বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও অভিনয় জগতের এক শক্তিমান অভিনেতা অমল বোস। অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কৌতুক, খলচরিত্র কিংবা মানবিক চরিত্র সব ধরনের ভূমিকায় সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একজন গুণী ও দক্ষ অভিনেতা হিসেবে তিনি অর্জন করেছিলেন সম্মানজনক স্বীকৃতি।
আজ এই প্রখ্যাত শিল্পীর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের ২৩ জানুয়ারি, ৬৯ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। প্রয়াণ দিবসে এই গুণী শিল্পীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
অমল বোস জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ১১ অক্টোবর, ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলায়। অভিনয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তার শিল্পীজীবনের সূচনা। ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি ক্লাব থিয়েটারের মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। মঞ্চনাটকের পাশাপাশি তিনি নাটক পরিচালনাও করতেন। তাঁর নির্দেশনায় নুরুল মোমেন রচিত ‘আলো ছায়া’ নাটক সে সময় দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি ‘অবসর’, ‘সপ্তরূপা’, ‘শৈবাল’ ও ‘রংধনু’ নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
১৯৬৫ সালে ইবনে মিজান পরিচালিত ‘একালের রূপকথা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় ও আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে—‘রাজা সন্ন্যাসী’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘আলোর মিছিল’, ‘মহুয়া’, ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘রাজকন্যা’, ‘মহানায়ক’, ‘ফুলশয্যা’, ‘গুনাই বিবি’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘রঙ্গীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘আজকের প্রতিবাদ’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, ‘জল্লাদ’, ‘হাছনরাজা’, ‘এক টাকার বউ’, ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ‘শ্বশুর বাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘কোটি টাকার কাবিন’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পরিচালনায়ও হাত দেন। ১৯৭৫ সালে ‘কেন এমন হয়’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন অমল বোস, যা তার বহুমাত্রিক শিল্পীসত্তার প্রমাণ।
অভিনয় নৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম নির্মিত ‘আজকের প্রতিবাদ’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
চলচ্চিত্রের বাইরেও তার অভিনয় বিচরণ ছিল বিস্তৃত। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও বিজ্ঞাপনচিত্র সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রচারিত বিশেষ নাটিকায় দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ‘অসুর’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ‘জাতীয় মহিষাসুর’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। জন্মাষ্টমীর নাটিকায় ‘কংস’ চরিত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য।
এছাড়া হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-র ‘নানা-নাতি’ পর্বে ‘নানা’ চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে এবং তাকে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে।
ব্যক্তিজীবনে অমল বোস বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন স্বাতী বোসের সঙ্গে। তাঁদের একমাত্র কন্যা মন্দিরা বোস। অভিনয়ের পাশাপাশি পেশাগত জীবনে তিনি জুট মিলস কর্পোরেশনের একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৫ সালে চাকরি জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অমল বোস ছিলেন একজন প্রকৃত অর্থেই প্রতিভাবান ও মেধাবী অভিনেতা যিনি অভিনয়ের সব মাধ্যমেই নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









