মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যিনি বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্য, নাটক, সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। আজ থেকে দুই শতাব্দী আগে ১৮২৪ সালের এই দিনে যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি বাংলা নবজাগরণ সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি নির্মাণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের নতুন পথ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর এই মহান কবি একাধারে ছিলেন কবি, নাট্যকার, প্রহসন রচয়িতা ও বহুভাষাবিদ। প্রচলিত কাব্যরীতি ও নাট্যধারাকে অস্বীকার করে পাশ্চাত্য ভাবধারা ও শিল্পচেতনার আলোকে বাংলা সাহিত্যকে নতুন দিশা দেখান তিনি। এই কারণেই তাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মধুসূদনের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে। তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের একজন খ্যাতনামা উকিল এবং মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন বিদুষী ও সংস্কৃতিমনা নারী। মধুসূদন ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
শৈশবে মায়ের কাছেই তার শিক্ষাজীবনের সূচনা। জাহ্নবী দেবীর কাছেই তিনি রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তিনি বাংলা, ফারসি ও আরবি ভাষা শিক্ষা করেন। সাগরদাঁড়িতেই কাটে তার শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময়।
কৈশোরে কলকাতায় এসে তিনি তৎকালীন হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। অসাধারণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তির কারণে অল্প সময়েই কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি. এল. রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। রিচার্ডসনই তার মনে গভীরভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও কাব্যপ্রীতির বীজ বপন করেন।
এই সময় হিন্দু কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর স্বদেশানুরাগ ও মুক্তচিন্তার স্মৃতিও তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। সহপাঠী হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক ও প্যারীচরণ সরকারের মতো ভবিষ্যতের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারকদের। অল্প বয়সেই তার মনে মহাকবি হওয়ার স্বপ্ন ও বিলাতে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দৃঢ় হয়ে ওঠে।
১৮৪৩ সালে মধুসূদন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘মাইকেল’ নাম গ্রহণ করেন। এর ফলে তাঁর পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। সমাজে এই ধর্মান্তর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর তিনি শিবপুরের বিশপস কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং সেখানে গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন।
পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আকর্ষণে তিনি প্রথমে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। চাকরি ও জীবিকার সন্ধানে তিনি মাদ্রাজে যান। সেখানে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৮৪৯ সালে তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি রচনা করেন তার প্রথম ইংরেজি কাব্য দ্য ক্যাপটিভ লেডি, যা তাকে ইংরেজি লেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
মাদ্রাজে অবস্থানকালে তিনি ১৮৪৮ সালে রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ তরুণীকে বিবাহ করেন। এই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ১৮৫৬ সালে তিনি ফরাসি তরুণী এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়াকে বিবাহ করেন।
১৮৫৬ সালে জে.ই.ডি. বেথুনের পরামর্শে মধুসূদন বাংলায় ফিরে আসেন এবং মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এই সময়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) প্রবর্তন করেন।
১৮৬০ সালে প্রকাশিত মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী ঘটনা। রামায়ণের প্রচলিত নায়ক-খলনায়ক ধারণা ভেঙে তিনি মেঘনাদকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব, ব্রজাঙ্গনা ও বীরাঙ্গনা কাব্য যা বাংলা কাব্যের রূপ ও ভাষাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়।
সংস্কৃত নাট্যের অনুকরণ থেকে বাংলা নাটককে মুক্ত করে পাশ্চাত্য নাট্যরীতির আলোকে আধুনিক বাংলা নাটকের সূচনা করেন মধুসূদন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রচনা করেন শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, কৃষ্ণকুমারী নাটক এবং প্রহসন একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ।
আইন ব্যবসায় তিনি প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। অমিতব্যয়ী স্বভাবের কারণে জীবনের শেষ পর্বে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর সমাধিস্থলে অমর পঙ্ক্তি আজও বাঙালিকে থমকে দেয়-
“দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী ‘জাহ্নবী'।”
দুই শতাব্দী পরেও মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় নাম একজন বিদ্রোহী কবি, এক মহাকাব্যের স্রষ্টা, এক চিরকালীন নবজাগরণের প্রতীক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









