২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরা এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। ১৯৮০ সালে প্রথমবার বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়। ১৯৭০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার সংবিধি গ্রহণের দিনটিকে স্মরণ করে ২৭ সেপ্টেম্বরকে দিবসটির জন্য বেছে নেওয়া হয়।
২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে পর্যটন খাতেও নতুন ধরনের সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও এবারের দিবসের আয়োজনকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের বড় অবদান
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, পর্যটন এখন শুধু বিনোদন বা ভ্রমণের বিষয় নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন রেকর্ড ১৫০ কোটি ছাড়িয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এটি ৫ শতাংশ এবং ২০১৯ সালের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও প্ররোচিত অর্থনৈতিক অবদান দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান। এ খাত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করেছে।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের হিসাবেও ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে এ খাত ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটনের অবস্থান
বাংলাদেশেও পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটনের মোট দেশজ উৎপাদনে সরাসরি অবদান ছিল প্রায় ৩ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে পর্যটন খাত মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮ দশমিক ০৭ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তবে বাংলাদেশের পর্যটন খাত নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আওতায় পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাব তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান, পর্যটক আগমন, জিডিপিতে অবদান এবং পর্যটকদের ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোর আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান আনুমানিক ২ থেকে ৩ শতাংশ। এটি বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদের কাজও চলছে।
পর্যটন সম্ভাবনায় বাংলাদেশ
সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিস্তৃত। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগানসহ দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।

পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ভ্রমণসেবা ও বিনোদন খাতের পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য, হস্তশিল্প, খুচরা বিক্রিসহ আরও অনেক খাতও পর্যটন ব্যয়ের মাধ্যমে উপকৃত হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাবে দেখা যায়, ২০২০ সালে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয়ের বড় অংশ আবাসন, খাবার ও পানীয় এবং কেনাকাটার মতো খাতে গেছে।
প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে পর্যটন
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পর্যটনের অভিজ্ঞতাকেও পরিবর্তন করছে। অনলাইনে গন্তব্য নির্বাচন, ভ্রমণ পরিকল্পনা, আবাসন ও পরিবহন বুকিং, পর্যটনস্থলের তথ্য পাওয়া থেকে শুরু করে ব্যক্তিভেদে ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত এবং শত শত কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে এ খাতের সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস তাই শুধু ভ্রমণের আনন্দ উদ্যাপনের দিন নয়; পর্যটনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখার দিনও। বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে কীভাবে টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর পর্যটনে রূপ দেওয়া যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









