিতিশীল হওয়ায় এসব এলাকার এক হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সকালে জামগড়া এলাকায় কারখানা ছুটির পর কিছু দুষ্কৃতকারী কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছে। সেখান থেকে কয়েকজনকে ধরার পর তাঁরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেন।
অন্যদিকে, সকাল থেকে আশুলিয়ার দোসাইদ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ওই এলাকার ‘ফেব্রিকা নিট কম্পোজিট’ কারখানার সামনে ৪০০-৫০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে কারখানার দুটি ফটক ভেঙে ফেলেন। এ পরিস্থিতিতে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে আশেপাশের কয়েকটি কারখানায়ও ছুটি দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের এখানে এই কয়দিন সুন্দরভাবে কাজ চলছিল। কোনো ঝামেলা হয় নাই। গতকাল দেড় শ লোক আসছিল। আমরা ওদের গেট থেইকা সরাইয়া দিছিলাম। কিন্তু আজকে প্রিপারেশন নিয়া আসছিল। প্রায় ৫০০ লোক আইসা দুইটা গেইট ভাঙছে। কারখানা ছুটি দিলে শ্রমিকেরা বের হলে তারা চইলা গেছে। পরে আশেপাশের কারখানাও ছুটি দিয়া দিছে।’
কারখানা ছুটির পর কারখানার বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত না হলে পিটুনি খেতে হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কয়েকজন শ্রমিক। জামগড়া এলাকার একটি কারখানার শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সকালে আমরা সবাই কাজ শুরু করছি। তহন বাইরে থেইকা পোলাপান আইসা যেই ঢিল শুরু করছে, মালিকে ছুটি দিয়া দিল।’ তিনি বলেন, ‘ছুটির পর ওগো লগে না গেলে মারে। গতকাল আমাকেও মারবার নিছিল। পরে গেছিলাম; খানিক পর পাশ কাইট্টা বাসায় চইলা আসছি।’
এদিকে সকাল সাড়ে দশটার দিকে সাভারের রেডিও কলোনী, হেমায়েতপুর এলাকা ঘুরে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন কারখানার সামনে এবং কারখানা–সংলগ্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদেরও দেখা যায়। বেলা ১র দিকে সাভারের জোরপুল এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। বিজিবির ঢাকা ব্যাটালিয়নের (৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈমুর হাসান খান বলেন, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের পরিস্থিতি ভালো। এখন পর্যন্ত নাশকতার ঘটনা কোথাও হয় নি। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। সাভার ও আশুলিয়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আশুলিয়ায় ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকা জেলার এসপি শামীমা পারভীনকে সঙ্গে নিয়ে ডিআইজি বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী শ্রমিকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। গত ৩-৪ দিন ধরেই এ বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। আশুলিয়া ও সাভার থানায় ২৫-৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কেউই শ্রমিক নন। এ-সংক্রান্ত চারটি মামলা হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। ডিআইজি বলেন, শ্রমিকেরা কারখানা, রাস্তাঘাট ও নিজেদের আবাসস্থল—সব জায়গায় নিরাপত্তা পাবেন। ইতিমধ্যে শ্রমিকদের আবাসস্থলে পুলিশ টহল দিচ্ছে। পাশাপাশি কারা শ্রমিকদের ভয় দেখাচ্ছে এবং তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর: এদিকে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। গতকাল কোথাও শ্রমিক আন্দোলনের খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যান চলাচলও স্বাভাবিক আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের টহল দিতে দেখা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরাও অবস্থান নিয়ে আছেন।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের যেসব এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকায় বাড়তি নজরদারি করছে গাজীপুর শিল্প পুলিশ। জেলায় কতটি কারখানা বন্ধ আছে, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে যেসব কারখানায় আগেই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলো বন্ধ আছে। শিল্প পুলিশের এসপি মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, মহাসড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সচেষ্ট আছে। জেলার অনেক কারখানা আগে থেকে ছুটি ঘোষণা করায় গতকাল সেগুলোও বন্ধ ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ১০ প্লাটুন আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার প্লাটুন প্লাটুন এবং গতকাল নারায়ণগঞ্জ থেকে আরও চার প্লাটুন আনসার মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
দুপুরে গাজীপুরের সফিপুরে আনসারের প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। আনসারের থানা ও ওয়ার্ডভিত্তিক জনবল থেকে তাঁরা দুষ্কৃতকারী কারা, কোথায় কী পরিকল্পনা করছে—জানতে পারছেন। দুষ্কৃতকারীরা যাতে জানমালের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য আনসার ব্যাটালিয়ন কাজ করছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









