ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যে কয়েকজন বিপ্লবী চিন্তানায়ক দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছিলেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় বা এম. এন. রয় তাঁদের অন্যতম। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রহণ করেছিলেন অসংখ্য ছদ্মনাম- মি. মার্টিন, হরি সিং, ডা. মাহমুদ, মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জী ইত্যাদি। তবে ইতিহাসে তিনি সর্বাধিক পরিচিত মানবেন্দ্রনাথ রায় বা এম.এন.রয় নামেই। তাঁর জন্মনাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
১৮৮৭ সালের ২১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার আড়বেলিয়া গ্রামে এক শাক্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। বিপ্লবী চিন্তা, দার্শনিক মনন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েনে ভর করে গড়ে ওঠা এই মানুষটি ১৯৫৪ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রয়াত হন। আজ তাঁর ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (বর্তমান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাদবপুরের বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে প্রকৌশল ও রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। ঠিক সেই সময় থেকেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে একবার গ্রেপ্তার হলেও প্রমাণের অভাবে মুক্তি পান। মজফরপুর ও মুরারীপুকুর মামলায় বহু বিপ্লবী বন্দি হলে বাঘা যতীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন। বিপ্লবের স্বার্থে দেশ-বিদেশে যোগাযোগ স্থাপনের কাজও তখন থেকেই শুরু হয়।
আমেরিকায় অবস্থানকালে তিনি গভীরভাবে মার্কসবাদ অধ্যয়ন শুরু করেন এবং সোস্যালিস্ট ভ্রাতৃসংঘের প্রথম ভারতীয় সদস্য হন। পরবর্তীতে মেক্সিকোতে সোস্যালিস্ট পার্টির আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে একজন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর মেধা ও বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ লেনিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, যা ভারতীয় বাম রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদিও লেনিনের উপনিবেশ বিষয়ক থিসিসের সঙ্গে তাঁর কিছু মৌলিক মতভেদ ছিল। তিনি নিজের স্বাধীন থিসিস পেশ করেন এবং মস্কোয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় অবনী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন’।
লেনিনের মৃত্যুর পর ১৯২৪ সালে তাঁকে চীনে পাঠানো হয়। সেখানে বোরোদিনের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে তাঁকে চীন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর আদর্শগত বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯২৯ সালে তাঁকে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কমিউনিজম থেকে সরে এসে তিনি মানবকেন্দ্রিক নতুন চিন্তাধারার দিকে অগ্রসর হন, যা পরিচিত হয় ‘র্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম’ বা আমূল মানবতাবাদ নামে। ১৯৩৭ সালে তিনি কংগ্রেসের ভেতরে ‘লিগ অব র্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন’ গঠন করেন এবং ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’। একই বছরে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন।
এই সময় সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর চিন্তাগত বিতর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানবেন্দ্রনাথ রায় বিশ্বাস করতেন, ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার আগে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। অপরদিকে সুভাষচন্দ্র বসু যে কোনো মূল্যে দ্রুত রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলেন। তবে আদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল।
মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন বহুভাষাবিদ। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি স্প্যানিশ, জার্মান, ফরাসি সহ মোট ১৭টি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬৭টি এবং পুস্তিকার সংখ্যা প্রায় ৩৯টি।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘নিউ হিউম্যানিজম’ (১৯৪৭), ‘রেভলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন চায়না’, ‘রিজন, রোমান্টিসিজম অ্যান্ড রেভলিউশন’ এবং মৃত্যোত্তর প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘মাই মেমোয়ার্স’ (১৯৬৪)।
বিপ্লবী কর্মী থেকে দার্শনিক মানবতাবাদী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের জীবন এক অনন্য বৌদ্ধিক অভিযাত্রা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









