বাঙালি নাট্যচর্চার উত্তরাধুনিক ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন–এর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৮ সালের এই দিনে বাংলা নাটকের এই মহীরুহ ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণ বাংলা নাট্যাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করে, যা আজও গভীরভাবে অনুভূত।
সেলিম আল দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট, ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে। তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলায় বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ‘মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বিজ্ঞাপন সংস্থা বিটপীতে কপি রাইটারের পদে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে যোগ দেন এবং এই বিভাগকে দেশীয় নাট্যচর্চার এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। অধ্যাপক ও নাট্যকার পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন গবেষক, সংগঠক, নাট্যনির্দেশক ও শিল্পতাত্ত্বিক। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে তিনি ‘ঢাকা থিয়েটার’এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮১–৮২ সালে নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তিনি গড়ে তোলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, যা দেশব্যাপী নাট্যচর্চার এক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তাঁর অনুবাদ ও সম্পাদনায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় নন্দিকেশ্বরের ‘অভিনয় দর্পণ’। গবেষণা গ্রন্থ ‘মধ্যযুগের বাংলা নাট্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘কবি ও তিমি’ (১৯৯০) এবং উপন্যাস ‘অমৃত উপাখ্যান’ (২০০৫) বাংলা সাহিত্যে ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
নাট্যকার হিসেবে সেলিম আল দীনের সৃষ্টিশীলতা ছিল বিস্ময়কর ও বহুমাত্রিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক ও নাট্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— সর্প বিষয়ক গল্প ও অন্যান্য নাটক (১৯৭৩), জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন (১৯৭৫), বাসন (১৯৮৫); তিনটি মঞ্চ নাটক মুনতাসির, শকুন্তলা ও কিত্তনখোলা (১৯৮৬); এছাড়াও কেরামতমঙ্গল (১৯৮৮), চাকা (১৯৯১), হরগজ (১৯৯২), যৈবতী কন্যার মন (১৯৯৩), একটি মারমা রূপকথা (১৯৯৫), বনপাংশুল (১৯৯৬), হাতহদাই (১৯৯৭), প্রাচ্য (১৯৯৮), নিমজ্জন (২০০২), ধাবমান, স্বর্ণবোয়াল (২০০৭), ঊষা উৎসব ও স্বপ্নরমণীগণ (নৃত্যনাট্য, ২০০৭) এবং পুত্র (২০০৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর রচিত হরগজ নাটকটি সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল কর্তৃক হিন্দি ভাষায় মঞ্চস্থ হয়েছে। সেলিম আল দীনের নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা নাটক ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সেলিম আল দীন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নান্দিকার পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।
নাট্যকার সেলিম আল দীন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব, ফিউশন তত্ত্বের প্রবক্তা এবং নিউ এথনিক থিয়েটারের উদ্ভাবনকারী। সেলিম আল দীন ছিলেন কেবল একজন নাট্যকার নন, তিনি ছিলেন বাঙালির নিজস্ব নাট্যভাষা ও নাট্যচিন্তার নির্মাতা। তাঁর সৃষ্টি ও দর্শন আজও বাংলা নাটকের পথচলাকে আলোকিত করে চলেছে। মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









