বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, সুপ্রিয়া দেবী তাঁদের অন্যতম। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক অনন্য অভিনেত্রী হিসেবে। সুপ্রিয়া দেবী নামে পরিচিত হলেও তাঁর আসল নাম ছিল কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। পারিবারিক ডাকনাম ছিল ‘বেনু’। এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
১৯৩৩ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) মিয়িত্কিনা শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুপ্রিয়া দেবীর পরিবার ভারতে চলে আসে এবং দক্ষিণ কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
কলকাতায় তাঁদের প্রতিবেশী ছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী চন্দ্রবতী দেবী। সুপ্রিয়া দেবী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে চন্দ্রবতী দেবীর ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, যা পরবর্তীকালে সুপ্রিয়ার অভিনয়জীবনের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
অভিনয় জগতে সুপ্রিয়া দেবীর অভিষেক ঘটে মাত্র সাত বছর বয়সে। তিনি তাঁর বাবার পরিচালিত দুটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই নৃত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। নাচে দক্ষতার জন্য তিনি ‘থাকিন নু’ থেকে পুরস্কারও অর্জন করেন। কলকাতায় আসার পরও তিনি নিয়মিত নাচের চর্চা চালিয়ে যান এবং গুরু মুরুথাপ্পান ও পরবর্তীতে গুরু প্রহ্লাদ দাসের কাছে নৃত্যশিক্ষা গ্রহণ করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে সুপ্রিয়া দেবী অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সফল হিসেবে বিবেচিত। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে— মেঘে ঢাকা তারা, চৌরঙ্গি, বসু পরিবার, সোনার হরিণ, উত্তরায়ণ, কোমল গান্ধার, দেবদাস, দুই পুরুষ, সন্ধ্যা রাগ, সন্ন্যাসী রাজা, যদি জানতেম, বাঘবন্দী খেলা, বনপলাশীর পদাবলী, চিরদিনের, শেষ ঠিকানা, হানিমুন, ইমান কল্যাণ, সবরমতী, কাল তুমি আলেয়া, ছিন্নপত্র, কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, মন নিয়ে প্রভৃতি।
ব্যক্তিজীবনে সুপ্রিয়া দেবী ১৯৫৪ সালে বিশ্বনাথ চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র কন্যা সোমা। ১৯৬৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর গিরীশ মুখার্জি রোডের পৈতৃক বাসভবন থেকে উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। লোকনিন্দা, অপবাদ সবকিছু মাথা পেতে নিয়েও জীবনের সতেরটি বছর একসঙ্গেই বসবাস করে গেছেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। আইনত বিয়ে করতে পারেননি কিন্তু বিবাহিত দম্পতির মতোই পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন তারা। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি এবং উত্তম কুমার একসাথে বসবাস করেন। উত্তম কুমারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার পাশে ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘বঙ্গভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও ২০১৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে।
২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি কলকাতায় ৮৫ বছর বয়সে এই গুণী অভিনেত্রী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ও স্মরণীয় অভিনয় আজও দর্শকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









