সুরে-ছন্দে এক অনন্য সাধক দিলীপ কুমার রায়। নাট্যকার, সঙ্গীতস্রষ্টা ও বিশিষ্ট কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপ কুমার রায় আজও বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য নাম। আজ এই বহুমাত্রিক শিল্পীর ১২৯তম জন্মবার্ষিকী।
১৮৯৭ সালের ২২ জানুয়ারি নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন দিলীপ কুমার রায়। শৈশবেই হারান মাকে। এরপর বাবার স্নেহচ্ছায়ায় বড় হলেও সেই আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জীবনের কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হন তিনি।
১৯১৮ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অঙ্কে অনার্সসহ বি.এ পাশ করে তিনি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কে ট্রাইপসের প্রথম ভাগে উত্তীর্ণ হন। এই সময়েই পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ জন্মায় তাঁর। লন্ডনে পিয়ানো শেখেন, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রথম ভাগ পাশ করেন। এরপর জার্মানি ও ইতালীয় সঙ্গীত শেখার জন্য যান বার্লিনে।
১৯২২ সালে দেশে ফিরে আসেন দিলীপ কুমার রায়। তখন তাঁর মনে প্রবলভাবে দানা বাঁধে ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও পরম্পরা অন্বেষণের বাসনা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডের মতো কিংবদন্তিদের কাছে।
পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শিক্ষা ও ভারতীয় সুরের মেলবন্ধনে তিনি নির্মাণ করেন এক স্বতন্ত্র ধারা।
সুরের নেশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের নানা প্রান্তে। সংগ্রহ করেছেন লোকসঙ্গীতের বিপুল ভাণ্ডার। বাঈজি কুঠিতেও গিয়েছেন সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা উপলব্ধি করতে। নিজেই বলতেন,“আমি যা অনুভব করি, তা-ই গাই।”
এই অনুভব থেকেই জন্ম নেয়, যদি দিয়েছ বাঁধুয়া, বঙ্গ আমার জননী আমার, জীবনে মরণে এসো, ওরা জানে না তাই মানে না এর মতো কালজয়ী গান।
দিলীপ কুমার রায় সঙ্গীতে গড়ে তুলেছিলেন একটি নিজস্ব ঘরানা, যা অনেক সঙ্গীতজ্ঞ ‘দৈলিপী ঢং’ নামে অভিহিত করেন। তিনি শুধু নিজের গানই নয়, গাইতেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলাম, হিমাংশুকুমার দত্ত প্রমুখের সৃষ্টিও। বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তাঁকে অনায়াসেই গণ্য করা যায়।
১৯২৮ সালে ঋষি অরবিন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে পন্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমে আশ্রয় নেন দিলীপ কুমার রায়। নিজের বসতবাড়ি ও সমস্ত সম্পত্তি দান করেন আশ্রমে।
দিলীপ কুমার রায়ের রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। সুরবিহার, হাসির গানের স্বরলিপি, গীতমঞ্জরী, দ্বিজেন্দ্রগীতি, মনের পরশ (১৯২৬), দুধারা (১৯২৭), দোলা (২ খণ্ড, ১৯৩৫),আপদ ও জলাতঙ্ক (১৯২৬), সাদাকালো (১৯৪৪), শ্রীচৈতন্য (১৯৪৮), আমার বন্ধু সুভাষ, উদাসী দ্বিজেন্দ্রলাল, শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে দিলীপ কুমার রায়ের বন্ধুত্ব ছিল গভীর ও অটুট। আমার বন্ধু সুভাষ গ্রন্থে সেই সম্পর্কের আন্তরিক দলিল পাওয়া যায়।
কলকাতার সংস্কৃত আকাদেমি দিলীপকুমার রায় কে “সুরসুধাকর” উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমীর ফেলোশিপ সম্মানে সম্মানিত হন।
দিলীপ কুমার রায় জন্মেইছিলেন তাঁর রক্তে সুর ও সংগীত নিয়ে। সংগীতের এই মহীরূহ ১৯৮০ সালের ৬ই জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
এমন একজন সুরকার, গীতিকার, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, অনুবাদক ও সুর-সংগ্রাহক ইতিহাসের পাতায় অমলিন ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









